সাহিত্য

খেলা শেষ হলো, শেষ হয় নাই বেলা

রতীশচন্দ্র দাস তালুকদার প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৯-২০১৯ ইং ০০:১০:৪২ | সংবাদটি ১১১ বার পঠিত

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তিনবার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। ভাবলেশহীন, মূক ও নিথর কবিকে দেখে প্রত্যেকবারই যার পর নাই ব্যথিত হয়েছি, হয়েছি বেদনাহত। তবুও যখনই ঢাকা গিয়েছি তখন অন্তত একবার কবির দর্শন লাভের চেষ্টা করেছি। কবিতা পড়ে তাঁর যে প্রতিকৃতি মনের কোণে প্রোথিত ছিল, তার সাথে কবির দীর্ঘ রোগজর্জর অবস্থা মেলানো যে সম্ভব নয় এটা তো বাস্তব সত্য। প্রাণবন্ত সদা উচ্ছ্বল কবির যে ছবি বাঙালির হৃদয়ে অঙ্কিত, যার লেখনী থেকে উৎসারিত হয়েছে ‘আমি দুর্বার/আমি ভেঙে করি সব চুরমার’, যিনি লিখেছেন ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে/ মোর মুখ হাসে, মোর চোখ হাসে, মোর টগবগিয়ে খুন হাসে’ সেই কবির উদাসীন শূন্য দৃষ্টি নিঃসন্দেহে সব ভক্ত অনুরাগীর কাছে মর্মবিদারক একটি দৃশ্য। রাজ দ্রোহিতার অভিযোগে ঔপনিবেশিক সরকার যখন কবিকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়, তখন সেই জেলে প্রখ্যাত রম্যলেখক শিবরাম চক্রবর্তীও ছিলেন। অল্প সময়েই কবির সাথে তাঁর গভীর সখ্য গড়ে ওঠে। শিবরাম চক্রবর্তী তাঁর জীবনীগ্রন্থ ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’তে একজায়গায় লিখেছেন ‘কাজির ব্যক্তিত্ব শতধা বিকীর্ণ, সহ¯্ররূপে বিচ্ছুরিত, অজ¯্র ধারায় উচ্ছল। যেমন তার শিল্পী সত্তা, বিপ্লবী সত্তা, সাধক সত্তা, তেমনি তার প্রেমিক সত্তা, আর সব ছাপিয়ে ছিল তার পুরুষ সত্তা। সবগুলোই সমান সত্য। আরও লিখেছেন, ‘আমার তো মনে হয়, বাঙলার মাটিতে শ্রীচৈতন্যদেবের পর সুভাষ আর নজরুল এক আবির্ভাব। ‘এককথায় যারাই কবির সংস্পর্শে এসেছে, তারাই তাঁর উদার, প্রাণদায়ী এবং প্রেমময় ব্যক্তিত্বের গুণে ভক্ত গুণগ্রাহী হয়ে পড়েছে। কিন্তু তাঁর যে শত্রু ছিল না তা কিন্তু নয়। কথাই আছে ‘ভাল মানুষের শত্রুর অভাব হয় না।’ তবে ঘোর শত্রুও একবার তাঁর সান্নিধ্যে এলে, তাঁর অমলিন ও প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্বের স্পর্শে বন্ধু হয়ে উঠত।
কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে। তাঁর ডাকনাম ছিল দুখু মিয়া। নজরুলের ‘দুখু মিয়া’ ডাক নামটি পিতা, মাতা বা অন্য যেই রাখুন না কেন, তিনি হয়ত নজরুলের ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন। দুখু মিয়ার দুঃখের জীবন শুরু হয় নয় বৎসর বয়স থেকেই যখন তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। ১০ বৎসর বয়সে তাকে জীবনযুদ্ধে নামতে হয়। ক্ষুৎপিপাসা নিবারণের জন্য কিশোর নজরুলকে রুটির দোকানে চাকরি, গৃহভৃত্যের কাজও করতে হয়েছে। একসময় তিনি লেটো গানের দলেও গান করেছেন শুধুমাত্র দু’মুঠো অন্ন সংস্থানের জন্য। দারিদ্র্য ছিল তাঁর আজীবন সঙ্গী। সেই দারিদ্র্যই তাকে নজরুল করে তুলেছে এবং এটাই তিনি বলতে চেয়েছেন পরবর্তীকালে লেখা ‘দারিদ্র্য’ কবিতায়। দরিদ্রের তো হারাবার কিছুই নেই, সে তো সব কিছু হারিয়ে এমনি রিক্ত নিঃস্ব। তাই সে সকল অত্যাচারী ও আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে নিঃশঙ্কচিত্তে করতে পারে সদর্প উচ্চারণ। নজরুল বলেছেন, ‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান/ তুমি মোরে দানিয়াছ ক্রীষ্টের সম্মান/ কন্টক মুকুট শোভা দিয়াছ- তাপস/ অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস/ উদ্ধত উল্লঙ্গ দৃষ্টি বাণী ক্ষুরধার/ বীণা মোর শাপেতব হল তরবার। এমন সহজ সরল আবার একই সাথে তীক্ষè ও সাহসী উচ্চারণ বিশ্বের অন্য কোন কবির কবিতায় পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। রুটির দোকানে কাজ করার সময় আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লাহর সাথে তার পরিচয় হয় এবং তিনি ১৯১৪ সালে নজরুলকে ময়মনসিংহ এর ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে ভর্তি করে দেন। কিন্তু স্বভাব চঞ্চল নজরুল এক বৎসর পরই আসানসোলে ফিরে এসে বাড়ি থেকে ১২ মাইল দূরে রাণীগঞ্জের রাজ স্কুলে ভর্তি হন। এখানে কবির সহপাঠী ও ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক শৈলজা রঞ্জন মুখোপাধ্যায়। তবে ১৯১৭ সালে দশম শ্রেণিতে পড়াকালীন অবস্থায় কবি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং প্রায় আড়াই বছর সেনা সদস্য হিসেবে করাচীতে বাস করেন। সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেও নজরুলকে যুদ্ধের ময়দানে যেতে হয়নি। তখন তিনি গানবাজনা ও সাহিত্যচর্চা করেই সময় কাটিয়েছেন। সেনানিবাসে থাকাকালীন নজরুল তাঁর প্রথম গদ্য রচনা, ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’ প্রথম প্রকাশিত কবিতা মুক্তি ইত্যাদি লিখেন। এছাড়াও গল্প ‘ব্যথার দান’, ‘ঘুমের ঘোরে’ কবিতা ‘সমাধি’ সহ আরও অনেক সৃষ্টিকর্মই তখন তিনি রচনা করেছেন। এককথায় বলা যায়, করাচী সেনানিবাসেই কবির সাহিত্য জীবনের সূচনা হয়।
৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টে থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার হিসেবে নজরুল অবসরে যান। নজরুলের সামনে তখন মোটামুটি ভাল সরকারি চাকরির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। তিনি বরং অনিশ্চিত লেখালেখির জীবনই বেছে নেন। ১৯২০ সালে কলকাতায় এসে ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে কমরেড মোজাফফর আহমদের মেসে উঠেন তিনি। তখন থেকেই তাঁর সাহিত্য ও সাংবাদিকতা জীবনের শুরু হয়। বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। সে সময়কার অনেক কবির লেখাতেই কবি গুরুর প্রভাব লক্ষ্য করা যেত, কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্র প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে প্রথম থেকেই নিজস্ব কাব্য ধারা তৈরি করতে সক্ষম হন। তিনি তাঁর প্রথম উপন্যাস বাঁধনহারা ১৯২০ সালে প্রকাশ করেন। তিনি শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নবযুগ পত্রিকায় প্রথম সাংবাদিকতা শুরু করেন। ১৯২২ সাল কবির জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর। এ বছর ‘বিদোহী’ কবিতাটি বিজলীতে প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে তিনি খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে যান এবং এরই ধারাবাহিকতায় প্রলয়োল্লাস, অগ্নিবীণা প্রভৃতি কবিতার মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে তাঁর বিপ্লবাত্মক চিন্তা চেতনার প্রকাশ ঘটান। এ বছরই তিনি দ্বিসাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ প্রকাশ করেন এবং এ পত্রিকায় আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি প্রকাশ করে সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির মনে কাঁপন ধরিয়ে দেন। সাথে সাথেই কবিতাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং ১৯৪৭ সালের আগ পর্যন্ত এ কবিতাটি আর আলোর মুখ দেখেনি। তখন রাজদ্রোহিতার অভিযোগ এনে কবিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ কবিতার প্রথম দুটি পংক্তি হলো-
‘আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
রাজদ্রোহের অভিযোগে কবির এক বছর সশ্রম কারাদ- প্রদান করা হয়। মামলা চলার সময় তিনি যে বক্তব্য দেন, এর ভাষা ও উচ্চারণ এত তেজোদ্দীপ্ত ছিল যে, এর সমতুল্য কোন রাজবন্দীর জবানবন্দী বিশ্বের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনি বলেছিলেন- ‘আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজ কারাগারে বন্দী এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত। একধারে রাজার মুকুট আর এক ধারে ধূমকেতুর শিখা। একজন রাজা হাতে রাজদ-, আর জন সত্য, হাতে ন্যায়দ-।’
অত্যাচার-নির্যাতনের প্রতিবাদে কবি ১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে অনশন শুরু করেন। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলং থেকে টেলিগ্রাম করে নজরুলকে অনশন ভঙ্গ করার অনুরোধ জানান আবার শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও অনশন ভঙ্গের অনুরোধ জানাতে জেলে যান। তবে রবীন্দ্রনাথের টেলিগ্রাম যেমন কবির কাছে পৌঁছেনি, তেমনি শরৎচন্দ্রকেও কবির সাথে দেখা করতে দেয়া হয়নি। ৪০ দিন পর কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর অনুরোধে নজরুল অনশন ভঙ্গ করেন। বিদ্রোহী ও প্রেমিক কবির জীবনে প্রেম এসেছে বারবার, তবে প্রথম প্রেম তাঁকে দিয়েছিল বেদনার নীলদংশন। তাঁর জীবনে দ্বিতীয় প্রেমিকা ছিলেন কুমিল্লার প্রমিলা সেনগুপ্ত এবং তাকেই কবি ১৯২৪ সালের এপ্রিল মাসে বিয়ে করেন। এ বিয়েতে গোঁড়া হিন্দু ও মুসলমান সমাজ কবির উপর খড়গ হস্ত হয়ে উঠে। তবে তিনি এসব অবহেলা ভরে অগ্রাহ্য করেন। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী ফজিলাতুন্নেসা, কানন দেবী এবং রানু সোমও প্রেমের অমলিন পরশ দিয়েছিলেন কবির জীবনে। রানু সোম যিনি পরবর্তীকালে বুদ্ধ দেব বসুর স্ত্রী প্রতিভা বসু হিসেবে সমধিক পরিচিত ছিলেন তিনি জীবনের জলছবি বইয়ের এক জায়গায় লিখেছেন, ‘এক বিষন্ণ বিকেলে মন খারাপ করে দোতলার ঝোলানো বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম। একটি ফিটন এসে আমাদের দরজায় থামলো। তাড়াতাড়ি দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে দরজা খুলে দেখলাম, বাঙালির তুলনায় একটু বেশিই স্বাস্থ্যবান এবং সুশ্রী এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন দরজায়। একমুখ হেসে গেরুয়া চাদর সামলাতে সামলাতে আমাকে ঠেলেই প্রায় ঢুকে এলেন ঘরে। হাসতে হাসতে বললেন, ‘তুমিই নিশ্চয় রানু? তুমিই মন্টুর ছাত্রী তো?’ এখানে মন্টু মানে কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ছেলে সঙ্গীতজ্ঞ দিলীপ কুমার রায় যিনি বৈজ্ঞানিক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন এবং তখন রানু সোম দিলীপ কুমার রায়ের কাছে কিছুদিন নজরুল সঙ্গীতের তালিম দিয়েছিলেন। কবি সম্পর্কে টুকরো টুকরো স্মৃতিচারণা এবং অজানা অনেক কথা প্রতিভা বসু ‘জীবনের জলছবি’তে লিপিবদ্ধ করেছেন অত্যন্ত শ্রদ্ধা ভরে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির নির্যাতন নিপীড়নের বিরুদ্ধে কবি যেসব কবিতা লিখেছেন, এগুলোর ভাষা যেমন তীক্ষè ও শানিত, একই সাথে কবিতা হিসেবেও শিল্পিত। সাম্প্রদায়িকতা, কূম-ুকতাসহ সকল সামাজিক অসঙ্গতি ও অনাচারের বিরুদ্ধেও তাঁর কলম ছিল ইস্পাত দৃঢ়। নারী ও বীরাঙ্গনা কবিতায় তিনি যে চিরন্তন সত্য উচ্চারণ করেছেন এবং সমাজের কাছে যে সব প্রশ্ন রেখেছেন, এর সদুত্তর তো আজও দেওয়া সম্ভব নয়, সমাজের উঁচু-নিচু, কুলীন-অকুলীন এ নিয়ে যে দ্বন্দ্ব তা কবি অত্যন্ত তীর্যকভাষায় নিন্দা করেছেন এবং বলেছেন জাতের নামে বজ্জাতি সব/জাত জালিয়াত খেলছো জুয়া।’ তিনি ছিলেন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত শ্লেষাত্মক ভাষায় ‘হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ’ কবিতায় লিখেছেন ‘মাভৈ:! মাভৈ: এতদিনে বুঝি জাগিল ভারতে প্রাণ/ সজীব হইয়া উঠিয়াছে আজ শ্মশান-গোরস্থান।’ তিনি ছিলেন সঙ্গীতের একনিষ্ঠ সাধক এবং বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান গীতি কবি। তিনি গান লিখতেন, সুর করতেন আবার অন্যকে শিখিয়ে খুব আনন্দ পেতেন। প্রতিভা বসু ‘জীবনের জলছবি’তে লিখেছেন- ‘পরের দিন সকালেই তিনি আবার এলেন। বললেন ‘এসো এসো শিগগির এসো, হারমোনিয়াম নিয়ে বসো, রাত্তিরে একটা গান লিখেছি, সুরটা তুলে নাও তাড়াতাড়ি, আবার ভুল হয়ে যাবে।’ সেই গানটি এখন খুবই জনপ্রিয় একটি গান যার প্রথম পংক্তি হলো- ‘আমার কোন কূলে আজ ভিড়লো তরী, এ কোন সোর গাঁয়।’ তাঁর গানগুলো সুরের দিক থেকে খুবই বৈচিত্র্যপূর্ণ। তিনি চার হাজারেরও বেশি গান লিখেছেন যার মধ্যে প্রায় ছয়শত গান বিভিন্ন রাগরাগিনী ভিত্তিক। তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় গজল লিখেন। তিনি যেমন কীর্তন ও শ্যাম সঙ্গীত লিখেছেন আবার হামদ, নাতসহ অনেক জনপ্রিয় ইসলামি গানও লিখেছেন। তাঁর ভক্তিমূলক ও ইসলামি গানগুলো বাণী ও সুরের সমন্বয়ে এমনই অপরূপ সৃষ্টি যে, ধর্মনির্বিশেষে সবার কাছে এগুলো সমান হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠেছে। রানু সোম ঐগঠ (ঐরং গধংঃবৎং ঠড়রপব) তে যখন নজরুল সঙ্গীত রেকর্ড করেন, তখন তার ট্রেনার হিসেবে নজরুলকে নিয়োগ করার জন্য গ্রামোফোন কোম্পানীকে অনুরোধ করেন। এরপর থেকে এইচএমবি নজরুলকে দিয়ে অবিরত গানও লেখাতে থাকে এবং আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, কাননদেবীসহ তখনকার সব বিখ্যাত গাইয়েদের ট্রেনার নিয়োগ করে। কথিত আছে, হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে গ্রামোফোন কোম্পানী তাঁকে প্রচুর পান ও চা দিয়ে দরজা বন্ধ করে বসিয়ে দিত। তিনি তখন গান লিখতেন, সুর করতেন এবং ট্রেনিং দিয়ে বড় বড় সব শিল্পীদের গান রেকর্ড করাতেন। আবার গান রেকর্ড হওয়ার পর গানের লিখিত কপি নজরুল যত্রতত্র ফেলে দিতেন। বর্তমানে সে সময়কার প্রায় সব রেকর্ডই হারিয়ে গেছে আবার মুদ্রিত কপি না থাকায় নজরুলের অনেক গানই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কবির তখন আয় রোজগারও বেড়েছিল এবং একটি গাড়িও কিনেছিলেন। এ প্রসঙ্গে রানু সোমকে কবি একদিন বলেছিলেন, ‘তুমি আমাকে বেশ সুন্দর একটা সোনার খাঁচায় ঢুকিয়ে দিয়ে গেছ।’ নজরুলের গানের স্মরলিপি এবং অনেক গানের মুদ্রিত কপি না থাকায় পরবর্তীকালে শিল্পীরা তাঁর গানের সুর বিকৃতির সাথে সাথে বেশ কিছু গানের বাণীরূপও পরিবর্তন করেছেন। বাংলাদেশ নজরুল একাডেমী শিল্পী সুধীন দাশের নেতৃত্বে নজরুল গীতির আদিসুর উদ্ধার করে স্মরলিপি তৈরির একটি উদ্যোগ নিয়েছিল তবে সুধীন দাশের মৃত্যুর পর এ প্রকল্প চলমান কিনা তা অবশ্য জানা নেই।
১৯২৯ সালে কলকাতার অ্যালবার্ট হলে আয়োজিত নজরুল সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক জগতের দিকপালরা বক্তব্য রেখেছিলেন। সুভাষ বসু সে সভায় বলেছিলেন, ‘আমরা যখন জেলে যাবো তখন নজরুলের গান গাবো, যখন যুদ্ধে যাবো তখনও নজরুলের গান গাবো’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে কবির সম্পর্ক ছিল খুবই হৃদ্যতাপূর্ণ। ১৯২১ সালে কাজী নজরুল ইসলাম শান্তি নিকেতনে গিয়ে কবি গুরুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন। ‘ধুমকেতু’ পত্রিকার ভূমিকায় কবি গুরু লেখেন ‘এখনও যারা অচেতন আছে ধূমকেতু যেন তাদের জাগিয়ে তুলে।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৩ সালে ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য বইটি কাজী নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেন। কাজী নজরুল ইসলামও ‘আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে’ কবিতাটি কবিগুরুকে ধন্যবাদ ও শ্রদ্ধা জানিয়ে রচনা করেন।
১৯৪১ সালে ৮ আগস্ট কবি গুরুর মহাপ্রয়াণ ঘটে। কাজী নজরুল ইসলাম তখন ‘রবিহারা’ কবিতা এবং ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে/ জাগায়ো না, জাগায়ো না’ গানটি রচনা করেন। এর কয়েক মাসের মধ্যেই বিদ্রোহী কবিও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৪২ সালের প্রথম দিকে বেতারের এক অনুষ্ঠানে তিনি হঠাৎ বাকরুদ্ধ হয়ে যান। কবিকে কিছু দিন হোমিওপ্যাথি ও কবিরাজি চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং ১৯৪২ সালের শেষ দিকে মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রেও ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডন পাঠানো হয়। লন্ডন থেকে তাঁকে ভিয়েনার প্রখ্যাত নিউরোসার্জন ডাঃ হ্যান্স হোফের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাঃ হ্যান্স হোফ কবির রোগটি সনাক্ত করতে সক্ষম হন। এটি অনিরাময়যোগ্য একটি ¯œায়ু রোগ, ডাক্তারি পরিভাষায় যার নাম চরপশ’ং ফরংবধংব। ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’ বইতে শিবরাম চক্রবর্তী বাংলা সাহিত্যের অনেক দিকপাল কবি সাহিত্যিকদের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে কাজী নজরুল ইসলামের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও দৃঢ়তা সম্পর্কে যা বলেছেন তা এককথায় অনবদ্য। তিনি বলেছেন, ‘আগুনকে কোন মালিন্য স্পর্শ করতে পারে না। বহতা নদী সবকিছু ধুয়ে মুছে নিয়ে যায়। আর কাজী তো কেবল প্রবাহিনী নয়, প্রবল বন্যাই।
ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২৪ মে কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং কবির বসবাসের জন্য ধানমন্ডীর একটি বাড়ি বরাদ্দ দেন। দেখেছি কবির ভক্ত অনুরাগীর সমাগমে সে বাড়ি সব সময় মুখর থাকতো। ১৯৭২ সালেই কবিকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি ঘোষণা করা হয়। জীবনের বাকি কয়টি বছর তিনি বাংলাদেশেই কাটিয়েছেন। ১৯৭৬ সালের ২৮ আগস্ট কবি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে অনন্তের পথে যাত্রা করেন। ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’ কবির সেই ইচ্ছা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে কবিকে সমাহিত করে। কবি একটি গানে লিখেছিলেন, ‘খেলা শেষ হলো, শেষ হয় নাই বেলা’। সৃষ্টির উল্লাস মুখর খেলা তো কবির ১৯৪২ এসেই থেমে গিয়েছিল, তবে তার জীবনের বেলা আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে। সে বেলায় ছিল না সৃষ্টির উচ্ছ্বাস, ছিল শুধু বাকহারা জীবনের সকরুণ যাত্রা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT