ধর্ম ও জীবন

হজের সফর শেষে

বেলাল আহমদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৯-২০১৯ ইং ০১:৩৫:০৭ | সংবাদটি ১২৪ বার পঠিত

হজ আল্লাহ তা’আলার নৈকট্য লাভের মহান ইবাদত। মহান আল্লাহ যাদের ডাকেন তারাই শুধু খানায়ে কাবা জিয়ারতের সুযোগ লাভ করেন। হযরত ইমাম আবু হানিফা (রা.) হজ করার পূর্ব পর্যন্ত ঠিক বুঝতে পারেননি যে, ইবাদত সমূহের মধ্যে কোনটি সর্বোত্তম। কিন্তু যখনই তিনি হজ করে এটার অন্তর্নিহিত কল্যাণ প্রত্যক্ষ করলেন, তখন তিনি স্পষ্ট কন্ঠে বলে উঠলেন- “ হজ-ই- সর্বোত্তম ইবাদত”।
মানুষ যখন তার সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে পূর্ণ করে তখন আল্লাহ তাকে নুসরত করেন। জীবনকে শান্তিময় করে দেন। আর আখেরাতকে করেন পরম শান্তির আশ্রয়স্থল। হাজী সাহেবরা হজব্রত পালনে সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবোধ সহমর্মিতা, সহনশীলতা ইত্যাদি গুণাবলী অর্জন করেন। হজের আভিধানিক অর্থ হলো বাহ্যিক ও অন্তরিস্থ রিপুকে দমন করে চলা। একজন হাজী সাহেব যদি পঞ্চ রিপু দমন করে চলেন তাহলে হজের স্বাদ পাওয়া যাবে। জীবন ও জগতে কিছু পেতে হলে হাজী সাহেবদের মধ্যে খোদা প্রেমের অনন্ত ভালবাসার স্বাদ জাগাতে হবে। আল্লাহ রাসূল (সা.) বলেন- আল্লাহর দোস্ত তিনজন যথা হাজী, গাজী ও ওমরাকারী। পরলৌকিক জীবনের সুখের আশায় ইহজীবনে ধর্মের অনুশাসন প্রত্যেক মুসলমানকে অবশ্যই মানতে হবে। তাই মুসলমানের জীবনে হজের মূল্য ও গুরুত্ব অপরিসীম।
আল্লাহর মেহমানগণ পবিত্র হজ সমাপান্তে দেশে ফিরে আসছেন। মক্কায় অবস্থানকালে হাজী সাহেবরা একে অন্যের সহযোগীতা, সহমর্মিতা, সহনশীলতা আর ত্যাগের মধুর বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। সমাজে হাজী সাহেবদের মর্যাদা অনেকগুণ বেশি। তাদের দেহ-মনে লেগে আছে মক্কা মোকাররমা ও মদিনা মনোয়ারার খুশবো। হাদীসে আছে ৪০ দিন পর্যন্ত একজন হাজীর দোয়া কবুল হয়। প্রিয় নবী (সা.) হাজী সাহেবদের সঙ্গে সালাম ও মুসাফার প্রতি তাগিদ দিয়েছেন। তিরমিজী শরীফে এসেছে রাসুল (সা) বলেছেন- কোন হাজীর সঙ্গে সাক্ষাত হলে তাঁকে সালাম বলবে, তার সঙ্গে মুসাফাহা ও মুরানাকা করবে এবং দোয়ার আবেদন করবে। কারণ হলো কবুল হজকারীর সব পাপ আল্লাহ মাফ করে থাকেন। যে ব্যক্তি হজ থেকে ফিরে এসেছে সে যেন আজই মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হয়েছে। একজন হাজী সাহেব সমাজে সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। আর; এই সম্মান আর মর্যাদার কথা স্মরণ রেখে তার পরবর্তী জীবন আল্লাহর দেখানো সিরাতুল মুস্তাকীমের পথে চলার শপথ নিতে হবে। হায়াতী জিন্দেগীতে একজন হাজী হজের অন্তর্নিহিত গুণাবলীকে লালন করে জীবন অতিবাহিত করলে আত্মিক ও আর্থিক ইবাদত সফল হবে।
সুফি সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন- রাসূল (সা.) বলেছেন- আদম সন্তান একটি স্বচ্ছ সুন্দর শুভ্র লাগহীন ‘কল্ব’ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। যখন সে একটি গুনাহ করে তখন কলবের আয়নায় একটি দাগ পড়ে। গুনাহর দাগে এক সময় ঔ আয়নায় তার শুভ্রতা, স্বচ্ছতা হারিয়ে ফেলে। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে কোন গুনাহ যদি হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে নিতে হবে বাকী জীবন আল্লাহ ও তার রাসূলের দেখানো পথে চলাই হলো হজের সার্থকতা। হজের মাধ্যমে মৃত হৃদয়ে ও জাগে জীবনের স্পন্দন এবং প্রাণের উত্তাপ।
