মহিলা সমাজ

সেই ছোট মেয়েটা আজ মা

মানুষী চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৯-২০১৯ ইং ০৪:৩১:০২ | সংবাদটি ২৫৭ বার পঠিত

জন্ম হয়েছিলো তার ছোট দেশের ছোট শহরে হৃদয়ের খুব ছোট জায়গায় দখল করে থাকা কোনো এক বাগানে। অবুঝ পাপহীন মায়াবী কিছু কাজের মাধ্যমে চলছিলো তার শৈশব। খুব ভালোবাসা পেতো মা-বাবার কাছ থেকে। দুঃখ কী জানতো না। হাসি-কান্না, আদর ভালোবাসার আনন্দে একটু একটু করে বড়ো হতে লাগলো। বুঝতেও শিখলো সবকিছু। তবে কখনো বুঝতে পারেনি ঝগড়া-বিবাদ, অভাব ইত্যাদি। অনুভব করেনি নির্যাতনের অনুভূতি। অবশ্যই অনুভব করার প্রয়োজন পড়েনি কখনো।
দুই বোন, এক ভাই। সে ছিলো সবার ছোট। তার বাবা অনেক সুন্দর আর্ট করতেন, লেখালেখি করতেন। সেও খুব ভালোবাসতো আর্ট। খুব প্রিয় ছিলো তার বাবা। বাবাকে বলতো, আমার আর্ট করতে খুব ইচ্ছা হয়। বাবা বলতেন, মারে তুমি বড় হও আমি শিখিয়ে দিবো। মা সবজি কাটার সময় আমাকে ডাক দিতেন আর বলতেন মা লিখতে বসো, অ, আ, ই, ঈ। আমি পাশে বসলাম। একটু লিখতাম, মা বলতেন এই তো কী সুন্দর হয়েছে। মা যখন একটু অমনোযোগী হয়ে যেতেন, তখন আমি ফুল, পাখি, নদী, আম, কাঁঠাল অনেক কিছু এঁকে ফেলতাম। মাকে বলতাম, মা তো দেখে অবাক হয়ে চেয়ে থাকতেন। আর ভাবতেন এই বয়সে কীভাবে এতো সুন্দর করে আঁকল। অক্ষর শিখেনি এখনও, মা আমাকে কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেললেন।
বাবা অফিস থেকে আসার পর বাবাকে বললেন, বাবা তো খুব খুশি, আমাকে ডেকে বললেন আজ তুমি কী কী কাজ করেছো। আমি তো মনে মনে খুব ভয় পেয়ে গেলাম। আর ভাবছিলাম হয়তো দুষ্টামির কথা কিছু হবে। আমি কান্না করে বললাম, না বাবা আমি কোনো দুষ্টামি করিনি। আমি মায়ের কাছে বসে বসে লিখছিলাম। বাবা বললেন, আর কী করলে? আমি বললাম, আর কিছু করিনি বাবা। বাবা বললেন তোমার মা যে বললেন তুমি নাকি ছবি এঁকেছো। আমি বললাম, হ্যাঁ বাবা এসো দেখাবো। বাবা গেলেন দেখার জন্য, আসলে তো মাটির মধ্যে সবজির ছাল দিয়ে এঁকেছিলাম। পরে তা মুছে গেছে, তা আর দেখাতে পারলাম না। আমি মাকে বললাম, মা মা আমার ছবিগুলো কোথায় গেলো। আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেলো। মা বললেন, মাটিতে থাকে নারে মা। বাবা বললেন, আমি তোমার রং পেন্সিল আর কাগজ এনে দিবো। আর মুছবে না। মন খারাপ করো না।
বাবা ছবি আঁকতেন আমি পাশে বসে থাকতাম। আমার যে কী ভালো লাগতো আমি তা বুঝাতে পারবো না। একটার পর একটা প্রশ্ন করতাম বাবাকে উত্তর ও দিতেন। কখনও আবার বলতেন একটু চুপ করো রে মা। আমি বলতাম ছবি তো এমনিতেই চুপ আছে। বাবা বলতেন নারে মা আমি তোকে বলছি চুপ থাকার জন্য। বাবা যদি কোন কারণে এদিক-ওদিক সরতেন আমি এঁকে দিতাম বাবা বুঝতে পারতেন না। আমিও বলতাম না ভয়ে। যাই হোক আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলাম। বাবা যখন অফিসে যেতেন তখন আমি বাবা হয়ে যেতাম। বাবার মতো গাছ-পালা, ফুল, নদী এসব ছবি যা যা পারি আঁকতাম। এরপর তো চাহিদা বেড়ে গেলো এখন তো ফুল-ফল ভালো লাগে না। বাবার মতো আঁকতে চায় আমার মন। বাবা ঘরে আল্পনা আঁকতেন আমিও আঁকতাম বাবার সাথে, খারাপ হলেও বাবা কিছু বলতেন না। বরং বলতেন খুব সুন্দর হয়েছে। আর বুঝিয়ে বলতেন এইভাবে না করে এইভাবে আঁকো। এখন দেখ কী রকম লাগছে।
একটু একটু করে শিখা হলো। যাই হোক আমি অনেক ছবি আঁকতাম নিজে নিজে আর বাবাকে দেখাতাম, বাবা খুব আনন্দ পেতেন আর অন্য কাকুদের দেখাতেন।
বাবার কলিক যারা তাদের মধ্যে যদি কেউ ভোটে দাঁড়াতেন তাদের মার্কা দিয়ে আমাদের আঁকতে বলতেন। আমি তো খুব খুশি, একটা বললে আমি দুইটা এঁকে দিতাম। আস্তে আস্তে আমার লেখাপড়াও বেড়ে গেলো আগের মতো পারতাম না। কাউকে নাও করতে পারতাম না। লেখাপড়ার পাশাপাশি দিতাম এঁকে। আমার সব কিছু ইচ্ছা করতো শিখার জন্য। মা সেলাই করতেন আমিও মা’র সাথে মাঝে মাঝে করতাম। বাবাকে বললাম, বাবা আমি সেলাই করবো। বাবা বললেন, ঠিক আছে। বাবা কোনোদিন কোনো চাওয়াকে না করতেন না। হয়তো বাবা ‘না’ শব্দটা চিনতেন না কিংবা আমাদের শুনাতে চাইতেন না। তারপর ভর্তি হয়েছিলাম সেলাই শেখার জন্য। রোজ রোজ যেতে পারতাম না। স্যারের পড়া থেকে যেতো। তারপর হয়ে গেল বিয়ে। তারপর শেষ হয়ে গেলো আমার আঁকা। কখনো কলম পেলে আঁকতাম। তারা অনেক কথা বলতো, গালাগালিও করতো। তা শুনে আমার খারাপ লাগতো একদম বন্ধ করে দিলাম। বাবা বলতেন মাঝে মাঝে একটু আঁকাআঁকি করিস রে মা। আমি বলতাম না বাবা তুমি ছাড়া আমার ভালো লাগে না। আসলে আমার আঁকতে খুব ইচ্ছাহতো। মিথ্যা বলেছি বাবাকে বাবা কষ্ট পাবেন বলে। সেই মেয়েটি আজ মা হয়ে গেছে। তার সন্তানকে নিয়ে যখন পড়ার টেবিলে বসতো তখন মাঝে মাঝে মনের অজান্তে একে ফেলতো। পরিবারের মানুষ দেখলে বলতো কাগজ কলম কিনতে কী টাকা লাগে না, নাকি নদীর জলে ভেসে আসে। খুব কষ্ট পেতাম, বন্ধ করে দিলাম।
একদিন বাবাকে বললাম, বাবা আমাকে একটা কলম আর একটা খাতা দিবে। বাবা বললেন, কেন রে কী করবি তুই। আমি বললাম না বাবা এমনি। বাবা দিলেন। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে আঁকতাম, আবার লুকিয়ে রাখতাম। এখন আমার ছেলে বলে, মা আমি বড়ো হয়ে রুজি করে অনেক রং পেন্সিল আর পেপার কিনে দিবো। তুমি ইচ্ছে মতো আঁকবে তোমাকে কেউ না করবে না। ওর দিকে চেয়ে হাসি আর অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকি। আর আমি বলি সোনারে আমি খুব খুশি হয়েছি। লাগবে না, কেন মা? এমনি সোনা, আসলে মানুষ যা চায় তা পায় না, আর যা চায় না তা পায়। এভাবে ঘটে গেছে জীবনে শত হাজার ঘটনা। যা হয়তো চাপা পড়ে গেছে দুঃখময় স্মৃতির মাঝে। কিছু কিছু স্মৃতি এখন কাঁদায় আবার অতীতে নিয়ে যায়। অতীত সর্বদাহ স্মরণীয়।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT