উপ সম্পাদকীয়

কারবালার ঘটনা ও কয়েকজন সাহাবীর স্বপ্ন

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৯-২০১৯ ইং ০৪:২৯:৩৪ | সংবাদটি ৩০৮ বার পঠিত

মুহররম মাসের ১০ তারিখ ইসলামের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ইতিহাসের সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাবলি সংঘটিত হয়েছে মুহররম মাসের ১০ তারিখে। মুহররম মাসের ১০ তারিখটি গোটা মুসলিম মিল্লাতের কাছে পবিত্র ‘আশুরা’ নামে পরিচিত। পবিত্র আশুরায় ইসলামের ইতিহাসের সর্বশেষ দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক যে ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে তা হচ্ছে-এই দিনে রাসূল (সা:) এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত হোসাইন (রা:) ও তাঁর পরিবারের ৭২ জন সদস্যকে হযরত মুয়াবিয়া (রা:) এর পুত্র ইয়াজিদ নির্মমভাবে হত্যা করে।
রাসূল (সা:) এর ওফাতের ৫০ বছর পর ৬১ হিজরির ১০ই মুহররম ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে এই লোমহর্ষক-দুঃখজনক ঘটনাটি সংঘটিত হয়। শিমার ইবনে জিলজুশান মুরাদী নিজে ইমাম হোসাইন (রা:) এর গলায় ছুরি চালিয়ে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ইয়াজিদ ছিল মদ্যপায়ী। নানা দোষে দুষ্ট। সে পাপ কাজ করে গর্ববোধ করত। সেই ইয়াজিদ হিজরি ৬০ সনে পিতার মৃত্যুর পর নিজেকে মুসলিম জাহানের খলিফা বলে ঘোষণা করে। সে খলিফা হয়েই নানা ধরনের অপকর্মকে বৈধ ঘোষণা করে। সাথে সাথে হযরত হোসাইন (রা:) কে আনুগত্যের আহবান করে। ইমাম হোসাইন (রা:) ইয়াজিদের আনুগত্য করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানান। স্বৈরশাসক ইয়াজিদ ইমাম হোসাইন (রা:) কে তার আনুগত্য করার জন্য বারবার চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। ইমাম হোসাইন (রা:) কে নানা ধরনের হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। কিন্তু ইমাম হোসাইন (লা:) সত্যের উপর অটল ও অবিচল। তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন-‘আনুগত্য কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের করতে হবে। জালিম যতবড় শক্তিশালী হোক না কেন তার কাছে কখনও মাথানত করা যাবেনা। জালিমের তরবারীর আঘাতে মাথা দ্বিখন্ডিত হতে পারে কিন্তু কখনও নত হতে পারেনা।’ এর ফলে কারবালার বিয়োগান্ত ও মর্মস্পর্শী ঘটনা সংঘটিত হয়।
কারবালার মর্মভেদী ঘটনার পূর্বাভাস কয়েকজন সাহাবী স্বপ্নযোগে পেয়েছিলেন। হযরত সালমা (রা:) ইরশাদ করেন, একদা আমি উম্মে সালমা (রা:) এর কাছে গিয়ে দেখলাম, তিনি কাঁদছেন। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কেন কাঁদছেন? তিনি বললেন, আমি রাসূল (সা:) কে এমন অবস্থায় দেখেছি! অর্থাৎ আমি স্বপ্নে দেখেছি, তাঁর মাথা ও দাড়ি মোবারক ধুলাবালিতে মিশ্রিত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার কী হয়েছে? আপনার এরূপ অবস্থা কেন? তিনি বললেন, এইমাত্র ইমাম হোসাইনের শাহাদতের স্থানে হাজির হয়েছিলাম (তিরমিজী, মিশকাত পৃষ্ঠা-৫৭০)। হযরত উম্মুল ফজল বিনতে হারিস (রা:) থেকে বর্ণিত, একদা তিনি রাসূল (সা:) এর কাছে গিয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ রাতে আমি একটি খারাপ স্বপ্ন দেখেছি। তিনি বললেন, সে স্বপ্নটি কী? উম্মুল ফজল বললেন, তা অতি ভয়ানক। তিনি পুনরায় বলেন, আরে বলোনা, সে স্বপ্নটি কী? তখন উম্মুল ফজল বললেন, আমি দেখেছি, আপনার দেহ মোবারক থেকে যেন টুকরা মাংস কর্তন করা হয়েছে এবং তা আমার কোলে রাখা হয়েছে। তখন রাসূল (সা:) বললেন, তুমি খুবই উত্তম ও চমৎকার স্বপ্নই দেখেছ। ইনশাআল্লাহ আমার কন্যা ফাতেমা একটি ছেলে সন্তান প্রসব করবে, যা তোমার কোলেই রাখা হবে। সুতরাং কিছুদিন পরে ফাতেমার গর্ভে হোসাইন (রা:) জন্মগ্রহণ করলেন এবং তাঁকে আমার কোলেই রাখা হল। যেমনটি রাসূল (সা:) বলেছিলেন। উম্মে ফজল বলেন, এরপর আমি একদিন রাসূল (সা:) এর কাছে গেলাম এবং বাচ্চাটিকে তাঁর কোলে রাখলাম। অতঃপর আমি অন্যমনস্কে আকেদিকে দেখছিলাম। হঠাৎ এদিক ফিরে তাকাতেই দেখলাম, রাসূল (সা:) এর চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে। উম্মুল ফজল বলেন, আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার প্রতি আমার পিতামাতা কুরবান হউন, আপনার কী হয়েছে? তিনি বললেন, এ মাত্র হযরত জিব্রাঈল (আ:) এসে আমাকে বলে গেলেন যে, অদূর ভবিষ্যতে আমার উম্মতেরা আমার এ পুত্রটিকে (হোসাইনকে) হত্যা করবে। আমি বিস্ময় প্রকাশে জিব্রাঈলকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার এ পুত্রটিকেও (হোসাইনকে) কি তারা হত্যা করবে? হযরত জিব্রাঈল (আ:) বললেন, হ্যাঁ। তখন ঐ জায়গার লালমাটিও এনে তিনি আমাকে দেখিয়েছেন, যেখানে তাঁকে হত্যা করা হবে (বায়হাকী)। হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণিত হাদীসে তিনি বলেন, এক রাতে আমি রাসূল (সা:) কে স্বপ্নে দেখলাম। তাঁর বেশবাস ছিল ধূলিমলিন। তাঁর হাত মোবারকে ছিল রক্তে ভরা একটি শিশি। আমি স্বপ্নের মধ্যে আরজ করলাম ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতামাতা আপনার প্রতি কুরবান হউন। এটা কী? তিনি বললেন, এটা হোসাইন ও তাঁর সঙ্গীদের রক্ত, যা আমি আজকের দিন এ শিশিতে উঠিয়ে রেখেছি। হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, আমি স্বপ্নের সেই সময়টি স্মরণে রেখেছি। পরে দেখতে পেলাম-হযরত হোসাইন (রা:) ঠিক সেই সময়েই শহীদ হয়েছেন। (বায়হাকী, মিশকাত শরীফ : পৃষ্ঠা-৫৭২)।
‘সত্যের জন্যই জীবন এবং সত্যের জন্যই মরণ’-এটাই কারবালার শিক্ষা। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে কারবালার ঘটনাকে আমাদেরকে হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। ‘ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায়’-হার কারবালা কে বা’দ’।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • দেশীয় টিভি চ্যানেল থাকবে, না হারিয়ে যাবে
  • পরিবেশ সচেতন মানুষ চাই
  • প্রসঙ্গ : ব্যাংক ঋণ
  • বৈশ্বিক গণতন্ত্র, ব্রেক্সিট এবং বাংলাদেশ!
  • বায়ুদূষণে শিশুরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
  • আমাদের শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গন
  • মধ্যপ্রাচ্যে নারীশ্রমিক প্রেরণ কেন বন্ধ হবে না?
  • ব্যবসার নামে ডাকাতি বন্ধ করতে হবে
  • কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ
  • বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন
  • সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ সম্মেলন ও কিছু কথা
  • শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী
  • আমরা কি সচেতন ভাবেই অচেতন হয়ে পড়ছি?
  • দ্রব্যমূল্যর উর্ধগতি রুখবে কে?
  • আগুনের পরশমনি ছোয়াও প্রাণে
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন
  • দেওয়ান ফরিদ গাজী
  • বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হালচাল
  • সিলেটের ছাত্র রাজনীতি : ঐতিহ্যের পুনরুত্থানের প্রত্যাশা
  • নাসায় মাহজাবীন হক
  • Developed by: Sparkle IT