পাঁচ মিশালী

হাওরের কান্না

হামীম মিয়া প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৯-২০১৯ ইং ০০:২৭:১২ | সংবাদটি ১৭৪ বার পঠিত

সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আমাদের এই দেশ। এত সুন্দর এর প্রকৃতির পরিবেশ, যার রূপের কোনো শেষ নেই। এত রূপের মাধুর্য পৃথিবীর দ্বিতীয় কোথায় কোনো দেশে নেই। এদেশে কোথাও উঁচু কোথাও নিচু আবার কোথায় সমতল। সমতল ভূমির বুক চিরে একে বেঁকে বয়ে গেছে অসংখ্য নদ-নদী। নদ-নদী ছাড়াও আমাদের দেশে অনেক হাওর বাওর রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাওরিও অঞ্চল সুনামগঞ্জ জেলা। বাংলাদেশের বড় বড় হাওরগুলো সুনামগঞ্জে। তাই সুনামগঞ্জ জেলা হাওর কন্যা নামে খ্যাত। এখানে হাওরগুলো সাগরের চেয়ে কম নয় তাই বর্ষাকালে হাওরে গেলে মনে হবে যেন এটি একটি বিশাল সাগর। হাওরের এক পাশে রয়েছে ভারতের বিশাল পাহাড়। যখন সূর্য পশ্চিম আকাশে অস্ত যেতে শুরু করে তখন হাওরের সৌন্দর্য আর পাহাড়ের সৌন্দর্য প্রকৃতিকে মাধূর্য মন্ডিত করে তুলে। বর্ষায় হাওরের গ্রামগুলোকে মনে হবে যেন এক একটা দ্বীপ। এক একটা গ্রাম পেরিয়ে এক একটি বিশাল হাওর আর হাওরের মাঝে গ্রামগুলো দ্বীপের মতোই। হাওরে যখন বিশাল ঢেউ খেলা করে ঢেউয়ের সাথে তালমিলিয়ে জেলেদের নৌকা দেয় পাল্লা। কি সুন্দর এ হাওর দৃশ্য। একে অপরে সাথে মধুর সম্পর্ক। মনে হয় যেন প্রকৃতি হাওরের সাথে ওদের বিশাল ভালবাসা স্থাপন করে দিয়েছে। জেলেরা সারাদিন হাওরের বুকে ভেসে মুক্ত মাছ ধরে, তা বাজারে বিক্রি করে তাদের সংসার চলে। মাঝে মধ্যে যখন হাওর জুড়ে বাতাস বয়, তখন গ্রামগুলোর অবস্থা ভয়ঙ্কর হয়। দেখা যায় তাদের বাড়ি ঘর বর্ষার পানিতে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। এমনও হয় তারা দুই তিন দিন পর্যন্ত হাওরে যেতে পারে না, পারে না তারা মুক্ত মাছ ধরতে। দেখা যায় নির্দিষ্ট জেলেদের সংখ্যা কম। কোনো মানুষ শুধু বর্ষাকালে মাছ ধরে, শরৎকালে তারা কৃষি কাজ করে। তাই এখানকার মানুষ দুইটি ঋতু সাথে সম্পৃক্ত। বর্ষায় মাছ ধরা, শরৎকালে কৃষি কাজ করা। কার্তিক থেকে জৈষ্ঠ্য মাস শুকনা মৌসুম (শরৎকাল) আর আষাঢ় থেকে অগ্রহায়ণ বর্ষা মৌসুম (বর্ষাকাল) নামে পরিচিত। ঋতুর বদলে তাদের পেশার পরিবর্তন। শুকনা মৌসুমে দেখা যায় অধিকাংশ মানুষ কৃষি কাজে ব্যস্ত থাকে। কিছু মানুষ থাকে মাছ ধরা নিয়ে ব্যস্ত তারা বিলের ইজারাদার বা মালিক। বর্ষা মৌসুমে দেখা যায় স্থানীয় সবাই মাছ ধরা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শুকনো মৌসুমে তাদের ফসলের জমিতে ধান উৎপাদন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কৃষক তার ফসলি জমি একা দেখাশুনা না করতে পারায় অন্যের সাহায্য নিতে হয়।
ছয়মাসের জন্য একজন লোক নিয়োগ করে নেয়া তাদের স্থানীয় ভাষায় কামলা বলে। ছয়মাস পরে তাকে বেতন হিসাবে দিতে হয় ৩৫-৪০ মণ ধান। কার্তিক মাস যেতে না যেতে শুরু হয় কৃষকের নিচু জমির জন্য উঁচু জমিতে বীজ বপন শুরু করে দেয়া। শুরু হয়ে যায় ধুমধাম কাজ। সারা দিন সে কৃষক তার কামলা নিয়ে এক ক্ষেত থেকে অন্য ক্ষেতে কাজ করে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে। সন্ধ্যায় ঘরে এসে কোনো মতে হাত মূখ ধোয়ে খেয়ে শুয়ে পড়ে। খুব ভোরে তারা হাল চাষ করতে গরু নিয়ে যেতে হয় ফসলের জমিতে। তখন শুনা যায় হাওরের বুকে কৃষকের কণ্ঠে নানার ধরনের গান। গান গায় আর হাল চাষ করে। বেলা আটটা হওয়ার আগে সে বাড়ি ফিরে আসে। ফসলের জমি রোপন করার জন্য রোজে লোক খুজতে হয়। মাঝে মধ্যে দেখা যায় রোজে কোনো কামলা পাওয়া যায় না। কমপক্ষে রোজের কামলাকে ৩-৪দিন আগে বলে রাখতে হয় আগামী শনিবারে আমার কাজ করবে। পৌষ ও মাঘ মাসে বেশি ব্যস্ত থাকে কৃষকেরা। দুই মাসের মধ্যে তারা তাদের বীজ বপনের কাজ শেষ করে। কিছু দিন পরে সেখানে দেখা যায় সবুজের সমাহার। যেদিকে তাকাবে দেখবে সবুজ আর সবুজ। এভাবে দিন যায়, মাঠের ফসলগুলো বড় হতে শুরু করে। ফসল বড় হয়, তাদের মনে মাঝে আশার টেউ ভাসতে থাকে। তারা গোলা ভরা ধান তুলবে, গোয়াল ভরা গরু থাকবে,বাকি ছয় মাস তার খাদ্যের জন্য কোনো চিন্তা করতে হবে না। তারা তাদের সন্তানের ভরণ পোষণ করবে। তাদের সন্তান শহরে লেখাপড়া করে তাদের মুখ উজ্জ্বল করবে,এটা তাদের প্রত্যাশা। কিন্তু এত আশার মাঝে তাদের অন্তরে থাকে ভয়, কখন জানি নদী বাঁধ ভেঙ্গে যায়,আবার কখন জানি আকাশ থেকে শিলা বৃষ্টি বা অতি খরা তাদের ফসলে আঘাত হানে। ধ্বংস করে দেবে তাদের মনে যত আশা ভরসা। এক দিকে আশা ভরসা, অন্য দিকে তাদের ফসল হারানোর ভয়। প্রায়ই তারা তাদের ফসল হারায়। ভাটিবাংলার মানুষের আসলেই প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়। ভাটিবাংলার মানুষ যেমন সংগ্রামী তেমনী সাহসী। ভয়াবহ বিপর্য সাথে নিত্যদিনের তাদের সংগ্রাম। তারা প্রকৃতির সংগ্রামকে আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করে নেয়। তেমনি এক বিপর্য মুখামুখি বছর ছিল ২৭-২৮ ই চৈত্র ১৪২৪ বাংলা। যা ইতিহাসের “কান্না বছর” হিসাবে পরিচিত হয়ে থাকবে। যখন ধানের গোছা গুলো আপন সাজে নতুন ধানের থুর ছাড়ছিল, চতুর্দিকে সবুজের সমাহার আর কৃষক মনে আনন্দের উল্লাস ঠিক সেই সময় পানি এসে ধাক্কা দেয় হাওরের বুকে। অথৈ পানিতে কৃষকের চোখের সামনে ভাসতে শুরু করে দীর্ঘ ছয় মাসের কাক্সিক্ষত ফসল। তার সাথে ভাসতে শুরু করে কৃষকের মনের আশা ভরসা ও পরিশ্রমের ফসল। কৃষকের চোখের সামনে যখন তার স্বপ্ন বন্যায় ভেসে যাচ্ছিল। কৃষকের কান্নার পানি কাছে হাওরের পানিকে হার মানতে হলো। কৃষক এমনভাবে কেদেঁ ছিল সে তার জীবনের সবকিছু হারিয়ে ফেলছিল। আমার মনে হয় হাওরের পানি কৃষকের আর্তনাদ দেখে মনে করেছিল আমি ভুল করেছি,আজ আমার জন্য চোখের পানিতে ভাসতে হচ্ছে হাজারো মানুষের, আজ আমার জন্য কাঁদছে কত শিশু ও গৃহবধূ। আমার জন্য কত না মানুষ অনাহারে জীবন কাটাতে হবে। আমি তাদের আর্তনাদের কি জবাব দেব সৃষ্টিকর্তার কাছে।
এই বিপর্যয়ে প্রায় কৃষকদের ছেলে মেয়ের ভরণ পোষণ করা হলো না আগের মতো। লেখাপড়া ছাড়তে হলো কত কৃষকের ছেলে-মেয়ের। কৃষক তার ঘরে ছয় মাসের জন্য যে কামলাকে ধান দেওয়ার কথা ছিল ৩৫-৪০ মণ, সেই ধান সে কোথা থেকে দেবে। কৃষকের মনে অনেক চিন্তা। এরকম কথা ভাবতে না ভাবতে ঘরে চাওয়ার আগে চলে আসে সুদখোর মহাজনের দল। একদিকে হাওরের পানির দেয়া কষ্ট ভুলতে না ভুলতে শুরু করে দেয় হারামখোর সুদখোর মহাজনদের অত্যাচার। এই সুদখোর মহাজনদের অত্যাচার সহ্য করতে হয় হাজারো কৃষকের পরিবারকে। তাদের অত্যাচার সইতে না পেরে, দেনা সুদ করার জন্য কৃষক তার ভিঠে বাড়ি বিক্রি করে দেয় হারামখোর মহাজনের কাছে । নিপীড় অত্যাচারে গরীব কৃষক তার নিজ গৃহে থাকতে পারল না, সে তার বাবার দেয়া ভিঠে বাড়ি বিক্রি করে চলে যাওয়ার সময় এমন কাঁদা কাঁদলো সে আর কোনো দিন কাঁদেনি এমন কান্না। সে হাওর পারে দাঁড়িয়ে হাওরকে বলে যায়, “কাঁদো হাওর কাঁদো” আর কোনো দিন তোমার সাথে দেখা হবে না, তোমার বুকে ভেসে গাওয়া হবে না আমার মন মাতানো গান। আজ থেকে তুমি মুক্ত শান্ত ও একাকি। আমি চললাম আমার জীবনের কান্না নিয়ে। অজানা ও অচেনা কোনো এক জায়গায়। বিদায় তোমার মায়াবী বুক ছেড়ে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT