সাহিত্য

রাতের নক্ষত্রে জ¦লে ওঠে প্রিয়তির ‘মায়াচক্ষু’

মামুন সুলতান প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৯-২০১৯ ইং ০০:১৪:২৫ | সংবাদটি ১০৩ বার পঠিত

‘আহসান হাবীব প্রিয়তিকে একটি সিগারেট বাড়িয়ে দেয়। প্রিয়তির সিগারেটের মাথায় আগুন ধরায় আহসান হাবীব। প্রিয়তি সিগারেট টানছে, জোছনার আলো আর সিগারেটের জ¦লন্ত আগুন মিশে তার গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট, কাজলকালো মায়াচক্ষু আহসান হাবীবের চোখের মনিকে আকর্ষণ করে। আহসান হাবীব প্রিয়তির দিকে হাত দুটো বাড়িয়ে দেয়। প্রিয়তি হাত থেকে সিগারেটটা ফেলে দেয় এবং আহসান হাবীবের হাত সরিয়ে নেয় আপনার সাথে শুধু ভালোবাসাই মানায়, এর বেশি নয়।’Ñ উপরিউক্ত সবসময় সিগারেট খায় কিন্তু পুরো উপন্যাস জুড়ে কোথায় সিগারেট খায়নি- একটি বিশেষ মূহুর্তে ধুমপান করছে।
আহসান হাবীব একজন কবি। তিনি বিবাহিত পুরুষ। সাংবাদিকতা করতেন একসময়। এখন ছেড়ে দিয়েছেন। নাদিয়া তাঁর স্ত্রী। অভাবের সংসারে বেশিদিন টিকতে পারেনি। এক ডাক্তারকে বিয়ে করে অন্যত্র ঘরসংসার করছে। হাবীব-নাদিয়ার সংসারে দুটি সন্তান কাব্য ও সাহিত্য। ওরা বাবার সাথেই থাকে। ওদের বাসা প্রিয়তিদের বাসার পাশে। বাপ- ছেলেদের সংসারে প্রিয়তির ‘মায়াচক্ষু’ দৃষ্টি রাখতো। প্রিয়তি বিশ^বিদ্যালয় শেষ করে নতুন একটি চাকরিতে যোগদান করেছে। ইতোমধ্যে তার বাবা ইমতিয়াজ সাহেব রিটায়ার্ড করে অবসর জীবন যাপন করছেন। মা জাহানারা গৃহিণী। একমাত্র ভাই অভি রংতুলি নিয়ে নিজ ঘরে বসে আঁকিবুকি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। প্রিয়তি ফুফু জুলিয়া বিয়ে হয়ে গেছে জুলিয়া-ইমনের সংসারে জুট-ঝামেলা প্রায়ই লেগে থাকে। মোটামুটি এইরকম চরিত্রগুলো নিয়ে ঔপন্যাসিক আলেয়া রহমান একটি উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর আরও তিনটি উপন্যাস- নিরধি, জোছনার পদ্ম এবং গাগরার জলধারা। মায়াচক্ষু তাঁর পঞ্চম বই।
সরল ও লাজুক স্বভাবের লেখিকা আলেয়া রহমান এই শহরের লেখক সমাজে একটি পরিচিত নাম। বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডায় তার প্রাণবৎ উপস্থিতি লক্ষ্য করার মতো। পাশাপাশি উপন্যাস নিয়ে কাজ করছেন। উপন্যাসের নামকরণ হিসেবে মায়াচক্ষু চমৎকার একটি নাম। রাতের নির্জন আলোয় হাবীবের বাসার ছাদে মুখোমুখী বসাবস্থায় যে প্রিয়তির যে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো একজোড়া চোখ ভেসে উঠেছিলো তারই নাম মায়াচক্ষু। হাবীবকে ভালোবেসে প্রিয়তি যখন স্বপ্ন দেখছিলো- হাবীব তখন বাস্তবতার কবিতায় মগ্ন। আবার হাবীবের চোখে যখন প্রিয়তির স্বপ্ন যোগ হচ্ছিলো- তখন বাস্তবে রিয়াদের নাকফুল বিয়ের এঙ্গেজমেন্ট হিসেবে হাজির। জীবনের এ জোয়াখেলা কতো সহজ অথচ কী নির্মম! এই নির্মম সত্যকে আলোয় রহমান শব্দে শব্দে জোড়া দিয়ে তার লেখক সত্ত্বার সুনিপুণ শিল্পসত্ত্বাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
উপন্যাস হলো একটা জীবনের সম্পূর্ণ অভিব্যক্তি। এখানে ইমতিয়াজ সাহেবের পরিবারের নানান টানাপোড়েন আছে। মধ্যবিত্ত একজন সরকারি চাকুরীজীবীর পারিবারিক কলহ আছে। বাধা-আছে, বিপত্তি আছে। জাহানারা বেগমের কৌলিন অহংকার আছে। রূপচর্চায় অভ্যস্ত-থাকার মুদ্রাদোষ আছে, স্বামীর সাথে মনোমালিন্যে বাপের বাড়ি চলে যাবার হুমকি আছে। এসবই কাহিনিতে লেখিকা তুলে এনেছেন। এই দ্বন্দ্ব সৃষ্টিই নাটক বা উপন্যাসের একটি শিল্প। এই শিল্পে আলেয়া রহমান উত্তীর্ণ হতে পেরেছেন বলে মনে হয়।
প্রিয়তি সিগারেট খাওয়া নিয়ে অভির সাথে অনেক ঝামেলা হয়েছে। সিগারেট প্রিয়তির চরম শত্রু। অথচ উপন্যাসের শেষে তাকেই আবার সিগারেট খেতে হয়েছে। প্রিয়তির বিয়ে নিয়ে বাবার প্রেসার আসতে থাকে। আহসান হাবীবকে প্রিয়তি ভালোবাসে একথা বাবার সহ্য করতে পারে না। বাবা মেয়ের সাথে একটি মানসিক দ্বন্ধ শুরু হয়। অথচ অবসরে থাকা বাবা প্রিয়তির বেতনে নির্ভরতা আছে। সে ভালোবাসে দু’সন্তানের অভাবী জনককে। তবে কথা হলো আহসান হাবীবের কাব্যপ্রীতিকে, তার কাব্যচর্চাকে প্রিয়তি মনে প্রাণে ভালোবাসে। আহসান হাবীবকে প্রিয়তি সাহায্য করতে চায়- আসলে এই সাহায্য একটা কবিপ্রতিভাকে সম্মান জানানো। কিন্তু বাস্তবে হাবীরের কাছে আত্মসমর্পণ। বাস্তবতাকে লেখিকা জিতিয়ে দিলেন।
ঔপন্যাসিক আলেয়া রহমানের মায়াচক্ষু- উপন্যাসের শব্দ চয়নে খুবই ভালো হয়েছে। চরিত্রের সাথে সাথে যুৎসই শব্দ বুনন ভালো লেগেছে। ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করে বাক্যকে বাহুল্য দোষ থেকে মুক্তি দিয়েছেন। কয়েকটি জায়গায় আঞ্চলিক শব্দ লক্ষ্য করা গেছে। মায়াচক্ষু- উপন্যাসের স্থান মানে গল্পের বা ঘটনার স্থান অর্থাৎ ঘটনাগুলো কোথায় ঘটছে তা অনুমানযোগ্য কিন্তু সরাসরি কোন শহর বা গ্রামের নাম ঠিকানা আসেনি। তবে একটি জায়গায় লেখিকা লিখেছেন- ‘মাজারের পুকুরে গজার মাছগুলো ভেসে বেড়াচ্ছিলো- এই বাক্যের গজার মাছগুলো মনে সিলেটের গজার মাছ হবে। এই ইঙ্গিত ছাড়া আর কোথায় কিছু পাওয়া গেলো না।
উপন্যাসের কাহিনিনির্ভর। ‘মায়াচক্ষু’ পড়ে হৃদয় এতোটুকু দাগ কাটেনি কিংবা চোখের কোনে একফোটা জল আর্দ্র হয়ে উঠেনি। আহসান হাবীবের চরিত্রে তা গ্রন্থিত করার সুযোগ ছিলো। কিংবা কাব্য ও সাহিত্যিকে নিয়ে আরো বেশি খেলা করা যেতো। ইমতিয়াজ সাহেবের ফেয়ারওয়েলকে আরো আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী করার সুযোগ ছিলো। অভিকে সংসারের হাল ধরিয়ে তাকে দিয়ে তারুণ্যের জয় শ্লোগান তোলা যেতো। উপন্যাস আরো ঘটনাবহুল, আরো দ্বান্ধিক- পড়তে পড়তে পাঠক কাঁদতে থাকুক।
‘মায়াচক্ষু’ উপন্যাস ভাষা অসাধারণ। শিল্পগুণে সমৃদ্ধ উপন্যাস। সংলাপগুলো- স্বতঃস্ফূর্ত ও আকর্ষণীয়। ঔপন্যাসিক আলেয়া রহমান একজন লেখিকা। সংসারের যাবতীয় সমস্যাকে বহুবিধ বাধা অতিক্রম করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার জন্য কাজ করছেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক। নতুন নতুন কাহিনি নিয়ে বারবার ফিরে আসুন নতুন উপন্যাস নিয়ে। লেখক জীবন সার্থক হোক।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT