ধর্ম ও জীবন

রাসূলের প্রতি মহব্বত

মাছুম আহমদ দুধরচকী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৯-২০১৯ ইং ০১:৩৪:০৬ | সংবাদটি ১২৬ বার পঠিত

‘বল, তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের সে সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছো, আর সে ব্যবসা যার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করছো এবং সে বাসস্থান, যা তোমরা পছন্দ করছো, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না। (সূরা : আত-তাওবা : ২৪)
কাযী ইয়ায (রহ.) বলেন, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে মহব্বত করা ফরজ সাব্যস্থ হওয়ার বিষয়ে দলিল ও প্রমাণস্বরূপ এই একটি মাত্র আয়াতই যথেষ্ট। কারণ এ আয়াতে ঐসব লোকদেরকে আল্লাহ তা’আলা সতর্ক করে দিয়েছেন যাদের কাছে নিজের পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের চেয়ে বেশি প্রিয়। আর তোমরা অপেক্ষা করো আল্লাহর নির্দেশ আসা পর্যন্ত শীর্ষক ঘোষণার মাধ্যমে তাদেরকে সাবধান করেছেন। অতঃপর আয়াতের শেষাংশে এ জাতীয় লোকদেরকে ফাসেকদের কাতারে শামিল করেছেন। আর জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা ঐ পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে আল্লাহ হেদায়েত দান করেন না। ( সূরা : আশ-শিফা)
হাদীসে এসেছেÑ তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না যতোক্ষণ না আমি তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হবো তার মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি এবং সকল মানুষ থেকে। (বুখারী ও মুসলিম)
উল্লিখিত আয়াত ও হাদিস দ্বারা সাব্যস্থ হয় যে, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে মহব্বত করা আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। আর আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের মহব্বত সকল মুহব্বতের উর্ধ্বে রাখাও অত্যাবশ্যক। কারণ রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, যে সবকিছু থেকে আমাকে বেশি মহব্বত না করবে সে মুমিন হতে পারবে না। এ থেকে বুঝা যায় যে, ঈমানের অস্তিত্বের জন্য আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের মহব্বত অত্যাবশ্যক। আর আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের মহব্বত ছাড়া ঈমানের স্বাদও অনুভব করা সম্ভব হয় না। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সল্লাম ইরশাদ করেছেনÑ তিনটি গুণ যার মাঝে থাকবে সে ঈমানের স্বাদ উপভোগ করতে পারবে : (১) আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল অন্য সবকিছু থেকে তার কাছে অধিক প্রিয় হওয়া। (২) একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে কাউকে মহব্বত করা এবং (৩) ঈমান আনার পর কুফরে ফিরে যাওয়াটা আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপছন্দের হওয়া।
কাযী ইয়ায বলেনÑ কোনো ব্যক্তি কাউকে ভালোবাসলে সে তাকে প্রাধান্য দেয় তার পছন্দ-অপছন্দকে প্রাধান্য দেয়। অন্যথায় মুহাব্বতের দাবিতে সে মিথ্যাবাদী বলে বিবেচিত হবে। তাই সত্যি সত্যি যে ব্যক্তি রাসূল (সা.) মহব্বত করে, অবশ্যই তার আচার-আচরণে সে মুহাব্বতের আলামতও প্রকাশ পাবে। আর এসব আলামতের মধ্যে প্রধান হলো, রাসূলের অনুসরণ ও তাঁর সুন্নতের অনুসরণ, কথা ও কাজে তাঁর আনুগত্য করা। তাঁর নির্দেশসমূহ মেনে চলা এবং যেসব বিষয় থেকে তিনি নিষেধ করেছেন তা বর্জন করা। সুখ-দুঃখ, সচ্ছলতা-অসচ্ছলতা সর্বাবস্থায় তাঁর আদর্শকে সামনে রেখে চলা। বলো, যদি তোমরা আল্লাহকে মহব্বত করো তাহলে আমার ইত্তিবা কর। আল্লাহ তোমাদেরকে মহব্বত করবেন এ আয়াতটি এরই প্রমাণ বহন করে। রাসূলের মুহাব্বতের আলামত হলো তিনি যে বিষয়গুলো বিধিবদ্ধ করেছেন প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার উপরে সেগুলোকে প্রাধান্য দেয়া। ইরশাদ হয়েছে, আর মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মদিনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), আর যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে তাদেরকে ভালোবাসে। আর মুহাজিরদেরকে যা প্রদান করা হয়েছে তার জন্য এরা তাদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা অনুভব করে না। এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্বেও নিজেদের ওপর তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম (সূরা : আল হাশর-৯)
আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে মহব্বত করার আলামত হলো তার দীনকে নুসরত করা, দীনের প্রতি আঘাত এলে তা প্রতিহত করা। তাঁর সুন্নত ও আদর্শের প্রতি আঘাত এলে তা প্রতিহত করা। রাসূলকে মুহাব্বতের আলামত হলো তাঁর উপর নাযিল হওয়া কুরআনুল কারিমের তিলাওয়াত মহব্বতের বিষয়ে পরিণত হওয়া। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে সাক্ষাতের শাওক বা আগ্রহ রাখা। অর্থাৎ সব সময় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা। কারণ মৃত্যুর মাধ্যমেই বান্দা আল্লাহর সাক্ষাত লাভ করতে পারে। আর মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকার অর্থ হলো আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জি অনুযায়ী জীবনযাপন করা। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল যাদেরকে মহব্বত করেন ও ভালোবাসেন তাদেরকে মহব্বত করা এবং যাদেরকে অপছন্দ করেন তাদেরূক অপছন্দ করা।
হযরত আবু হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত এক হাদিস অনুযায়ী, আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরাইল (আ.) কে ডেকে বলেন, হে জিবরাইল, আমি উমুককে মহব্বত করি, অতঃপর তুমিও তাকে মহব্বত করো। জিবরাইল (আ.) তাকে মহব্বত করেন ও আকাশবাসীদেরকে ডাক দিয়ে বলেন, যে নিশ্চয় আল্লাহ উমুককে ভালোবাসেন, অতঃপর আকাশবাসীরা তাকে ভালোবাসে। এরপর তার জন্য পৃথিবীতে ব্যাপক গ্রহনযোগ্যতা রাখা হয়। (আহমদ)
আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অধিক প্রিয় ও মর্যাদার অধিকারী আমার কাছে অন্য কেউ ছিলো না। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি সম্মান ও মর্যাদার কারণে আমি দৃষ্টি ভরে তাঁর দিকে তাকাতে পারতাম না। সুতরাং আমাকে রাসূলের অবয়ব বর্ণনা করতে বলা হলে আমি তা পারবো না। কেননা দৃষ্টি ভরে রাসূলের দিকে আমি কখনো তাকাতাম না। (মুসলিম)
একদা আলী (রা.) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি আপনাদের মহব্বত কেমন ছিলো? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর শপথ! আমাদের কাছে তিনি আমাদের ধন-সম্পত্তি, সন্তান-সন্ততি ও বাবা-মার চেয়েও অধিক প্রিয় ছিলেন। এমনকি তীব্র পিপাসার সময় ঠা-া পানি যেমন প্রিয়, আমাদের কাছে আল্লাহর রাসূল তার চেয়েও অধিক প্রিয় ছিলেন।
মহান আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলকে আল্লাহ পাক যেন আমাদের হৃদয়-অন্তর আপনার মহব্বত ও আপনার রাসূলের মহব্বতে ভরে দিন। সর্বোচ্চভাবে আপনাকে ও আপনার রাসুলকে মহব্বত করার তাওফীক দিন। স্ত্রী-সন্তান, ধন-দৌলত, এমনকি পৃথিবীর সকল কিছুর উর্ধ্বে আপনাকে ও আপনার রাসূলকে মহব্বত করার তৌফিক দান করুন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT