মহিলা সমাজ

এসএসসির রেজাল্ট

নার্গিস মোমেনা প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৯-২০১৯ ইং ০১:২৪:২৪ | সংবাদটি ১২৬ বার পঠিত

বিভা সদ্য এসএসসি পরীক্ষা শেষ করে রাজধানী ঢাকায় তার মায়ের কাছে এসেছে। রেজাল্ট এর জন্য তিন মাস অপেক্ষা করতে হবে। এ তিনটি মাস সে কি করবে এটা তার ভাবনাতে নেই বললেই চলে। এখন তার যা বয়স!
একেবারে চপলা চঞ্চলা মায়াবিনী হরিণীর মত। নীচ তলা থেকে দোতলা পর্যন্ত অকারণেই কতশতবার যে ছোটাছুটি করে তার অন্ত নেই। বিভার মা বিধবা মহিলা। এই মেয়েটিই তার একমাত্র সন্তান। দূর সম্পর্কীয় এক পরিচিত আত্মীয়ের বাসায় থেকে তিনি সুইডিস সংস্থার একটি প্রতিষ্ঠানে ‘এডুকেশন টিচার’ পদে কর্মরত। বিদেশীদের সাথে কাজ করা বুঝতেই তো পারছেন সময়জ্ঞান থাকতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থেকে স্মার্ট হয়ে কাজে আসতে হবে। ঘড়ির কাটা ধরে নিয়মিত ডিউটি পালন করতে হবে। চা-নাস্তার আর দুপুরের খাবারের বিরতী ছাড়া অন্য সময় অফিসের কাজ ব্যতিরেকে কারো সাথে গল্প গুজবে সময় অতিবাহিত করা যাবে না। কর্মক্ষেত্রে শ্রেণীভেদে সকলকেই ইউনিফরম অর্থাৎ কাজের পোশাক পরতে হয় এবং নিজ নিজ পরিচয় পত্র দৃশ্যমান ব্যবহার করে নেম প্লেট লাগাতে হয়। এমনি একটি প্রতিষ্ঠানে বিদেশীদের সাথে দীর্ঘ প্রায় পঁচিশটি বছর সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছেন সাজেদা বেগম। এই দীর্ঘ চাকুরী জীবনে তিনি যথেষ্ট খ্যাতি আর সম্মান পেয়েছেন কেননা অন্যদের থেকে সাজেদা বেগম এর কথা বার্তা আচার-আচরণ অত্যন্ত বিনয়ী ও ভদ্র। নিজ কর্মে কখনও অনীহা প্রকাশ করেননি। দক্ষতার সাথে কাজ করেছেন। এ কারণে অবসর পরবর্তী বাকী জীবনে অফিস সহকর্মী সকলেই তাকে স্মরণ করে।
বিভার এসএসসি রেজাল্ট সময় কালীন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। মাঝে মধ্যে সে হুট করে মায়ের অফিসে চলে যেতো। অল্প সময়ে সকলের সাথেই সে পরিচিত হয়ে যায়। সবাই তাকে ¯েœহ করে, আদর করে। এমনি এক পর্যায়ে সাজেদা বেগম এর কর্মরত প্রতিষ্ঠানের দু’জন পরিচালক যথাক্রমে জনাব লতিফ ও জনাব জামান সাহেবদ্বয়ের নজরে পরে বিভা। বিভাকে একদিন ডেকে তাদের পরিকল্পনা জানায়। বিভাতো মহা খুশি, এটা কি ধরনের কাজ, কি এমন জিনিস, কি পাওয়া যাবে ইত্যাদি নানান ধরনের অজানা সব প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সময় করে বিভাকে নিয়ে যাওয়া হলো গাজীপুর। সেখানে একটি কারখানায় গুটি পোকা দিয়ে রেশম চাষ করা হয়। সারাদিন ঘুরে ঘুরে সব দেখানো হলো তাকে, এসব দেখে বিভা বেশ উৎফুল্ল। যে কথা সে কাজ। সাজেদা বেগম এর অফিসের ছাদে পরিকল্পিতভাবে একটি কক্ষ তৈরি করা হয়। সেখানে কাঠ এবং বাঁশ দিয়ে মাচা তৈরী করে বেশ কয়েকটি বক্স নির্মিত হলো। এরপর গাজীপুর থেকে চাহিদা মত গুটি পোকা এনে শুরু হলো রেশম চাষ। বলা প্রয়োজন গুটি পোকাকে রেশম পোকাও বলা হয়ে থাকে। বিহারী সম্প্রদায়রা একে বলতো ‘পিল্লকা পোকা’ তাই বিভাকে আদর করে কেউ কেউ বলতো ‘পিল্লকা মা’ এতে বিভা খুব মজা পেতো।
এই গুটি পোকা এরা জীবন্ত তাই এদের খাদ্যের দরকার। গুটি পোকার খাবার ছিলো ভেন্না গাছের পাতা। প্রতিদিন অফিসে হাজিরা দেয়ার পূর্বে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে একজন পুরুষ সহকর্মীর মাধ্যমে এই ভেন্না পাতা সংগ্রহ করে এনে তবেই অফিসে প্রবেশ করতে হতো। তারপর যা ঘটত, গুটি পোকার কক্ষে গিয়ে দেখা যেত সমস্ত পোকাগুলো পূর্বের দিনের পাতা খেয়ে উচ্ছৃষ্ট পাতার উপর উঠে বিচরণ করছে। কিছু পোকা নিচে পড়ে কূল কিনারা পাচ্ছেনা। নতুন একটি বক্সে টাটকা তাজা ভেন্না পাতা বিছিয়ে পোকাগুলো হাত দিয়ে একটি একটি করে তুলে পাতার উপর বসিয়ে দিতেই নিরবে কুট কুট করে সমস্ত পাতা উজাড় করে দিত। গুটিপোকা যতই বৃদ্ধি পেত ওদের খাবারও ততটাই বৃদ্ধি পেত। কিন্তু খাবারগুলো সংগ্রহ করতে বিভাকে অনেক পরিশ্রম করতে হত। সেই সাথে টেনশনে থাকতে হত পরদিন ওদের খাবার কোথা থেকে সংগ্রহ করা হবে। যদি খাবার পাওয়া না যায় পোকাগুলো না খেয়েই হয়তো মারা যাবে ইত্যাদি। অন্যদিকে এই গুটি পোকার কক্ষে কোন মহিলা প্রবেশ করলে তাদের স্পর্শে সব গুটি পোকাগুলো মরে যেত। খুবই স্পর্শকাতর ছিলো এগুলো সংরক্ষণ করা। তাছাড়া বিভার পক্ষে এককভাবে এই কাজের পরিধি বৃদ্ধি করা আদৌ সম্ভব ছিলো না। বিষয়টি কর্তৃপক্ষ পর্যবেক্ষণ করে অবশেষে এই কার্যক্রম পরিচালকদ্বয় মাথা থেকে ঝেরে ফেলেন এবং বিভার কাজের প্রশংসা করে তাকে পারিশ্রমিক দিয়ে খুশি মনে বিদায় জানান।
বিভার মা এসব বিষয়ে সবই অবগত। কাজেই এবার নতুন করে সাজেদা বেগম ভাবছেন এখন কি করা যায়! এরি মধ্যে সুন্দর আইডিয়া চলে এলো মাথায়। মায়ের পরামর্শে কাছাকাছি একটি মার্কেটে টাইপিং সেন্টারে বাংলা ও ইংরেজী টাইপ করতে শুরু করল বিভা। প্রতিটি অঙ্গুলির সাথে অক্ষর চিনে ব্যালেন্স করে একটি শব্দ গঠন প্রথম প্রথম বেশ আগ্রহ হয়েছিল, ইংরেজিটা মোটামুটি সহজ তুলনামূলকভাবে বাংলার থেকে। বাংলায় একটি বাক্য মিলাতে খুবই কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। এমনি চেষ্টা করতে করতে বাংলা ও ইংরেজিতে টাইপিং এ স্পীড মাত্রই নিয়ন্ত্রীত হচ্ছে এরই মধ্যে বিভার হঠাৎ এসএসসির রেজাল্ট বের হলো। তখনকার রেজাল্ট বর্তমানের মত গ্রেড সিস্টেম ছিলো না, তখন ছিলো বিভাগ সিস্টেম। কে কোন বিভাগে পাশ করেছে এটাই মূখ্য কথা। অবশেষে দেখা গেল বিভা দ্বিতীয় বিভাগ নিয়ে এসএসসি পাশ করেছে। এতে সবচাইতে খুশি ও আনন্দিত এবং গর্বিত তার মা সাজেদা বেগম। আরও একজন নিঃশ^ার্থভাবে যে খুশি হয়েছেন, সে হলো তার মামা। কিয়াম মামা সেদিনই বাজারে গিয়ে ব্যাগ ভর্তি করে অনেক অনেক বাজার নিয়ে এসেছিলেন। এর মধ্যে বড় বড় কাঁচা আম ছিল যা বিভার মামা ডাল দিয়ে খেতে পছন্দ করতেন। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন দুপুরে ভাল রান্না হলো, খাওয়া হলো। বলা প্রয়োজন বিভার রেজাল্টে সেই সময় খুশি হয়েছিলেন আরো একজন, তিনি ওরই বড় ভগ্নীপতি যার বাড়িতে দু’বছর থেকে পড়ালেখা করেছে বিভা। তিনি থানা পর্যায়ের হাই স্কুলের সনামধন্য অতি পরিচিত এবং শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব। তিনি স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক। এলাকায় তার যতেষ্ট খ্যাতি রয়েছে। বর্তমানে তার নামে এলাকায় একটি স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা রয়েছে। বেশ বড় তাদের পারিবারিক কবরস্থান। তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিভার শ্রদ্ধেয় এই ভগ্নীপতি বরাবরই সমাজ সেবায় নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। বিভার এসএসসির রেজাল্টের পেছনে তার ভগ্নীপতির অবদান অনস্বীকার্য।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT