ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৯-২০১৯ ইং ০১:২৯:৩২ | সংবাদটি ৭৫ বার পঠিত

পূর্ব প্রকাশের পর
আল্লাহর কাছে সূক্ষ্মদর্শিতার চাইতে চারিত্রিক দৃঢ়তার মূল্য বেশি :
পরীক্ষার এসব বিষয়বস্তু পাঠশালায় অধীত জ্ঞান-অভিজ্ঞতার যাচাই কিংবা তৎসম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান ছিলো না, বরং তা ছিলো চারিত্রিক মূল্যবোধ এবং কর্মক্ষেত্রে দৃঢ়তা যাচাই করা। এতে বোঝা যায় যে, আল্লাহর দরবারে যে বিষয়ের মূল্য বেশি, তা শিক্ষাবিষয়ক সূক্ষ্মদর্শিতা নয়, বরং কার্যগত ও চরিত্রগত শ্রেষ্ঠত্ব।
এ ধরণের পরীক্ষার বিষয়বস্তুর মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই :
আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা ছিলো হযরত ইবরাহিম (আ.) কে স্বীয় বন্ধুত্বের বিশেষ মূল্যবান পোশাক উপহার দেয়া। তাই তাঁকে বিভিন্ন রকম কঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়। সমগ্র জাতি, এমন কি তাঁর আপন পরিবারের সবাই মূর্তি পূজায় লিপ্ত ছিলো। সবার বিশ্বাস ও রীতিনীতির বিপরীত একটি সনাতন ধর্ম তাঁকে দেয়া হয়। জাতিকে এ ধর্মের দিকে আহবান জানানোর গুরুদায়িত্ব তাঁর কাঁধে অর্পন করা হয়। তিনি পয়গাম্বরসুলভ দৃঢ়তা ও সাহসিকতার মাধ্যমে নির্ভয়ে জাতিকে এক আল্লাহর দিকে আহবান জানান। বিভিন্ন পন্থায় তিনি মূর্তি পূজার নিন্দা ও কুৎসা প্রচার করেন। প্রকৃতপক্ষে কার্যক্ষেত্রে তিনি মূর্তিসমূহের বিরুদ্ধে জিহাদ করেন। ফলে সমগ্র জাতি তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উদ্যত হয়। বাদশাহ নমরূদ ও তাঁর পরিষদবর্গ তাঁকে অগ্নিকু-ে নিক্ষেপ করে জীবন্তু পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয়। আল্লাহর খলীল প্রভুর সন্তুষ্টির জন্যে এসব বিপদাপদ সত্ত্বেও হাসিমুখে নিজেকে আগুনে নিক্ষেপের জন্যে পেশ করেন। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় বন্ধুকে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে দেখে আগুনকে নির্দেশ প্রদান করলেন : ‘অর্থাৎ, আমি হুকুম দিয়ে দিলাম, হে অগ্নিÑ ইবরাহিমের উপর সুশীতল ও নিরাপত্তার কারণ হয়ে যাও।’
নমরূদের আগুন সম্পর্কিত এ নির্দেশের মধ্যে ভাষ্য ছিলো ব্যাপক। বস্তুতঃ কোনো বিশেষ স্থানে আগুনকে নির্দিষ্ট করে এর নির্দেশ দেয়া হয়নি। এ কারণে সমগ্র বিশ্বে যেখানেই আগুন ছিলো, এ নির্দেশ আসা মাত্রই স্ব স্ব স্থানে সব ঠা-া হয়ে গেল। নমরূদের আগুনÑ এর আওতায় পড়ে শীতল হয়ে গেল।
কুরআনের শীতল শব্দের সাথে নিরাপদ শব্দটি যুক্ত করার কারণ এই যে, কোনো বস্তু সীমাতিরিক্ত শীতল হয়ে গেলে তাও বরফের ন্যায় শীতল হয়ে কষ্টদায়ক, বরং মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। বলা না হলে আগুন বরফের ন্যায় শীতল হয়ে কষ্টদায়কও হয়ে যেতে পারতো।
এ পরীক্ষা সমাপ্ত হলে জন্মভূমি ত্যাগ করে সিরিয়াস হিজরত করার পর দ্বিতীয় পরীক্ষা নেয়া হয়। ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় স্বগোত্র ও মাতৃভূমিকেও হাসিমুখে ত্যাগ করে পরিবার-পরিজনসহ সিরিয়ায় হিজরত করলেন।
মাতৃভূমি ও স্বজাতি ত্যাগ করে সিরিয়ায় অবস্থান শুরু করতেই নির্দেশ এলো, বিবি হাজেরা (রা.) ও তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশু হযরত ইসমাঈল (আ.) সঙ্গে নিয়ে এখান থেকেও স্থানান্তরে গমন করুন। (ইবনে কাসির)
জিবরাঈল (আ.) আগমন করলেন এবং তাঁদের সাথে নিয়ে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে কোনো শস্যশ্যামল বনানী আসলেই হযরত খলীল বলতেন, এখানে অবস্থান করানো হোক। জিবরাঈল (আ.) বলতেন, এখানে অবস্থানের নির্দেশ নেইÑ গন্তব্যস্থল সামনে রয়েছে। চলতে চলতে যখন শুষ্ক পাহাড় ও উত্তপ্ত বালুকাময় প্রান্তর এসে গেল (যেখানে ভবিষ্যতে বায়তুল্লাহ নির্মাণ ও মক্কা নগরী আবাদ করা লক্ষ্য ছিলো), তখন সেখানেই তাঁদের থামিয়ে দেয়া হলো। আল্লাহর বন্ধু স্বীয় পালনকর্তার মহব্বতে মত্ত হয়ে এই জনশূন্য তৃণলতাহীন প্রান্তরেই বসবাস আরম্ভ করলেন। কিন্তু পরীক্ষার এখানেই শেষ হলো না। অতঃপর হযরত ইবরাহিম (আ.) নির্দেশ পেলেন যে, বিবি হাজেরা ও শিশুকে এখানে রেখে নিজে সিরিয়ায় ফিরে যাও। আল্লাহর বন্ধু নির্দেশ পাওয়া মাত্রই তা পালন করতে তৎপর হলেন এবং সিরিয়ার দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন। ‘আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক আমি চলে যাচ্ছি’Ñ বিবিকে এতোটুকু কথা বলে যাওয়ার দেরীও তিনি সহ্য করতে পারলেন না। হযরত হাজেরা তাঁকে চলে যেতে দেখে কয়েকবার ডেকে অবশেষে কাতরকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এ জন-মানবহীন প্রান্তরে আমাদের একা ফেলে রেখে কোথায় যাচ্ছেন? কিন্তু হযরত ইবরাহিম নির্বিকারÑ কোনো উত্তর নেই। অবশ্য হাজেরাও ছিলেন খলিলুল্লাহরই সহধর্মীনি। ব্যাপার বুঝে ফেললেন। ডেকে বললেন, আপনি কি আল্লাহর কোনো নির্দেশ পেয়েছেন? হযরত ইবরাহিম বলেলেন, হ্যাঁ। খোদায়ী নির্দেশের কথা জানতে পেরে হযরত হাজেরা খুশী মনে বললেনÑ যান। যে প্রভু আপনাকে চলে যেতে বলেছেন, তিনি আমাদের ধ্বংস হতে দেবেন না।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT