উপ সম্পাদকীয়

ঝুঁকিপূর্ণ রেল যোগাযোগ : প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা

মো. জহিরুল আলম-শাহীন প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৯-২০১৯ ইং ০০:১০:১১ | সংবাদটি ১৩৮ বার পঠিত

একটি দেশের উন্নয়নের নিয়ামকগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখে তেমনি তার সাথে জনগণের জীবনযাত্রার মানকে উন্নত করে। দেশের আকাশ, জল আর স্থলপথের যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যাত্রাপথ হলো সড়ক পথ। বর্তমানে প্রতিদিন সারাদেশের সড়ক পথে ১০ থেকে ১২ জন মানুষ মারা যাচ্ছে। এখনও সড়ক পথের যাত্রাকে নিরাপদ বলয়ে আনা যায়নি। আবার সব যোগাযোগের মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ, ঝুঁকিমুক্ত, সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে রেল যোগাযোগকে বিবেচনা করা হয়। অধিক ঝুঁকিমুক্তি আরামদায়ক ও নিরাপদ পরিবহন হওয়ায় সারা বিশ্বেই রেলওয়ে যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তথ্য প্রযুক্তির যুগে বিজ্ঞানের অগ্রগতির নতুন নতুন আবিষ্কার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রেলের গতি বৃদ্ধির নতুন নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের সোনার বালাদেশের রেল পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির ছোঁয়া লাগছে বলে মনে হয় না। ফলে জনগণের নিরাপদ পরিবহন পথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। গত ২৩ জুন ২০১৯ তারিখে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ার বরমচাল এলাকার একটি সেতুর ওপর সিলেট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী উপবন এক্সপ্রেস দুর্ঘটনায় কবলিত হয়। এতে তিনজন নিহত ও ১৫০ জনের মতো আহত হয়। এ সময় সারাদেশে রেলযোগাযোগ নিয়ে বেশ হৈ চৈ পড়ে যায়। আর এ ঘটনার পর হতেই রেলের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচলের বিষয়টি সংবাদপত্রের মাধ্যমে জনসাধারণের সামনে বেরিয়ে আসে। নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, রেলপথের অব্যবস্থাপনা চিত্র অবলোকন করা হয়। এতে জনগণের রেল ভ্রমণকে আতঙ্কিত করে তুলে। দেশ স্বাধীনের পর দেশের নানা ব্যবস্থার নানা দিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন হলেও দেশের যোগাযোগের দুইটি মাধ্যম সড়ক ও রেলপথকে আধুনিকায়ন করা যায়নি। করা যায়নি নিশ্চিত নিরাপদ।
রেলের ইতিহাসে ১৮২৫ সালে ব্রিটিশ প্রযুক্তিবিদ জর্জ স্টিফেনসন আবিষ্কৃত লোকোমোটিভ-লোকোমেশোনের উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডের স্টকটন থেকে ডার্লিংটন পর্যন্ত চলাচল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম রেল যোগাযোগ শুর হয়। পরে ১৮৫৩ সালের ১৬ এপ্রিল ব্রিটিশ সরকার ভারতের বোম্বে থেকে থান পর্যন্ত ৩৩ কিলোমিটার রেললাইন উদ্বোধনের মাধ্যমে ভারতে প্রথম রেল যাত্রা শুরু হয়। ১৮৬২ সালে ১৫ নভেম্বর ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত ৫৩৪ দশমিক ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশে রেল যাত্রার নব সূচনা ঘটে। পরে পর্যায়ক্রমে এদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৪ জেলায় রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ফলে রাজধানীর সাথে সারাদেশের রেল যোগাযোগ গড়ে ওঠে। বর্তমানে সারাদেশের রেলপথের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৯ শত ৫৫ দশমিক ৫৩ কিলোমিটার। এ দীর্ঘ রেলপথের মধ্যে মোট সেতুর পরিমাণ ৩ হাজার ৬২৯টি। জানা যায় বর্তমানে ৪০২টি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ৬০ ফুটের বেশি দীর্ঘ বড় সেতু ৩২৬টি এবং ছোট সেতু ৩ হাজার ৩০৩টি। রেল ক্রসিং আছে ২ হাজার ৮৭৮টি। তবে এসব সেতুর অধিকাংশই ব্রিটিশ সরকারের আমলে নির্মিত। দেশের সংবাদপত্র মাধ্যমের তথ্য মতে এসব সেতুর বয়স ৮০ থেকে ১০০ বছর হয়ে গেছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ২০০ সেতুর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের তথ্য মতে সেতু নির্মাণের ৫০-৫৫ বছর পরই সেতুর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। তাহলে দেখা যায় প্রায় ৯০ শতাংশ সেতুর কার্য ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে। এসব সেতুই রেলপথের বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ। রেলওয়ের তথ্য মতে ব্রডগেজের পথের জন্য রেল ইঞ্জিন আছে ৯৪টি। আর মিটার গেজের পথের জন্য ইঞ্জিন আছে ১৭৯টি। একটি ইঞ্জিনের নির্মাণকাল হতে অর্থাৎ চালু হওয়ার পর হতে ২০ বছর পর্যন্ত চলাচলের ক্ষমতা থাকে। ব্রডগেজের ৯৪টি ইঞ্জিনের মধ্যে ২৪টির বয়স ৩১-৪০ বছরের মধ্যে। আর মিটারগেজের ১৭৯টির মধ্যে ১৪০টি মেয়াদোত্তীর্ণ।
রেলপথের সিলেট অঞ্চলের হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুরের মনতলা ও হরষপুর রেল স্টেশনের মধ্যবর্তী স্থানে আমার জন্ম স্থান। রেল পরিবহনই এতদঞ্চলের প্রধান বাহন।
শিক্ষা ও কর্মজীবন আমার সিলেটে কাটছে। সে কারণে প্রতি মাসে ১/২ বার রেলপথে আসা-যাওয়া করতে হয়। বলতে গেলে আমি ১৯৮৯ সাল হতে এ পথের রেলে প্রায় নিয়মিত যাত্রী হিসেবে ভ্রমণ করছি। তখন আমি এমসি কলেজের ছাত্র। সে সময় থেকে দেখে আসছি মনতলা রেলস্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের কোনো বিরতি ছিল না। পরে অবশ্য হয়েছে। তখন আমি ও এ অঞ্চলের রেল ভ্রমণকারীরা মনতলার নিকটবর্তী রেল সেতুতে ও ইটাখোলা রেল সেতুতে যেকোনা ট্রেন অত্যন্ত ধীর গতিতে চলত। আমরা এখানে নেমে যেতাম। এর কারণ ছিল সেতুগুলোর অবস্থা ভালো ছিল না। আমার দীর্ঘ ৩১ বছরের রেল ভ্রমণের বাস্তব অভিজ্ঞতাই এ লেখায় তুলে ধরব। আমার আক্ষেপ হয় এ দীর্ঘ সময় পর এখনও ট্রেন সেতুগুলোর ওপর ধীর গতিতে চলে। বলা যায় এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।
রেলের পূর্বাঞ্চল ঢাকা-সিলেট অঞ্চল অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার কারণে বেশি দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে ট্রেন। রেল ইতিহাসে জানা যায়, ১৮৯১ সালে সর্বপ্রথম সিলেট অঞ্চলে রেল যোগাযোগ চালু হয়। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে পরবর্তীতে ১৯১০ সালে পুরোদমে রেলের সেবা শুরু করে। এ সময়ের মধ্যেই সিলেট-আখাউড়া রেলপথের সেতুগুলো নির্মাণ করা হয়। ১৯১৫ সালে সিলেট-কুলাউড়া রেল সেকশন স্থাপিত হয়। সিলেট থেকে আখাউড়া পর্যন্ত রেলপথের দৈর্ঘ্য ১৭৯ কি.মি। এর মধ্যে রেলসেতু আছে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৫০টির বেশি। এসব সেতুর দৈর্ঘ্য সর্বনি¤œ তিন ফুট সর্বোচ্চ ৩০০ ফুট। এসব সেতুর বেশির ভাগ বয়স ৮০ থেকে ১০০ বছর হয়ে গেছে। আর যে সেতুগুলো কিছু ভালো তাও মেরামত করে কোনোরকমভাবে জোড়াতালি দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন চালানো হচ্ছে। এই ২৫০টি সেতুর মধ্যে মাত্র ৬টি সেতু ব্রিটিশ আমলে স্থাপনের পর হতে মেরামত করা হয়েছে। রেলের তালিকায় ১৩টি স্পটকে ‘ডেড স্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট-মোগলা বাজার রেল স্টেশন পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে ৮টি এবং মোগলাবাজার হতে আখাউড়া পর্যন্ত ১৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে ৫টি সেতু ‘ডেড স্পট’ হিসেবে চিহ্নিত। এ তেরটি সেতুর আগে ট্রেন থেমে যাবে। পরে ৫ কি.মি বেগে চলতে শুরু করবে। রেলওয়ে প্রকৌশল শাখার তথ্য মতে, সিলেট-আখাউড়া রেলপথের ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলো হলো মোগলাবাজার-মাইজগাঁও সেকশনের ৪৩, ৪৫, ৪৭ নম্বর সেতু, শমসেরনগর-টিলাগাও সেকশনের ২০০নং সেতু, কুলাউড়া-বরমচাল সেকশনের ৫, ৭ নম্বর সেতু, সাতগাঁও-শ্রীমঙ্গল সেকশনের ১৪১ নং সেতু, শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সেকশনের ১৫৭ নম্বর সেতু, মাইজগাঁও-ভাটেরাবাজার সেকশনের ২নং সেতু, মনতলা-ইটাখোলা সেকশনের ৫৬নং রেলসেতু। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের তথ্য মতে আখাউড়া-সিলেট রেলপথে পারাবত, জয়ন্তিকা, পাহাড়িকা, উদয়ন, উপবন, কালনি সহ লোকাল ডেমু ট্রেন চলাচল করে। প্রতিদিন এতে ১২ থেকে ১৫ হাজার মানুষ ঢাকা-সিলেট, সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথে যাতায়াত করে।
সম্প্রতি রেলপথের নিরাপদ যাত্রা নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা চলছে দেশজুড়ে। নিরাপদ যাত্রার সাথী রেল যাত্রা নামে খ্যাত সরকারের প্রধান পরিবহন খাত এখন ঝুঁকিপূর্ণ একটি খাত। সারাদেশের মধ্যে ঢাকা-সিলেট রেলপথে দুর্ঘটনা ঘটে বেশি। এ সেকশনে আজ থেকে ৩০-৩৫ বছর আগে ট্রেন চলত ৮০-৯০ কিলোমিটার বেগে। বর্তমানে সেই ট্রেনের গতিবেগ নেমে এসেছে ৪০-৪৫ কিলোমিটারে। এ অবস্থায় ট্রেন চলার কারণ হচ্ছে ট্রেন যে পথে চলবে তার অবস্থা মোটেই ভালো নয়। দিন দিন আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর সাথে পাল্লা দিয়ে রেল দুর্ঘটনা বাড়ছে। নি¤েœ কয়েকটি দুর্ঘটনার চিত্র তুলে ধরা হলো-গত ২ জুন ২০১৯ বাহুবলের রশিদপুরে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়। ২৩ জুন কুলাউড়ার বরমচালে স্টেশনের নিকটবর্তী বড়ছড়া এলাকায় ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেন দুর্ঘটনায় কবলিত হয়। এতে ৪ জন যাত্রী নিহত ও ২ শতাধিক যাত্রী আহত হয়। এতে রেলের ক্ষতি হয় ২৮ কোটি টাকা। ৭ জুলাই রেললাইনের একটি গরুর সাথে ধাক্কা লেগে ঢাকাগামী আন্তঃনগর জয়ন্তিকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। ১৭ জুলাই ঢাকা থেকে সিলেটগামী আন্তঃনগর ট্রেন কালনি বাহ্মণবাড়িয়ায় আসার পর ব্রেকের তাঁর ছিঁড়ে যায়। তা জোড়াতালি দিয়ে কোনো রকমভাবে এসে পৌঁছে সিলেট। ১৯ জুলাই কুলাউড়া আউটার সিগন্যালের কাছে লাইনচ্যুত হয় জয়ন্তিকার বগি। একই জায়গায় ২০ জুলাই ঢাকাগামী আন্তঃনগর কালনি ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়। ১৭ আগস্ট ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজগাঁও রেলওয়ে স্টেশনের নিকট ঢাকাগামী উপবন লাইনচ্যুত হয়। ২০১৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজারের সাতগাঁও রেলওয়ে স্টেশনের নিকট উপবনের ১১টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এ দুর্ঘটনায় প্রাণে রক্ষা পান ট্রেনে থাকা তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী, বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী এম.এ মান্নান। ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ হবিগঞ্জের মাধবপুরের ইটাখোলা রেলব্রিজে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সিলেটের সাথে ৫ দিন রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল। ৬ এপ্রিল শ্রীমঙ্গলের ১৪১ নম্বর রেলসেতুর মাটি সরে গেলে আটকা পড়ে পাহাড়িকা, ২৯ মার্চ মাধবপুরের ইটাখোলায় ৫৬ নম্বর সেতুর মাটি সরে পিলার ধসে পড়ে এবং রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ২৫ ফেব্রুয়ারি কমলগঞ্জের ভাটারায় ১৫৭ নম্বর সেতুর মাটি সরে গেলে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৮ সালে টঙ্গীতে লাইনের পয়েন্টস বদলের কারণে ঢাকাগামী-জামালপুর কমিউটার দুর্ঘটনায় কবলিত হয়। এতে ৫টি বগি লাইনচ্যুত হয়। ৫ জন নিহত ও অর্ধ শতাধিক যাত্রী আহত হয়। ২০১৬ সালের নরসিংদির আরশীনগর এলাকার ভুল সিগন্যালের কারণে লাইনচ্যুত হয় তিতাস কমিউটার ট্রেন। এতে ২ জন নিহত হয় আর আহত হয় ১০ জন। ২০১০ সালে নরসিংদিতে চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর মহানগর গোধুলি ও ঢাকাগামী মেইল চট্টলা মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এতে চালকসহ ১২ জন নিহত হয় এবং আহত হয় অর্ধশতাধিক। ১৯৯৫ সালের ১৩ জানুয়ারি হিলি স্টেশনে গোয়ালন্দ থেকে পাবর্তীপুরগামী ৫১১নং লোকাল ট্রেন এবং সৈয়দপুর থেকে খুলনাগামী ৭৪৮নং আন্তঃনগর সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ২৭ জন নিহত হন এবং আহত হয় ২ শতাধিক। সব ট্রেন দুর্ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় রেল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার কারণেই কোনো কোনো ঘটনা ঘটছে।
দুর্ঘটনার ৯০ ভাগই ঘটে লাইনের কারণে লাইনচ্যুত হয়ে। রেললাইন তৈরির মূল উপাদান পাথর, কাঠের বা আরসিসি স্লিপার, স্লিপারের সাথে লাইন আটকে রাখার ক্লিপ, নাট-বল্টু, হুক, ফিসপ্লেট ইত্যাদি। রেললাইনে যে সরঞ্জামাদি থাকে তার অভাবে লাইন সঠিক থাকে না বলে লাইন দুর্বল হয়ে যায়। তার ফলেই দুর্ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইনের ব্যবস্থাপনার অভাবেই রেল দুর্ঘটনা বাড়ছে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত রেললাইনের কাঠের স্লিপারগুলো অনেক জায়গায় পচে গেছে। আর কাঠ পচে যাওয়ার কারণে নাট-বল্টু ঝুলে আছে। কোথাও স্লিপার নেই, সেখানে বাঁশ দিয়ে বেধে রাখা হয়েছে। লাইনের সংযোগ স্থলে দুই তিনটি বা একটি নাট-বল্টু লাগানো আছে। আবার অধিকাংশ লাইনের সংযোগস্থলে নাট-বল্টু খোলা অবস্থায় রয়েছে। ফলে লাইন নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। যখন এসব লাইনের ওপর দিয়ে ট্রেন চলে তখন বিকট শব্দ হয়। সরেজমিনে আমি দেখলাম কোনো কোনো জায়গায় স্লিপারের সাথে লাইন লাগানো নেই। ক্লিপ খোলা, ফিসপ্লেট খোলা, হুক খোলা। তাই লাইন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। রেল বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা যায় ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার মূল কারণ লাইনের নিচে পর্যাপ্ত পাথর না থাকা। সুতরাং লাইনে প্রচুর পরিমাণ পাথর থাকা খুবই জরুরি। লাইনে প্রয়োজন মতো পাথর না থাকলে ট্রেন চলাচলের সময় লাইন ঝাঁকুনি শুরু করে। আর এসব স্থানেই ট্রেন লাইনচ্যুত হয় বেশি। সংবাদ মাধ্যমে জানা যায় পুরো রেলপথে প্রতিবছর ২২ লাখ ঘনফুট পাথর প্রয়োজন। কিন্তু দেওয়া হচ্ছে ১০ থেকে ১২ লাখ ঘনফুট পাথর। পুরো রেললাইনে পূর্ণমাত্রায় পাথর দিতে এক বছরে খরচ হয় ৩৩ কোটি টাকা। আবার ঘন ঘন দুর্ঘটনায় রেলের বগি, ইঞ্জিন লাইনচ্যুত হতে তুলতে এবং লাইন মেরামত করতে প্রতি মাসে প্রায় ৮ কোটি টাকারও বেশি খরচ হয়। এ হিসাবে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা খরচ হয়। সুতরাং আমরা যা বুঝি যদি রেল বিভাগ গুরুত্ব সহকারে রেললাইন পাকাভুক্ত করে তুলে তাহলে ঘন ঘন দুর্ঘটনা কমে আসবে এবং তার সাথে বাড়তি খরচ শত কোটি টাকা বাঁচবে। অপরদিকে রেললাইনের হুক, নাট-বল্টু, ফিসপ্লেট খাঁটি লোহার তৈরি। বাজারে এগুলোর মূল্য খুবই বেশি। তাই প্রতিনিয়ত লাইনের এসব হুক, নাট-বল্টু ও অন্যান্য লোহা জাতীয় সরঞ্জাম চুরি হয়ে যাচ্ছে। জানা যায় সংঘবদ্ধ চোরের দল রেললাইনের স্পাইক খোলার বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে টাইপ্লাট, ক্লিপস, ফিসপ্লেট খুলে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে লাইন পরীক্ষা না করায় বছরের পর বছর খোলা অবস্থায়ই রয়ে যায়। পরে যখন দুর্ঘটনা ঘটে তখন সংশ্লিষ্ট বিভাগ সজাগ হয়।
এই হলো রেল ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার মূল কারণ। আগে দেখা যেত মোটর ট্রলিতে করে রেলের লোকজন লাল গেঞ্জি পরে লাইন পরীক্ষা করছে। কিন্তু এখন এমন দৃশ্য চোখে পড়ে না। পুরো রেলওয়েতে ৮০টি সেকশন রয়েছে। এসব সেকশনের রেললাইন দেখাশুনা বা তদারকি করার দায়িত্ব পালন করেন স্থায়ী রেলপথ পরিদর্শক। যাদের তত্ত্বাবধানে থাকে ওয়েম্যান। ওয়েম্যানরাই মূলত লাইন রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন। ৮ জন ওয়েম্যান একত্রিত হয়ে একটি গ্যাংক তৈরি করা হয়। এক একটি গ্যাংক ৫ থেকে ৮ কিলোমিটার রেলপথ দেখাশুনা করার কথা। বর্তমানে লোকবলের অভাবে গ্যাংক বানানোর মতো লোক নেই। থাকলেও ১ থেকে ২ জন। যার ফলে রেললাইন দেখাশুনা করার ব্যবস্থা কমে গেছে। জানা যায় প্রতি বছর ৫ লাখেরও বেশি ক্লিপ চুরি বা ভেঙ্গে যায়। যার মধ্যে ২ লাখ থেকে সোয়া দুই লাখ ক্লিপ সরবরাহ করে ঘাটতি পূরণ করা হয়। বাকি ৩ লাখ ক্লিপের স্থান খোলা থাকে। তাই রেল ব্যবস্থা দিন দিন দৈন্যদশায় পরিণত হয়েছে। রেলের নিয়মানুসারে একটি স্লিপার কিংবা নাট-বল্টু ক্লিপ, হুক ফিসপ্লেট খোলা থাকলে প্রয়োজনে ট্রেন দাঁড় করিয়ে তা সাথে সাথে পূরণ করে তারপর ট্রেন চালাতে হবে। কোনো অবস্থায়ই লাইন খোলা অবস্থায় থাকতে পারে না। এ ব্যাপারে রেল বিভাগ গুরুত্ব দিয়ে তা সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে।
সিলেট-আখাউড়া রেললাইন দেশের অন্যতম পুরানো রেলপথ। এ রেলপথের দূরত্ব ১৭৯ কিলোমিটারের জন্য ওয়েম্যান থাকার কথা ১৮৪ জন। আছে মাত্র ২৯ জন। তারাও লাইন পরীক্ষা করেন না বলে স্থানীয় জনগণের অভিযোগ। শায়েস্তাগঞ্জের অধিবাসী সিলেটে পুলিশ বিভাগে কর্মরত অত্যন্ত চৌকস সহকারী ডিস্ট্রিক্ট ইন্টিলিজেন্ট অফিসার (সহকারী ডি.আই.ও) মোঃ শামীনুর রহমান শামীম বলেন, এ পথের রেললাইন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের আশেপাশের সেতুগুলো খুবই পুরাতন এবং জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে। তাছাড়া শায়েস্তাগঞ্জের স্টেশনের যাত্রীদের বিশ্রামের কক্ষগুলো খুবই অপরিচ্ছন্ন এবং বসার মতো উপযোগী নয়। এ ব্যাপারে রেল কর্তৃপক্ষ নজর দেওয়া জরুরি।
অপরদিকে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনায় ডুবে আছে আমাদের রেল বিভাগ। প্রতিটি রেল স্টেশনের আশপাশের পরিবেশ খুবই নাজুক। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কোনো বালাই নেই। স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের বিশ্রামাগার রয়েছে। তা ময়লা আবর্জনায় পরিপূর্ণ থাকে। দেখার যেন কেউ নেই। টয়লেটগুলো মোটেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নয়। দুর্গন্ধে প্রবেশ করা যায় না। ব্যবহার উপযোগী নয়। কোনো স্টেশনগুলোতে মাদকসেবীদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। স্টেশনগুলোতে চাহিদা মোতাবেক টিকেট পাওয়া যায় না। বলা হয় সিট খালি নেই। কিন্তু ট্রেন চলারপর দেখা যায় প্রতি কক্ষে যথেষ্ট সিট খালি আর স্টেশনের আশপাশের দোকানে দ্বিগুণ বা অতিরিক্ত টাকা দিলে টিকেট মিলে।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • এই বর্বরতায় শেষ কোথায়?
  • কি করে ফেরানো যায় ভারতমুখী রোগীর স্রোত
  • প্রসঙ্গ : শিশু হত্যা ও নির্যাতন
  • শব্দের অত্যাচারে নিঃশব্দ ক্ষতি
  • এমন মৃত্যু কাম্য নয়
  • কোন সভ্যতায় আমরা!
  • দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ রোল মডেল
  • বৃক্ষ নিধন রোধে চাই জনসচেতনতা
  • আফ্রিকা-চীনের দ্বিতীয় মহাদেশ
  • শিশুরা নিরাপদ কোথায়?
  • অপেক্ষার অশেষ প্রহরগুলি
  • ঘুষ-জুয়া বন্ধে কঠোর হোন
  • মা ইলিশ রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে হবে
  • ছাত্ররাজনীতি হোক কল্যাণ ও বিকাশের
  • পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক গবেষক আতিকুর রহমান
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • Developed by: Sparkle IT