একজন হাজীর করণীয় হলো ইসলাম ধর্মের হেফাজত করা এবং আল্লাহর দেয়া বিধি বিধান সর্বাগ্রে মেনে চলা। একজন হাজী নিজের আত্মসমালোচনা করবে এবং নিজের আমলের হিসাব নেয়া। একজন হাজী নফ্সের প্রবঞ্চনা ও শয়তানের প্রতারণার শিকার হয়ে ইসলাম ও ইসলামী আদর্শ বিরোধী কাজ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। তাছাড়া ওয়ারিশান সম্পত্তি, তালাক ইত্যাদি সামাজিক বিচার সালিশে মাসায়েল সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল না হলে অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকা। মহান রাব্বুল আলামীন আল কুরআনে বলেছেন- ‘সে (উম্মাদিনী) নারীর মতো হয়ো না, যে সুতা পাকিয়ে মজবুত করার পর তা খুলে ফেলে নষ্ট করে দেয়। (সূরা নাহল আয়াত: ৯২) মহান আল্লাহ অবশ্যই ন্যায়পরায়নতা, সদাচরণ পছন্দ করেন।
একজন হাজী বায়তুল্লাহ আল হারাম অর্থাৎ মহাপ্রভুর আল্লাহর পবিত্র গৃহ তাওয়াফ করে ¯্রষ্টার সৌন্দর্য, অনুভব, অনুধাবন ও অনুভূতির খাঁচায় বন্দী করে নিয়েছেন। একজন হাজী মরুভুমির তপ্ত বায়ু, কালো বালিহারি পাথরের মধ্যে বিকিরিত লহু হাওয়া এ সবটুকু ঈমান দীপ্ত এশ্কের চাদরে হৃদয়ের অন্তস্থলে ঢেকে রেখেছেন। একজন হাজী মধুর স্বর্গীয় পরম তৃপ্তিকর পরম রহস্যময় অসীম ও চিরন্তন সৌন্দর্যের মধুমাখা পরশ নিয়ে ¯্রষ্টার প্রেমের সৌন্দর্য ইসলামের মর্মবাণীকে বাস্তবায়ন করতে হবে। একজন হাজীকে জীবনের সর্বস্তরে রাসুল (সা.)-এর আদর্শ বাস্তবায়নের ইস্পাত কঠিন শপথ নিতে হবে।
(১) একজন হাজী মিনার মাঠের শিক্ষা আল্লাহ প্রেমের আকর্ষণীয় আনুগত্য প্রদর্শন করে চলতে হবে। (২) বিশ্বের সবচাইতে বড় ধর্ম মানব ধর্ম। ইসলাম মানব ধর্মে বিশ্বাস করে। বিশ্বের মঙ্গল কামনাই ইসলামের কাম্য। ইসলাম মানুষের সঙ্গে মানুষের ভ্রাতৃত্ব চায়। হযরত মুহাম্মদ (সা.) আরাফাতের ময়দানে লক্ষ লক্ষ অনুসারীর জমায়েত উদ্দেশ্য করে যে বাণী রেখে গেছেন তার অমীয়বাণী প্রত্যেক হাজী সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অন্তর থেকে মুছে ফেলতে হবে অহঙ্কারের কালিমা। (৩) জামারায় আকাবা শয়তানকে কঙ্কন নিক্ষেপের মাধ্যমে দৃঢ়সংকল্প নিতে হবে। বিতাড়িত শয়তানের ধোঁকা থেকে হাজীকে বাঁচিয়ে রাখার সংকল্প অটুট রাখতে হবে। (৪) কুরবাণীর শিক্ষা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য পুরো জীবন-মৃত্যু আল্লাহতায়ালার জন্য উৎসর্গ করতে হবে। কুরবানীর মাধ্যমে শিক্ষা নিতে হবে নিজের পশুত্বকে বিসর্জন দিয়ে।
একজন মুসলমানের জীবনে হজ সমাপন করা নি:সন্দেহে অতীব তাৎপর্যময় ও পুণ্যময় কাজ। বায়তুল্লাহর মেহমানরা সত্যই সৌভাগ্যবান। প্রত্যেক হাজীকে হজ থেকে ফিরে এসে হজের প্রকৃত শিক্ষাকে দৈনন্দিন জীবনে লালন করতে হবে। নিজেকে সব সময় আল কুরআনের পরিপন্থী কাজ থেকে বিরত থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ রাখতে হবে। যা অন্যের কাছে অনুশীলনযোগ্য হয়। সর্বদা মনে রাখতে হবে একজন হাজী পবিত্র মক্কা মোকারমা এবং মদিনা মনোয়ারার আধ্যাত্মিকতাকে নিয়ে শতব্যস্থতার মাঝে ¯্রষ্টার সৃষ্টির কল্যাণে সদা নিয়োজিত থাকতে হবে। দেশ ও মাটিকে ভালবাসতে হবে। মানুষের কল্যাণে মেধা ও শ্রম দিতে হবে। সমাজের সর্বত্র নৈতিক অবক্ষয়ের আবহাওয়া বিরাজ করছে। ইসলাম নামের ধর্মের মাধূর্যতা দিয়ে ন্যায় ও সত্যের ডানা মেলে ধরার দায়িত্ব হাজী সাহেবদেরকে নিতে হবে। সকল ভাল কাজের পূর্ণতা সাধনের একমাত্র উপায় হচ্ছে মহান আল্লাহর অনুগ্রহ। তবে ভাল কাজে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
আধ্যাত্মিক ভাবনার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে ত্যাগের- এ বৈরাগ্য নয় কর্মযোগ্য। একজন হাজীকে মানবতাবাদী কাজে কর্মে, আচার আচরণে, ধর্মে-কর্মে, নৈতিক আদর্শে নিজের ভালোর সঙ্গে অপরকে ভাল হওয়ার পথ প্রসারিত করতে হবে। সর্বোপরি একজন হাজী সাহেব-কে সহমর্মিতা ও সহানুভূতিতে আপ্লুত দরদী মনের অধিকারী হতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT