শেষের পাতা সিলামে মুদাব্বির হোসেনের পত্রিকার সংগ্রহশালা

পত্রপত্রিকার এমন সংগ্রহ দেশ-বিদেশের ঘটনা প্রবাহের একটি দালিলিক প্রমাণ

এম. আহমদ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৯-২০১৯ ইং ০৩:০৫:০৭ | সংবাদটি ১৩৭ বার পঠিত

পেশায় দলিল লেখক। নেশায় পত্রিকা পাঠক। কাগজ পড়ার শুরু সেই ১৯৬৫-তে। শৈশবে যে নেশার শুরু, পাঁচ দশক পর এখনো নিরন্তর তার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আর পড়ে ফেলা পত্রিকাগুলো বিক্রি না করে সংরক্ষণ করেছেন অতি যতেœ। দেখতে দেখতে পুরোনো পত্রপত্রিকার বিশাল এক সংগ্রহশালা গড়ে উঠেছে তার বাড়িতে।
সঠিক হিসাব না থাকলেও বাড়ির পাঁচটি কক্ষে সাজানো রয়েছে কয়েক হাজার দৈনিক, সাপ্তাহিক ও ম্যাগাজিন। সিলেটের প্রাচীনতম পত্রিকা থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের নানা পত্রিকা রয়েছে তার সংগ্রহশালায়। পত্রিকাপ্রেমী এই মানুষটির নাম মো. মুদাব্বির হোসেন। বাড়ি সিলেটের দক্ষিণ সুরমার সিলাম শেখ পাড়া গ্রামে। সিলেটের প্রাচীনতম পত্রিকা যুগভেরী থেকে শুরু করে পূরনো বিভিন্ন পত্রিকাসহ বর্তমান সময়ের নানা পত্রিকা ও ম্যাগাজিন রয়েছে এই সংগ্রহশালায়। সিলেট থেকে ১৯৩০ সালে প্রকাশিত বাংলা সংবাদপত্র যুগভেরীর সাপ্তাহিক ও দৈনিক, সাপ্তাহিক সিলেট সমাচার, দৈনিক জালালাবাদী, সাপ্তাহিক সিলেট কণ্ঠ, সাপ্তাহিক দেশ বার্তা, সাপ্তাহিক সিলেট, সাপ্তাহিক সিলেট ধ্বনি, সাপ্তাহিক অনুপম, সাপ্তাহিক জালালাবাদ, সাপ্তাহিক সিলেট বাণীসহ দৈনিক আজকের সিলেট, দৈনিক বৃহত্তর সিলেটের মানচিত্র, দৈনিক সিলেট প্রতিদিনসহ বিভিন্ন পত্রিকা রয়েছে মুদাব্বিরের সংগ্রহে। এ ছাড়া, আছে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক পাকিস্তান, উর্দু পত্রিকা জং,হক কথা (ভাসানী সম্পাদিত), দৈনিক ইত্তেফাক, আজাদ, গণকণ্ঠ, নবঅভিযান, জনপদ, মুক্তিযুদ্ধকালীন পত্রিকা জয়বাংলা, অগ্রদূত, চরমপত্র, দৈনিক বাংলা, জাহানে নও, ইত্তেসান,দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক রূপালী ও দৈনিক খবর। রয়েছে বর্তমান সময়ের আজকের কাগজ, ইত্তেফাক, ইনকিলাব, দৈনিক খবর, সংবাদসহ আরও অনেক দৈনিক। আর সাপ্তাহিকের মধ্যে রয়েছে, হলিডে, রূপসী বাংলা, রূপকথা। ম্যাগাজিনও সংগ্রহে কম নেই। এই তালিকায় রয়েছে, বেগম, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, চিত্রালী, চিত্রবাংলা, পূর্বাণী, পূর্ণিমা, খবরের কাগজ, চলতিপত্র, যায়যায়দিন, আগামী ও প্রিয়জন।
নিতান্ত শখ থেকে পত্রিকা সংগ্রহের এই কাজ এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। নিজের সংগ্রহশালার দিকে ইঙ্গিত করে আবেগতাড়িত কণ্ঠে মুদাব্বির বললেন, ‘এ হচ্ছে আমার জীবনের পাঠ।’
পাঁচটি কক্ষে ক্রমান্বয়ে সাজানো আছে পত্রিকা বসতঘর ও বাংলোর পাঁচটি কক্ষজুড়ে এই সংগ্রহশালা। ইতিমধ্যে চারটি কক্ষ পত্রিকায় ভরে গেছে। বাকি কক্ষের এক পাশে রয়েছে বেঞ্চ আদলের একটি খাট। সেখানে বসেই পত্রিকা পড়েন মুদাব্বির। মাস শেষে পত্রিকাগুলো সংগ্রহ করে রাখেন ওই কক্ষেই। জানালেন, এই কক্ষটিও পূর্ণ হয়ে গেলে নতুন আরেকটি কক্ষ নেবেন পত্রিকার জন্য।
সংগ্রহশালার প্রতিটি বান্ডিলে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা আলাদা করে রাখা। একেকটি বান্ডিলে এক সপ্তাহের পত্রিকা, যা সংখ্যায় ৪০ থেকে ৭০টি। মাঝেমধ্যে বান্ডিল খুলে বাড়ির উঠানে রোদে শুকাতে দেন মুদাব্বির।
তার নানা দক্ষিণ সুরমার ভার্থখলার বাসিন্দা তৈয়বুর রহমান আজাদ নিয়মিত পত্রিকা পড়তেন। নানার অভ্যাসটাই একসময় রপ্ত করে ফেলেন মুদাব্বির। তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। নানার পড়া পত্রিকাগুলো যতœ করে বাড়িতে এনে পড়তেন ও সংগ্রহ করতেন। ১৯৬৭ সালে সিলেটের আদালত পাড়ায় দলিল লেখক হিসেবে পেশাগত জীবনের শুরু। মূলতঃ তখন থেকেই পত্রিকা কিনেও পড়া শুরু তার।
প্রযুক্তির কল্যাণে পত্রিকাশিল্পে নানা পরিবর্তন এসেছে। যুগে যুগে সেই পরিবর্তনের বড় সাক্ষী হয়ে আছে মুদাব্বিরের এই সংগ্রহশালা। পৃষ্ঠাসজ্জা ও ছাপায় পরিবর্তন সময়েরই দাবি বলে তার অভিমত। লেটার প্রেস থেকে অফসেট প্রেস, সাদাকালো থেকে রঙিন, ভাষারীতির পরিবর্তন সবকিছু সময়ের বিবর্তনে ঘটেছে বলে মনে করেন তিনি।
প্রবীণএই দলিল লেখক বলেন, একটি পত্রিকাকে পাঠকপ্রিয় করে রাখার পূর্বশর্ত হচ্ছে খবর পরিবেশনে বস্তুনিষ্ঠতা। তিনি নিজেও খবরের বস্তুনিষ্ঠতার সন্ধানে একাধিক পত্রিকা পড়েন। নিজের সংগ্রহকে একরকমের ইতিহাস আখ্যা দিয়ে মুদাব্বির বলেন, ‘এটা প্রথমত আমার ঘরের জন্য, আমার সন্তানদের জন্য রাখছি।’
সংসারে স্ত্রী শেফালি হোসেন অসুস্থ হয়ে অকালে মারা যাওয়ার পর তার কলেজ পড়ুয়া এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রয়েছে। মুদাব্বির হোসেনের দেখাদেখি তার পুত্র-কন্যাও নিয়মিত পত্রিকা পড়েন।
তার কলেজ পড়–য়া একমাত্র পুত্র তানভির হোসেন। তার ভাষায়, বাবার এই সংগ্রহশালা ইতিহাস। এটা ভবিষ্যতে সংরক্ষণ করে রাখার চিন্তা আছে।
পেশাগত কারণে মুদাব্বিরের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলামের। তিনি বলেন, প্রতিদিন একাধিক পত্রিকা বগলদাবা করে বাড়ি নিয়ে যান মুদাব্বির। তার এই পাঠাভ্যাস নিঃসন্দেহে বিরল।
মুদাব্বিরকে এক নামে চেনেন স্থানীয় অনেক সংবাদপত্র পরিবেশক। অন্যতম পুরোনো পরিবেশক ‘আলমগীর এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক ইসমাইল হোসেন বলেন, পাকিস্তান আমলে পত্রিকা ছিল কম। যেগুলো আসত সবই কিনতেন মুদাব্বির হোসেন।
নিজ প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক খাতা দেখে ইসমাইল হোসেন জানান, ১৯৭৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন পত্রিকা কিনেছেন মুদাব্বির। দিনে সর্বোচ্চ ২০টিও নিয়েছেন। ১৯৯১ সালের পর পত্রিকার সংখ্যা বাড়লে তার মাসে বিল আসত কয়েক হাজার টাকা। মাঝেমধ্যে বিল বকেয়া পড়লে টাকার জন্য তাগাদা দিলে তিনি বলতেন, ‘পড়া জমাইয়া রাখলাম!...মাইর যাইত নায়,জমিজামা বিক্রি করি হইলেও বিল দিমু!’ বাস্তবে দু’বার জমি বিক্রি করে বিল পরিশোধও করেছেন। বর্তমানে তিনি নিয়মিত রেজিষ্ট্রারী অফিসে আসেন না । তাই বর্তমান সংগ্রহ তার কমেছে।
মুদাব্বিরের এই পত্রিকাপাঠ ও সংগ্রহকে ‘অমূল্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের উপ-গ্রন্থাগারিক মো.সোহরাব হোসেন। তিনি বলেন, পত্রপত্রিকার সংগ্রহ দেশ-বিদেশের ঘটনাপ্রবাহের একটি দালিলিক প্রমাণ। নিঃসন্দেহে এটি অমূল্য। কিন্তু যথাযথ প্রক্রিয়ায় এগুলো সংগ্রহ করে না রাখতে পারলে এর কোনো মূল্য নেই। তিনি পত্রিকাগুলো রক্ষায় মুদাব্বিরকে বাড়িতে একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দেন। তাতে পত্রিকাগুলো সব সময় পাঠকদের নাড়াচাড়ার মধ্যে থাকলে সংরক্ষণের জন্যই ভালো।

শেয়ার করুন
শেষের পাতা এর আরো সংবাদ
  • সুনামগঞ্জে মুদি ব্যবসায়ী হত্যা মামলায় যুবকের যাবজ্জীবন
  • সিসিকের ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন লিপন বক্স
  • কমলগঞ্জে দুই সিএনজি মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশু নিহত ঃ আহত-৫
  • সিলেটের সম্ভাবনাময় পর্যটন নিয়ে সরকার আন্তরিক
  • মাধবপুরে ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন
  • নদী রক্ষায় সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে
  • স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা পিযুষের ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর
  • টেলিনর হেলথ-এর সব ধরণের সেবা এখন সিলেটবাসীর হাতের নাগালে
  • জামালগঞ্জে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে যুবকের মৃত্যু
  • বদলে গেছে ঢাকা দক্ষিণ বাজারের ভাদেশ্বর রোড
  • রোহিঙ্গাদের জন্য আরও ৮ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড দেবে যুক্তরাজ্য
  • মোহামেডানসহ চার ক্লাবে ক্যাসিনোর সরঞ্জাম
  • ছবি
  • রেলগেইট মারকাজ পয়েন্টে সিএনজি অটোরিক্সা শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষে ৯জন আহত
  • জীবনে বহুমাত্রিক বিকাশের জন্য শিক্ষার কোন বিকল্প নেই -সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এ এম এম খায়রুল কবীর
  • লিডিং ইউনিভার্সিটিতে আইন বিভাগের সেমিনার অনুষ্ঠিত
  • এনআইডি জালিয়াতি জয়নালের জবানবন্দিতে ‘আরও নাম’
  • ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ২০ শতাংশ কমেছে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
  • দুর্নীতিবাজ কেউ রেহাই পাবে না --------------স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
  • টিআইবির চিঠিতে বেক্সিমকোর প্রশংসা শুদ্ধাচারের প্রত্যাশা
  • Developed by: Sparkle IT