উপ সম্পাদকীয় দৃষ্টিপাত

বিয়ে ব্যবস্থায় পরিবর্তন

মো. মনজুর আলম প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৯-২০১৯ ইং ০৪:৩০:০৩ | সংবাদটি ১০৩ বার পঠিত

বিবাহ মানব সভ্যতার এক অনিবার্য পরিণতি। মানুষের বংশ বিস্তার ঘটাতে নারী পুরুষের বিয়ে অনিবার্য। তবে হ্যাঁ আধুনিক অনেক পদ্ধতির মাধ্যমে বাচ্চা কাচ্চা জন্ম দেওয়া সম্ভব বলে প্রমাণ হয়েছে। শুধু বাচ্চা জন্ম দেয়া বিবাহের মূল্য লক্ষ্য নয়। বিবাহের মাধ্যমে একজন একজনের সাথী হওয়া পরস্পর দুখে সুখে অংশ নেয়া এবং আত্মার বন্ধন সৃষ্টির মাধ্যমে দুইটি পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। আমার দেখা মতে একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশের মধ্যে আগে বিবাহের আয়োজন করা হতো। দেখতেও ভালো লাগত। দুটি পরিবারের মধ্যে কথাবার্তা আদান-প্রদান, দেখাশোনা, তথ্য বিনিময়, বুঝাপড়া তারপর দিন তারিখ ঠিক করে কন্যাকে সম্মানের সাথে বরের কাছে তুলে দেয়া হত। কোন পক্ষ বিশেষ করে ছেলের পক্ষ থেকে ছেলের কোন দাদা বা চাচা কন্যার বাবা বা চাচার সাথে প্রথমে আলাপ করতেন। যে ব্যক্তি আলাপ নিয়ে গেলেন তাকে অনেক সম্মান করে আদর আপ্যায়ন করে প্রস্তাব পছন্দ হলে মেয়ের বাড়ি গিয়ে অন্য আত্মীয়রা কন্যা দেখে আসতেন আর পছন্দের যদি প্রস্তাব না হয় তাহলে বুঝিয়ে না করে দিতেন।
ছেলেপক্ষ মেয়েপক্ষ পরস্পরকে পছন্দ করলে কথাবার্তা শুরু হয়ে গেল। প্রথমেই ছেলের আত্মীয়-স্বজন মেয়ের বাড়িতে কয়েকজন মেয়ে দেখতে আসতেন। এই দিন মেয়ে দেখে কিছু সালামী দিয়ে যেতেন। তারপর ছেলের বাড়ি ছেলে দেখতে এভাবে একাধিক লোক যেতেন। বিশেষ করে পাত্রীর দাদা, চাচা, ভাই, বাবা যেতেন। এরপর কিন্তু পাত্রীর বাড়ি উভয় পক্ষ বসে বিবাহের দিন তারিখ ঠিক করতেন। এদিনকে কোনো কোনো জায়গায় চিনিপানের তারিখ বলা হয়।
চিনিপানের তারিখে এসে বিবাহের দিন ধার্য্য করা হয়। এদিন কন্যার বাড়িতে কন্যার গোষ্ঠীর বড় বড় লোকেরা উপস্থিত থাকেন এবং বরের বাড়ি থেকে যারা আসবেন তাদেরকে নিয়ে দুপুরের খাবার খেতেন। ঐ দিনের আলাপ আলোচনা সাধারণত চা’পান সেরে এবং দুপুরের খাবারের আগেই সেরে ফেলেন। দেখা যেত সবাই বলতেন চাঁদের তারিখ দেখে বিবাহের দিন ঠিক করার জন্য। তখন ক্যালেন্ডার খোঁজা হত। চান্দ্র মাসের তারিখ কেন দেখা হত এটা সহজে অনুমেয়। দিন ঠিক হলে সবাই মিলে দোয়া করতেন আল্লাহর দরবারে তারপর মেয়েকে একটি আংটি সরবরাহ করা হতো।
