ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী

ফখরূল কবির খাঁ প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৯-২০১৯ ইং ০১:০১:২১ | সংবাদটি ৩৯৫ বার পঠিত

পাক ভারতের শ্রেষ্ঠ আলেমদের মধ্যে যারা মুসলিম সমাজকে জাগরিত করে একতাবদ্ধ করে ছিলেন এবং ইসলামের জাতীয়তা ডুরে আবদ্ধ করে ভারত বুকে মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের আশার বাণী শুনিয়েছিলেন ও তাহা বাস্তবায়িত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, হজরত আল্লামা শাহ সুফি মৌলানা ছহুল উসমানী (রঃ) তাদের অন্যতম অগ্রগণ্য মুজাহিদ বীর পুরুষ। আমরা হয়তো অনেকে তার নাম জানিনা, অথবা ভুলতে বসেছি তাই কৃতজ্ঞতাবোধের তাগিতে এ মহান ব্যক্তির শুধু সিলেটের রেফান্ডামে অগ্রগণ্য ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে এ কলামে আলোচনা করব।
হজরত মৌলানা ছহুল উসমানী(রহ.) ১৮৭৬ ইং সালে বিহারের ভগলপুর জেলার পুরীয়নীতে জন্মগ্রহন করেন। তিনি হজরত উসমান গনী (রহ.) বংশধর। তাহার পিতা মৌলভী আকমল হোসেন উসমানী (রহ.) স্থানীয় বিশিষ্ট আলীম ও আমিল ছিলেন। ছহুল উসমানী ভারতের শ্রেষ্ঠ দ্বিনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (কানপুর, হায়দ্রাবাদ, শাহরানপুর) সমূহে অধ্যয়ন করার সুযোগ পান। তিনি ফখরে উলামা শায়খূল হীন্দ হজরত মৌলানা মাহমূদূল হাসানের ¯েœহের শাগরিদ ছিলেন। এছাড়া হজরত মৌলানা রশীদ গঙ্গুহীর হাতে বায়াত গ্রহন করে তছউফের ইজাজতের খিরকা লাভ করেন। চাকুরী জীবনে তিনি দেওবন্দ, কলিকাতা আলীয়া মাদ্রাসা, শাহরানপুর মাদ্রাসা, পাটনা সরকারী শামছুল হুদা মাদ্রাসায় দক্ষতার সহিত অধ্যাপনা ও অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। কথিত আছে হজরত মৌলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.) পর হজরত ছহুল উসমানী কুতবে আলম এর পদে বারিত হন। ১৯১৮ ইং সালে তিনি সিলেট আলীয়া মাদ্রাসায় হেড মৌলভীর পদে দেড় বৎসর অতিশয় সুখ্যাতির সহিত অধ্যাপনা করেন। পরে আবার ১৯৩৭ ইং সনে সিলেট আলীয়া মাদ্রাসায় তাহার টাইটেল কোর্সের শর্ত নির্ধারিত হওয়ায় তাহা পুরনার্থে আসাম সরকার ও সিলেটবাসীর বিশেষ অনুরোধে সিলেট মাদ্রাসায় টাইটেল কোর্সের শায়খূল হাদিসের পদে যোগদান করিয়া ০৭ বৎসর অর্থাৎ ১৯৪৪ইং পর্যন্ত থাকেন। দীর্ঘদিন সিলেট অবস্থান করার সুবাদে তার খ্যাতি সারা ভারতের মত বৃহত্তর সিলেটে ছড়িয়ে পড়ে। দরগা মসজিদে বাদ জুম্মা তার জ্ঞানগর্ভ ওয়াজ শুনার জন্য দূর-দূরান্তর থেকে লোক সমাগম হতো।
সিলেট প্রাচীনকাল থেকেই সুবে বাংলার অধিনে ছিলো। অনগ্রসর আসাম প্রদেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে বৃটিশ সরকার ১৮৭৪ ইং সালে সমৃদ্ধ সিলেট জেলাকে আসাম প্রদেশের সাথে সংযুক্ত করে। আসাম প্রদেশের সংসদ রাজনীতি,ব্যবসা-বাণিজ্য অর্থাৎ প্রশাসনসহ সর্বক্ষেত্রে সিলেটিদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। ১৯৪৭সালে দেশ বিভাগ হইয়া যাওয়ার পর সিলেট জিলার ভাগ্য চরম অনিশ্চয়তার দোলায় আন্দোলিত হইতে থাকে। তৎকালীন আসাম মুসলিমলীগের সভাপতি মৌলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ময়মনসিংহ, টাংগাইল থেকে আসামে গিয়ে বসবাসরত বাঙ্গালী মুসলমানদের নিরাপত্তার স্বার্থে সিলেট জেলা আসামের সাথে থাকা দরকার বলে জিন্নাহ সাহেবের কাছ থেকে তার মতামত ব্যক্ত করলেন।
আমি ‘সিলট একাডেমির সহসম্পাদক’ থাকাকালীন মরহুম এডভোকেট শামসুল ইসলাম চৌ. বাসায় অনুষ্ঠিত সভাশেষে ঘরোয়া আলাপচারিতায় আমার খালু মুসলিমলীগের প্রাক্তন এম.এন এ এডভোকেট মরহুম আহমদ আলী সাহেবের বাচনিক জানতে পারি ভাদেশ্বরের আব্দুল মতিন চৌধুরী (কলা মিয়া) একক প্রভাবে জিন্নাহ সাহেব সিলেটে গণভোটের সিদ্ধান্ত নেন। আব্দুল মতিন সাহেব ছিলেন জিন্নাহ সাহেবের প্রতিষ্ঠিত ‘ইনডিপেন্ড পার্টির সেক্রেটারী’ (জিন্নাহ সাহেবের দক্ষিণ হস্ত বলিয়া পরিচিত),লিয়াকত আলী খান ও গোলাম মোহাম্মদের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাটি আসাম ও সিলেট মুসলিমলীগের প্রতিষ্ঠাতা এবং স্যার সাদউল্লাহর মন্ত্রিসভার দুইবারের মন্ত্রি,ভারতের ব্যবস্থা পরিষদে আসামের মুসলমানদের প্রতিনিধি, বোম্বে ক্রনিকল ও আসাম হেরাল্ড পত্রিকার প্রখ্যাত সম্পাদক এবহুবিধ পরিচয়ের অধিকারী মতিন চৌধুরী জিন্নাহ সাহেবকে বলেন সিলেট যদি ভারতের সাথে আসামের অংশ হিসাবে থাকে তবে আমার আজীবন মুসলিমলীগের রাজনীতি ব্যর্থতায় পর্যবশিত হবে। অবশেষে মতিন চৌধুরীর অনুরোধ উপেক্ষা করতে না পেরে জিন্নাহ সাহেব সিলেটে গণভোট অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত মুসলিমলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে অনুমোদন করান। অবশেষে বিলেতের মুসলিম বিরোধী শ্রমিক সরকারকে জিন্নাহ সাহেবের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও আপোষহীন চাপের নিকট নতি স্বীকার করতে হয় এবং মুসলিমলীগ সংখ্যাগরিষ্ট সিলেট জিলার ভাগ্য গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারন করার ব্যবস্থা হয়।
এ সময় কুচক্রী হিন্দুরা সিলেটের মুসলমানদের কে চিরতরে গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ করিতে উঠিয়া পড়িয়া লাগেন এবং এদেশে তথাকথিত জাতীয়তাবাদী মুসলমানদিগকে ছলে বলে ও কৌশলে বশীভূত করিতে সক্ষম হন। নয়াসড়ক মসজিদে প্রতিবছর রোজামাসে জমিওতে উলামা হিন্দের মৌলানা সৈয়দ হুসেন আহমেদ মদনী সাহেব আগমন করতেন। সিলেট শহরসহ সারাজিলায় তার অসংখ্য মুরিদ ছিলেন। এছাড়া বৃহত্তর সিলেটের তৎকালীন নামকরা অধিকাংশ আলিম,পাকিস্তান বিরোধী অখন্ড ভারতে বিশ্বাসী কংগ্রেসের দোসর কমিটিতে জমিওতে উলামায়ে হিন্দের সমর্থক ছিলেন। কংগ্রেস কমিটিতে উলামায়ে হিন্দের সম্মেলিত প্রচারনায় ফলে তাদের কার্যক্রম সফলতার সহিত চলিতে লাগিল। সিলেটের ধর্মপ্রবন ও রাজনীতিতে চেতনাহীন মুসলিম জনসাধারণ এসময়ে একেবারে বিভ্রান্ত ও কিংকর্তৃব্য বিমূঢ় হইয়া পড়ে। মুসলমানরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। সিলেটের মুসলমানগণ এহেন দূর্দিনে ভাগ্যগুণে হজরত মৌলানা ছহুল উসমানী আল্লাহর রহমত স্বরূপ আর্ভিভূত হইলেন। তিনি তাহার অসংখ্য ছাত্র, শিষ্য, ভক্ত ও অনুরক্তসহ কাল বিলম্ভ না করিয়া রাজনীতিতে ঝাপিয়ে পড়িলেন। তিনি স্বার্থহীন ভাষায় ফতওয়া দিলেন। পাকিস্তানের পক্ষে ভোট প্রদান সিলেটের মুসলমানদের জন্য ফরজ ও জিহাদের সমতূল্য। এই ফতওয়া মুসলমানদের মোহ কাটিয়া গেল। তাহারা পথের সন্ধান পাইলেন।
তাহারা ইতস্ততঃ ভাব পরিহারপূর্বক দলে দলে মৌলানা সাহেবের নেতৃত্বে পাকিস্তান অর্জনের সংগ্রামে ঝাপাইয়া পড়িলেন। উনার ডাকে সিলেটের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব,ব্যবসায়ী,আইনজীবিসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সাড়া দিলেন। সিলেট জিলা রেফারেন্ডাম বোর্ড গঠিত হলো। বোর্ডের সেক্রেটারী ছিলেন অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেবের পিতা এডভোকেট আব্দুল হাফিজ সাহেব। গণভোটে পরিচালনার জন্য কোন অর্থ ছিলনা। ভাসানী সাহেব কোন ফান্ড দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। অবশেষে জিন্নাহ সাহেবের বিশেষ অনুরোধে তৎকালীন কেন্দ্রীয় মুসলিমলীগের কোষাধ্যক্ষ ইষ্পাহানী সাহেব তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে সিলেট রেফারেন্ডামের অর্থ সরবরাহ করেন। আমরা সিলেটবাসী তার এ অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সহিত স্বরণ করি। মৌলানা সাহেব ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে পাকিস্তান বিরোধী প্রতিটি এলাকায় বৃষ্টি-বাদলা উপেক্ষা করে একের পর এক জনসভা চালিয়ে নিলেন। এই রেফারেন্ডামের সময় আসাম প্রাদেশিক মুসলিমলীগের সহ-সভাপতি মরহুম আব্দুল বারী চৌধুরী এম.এ.বি.(এল.এম.এল এ) নিজ এলাকায় গুরুত্বপূর্ন পাকিস্তান বিরোধী ঘাটিতে মৌলানা ছহুল সাহেককে নিয়া যান, ফলে দলে দলে লোকজন মুসলিমলীগের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়।
জৈন্তা এলাকা তখন জমিওতে উলামা হিন্দের প্রভাবাধীন ছিল। হরিপুরের খান সাহেব শায়খুল করিম মৌলানা ছহুল উসমানী সাহেবকে নিয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় সভা করেন। তিনি মুসলিমলীগের প্রতীক কুড়াল মার্কায় ভোট দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন এবং মুসলিম জনগণকে নিয়া মুসলিম রাষ্ট্রে যোগদানের কোরআন হাদিস ও ফেকাহের আলোকে দলিলাদি পেশ করে সাধারণ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিচারের জন্য আহবান জানান। তাহার যুক্তি নির্ভর বক্তৃতায় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রবক্তাদের অখন্ড ভারতের এবং ধর্মনিরপেক্ষ জাতিয়তাবাদের যুক্তির বহুপূর্ব হতে স্থাপিত বহুব্যাপীজাল ধর্মপ্রান মুসলমানদের তাওহীদি হৃদয় হতে বিলীন হয়ে যায়। এভাবে বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন স্থানে একের পর একজন জনসভা করার ফলে সভা সিলেটের মুসলমানরা কংগ্রেস ও জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের অখন্ড ভারতের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে বুঝতে পারে এবং সিলেটের পাকিস্তান ভুক্তির পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। অনেক সময় মৌলানা সাহেব কে কংগ্রেসের লেলিয়ে দেওয়া গুন্ডাদের মোকাবেলা করে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে চলতে হয়।
এদিকে মুসলিমলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশে সিলেটের গণভোটের প্রচারনার জন্য একদল নেতৃবৃন্দ সিলেটে আগমন করেন। এদের মধ্যে শাহ আজিজ, শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখযোগ্য। আমার খালু গ্রুপক্যাপ্টেন, সুসাহিত্যিক ও সিলেট গবেষক ফজলুল রহমান সাহেব তখন সিলেট জিলা মুসলিমলীগ ষ্টুডেন্ট ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন। তিনি নির্বাচনী প্রচারনা সভা হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, করিমগঞ্জ অর্থাৎ তৎকালীন বৃহত্তর সিলেটে পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সহযোগীতার জন্য ছাত্রদের টিম করে বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করেন। মুসলিমলীগ নেতৃবৃন্দের জ্বালাময়ী যুক্তিসংগত বক্তৃতার মাধ্যমে সিলেটের মুসলমানরা তুলনামূলক ভাবে বুঝতে পারে ভারতের সাথে থাকলে তাদের কি পরিণতি হবে এবং পাকিস্তানে যোগ দিলে তাদের অবস্থান মর্যাদা ধর্মীয় স্বাধীনতা কতটুকু লাভ হবে।
কলিকাতার হিন্দুরা রায়টের মাধ্যমে কিভাবে মুসলমানদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে এসব দেখার করুণ দৃশ্যের বর্ণনা শেখ মুজিব সিলেটের মুসলমানদের সামনে জ্বালাময়ী বক্তৃতার মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। এভাবে একদিকে মৌলানা সাহেবের যুক্তিসংগত বক্তৃতা ও দোয়া এবং অন্যদিকে মুসলিমলীগ নেতাদের জনসভার মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্য পাকিস্তানভুক্তির পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। বৃহত্তর সিলেটের মুসলিম নারীরা পুরুষের সাথে নির্বাচনী প্রচারনায় নেমে পড়লেন। সিলেটের নারীদের মধ্যে এই উচ্ছাস দেখে কংগ্রেস ও জমিওতে উলামায়ে হিন্দ উদ্ভিগ্ন হয়ে পড়ে। সিলেটের মুসলিম নারীদের কে ভোটদান থেকে বিরত রাখতে জমিওতের মৌলানারা ফতওয়া দিলেন। নারীদের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়া হারাম ও পর্দার খেলাপ। এই ফতওয়া সিলেটের অভিজাত রক্ষণশীল মহিলাদের মনে দারুন রেখাপাত করে। এই নাজুক অবস্থায় মৌলানা ছহুল উসমানী এগিয়ে আসেন। তিনি কুরআন ও হাদীসের আলোকে দ্ব্যের্থহীন ভাবে ফতওয়া জারি করে ঘোষনা করলেন। পর্দার মধ্যে থেকে মুসলিম নারীদের ভোট প্রদান ফরজ এবং শরীয়ত সম্মত। এ ভোটের মাধ্যমে জ্বিহাদে অংশ নেয়া প্রত্যেক মুসলিম নারীর অবশ্য কর্তৃব্য এ ফতওয়া দৃশ্যপট বদলে ফেলে। জমিওতে উলামায়ে হিন্দের কণ্ঠ স্থব্ধ হয়ে যায়। নির্ধারিত তারিখে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সিলেটের মুসলিম নারীরা পুরুষের পাশাপাশি সমানভাবে স্ততঃস্ফুর্তভাবে গণভোটে অংশগ্রহন করেন। গণভোট বিপুল ভোটে সিলেট পাকিস্তানে অর্ন্তভূক্তির রায় ঘোষিত হয়। উল্লেখ্য রেডক্লিফ মিশনের পক্ষপাতিত্তের ফলে ও কংগ্রেস নেতাদের গোপন যোগাযোগের কারনে এবং সিলেটের তৎকালীন সর্বোচ্চ পর্যায়ের আমলার মৌন সমর্থনে করিমগঞ্জ মহকুমার প্রায় ০৩টি থানা ভারতের সাথে সংযুক্ত হয়-যা প্রাচীনকাল থেকে সিলেটের অংশ ছিল।
বৃদ্ধবয়সে অসুস্থ্য শরীর নিয়ে মৌলানা ছহুল উসমানী সাহেব প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্বাচনী প্রচারনায় সক্রীয় অংশগ্রহন করার ফলে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। তৎকালীন খাসীয়া ও জৈন্তাহিলস(শীলং) এর প্রথম ভারতীয় জেলা প্রশাসক জনাব সৈয়দ নবীব আলী সাহেবের বিশেষ আমন্ত্রনে চিকিৎসা ও বিশ্রামের জন্য মৌলানা ছহুল উসমানী, তার ছেলে এবং অন্য একজন মৌলানা ডি.সি সাহেবের বাংলো তে অবস্থান করেন। প্রতি বেলা নামাজের সময় উচ্চস্বরে আজান দিতেন। ডি.সির বাংলোতে পৃথিবী সৃষ্টির পর খুব সম্ভব প্রথম আজান ধ্বনী উচ্চারিত হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর সৈয়দ নবীব আলী সাহেব সিলেটের জেলা প্রসাশক হিসাবে যোগদান করিতে সিলেট চলে আসেন। মৌলানা সাহেবও উনার সাথে সিলেটে চলে আসেন। সৈয়দ নবীব আলী সাহেবের সাথে মৌলানা সাহেবের পরিচয় ছিল অনেক বছর পূর্ব থেকে। ১৯৩৮ সালে সিলেট সরকারী আলীয়া মাদ্রাসায় টাইটেল ক্লাস শুরু করার শর্ত হিসাবে উপযুক্ত ব্যাক্তির প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন প্রথম মৌলানা হুসেন আহমদ মদনীকে অনুরোধ জানাইলে তিনি তা গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে তিনি মৌলানা ছহুল উসমানী নাম প্রস্তাব করেন।
আসাম সরকার তথা সিলেটবাসী অনুরোধে মৌলানা ছহুল উসমানী সাহেব সিলেট আলীয়া মাদ্রসায় প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগদান করেন। মৌলানা সাহেবের অবস্থানকালীন সময়ে ১৯৪৩ইং সনে সৈয়দ নবীব আলী সাহেব সিলেটের এডিশনাল ডিষ্টিক্ট ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন এবং ভাগ্যক্রমে মৌলানা সাহেবের বাসা সংলগ্ন বাসায় নবীব আলী সাহেব বসবাস করতেন। ছহুল উসমানী সাহেবের মত একজন পন্ডিত, দরবেশ ব্যাক্তিকে প্রতিবেশী পেয়ে ডি.সি সাহেব কৃতজ্ঞ ছিলেন। মৌলানা সাহেবের ব্যক্তিত্ব,জ্ঞানগর্ভ আলোচনা বিশেষ করে শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর দরগা মসজিদে তার ওয়াজ এবং দোয়া ডি.সি সাহেবকে বিমোহিত করে।
মৌলানা ছহুল উসমানী সাহেব বিভিন্ন মেয়াদে সিলেট আলীয়া মাদ্রাসায় চাকুরীর সুবাদে সিলেট অবস্থান করার কারনে তৎকালের শহরের তথা বৃহত্তর সিলেটের বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। কে কার চেয়ে বেশী হুজুরের সংস্পর্শে আসবেন এ নিয়ে রীতিমত প্রতিন্ধিতা চলতো। তাদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করছি-মজদউদ্দিন চৌধুরী, (সুন্নাত চৌধুরী সাহেবের পিতা),প্রিন্সিপাল এম.সি কলেজ,খান বাহাদুর আব্দুল্লা আবূ সায়ীদ, (প্রাক্তন প্রিন্সিপাল এম.সি কলেজ), শমসুল উলামা মৌলানা আবু নছর ওহীদ (প্রাক্তন মন্ত্রী), এ জেড আব্দুল্লাহ সরকুম মতোয়াল্লী শাহজালাল দরগা, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অবসরপ্রাপ্ত এ.ডি.ম, জহীর উদ্দিন আহমদ অবসরপ্রাপ্ত এ.ডি.সি, সৈয়দ আওলাদ হোসেন অবসরপ্রাপ্ত মুন্সিফ, অধ্যাপক ইসহাক মোহাম্মদ, নুরুল হক সম্পাদক আল-ইসলাহ, আছাবুর রাজা চৌধুরী,সদস্য লোকেল বোর্ড সুনামগঞ্জ, মুসলিম চৌধুরী অবসরপ্রাপ্ত বিভাগীয় স্কুল ইনেসপেক্টর, সৈয়দ তফজ্জুল হোসেন লাইব্রেরিয়ান সিলেট আলীয়া মাদ্রাসা, নজমুল হোসেন চৌধুরী অবসরপ্রাপ্ত স্কুল ইনেসপেক্টর, হোসেন বখত মজুমদার, দেওয়ান আব্দুল হামিদ চৌ. (ইটা), ইউসুফ মাচ্র্ন্টে, আব্দুল খালিক মার্চেন্ট, কৌলার সৈয়দ বদরুল হোসেন, কানিহাঠির মান্নান চৌ., ছাতকে আব্দুল হাই আজাদ, চাউতলীর মইনউদ্দিন আহমদ চৌ. সচিব, প্রিন্সিপাল লুৎফুর রহমান গং।
মৌলানা ছহুল উসমানী সাহেবের প্রতি বৃহত্তর সিলেটের এলিট শ্রেণির আকর্ষনের অন্যতম কারণ হচ্ছে কোরআন ও সুন্নাহ আলোকে ব্যক্তিজীবনে অনুশীলনে তার নিরবধি প্রয়াস। এ প্রসংগে একটি উদাহরণ এখানে না দিয়ে পারছি না। একবার সিলেটের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মৌলভী আব্দুল করিম সাহেব (পাঠানটুলায় আব্দুল হামিদ মন্ত্রী সাহেবের চাচা) সুরমা ভ্যালী মুসলিম স্টুডেন্ট ফেডারেশনের বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করার জন্য সিলেট শহরে আগমন করেন। তৎকালীন সিলেটের শেখঘাটের বিশিষ্ট জমিদার খান বাহাদুর আবু নছর, এহীয়া(জিতু মিয়া) সাহেবের বাড়িতে মধ্যান্য ভোজের নিমন্ত্রনে,ক্যাভেজে চড়ে আব্দুল করিম ও মৌলানা ছহুল উসমানী গমন করেন। পথে ছহুল উসমানী সাহেব খুব অস্বস্থি বোধ করেছিলেন। করিম সাহেব এ অস্বস্তির কারন জিজ্ঞেস করলে মৌলানা সাহেব বললেন ছাত্ররা বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে তাই তিনি গাড়ী থেকে নামার অনুমতি নিয়ে পায়ে হেঁটে ছাত্রদের সাথে নিমন্ত্রনস্থলে পৌছেলেন। ছহুল সাহেবের ব্যক্তিজীবনে ইসলামের এ অনুশীলন দেখে করিম সাহেব বিমোহিত হলেন।
সিলেটের এলিট শ্রেণী মৌলানা সাহেবের নিরাপত্তা নিয়ে খুব বেশী উদ

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সুনামগঞ্জের সাচনা: ইতিহাসের আলোকে
  • বদলে গেছে বিয়েশাদীর রীতি
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ঐতিহ্যবাহী পালকী
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ইতিহাসের আলোকে নবাব সিরাজ উদ-দৌলা
  • ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জল শতবর্ষ
  • পুরান পাথরের যুগ থেকে
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • Developed by: Sparkle IT