সাহিত্য

কোথায় তোমার বাঁশের বাঁশি, নারকেল পাতার চশমা ঘড়ি

জীম হামযাহ প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৯-২০১৯ ইং ০০:১২:৪৬ | সংবাদটি ২৩৯ বার পঠিত


ঘুম ভাঙ্গা রাতের শেষ প্রহরে কানে এলো নতুন দিনের আজান। দুয়ারে উঁকি দিলো পল্লী বাংলার নতুন ভোর। দু’চোখে অপার মুগ্ধতায় একে একে সবাই প্রবেশ করলো গ্লোবাল ভিলেজ নামে নতুন এক জগতে। পৃথিবী চলে এলো হাতের মুটোয়। মুহূর্তে পৌঁছে যায় প্রান্ত থেকে প্রান্তে। কতো সহজ হয়েছে জীবন। কতো কিছু আজ হাতের নাগালে যা এক সময়ে কল্পনা করাও ছিলো দুষ্কর! সেকাল একাল ভেবে আজ হয়তো তুমি নিজেও বিস্মিত। তুমি এবং তুমার পূর্ব পুরুষেরা যা চেয়েছে তা পেয়েছে। যা চায় নি, ভাবে নি তাও এখন তুমার দোরগোড়ায়। এই মুহূর্তে তুমি আদৌও কী চাও তা হয়তো স্থির করতে পারছো না। তবে তুমার আকাক্সক্ষার কোন শেষ নাই। আজ তুমি এতোকিছু পেয়ে এতো উপকরণের ভীড়ে কতোটা সুখি হয়েছো? কৃত্রিমতা দিয়ে পারছো কি তুমার মনের হাহাকার ঘুচাতে? তোমার ভেতরে আজ কেন শূন্যতার খাঁ খাঁ আর সীমাহীন হাহাকার! মনে আনমনে কোন সুখ স্মৃতি খোঁজে ফেরো বারবার। জীবনের কোন প্রাণবন্ত ছবির দিকে তাকিয়ে তুমি হারিয়ে যাও নির্বিকার ভাবনায়? কোথায় তুমার বাঁশের বাঁশি আর সবুজ পাতার পুতপুতি, নারিকেল পাতার চশমা আর হাত ঘড়ি? নিজের অজান্তেও কখনো কেন তুমার ঠোঁট নড়ে ওঠে ভাটির বাউলের উদার সুর আর দারাজ কণ্ঠে- আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম!
তুমি হারিয়ে এসেছো এক বিস্ময়কর অতীত। যেখানে পারস্পরিক ভাবাবেগ ছিলো। ছিলো হৃদ্যতা, আন্তরিকতা। সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সদ্ভাব। সহজ এবং সাবলিল জীবনের সুর ও ছন্দ। ঘরে যদিও অভাব ছিলো কিন্তু মন ছিলো অঢেল প্রাচুর্য্যে ভরপুর! কোথায় আজ হারিয়ে ফেললে তুমার সোনারগাঁয়ের সোনার মানুষ?
আজ তুমি নিজেকে যতোই আড়াল করো, যতোই তুমি রঙচঙ বাহারী পোশাকের তলে লুকিয়ে রাখো, তুমার উদাম গা শুকে দেখো এখনো লেগে আছে পলিমাটির সৌরভ! তুমি গেরামের ধূলি উড়া মেঠোপথে, কাদামাখা নরম আইলে রেখে এসেছো তুমার পদচিহ্ন। দূর্বা বিছানো পথে শিশির ধুয়েছে তুমার পদযুগল। তুমার হৈ-হোল্লোড় আর বাঁশির সুরে ভেঙ্গে খান খান হয়েছে উদাস দুপুরের নিরবতা। ডুব আর সাঁতারে ভেঙ্গেছে পদ্মপুকুরের মৌনতা। আছে বৃষ্টিতে ভেজা আর রোদে পুড়ার অভিজ্ঞতা। মার্বেল, ডাঙ্গুলি,গোল্লাছুট আর বউ-বউ কানামাছির স্মৃতি। মক্তব কামানো আর স্কুল পালানোর দুষ্টুমি। আম, জাম আর লিচু,পেয়ারার শাখে ঢিল ছুঁড়েছো কতো। মনে আছে তুমার পৌষের বিকেলে নাড়ার আগুনে আলুপোড়ানোর সুখ? পুরো গেরাম ছিলো তুমার নিজস্ব একখন্ড উঠান। না ছিলো বাঁধা,ভেদাভেদ না ছিলো কোন প্রাচীর। দু’হাত ভরে লুটে এনেছিলে ¯েœহ আর প্রীতি। রাতের আকাশে তুমারও ছিলো নিজস্ব একটা চাঁদ! তাকে নিয়ে তুমি কতো দৌড়েছো। ছায়া সুনিবিড় গাছগাছালি, ঘন পত্র-পল্লব আর বন বাদাড়ে এখনো লুকানো আছে তুমার শৈশব। তুমি চাষাভুষার সন্তান। তোমার চোখে আজও ভাসে লাঙ্গল- জোয়াল, গরু আর গোয়ালের ছবি।
কথায় কথায় এমন অনেক কথা আজ বলতে পারি। আউলাইয়া বের করতে পারি অনেক অনেক স্মৃতি। আর হ্যাঁ, তুমাকে আজ এতো কথা আরও বলছি এ জন্য যে-তুমি হয়তো সেই প্রজন্মের একজন যে এককালের মানুষের হারিয়ে যাওয়া জীবন-সংস্কৃতি ও অনুষঙ্গের শেষ সাক্ষী!
এসো হাত ধরে তুমাকে নিয়ে দেখে আসি সেকালের গেরামের কতক ছবি!
গ্রীষ্মের তাবদাহ। খাঁ খাঁ রোদ্দুর। জমিন ফেটে চৌচির প্রায়। আকাশে নেই মেঘের দেখা। তাতানো মাঠ-ঘাট। জনজীবনে অস্বস্তি। কৃষক তাকায় আকাশের দিকে, রোদের তীব্রতায় চোখ নেমে আসে আবার জমিনের ওপর। গাছতলায় গরুগুলো অলস জাবর কাটে। লাঙ্গলে ধরেছে মরিচা। আউশের দিন যায় যায়। জমিনে নেই পানি। মেঘ মাঙ্গে আল্লাহর কাছে। ছেলে মেয়েরা দেয় ব্যাঙের বিয়ে। কুলা পানি নিয়ে গান গেয়ে গেয়ে বাড়ি বাড়ি যায়, চাল তুলে। তেমন তাতানো দুপুরে পুকুরের পাড়ে শীতল ছায়ার নিচে কেউ কেউ বসে বসে গুটি বা লুড খেলে। কেউবা ব্যস্ত বেতের কাজ নিয়ে। কেউবা ঠিক করছে তার লাঙ্গল, জোয়াল, কোদালের হাতল। আবার কেউবা দেখো গাছের নীচে শীতলপাটি পেতে গড়াগড়িতে জুড়াচ্ছে দেহ-প্রাণ।
ঘরের ভেতরে বউ ঝিয়েরা বসে নেই। কেউ বুনছে শীতলপাটি, কেউবা পাখা, কেউ বানাচ্ছে সিকা কেউ দেখো ঠিক করছে লাউ-কদুর মাচা। দহলিজে একসাথে কয়েকজন বসে উঁকুন বাছতে বাছতে করছে বার বাজার, তের গল্লির গফ। আর ওদিকে ঐ ঘরে সদ্য বিবাহিত পল্লী বধূ স্বামীর গায়ে হাতপাখা ঘুরাতে ঘুরাতে চলছে গুনগুন প্রীতিলাপ। দেখলে লাজে মরে যাবে, চুপিচুপি তাকাও পল্লীবালার দিকে-জানালার পাশে রুমালে ফুল তুলতে তুলতে কান পেতে আছে দূর থেকে ভেসে আসা বাঁশির সুরে। ক্ষণে ক্ষণে চোখ তুলে তাকায় সে কোন সুদূরের পথে। না জানি কখন সুই ফুটে যায় তার কোমল আঙ্গুলে।
আবার ওদিকে কোন এক বাড়ির পাশে গাছগাছালির আড়ালে আকুপাকু মনে ইতস্তত পদে খুব সন্তর্পনে বারবার তাকায় কোন এক প্রেমিক। পকেটে তার কাগজের ভাঁজে জমে আছে কতো কথা, কতো প্রেম। চিঠি কেমনে পৌঁছায় প্রিয়তমার কাছে এ ভেবে সে ব্যাকুল! ব্যাকুল!
দক্ষিণ পাড়ার রহমত আলি এসেছেন আবির মাস্টারের খোঁজে। পুত্র তার বহুদিন পর চিঠি পাঠিয়েছে বিদেশ থেকে। কতো কথা নিঃশব্দ পড়ে আছে কালো কালো অক্ষরে। পত্র পড়ে শুনার বাড়িতে সবাই অপেক্ষার সময় গুনছে। আবির মাস্টারকে এই চিঠে পড়ে দিতে হবে। কিন্তু আবির মাস্টার কই গেছে, কখন ফিরবে কেউ জানে না। রহমত আলি এবার চিঠি পড়ার জন্য কাকে খুঁজবে?
দুপুর কাত হয়ে সূর্য ঢলে ঢলে বেলা যায় যায়। গাঁয়ের রাস্তায় ধূলি উড়িয়ে গরুর পাল হাঁকিয়ে রাখালরা ফিরছে গৃহপানে। সারাদিনের খেলা শেষে গায়ের পথের শিশুরা ফিরছে নিজ নিজ নীড়ে। ঘনালো সন্ধ্যায় কুপিবাতিগুলো জ¦লে উঠেছে প্রতিটি ঘরে ঘরে। উঠানে বসেছে শীলতপাটির আসর। মহিলারা জড়ো হয়ে বসেছেন শিশুদের নিয়ে। দাদি খোলেছেন কিচ্ছার ঝাঁপি। কিচ্ছার সুতায় বেঁধে হাজির করছেন দেও-দানব, পরি। গল্প বলছেন রাজা-বাদশাদের। উজির-কোটালের। গল্পে গল্পে কখনো নিয়ে যাচ্ছেন পাতালপুরীর অতল রহস্যে। কখনো ভয় ভয়, কখনো আনন্দ, কখনোবা বিষাদ বেদনা। এরই ফাঁকে শুনা যায় হুকা টানার শব্দ, নাকে আসে তামাকের গন্ধ। বাড়ির পুরুষেরা একে একে বাজার সদাই নিয়ে ফিরছেন। কেউ কেউ সদাই রেখে চলে যাচ্ছেন মনাই শেখের বাড়ি রেডিও শুনার জন্য। একটা মাত্র রেডিও সেটা শুনার জন্য কতো ভীড়! জোয়ান পোলার মন ঘরে টিকে না। সেও বেরিয়ে গেছে বাঁশি হাতে। যে বাঁশির সুরে গভীর রাত অবধি ঘুম আসে না পল্লীবালার চোখে।
শেষ রাতে বৃষ্টি নামে। বহুল প্রতিক্ষিত বৃষ্টি। কালিঞ্জা বেলা উঠে লাঙ্গল জোয়াল কাঁধে নিয়ে গরু হাঁকিয়ে কৃষক ছুটে যায় মাঠ পানে। হিরহির, ইতিইতি ডাকে জেগে ওঠে পুরো মাঠ। কঠিন শক্ত মাটি আজ গলে গলে পড়ে লাঙ্গলের ফালে ফালে।
বাড়ির কৃষাণীর নিস্তার নাই। ঘুম থেকে জেগে তার ঘরে-বাইরে, গোয়াল ঘরে, পাকঘরে বিস্তর কাজ। বন্দে পাঠাতে হবে নাস্তা। দিতে হবে তামাক সাজিয়ে।
বেলা বাড়ে। রোদ চড়ে। চাষি বারংবার তাকায় বাড়ির দিকে। কোন এক কৃষাণী, বালক কিংবা কিশোরী আলপথে পা ফেলে ফেলে এগিয়ে আসছে হালের কাছে। আর ঐদিকে চেয়ে দেখো পল্লীবালার দিকে। এক হাতে ধরেছে জগ অন্য হাতে কাপড়ের পোটলা। আলতা পায়ে নূপুর বাজিয়ে এগিয়ে আসছে তার বাপজানের কাছে। বাপজানের কাছে আসতে এতোটুকুন পথ তবুও যেন সে পথ ফুরায় না। রাখাল চোখ ফিরে ফিরে তাকায়। সে লাজে মরি মরি। লাজে তার পা আটকে যায়। কখন যে পিছলে পড়ে নরম আইলে। আর তার লজ্জার ভারে গলে যায় পায়ের তলের মাটিও...। ওগো পল্লীবালা, ও আমার খাঁটি সোনা, লক্ষ্মী ময়না। তুমার পদচিহ্নের খোঁজে আজও আমার রাখাল মন ঘুরে বেড়ায় বাংলার আইলে আইলে!
আকাশে ঘন কালো মেঘ আর বৃষ্টির মাতম। পানিতে থৈ-থৈ চারপাশ। এখন ঘোর বারিষা। ঝমঝম বৃষ্টির দিনে ঘরের চিপায়-চাপায় শিশুরা মেতেছে লুকুচুরি খেলায়। মেয়েরা গল্পে গল্পে হস্তশিল্প বুনে। কখনো একে অন্যের প্রতি ধাঁধাঁ ছুড়ে-তিন কুণা মাঝে গাত, না ভাংগাইলে খাইবে লাথ। কিশোরির হাত নাচে ফুলগুটির ছন্দে- ফুল ফুল ফুলটি, কুসুম কুসুম কুসুমটি...।
বৃষ্টি একটু ধরালে ছেলেরা বের হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে থৈ-থৈ পানিতে। ভেলা ভাসিয়ে দেয় জলের বুকে। মায়েদের বকা আর বারণ পড়ে যায় তাদের গা পিছলে পিছলে। কে পারে বেঁধে রাখতে এমন দূরন্ত শৈশবকে?
গরিব কৃষকের মন ভালো নেই এমন দিনে। ঘরে তার হানা দিয়েছে আষাঢ়ের নিদান। পেট করে ছু ছু। আর বৃষ্টিতে ভিজে পচে খসে খসে পড়ে শনের চাল। বৃষ্টির পানি গড়াগড়ি খায় তার খাটাল জুড়ে। কলাপাতা, তালপাতা এনে চালে দেয়। কিন্তু তা কতোটুক পারে বৃষ্টি রুধিতে? বাচ্চারা কেঁদে জারে জার। পেটের ক্ষুধা মানে না আল্লাহরও দোহাই। ঋণের জন্য কৃষক দৌড়ায় সুদিমহাজনদের দুয়ারে দুয়ারে!
ও আমার সোনা ফলানো মানুষ। গায়ের রক্ত পানি করে ঘামে নেয়ে সারা বছর তুমার কি পরিশ্রম আর খাঁটুনি। অন্ন যোগাও জাতির জন্য। অথচ তুমার ঘরে আজ ভাত নেই। কোন ডাকাতের নাও এসে লুটে নিয়ে যায় তুমার সমস্ত অর্জন? তুমাকে ঠকিয়ে যারা সম্পদের পাহাড় গড়ে তাদের ওপর খোদার লানত পড়ুক!
নিদানে নিদানে বারিষা যায়। আসে ভাদ্রের তাল পাকা গরম। একটু জিরাম নেই কিষাণ কিষাণীর। ঘাম ঝরে দরদর। আউশের ধান ঘরে তুললে পেটে দু’মুটো ভাত হয়। খড়, ন্যাড়া দিয়ে গরুগুলোরও একটু উপায় হয়। সাথে সাথে আবার জমিনকে প্রস্তুত করতে হয় আমনের জন্য। দম নেবার সুযোগ নেই। ব্যস্ত কৃষক। ব্যস্ত কৃষাণী।
আকাশে উড়ছে শারদীয় মেঘ। কাশবনে শুভ্র ঢেউ। বাতাস লুটিপুটি খায় ধানের ক্ষেতে। গায়ের রাস্তার ছেলেরা দল বেঁধে দৌড়ায়। আলতা রাঙ্গা নূপুর পায়ে আঁচলে ঢেউ তুলে যায় পল্লী বালিকা। শিউলি ঝরে পড়ে গাছ তলায়। ভোর বিহানে পল্লীবালা সে সে ফুল নিয়ে যায় কুড়িয়ে । কার জন্য এতো মালা গাঁথে তা ভেবে সেও হয়তো কুল কিনারা পায় না! তবুও সে কোন একজনের তরে আঙ্গুলে সুই ফুটিয়ে গেঁেথ যায় শিউলি ফুলের মালা।
এদিকে ছোপ ছোপ সোনা রং লেগেছে ধান ক্ষেতে। কৃষক তাকায় বারবার ফিরে ফিরে। দেখতে না দেখতে পুরো মাঠ ছেয়ে যায় সোনালী রংয়ে। মাঠ জুড়ে কাস্তের ঘ্যাচ-ঘ্যাচ, কৃষকের হাঁক-ডাক। কখনো গলা ছেড়ে গান গায়-রুপের মাইয়া একবার চাইয়া গো, ভাব লাগাইয়া পরাণ কাড়িলে...।
উঠানে ধানের স্তূপ। কৃষাণী বিছায় মাড়া। দুপুর থেকে রাত অবধি গরু হাঁকিয়ে ধান মাড়ায়। হেলতে দুলতে থাকা কুপি বাতির আলোতে রাত ঘনায়। বউ ঝিয়েরা খড় ঝেড়ে ধান আলাদা করে। তারপর সেই ধান ঘরে তুলে। আবার নিয়ে যায় রোদে শুকাতে। কুলা দিয়ে পালিয়ে পরিস্কার করতে হয় খড়কুটো। উঠানে উঠানে আজ ধানের স্তূপ। বাড়িতে বাড়িতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে খড়ের গম্বুজ। বহুদিন পর অচল ঢেঁকি আবার সচল হয়েছে। পাড়া জুড়েই ধান ভাঙ্গা ঢেঁকির আওয়াজ। গভীর রাতে ঢেঁকির তালে তালে শুনা যায় ও বাড়ির কুলসুমের গলা-
‘বলি ও ননদি আর দু’মুটো চাল ফেলে দে হাড়িতে
ঠাকুর জামাই এলো বাড়িতে-
লো ননদি, ঠাকুর জামাই এলো বাড়িতে...’
সকাল হতে না হতে শুনা যায় গাঁউ জুড়ে ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক। কেউ নিয়ে আসে হাড়ি-পাতিল, কেউ কুলা, টাইল, চালনী এসব, কেউবা চোঙ্গা পিঠার বাঁশ। বাচ্চারা দৌড়ায় লাড্ডুওয়ালার পিছে। বধূ,বালিকারা ঘিরে বসে আলতা, ¯েœা, চুড়িওয়ালাকে নিয়ে। বিনিময় মূল্য ধান। ফেরিওয়ালার বেতের পাত্রে গুনে গুনে দিতে হয়।
চারদিকে ধানের মৌ মৌ গন্ধ। নতুন চালের ঘ্রাণ। পিঠাপুলির আয়োজন। গ্রামজুড়ে চলছে আমনের মহোৎসব। রাতে বসছে পুঁথির আসর। জারি কিংবা পালা গানের মজমা। মসজিদে মসজিদে চলছে ওয়াজের এলান। গোল্লাছুটের দৌড়ে জমিনের খাড়া ন্যাড়া হয় ধরাশায়ী। নুনতা বলোরে- এক হলো-রে...ইচিংবিচিং চিচিং চা...সুলতানা বিবিয়ানা সাহেব বাবুর বৈঠকখানা...কিংবা কানামাছি, ডাংগুলি,দাড়িয়াবান্ধা, কাবাডি আরও কতো কতো খেলায় মেতে আছে পুরো মাঠ।
এদিকে কুঁয়াশার চাদর গায়ে জড়িয়ে কাঁপা কাঁপা পায়ে ঠকঠক করে গ্রামে ঢুকেছে শীতের বুড়ি। বউ ঝিয়েরাও কম যায় না। তাকে দেখে আগে থেকেই বসেছে কাঁথা সেলাইয়ে। কেউবা সুই সুতা দিয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে ফুল, লতাপাতা, আল্পনা আঁকছে নক্সিকাঁথার মাঠে!
পুরো গ্রামে বয়ে চলছে হাসি-খুশি আর আনন্দের বন্যা। মেতেছে নবান্নের উৎসবে। ও পাড়ার মতিন মিয়ার বাড়ি মেয়ের বিয়ে লেগেছে। টেপ রেকর্ডারে উচ্চ ভলিয়মে গান বাজছে। সই, ভাবিরা মেহেদি তুলছে। পাড়ার মেয়েরা নেচে নেচে গাইছে বিয়ের গান-
“আইলারে নয়া দামান আসমানেরও তেরা
বিছানা বিছাইয়া দিলাম শাইল ধানের নেরা
ও দামান বও, দামান বও।
বও দামান কওরে কথা, খাওরে বাটার পান
যাইবার কথা কও যদি কাইট্যা রাখমু কান
ও দামান বও, দামান বও...”
এতো আনন্দ উৎসবের ভীড়ে কেবা খোঁজ রাখে ও বাড়ির বালিকা বধূর মনের খবর। বহুদিন হয় সে বাপের বাড়ি যায় নাই। কথা ছিলো অঘ্রাণে এসে নিয়ে যাবেন। এ পাড়ার মেয়েরা সব একে একে নাইয়র এসেছে। এখানের বধূদেরকে তাদের বাপ ভাই এসে নিয়ে গেছে। কিন্তু তার বাড়ি থেকে এখনো কেউ যে আসে না। ক্ষেতের কাজ কি এখনো শেষ হয়নি? প্রতিদিন সে ফিরে ফিরে তাকায় মেঠোপথের কিনারে। দূরে কোন পথিককে আসতে দেখলে সে মনে করে এই বুঝি তার বাপ ভাই কেউ আসছেন তাকে নাইয়র নিতে। সে অপলক তাকিয়ে থাকে। যখন দেখে সেই গেঁয়ো পথিক কিছুদূর এগিয়ে আবার অন্য পথে চলে যাচ্ছে, তার বুক ভেঙ্গে যায়। নিরাশ হয়ে ফিরে গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বালিশ ভিজায়। কেউ বুঝতে চায় না তার মনের ব্যথা!

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT