উপ সম্পাদকীয়

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শিক্ষা শহীদে কারবালা

মো. লোকমান হেকিম প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৯-২০১৯ ইং ০০:৪১:০৯ | সংবাদটি ৬২ বার পঠিত

ইসলাম হলো সত্য ন্যায় এবং শান্তির ধর্ম। মানবতার মুক্তির পথ প্রদর্শক হিসাবে এ ধর্মের যাবতীয় কর্মকান্ড নিয়ে প্রেরিত হয়েছিলেন রাসূল (সা:)। আইয়ামে জাহেলিয়াতের সকল কু-সংস্কার অন্যায়, অবিচার ও অত্যাচারকে বিনাশ করে ইসলামের আলো পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার এক মহান দায়িত্ব দিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শ্রেষ্ঠ নবী হিসাবে দুনিয়ায় পাঠালেন হযরত মুহাম্মদ (সা:)-কে ৫৭০ খ্রীঃ। আরবের মক্কা নগরীর বিখ্যাত কোরাইশ বংশে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। জন্মের পূর্বে পিতা আবদুল্লাহকে এবং জন্মের পরে মাতা আমিনাকে হারান। দাদা আব্দুল মুত্তালিব নিজের মতো করে বড় করে তোলেন। ৪০ বছর বয়সে আরবের মক্কা নগরীর ধনাঢ্য বিবি খাদিজাকে বিবাহ করেন এবং এ সময়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি প্রাপ্ত হন। ৬৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। রাসূল (সা:)-এর ওফাতের পরে হযরত আবু বকর, ওমর, উসমান এবং হযরত আলী (রা:) খলিফা নিযুক্ত হন। হযরত আলী একদিকে যেমনি ছিলেন রাসূলের চাচাত ভাই অন্য দিকে জামাতা। হযরত আলী (রা:)-এর দুই পূত্র ইমাম হাসান এবং ইমাম হোসাইন (রা:)।
শহীদে কারবালার ঐতিহাসিক পটভূমি-হযরত আলী (রা:)এর খিলাফতের সময় হযরত মুয়াবিয়া সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন। দুর্ভাগ্য বশত: হযরত আলী (রা:) -এর নির্মম হত্যাকান্ডের পরে খিলাফতের ধারাবাহিকতা যখন মুয়াবিয়া পর্যন্ত পৌঁছে তখন খেলাফতে রাশেদার জৌলুসের বিলপ্তি ঘটে এবং ধীরে ধীরে তা রাজতন্ত্রে পরিবর্তিত হয়ে পড়ে। তখন হযরত মুয়াবিয়া নিজের বুদ্ধি এবং বিচক্ষণতা দিয়ে দেশ চালাতে থাকেন। হযরত মুয়াবিয়া তার খেলাফতের পরে কাকে খালিফার দায়িত্ব দিবেন এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা শুরু করলেন। এরপর হযরত মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে মদিনার আমীর মারওয়ান মক্কা ও মদীনায় ইয়াজীদের নাম বলা শুরু করেন। এতে করে মক্কা মদিনা এবং শামসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। কারণ ইয়াজীদের স্বভাব চরিত্র এমন ছিলো যে, তাকে সমগ্র ইসলামী সা¤্রাজ্যের খলিফা মেনে নেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। এদিকে হযরত মুয়াবিয়া ৫১ হিজরীতে হিজাজ সফর করেন। সকলের সাথে ইয়াজিদের ব্যাপারে আলোচনা করলে সকলে এর চরম বিরোধীতা করেন। হযরত মুয়াবিয়া এ ব্যাপারে হযরত আয়েশার সাথে আলোচনা করলে হযরত আয়েশাও এর চরম বিরোধিতা করেন এবং হযরত মুয়াবিয়াকে এই মর্মে উপদেশ দেয়া হয় যে, তিনি যেন জোর করে সকলের মতের বিরুদ্ধে কিছু না করেন। আল্লামা ইবনে কাছিরের মতে, হযরত মুয়াবিয়া হযরত আয়েশাকে এ মর্মে আশ্বাস দেন যে, সকলের সাথে তিনি ন¤্র ব্যবহার করবেন এবং বুযুর্গগণের সাথে কঠোর ব্যবহার করবেন না। ন¤্রতার সাথে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিবেন। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হযরত মুয়াবিয়া হযরত আয়েশাকে আশ্বাস দিলেও তিনি পরে তার নিজের কথা নিজেই গুরুত্ব দেননি। পরে হযরত হুসাইন ইবনে সাবা, আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাছ (রা:)-সহ অনেক সাহাবী এবং অসংখ্য বুযুর্গ দ্বীন হযরত মুয়াবিয়াকে এ উপদেশ প্রদান করেন যে, আপনি আপনার ইচ্ছায় কোন সিদ্ধান্ত নিবেন না এবং রাসূল যে নীতি অনুসরণ করেছিলেন সে নীতির অনুসরণ করুন। অর্থাৎ আপনি খেলাফতের জন্য কোন ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করে যাবেন না বরং এটা মুসলমানদের উপর ছেড়ে দিন। আল্লামা ইবনে আসীরের মতে মৃত্যুর পূর্বে হযরত মুয়াবিয়া তার পুত্র ইয়াজীদকে এ মর্মে ওছিয়ত করে যান যে, আমার মনে হয় ইরাকের লোকেরা হুসাইন (রা:)-কে তোমার বিরুদ্ধে আহবান জানাবে, আর যদি; এরূপ হয় যে, এর মোকাবেলাতে তুমি জয়ী হও তাহলে হুসাইনকে তুমি ক্ষমা করবে। কেননা সে রাসূলের আত্মীয়। আর সমগ্র মুসলমানদের উপর তার হক রয়েছে।
মূলত হযরত মুয়াবিয়ার এ কথার আলোকে দেখা যায় যে, তিনি মৃত্যুর পূর্বে তার পুত্রকে খলিফার আসনে আসীন করে গেছেন। হযরত মুয়াবিয়ার ইন্তেকালের পরে ইয়াজিদ সমগ্র আমিরদের কাছে তার খেলাফত মেনে নেয়ার জন্য চিঠি প্রদান করেন। সকলেই তা মেনে নেয় অপরদিকে মদীনার আমীরকে এমর্মে নির্দেশ দেয়া হয় হুসাইনকে বাইয়াত কবুল করাতে। কিন্তু মারওয়ান এতে ব্যর্থ হলে হুসাইনকে ধরার জন্য গোপন ফন্দি আটতে থাকে। তখন সমগ্র ইসলামী সা¤্রাজ্যের অবস্থা এমন যে, কোথাও কোন শান্তি ছিলনা। এদিকে হযরত মুয়াবিয়ার মৃত্যুর খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে কুফাবাসীরা হযরত হুসাইনকে কুফা যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। যার কারণে হিজরী ৬০ সালে ইমাম হুসাইন কুফা অভিমুখে যাত্রা করেন। কিন্তু পথিমধ্যে তিনি ইয়াজিদের সৈন্যবাহিনীর মুখোমুখি হন। সামনা সামানি মুখোমুখি হবার পর ইমাম হুসাইন উপস্থিত সাধারণের উদ্দেশ্যে পর পর চারটি ভাষণ প্রদান করেন। এই ভাষণ সমূহে তিনি আল্লাহ এবং তার রাসূলকে খুশি করার জন্য যে কোন পদক্ষেপ মেনে নিতে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। হযরত হুসাইন কুফায় যাত্রাকালে ইয়াজিদ এ মর্মে ঘোষণা করে যে, ইমাম হুসাইন বাইয়াত গ্রহণ করতে অস্বীকার করলে মুরুভূমির মধ্যে তার পানির সকল ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়া হোক এবং সেপথও বন্ধ করে দেয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে ইমাম হোসাইন (রা:) তিনটি শর্ত করে ইয়াজিদের নিকটে পাঠানোর প্রস্তাব দেন। শর্ত সমূহ-১. আমি যেখান থেকে এসেছি আমাকে সেখানে ফিরে যেতে দেয়া হোক। ২.আমাকে ইয়াজিদের নিকট যেতে দেয়া হোক। আমি আমার সমস্যাসমূূহ তার সামনে পেশ করে সমাধান করবো। ৩.আমাকে মুসলিম জনপদে যেতে দেয়া হোক আমি পূর্বের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করবো। কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন যে, ইমাম হোসাইন শেষের প্রস্তাব ২টি পেশ করেনি। ইবনে জিয়াদ হুসাইনের এ শর্তে খুশি হন। কিন্তু সীমার বললো যে আপনি হোসাইনকে এ সুযোগ দিতে চান যে, সে মদীনা ফিরে গিয়ে আবার শক্তি সঞ্চয় করে বিদ্রোহ করবে। আর আজ সে যদি আপনার হাত থেকে ছুটে যায় তাহলে আপনি তাকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। ইবনে জিয়াদ সীমারের এ প্রস্তাব কবুল করেন এবং এমর্মে ঘোষণা দেন যে, হয় বাইয়াত গ্রহণ করতে হবে অন্যথায় যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোন পথ নাই। অপরদিকে হযরত হোসাইনকে ইবনে সাদ চিঠির মাধ্যমে জানালেন যে আপনার তিনটি শর্ত কোনটাই গ্রহণ হলো না। কারণ সীমার ইবনে জিয়াদকে আপনার বিরুদ্ধে পরামর্শ দিয়েছেন যে, জোর করে বায়াইত গ্রহণ করানো অথবা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে। হযরত হোসাইন (রা), ওমর ইবনে সাদের এ বক্তব্য শুনে বাইয়াত গ্রহণ করে অপমানের চেয়ে সত্য এবং ন্যায়ের জন্য যুদ্ধ করে মরে যাওয়াকে ভালো মনে করলেন।