নির্দিষ্ট দিনে বিয়ের আয়োজন। কিন্তু কন্যা, বিয়ের আলাপ চলার পর থেকেই কেঁদে কেঁদে অস্থির। আগের থেকে নিজেকে অনেক আড়াল করে রাখার চেষ্টা। কোনো কোনো আত্মীয়-স্বজন কন্যাকে তাদের বাড়ি দাওয়াত করে নিয়ে যায়। বিয়ে হয়ে গেলে সব সময় হয়ত আসতে পারবেনা। আগে বিয়ের অনুষ্ঠান হতো কন্যার বাড়ির আঙ্গিনায় বা কোন বড় ঘরে বিয়ের গেইট তৈরি হত কলাগাছ অথবা শাড়ি পেছিয়ে। রঙিন কাগজ দিয়ে পুরো বাড়ি সাজানো হতো। পঞ্চায়েতকেও দাওয়াত দেওয়া হতো। দাওয়াতের ধরণ ছিল ‘অমুক দিন যাবেন পান তামুক খাবেন’। নির্দিষ্ট দিন উল্লেখ করে বলা হত। আগে সাধারণত রবিবার আর শুক্রবারে বিয়ে হত। পঞ্চায়েতের মানুষ এসে গেইটের সামনে যুহরের নামাজ শেষে দাড়িয়ে থাকতেন, বর পালকিতে অথবা গাড়িতে এসে গেইটের সামনে আটকে যেতেন। পঞ্চায়েত মুরুব্বি অনুমতি দিলে বর গেইট পাশ হতেন।
বর ভিতরে প্রবেশ করে যে বিছানায় বসবেন তার দুই পাশে বালিশ থাকত কিন্তু বর তখনো দাড়িয়ে আবার যখন মুরুব্বি অনুমতি দিতেন তখন বর সবাইকে সালাম করে মুখে রুমাল দিয়ে বসে থাকতেন। তারপর খাওয়ার দাওয়ার ধুম পড়ে যেত। মুরুব্বিদের সবাই আগে বসতে দিতেন। তারপর কন্যা বর একখানে এনে মালা বদল হত। বিবাহের দিন আক্দ বা কবুলিয়াত খুব কম হত। এ কাজ আগেই সেরে ফেলা হত। বরের বাড়ি কন্যা এসে বড়দের সালাম করত। তারপর শুরু হলো সুখের জীবন। তখন দাম্পত্য ভঙ্গ হতো না। সংসার সুখের ও আনন্দের ছিল।
এখন সব উল্টোপাল্টা হয়ে গেছে। আগের তেমন কিছু নেই। তবে অনেক আধুনিক হয়েছে কিন্তু দাম্পত্য জীবনে সুখ যেন মরিচিকা হয়ে গেছে। এখন বিবাহ ঠিক করতে ঘটক প্রয়োজন হয়। ঘটককে বড় অংকের টাকা দিতে হয়। দাদা, চাচা অনেক সময় এসবের ধারে কাছে আসেন না। অনেক বিয়েতে ঘটকের প্রয়োজন হয় না। ছেলে মেয়ের সম্পর্কের জন্য। কোন পক্ষ যদি প্রবাসী বর অথবা কন্যা পেয়ে যায় তখন অনেক বিষয় না জানিয়ে পরস্পর এগুতে থাকে। আত্মীয়-স্বজন কাউকেই কিছু বলার প্রয়োজন মনে করেনা। ছেলে বা মেয়েটি বিদেশ গেলেই যেন হাতে আকাশ পাওয়া যাবে। দেনমোহর যত ইচ্ছা লিখে রাখে। কিন্তু আগে দেনমোহর ধার্য্য করা হতো বরের অবস্থার উপর এবং পরিশোধও করা হতো। বিয়ের অনুষ্ঠান হয় বড় বড় কমিউনিটি সেন্টারে আর যাওয়া হয় গাড়ি বহর নিয়ে। গাড়ি থেকে নেমে কে কার আগে আসন দখল করবে সে প্রতিযোগিতা চলে। অনেক সময় দেখা যায় বয়োবৃদ্ধরা দাড়িয়ে কিন্তু ছেলে বয়সের অনেকে বসে খাচ্ছে। বর কনে অনেক ক্ষেত্রে শ্বশুর শাশুড়ীকে মূল্যায়ন করে না। কাউকে কিছু না বলে কোথায় বেরিয়ে যায়। বিয়ের পরের দিন হানিমুন করতে অন্যত্র বা দেশের বাইরেও চলে যাওয়া হয়। বিবাহের আগে সম্পর্ক হওয়ার কারণে মা-বাবা অনেক ক্ষেত্রে বেমানান দেখে মেনে নিতে পারেন না। তাই কোর্ট ম্যারেজের মতো ঘটনা ঘটে তখন সবাই লজ্জায় কাঁদতে থাকে। সকলের অংশ গ্রহণে বিবাহ হওয়া বাঞ্ছনীয়।
লেখক : কবি।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • আবাসিক এলাকায় ব্যবসা
  • এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • Developed by: Sparkle IT