সীমার ৯ মহররম যুদ্ধের ময়দানে পৌঁছেছিল। এ সময় হযরত হোসাইন নিজ তাবুর সামনে বসে ছিলেন এবং এ অবস্থায় কিছুটা নিদ্রাভাব এলে তিনি দেখতে পেলেন যে, রাসূল (সা.) তাকে বলছেন তোমাদের আমার কাছে আসার সময় হয়ে গেছে। এরপরেই ইমাম হোসাইন সীমারের কাছে প্রস্তাব পাঠান যে, আজ রাত্রে যুদ্ধ না করে একদিন পরে করলে ভালো হয়। কারণ আজকের রাত্রটা যাতে আমি ইবাদত বন্দেগী করে কাটাতে পারি। এই যুদ্ধের ময়দানে বসে ইমাম হোসাইন তার পরিবার বর্গ ও অন্যান্য সাথীদের একত্রিত করে পরপর কয়েকটি ভাষণ প্রদান করেন এবং প্রতি ভাষণেই আল্লাহর এবং তার রাসূলকে খুশি করার জন্য অন্যায় এবং অসত্যের সাথে কোনভাবেই আপোষ না করার জন্য অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। যুদ্ধ এবং ইমাম হোসাইনের শাহাদত -১০ মহররম ইয়াজিদের বাহিনী এবং ইমাম হোসাইনের ক্ষুদ্র বাহিনীর মধ্যে তীর নিক্ষেপ শুরু হয়। বিশাল ইয়াজিদের বাহিনীর কাছে ইমাম হোসাইনের বাহিনী বেশি সময় টিকতে পারলো না। একে একে শাহাদত হতে লাগলো। এরপর সীমার ১০ জন লোক নিয়ে হযরত হোসাইনের দিকে অগ্রসর হয়। হযরত হোসাইন চরম পিপাসায় এবং অগণিত আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও এতই বীর বিক্রমে যুদ্ধ করছিলেন যে দিকেই ইমাম হোসাইন অগ্রসর হতেন সে দিকের শত্রু বাহিনী পালিয়ে যেত। সীমার যখন দেখলো যে কোনভাবেই ইমাম হোসাইনকে পরাজিত করা যাচ্ছে না তখন সকলে একত্রে ইমাম হোসাইনের উপর আক্রমণ করলো। এভাবে একের পর এক মোকাবেলা করতে করতে ইমাম হোসাইন শাহাদত বরণ করলেন। সীমার আওলি ইবনে ইয়াজিদকে নির্দেশ দিলো যে ইমাম হোসাইনের মাথা শরীর থেকে আলাদা করে দিতে। কিন্তু খাওলি তা পারলো না । কারণ তার হাত কেঁপে উঠলো অত:পর অভিশপ্ত সিনান ইবনে আনাছ এ কাজ সমাধান করে। যখন ইমাম হোসাইনের শরীর পর্যবেক্ষণ করা হলো তখন দেখা গেল যে, তার শরীর মোবারকে ৩৩টি বর্শা, ৩৪টি তরবারির আঘাত ছিলো। এছাড়া অসংখ্য তীরের আঘাত। গণনায় দেখা গেল ইমাম হোসাইনের সাথীদের মধ্যে ৭২ জন শহীদ হন এবং ইবনে সাদের/সীমারের বাহিনীর ৮৮ জন নিহত হয়। ইমাম হোসাইনের সাথীদেরকে গাদিসিয়াহবাসী একদিন পরে দাফন করে। ইমাম হোসাইনের খন্ডিত মস্তক ১দিন পরে ইয়াজিদের দরবারে পেশ করা হয়।
শহীদে কারবালার নামকরণের কারণ : ইমাম হোসাইন (রা:) এবং তার পরিবার পরিজন ও সাথীবর্গ নিষ্ঠুর ও পাপিষ্ঠ ইয়াজিদের নির্দেশে সীমারের নেতৃত্বে সিনান কর্তৃক ঐতিহাসিক কারবালার প্রান্তে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয় ১০ মহররম তারিখে।
একারণেই কারবালার ময়দানকে শহীদে কারবালা নামে আখ্যায়িত করা হয়। কারবালার মিক্ষা : ১০ মুহাররম তথা কারবালা আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, অন্যায়-অসত্যের সাথে কোন আপোষ নেই। আল্লাহ প্রদত্ত আইন ও বিধান আল্লাহর জমীনে চলবে। আর এ বিধান চালু করতে গিয়ে জেল-জুলুম, অনেক কিছু, সহ্য করতে হবে। যেমনটি করে গেছেন ইমাম হোসাইন এবং তার সাথীবর্গ। তিনি ইয়াজিদের বেঁধে দেয়া অন্যায়কে কখনো মেনে নেন নি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অল্প সংখক সাথী বর্গ নিয়ে নিষ্ঠুর ইয়াজিদের বাহিনির সাথে কারবালার মাঠে লড়াই করে শাহাদত বরণ করেছেন এবং ন্যায় ও সত্য, সুন্দরকে চির সমুন্নত করে রেখে গেছেন।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • আবাসিক এলাকায় ব্যবসা
  • এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • Developed by: Sparkle IT