শিশু মেলা

দ্বীপের রাণী

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৯-২০১৯ ইং ০০:১৪:২৪ | সংবাদটি ১১৫ বার পঠিত

লহরি গ্রামের দিকে পা বাড়ালো। ভাঙ্গাচুরা রাস্তাটা বড়ই সংকীর্ণ। উভয় দিকে বাড়িওয়ালারা যেন রাস্তাটিকে চেপে ধরেছে। কেউ বেড়া দিয়ে কিয়দংশ আয়ত্তে নিয়েছে, কেউ একটা অংশে বালু, পাথর রেখে চলাচলে বাঁধা সৃষ্টি করেছে, কেউবা সদ্য তোলা ধান-খড় শুকাতে দিয়েছে। মোট কথা রাস্তাটা যার যার অধিকারে নিতে পারলে যেন সবাই খুশি হয়, এই আর কি। লহরি ভাবে ওদের কি মানসিকতা। একটা রাস্তা থাকবে অবাধ, বিস্তৃত। গাড়ি-ঘোড়া, পথচারি নির্বিঘেœ চলাচল অত্যন্ত জরুরি। চলাচল নির্বিঘœ করতে কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিচ্ছে না কেন? তাইতো এত এক্সিডেন্ট...
লহরি হাঁটছে ৩০ কি.মি ঘন্টায়। অনেক গাড়ি থেকে স্পিড বেশি। একটা লোক ওকে ক্রস করছে। লোকটির তাকানোটা সহ্য হচ্ছে না লহরির। দৃষ্টি লুলোপ। লহরি লোকটির মনের কথা পড়তে শুরু করল। সর্বনাশ। এতো মস্ত বড় ভন্ড। এই মাত্র একটা বাচ্চা মেয়েকে ধর্ষণ করে এসেছে। এখন তাকাচ্ছে আমার দিকে। বাপরে বাপ। লোকটি এগিয়ে আসছে লহরির দিকে। ওকে ধরবে বলে। ও ভাবছে লহরি মানুষ। কিন্তু ও জানে না লহরির কত পাওয়ার। ও যে ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা সে তো কল্পনাও করতে পারছে না।
দ্রুত গতিতে লহরির গতিরোধ করল লোকটি। কিন্তু লহরি তাকে সে সুযোগ দিল না। সূর্যের আলোতে ওর হাত ধরতেই আচমকা একটা আলোকরশ্মি লোকটির তলপেটে আঘাত করল। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল লোকটি। হাতড়ে দেখে ওর পুরুষাঙ্গ নেই। উঠতে চেষ্টা করল; পারল না। ততক্ষণে লহরি চলে গেছে অনেক দূর।
পথে আরেকটা লোকের সাক্ষাৎ পেল সে। শহর ছেড়ে গ্রাম অভিমুখী যে রাস্তা- একে বেঁকে চলে গেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। এই জায়গাটা বোধ হয় দুদুলের গ্রাম আর শহরের মাঝ বরাবর হবে। একটা বড় বটগাছের ছায়ায় লোকটি বিশ্রাম নিচ্ছে। বৈকালী রোদ তখনও গন্গন্ েআলো ছড়াচ্ছে। লহরিকে অনেক দূর থেকে ফলো করছে লোকটি। লহরিকে ওই বটগাছটার পাশ দিয়েই যেতে হবে। লহরি ভাবল এ আবার কোন বিপদ। ধরে ফেলবে না তো? লহরি ওর অন্তর পড়ার চেষ্টা করল। হ্যাঁ অনেক তথ্যই সে পেয়ে গেল। এই সেই লোক যে কিছুদিন আগে মৃত্যুপথ যাত্রী ছিল। অজানা ভয়ে সে আতঙ্কগ্রস্ত ছিল। কখন তার মৃত্যু হয়- সেটা ভাবতে ভাবতে রাতে ঘুম আসত না। ওকে বাঁচানোর জন্য রক্তের প্রয়োজন ছিল। রেয়ার গ্রুপের রক্ত। ওর ছেলের এক বন্ধু রক্ত দিয়ে তাকে বাঁচাল।
ছেলের বন্ধুটি একটা প্রতিষ্ঠানে কাজ করত। ওর মধ্যে অনেক মানবপ্রীতি ছিল। সে অসুস্থ লোকটির ছেলেকে তার প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়। এর কিছুদিন পর এই উপকারি বন্ধুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে এই সংবাদটি ছেলের মাধ্যমে এই লোকটি পায়।
বটগাছের নিচে বসে লোকটি ভাবছে- যে ছেলেটি অসুস্থ মনে হয় বাঁচবে না। ভালোই হলো। ও মরে গেলে আমার ছেলে ম্যানেজার হবে। দুটো টাকা অতিরিক্ত কামাই হবে। লহরি অবাক হয়ে- ভাবছে হায়রে পৃথিবীবাসী। হায়রে মানুষ। তোমরা এতই বদ? যে ছেলেটি রক্ত দিয়ে বাঁচালো তারই কিনা অমঙ্গল কামনা করছে। লহরি দ্রুত পা চালালো.... দুদুলের গ্রামের দিকে, আর ভাবছে মানুষের মন এত জটিল ও কুটিল কেন? রক্ত মাংসের মানুষ ওরা- একই প্রজাতির। একে অন্যের প্রতি ভালবাসা থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু মাঝে মধ্যে দেখছি শয়তান থেকেও ভয়ংকর ওরা....।
এখন বিকেল তিনটা। লহরি ভাবল নিশ্চয়ই দুদুলরা ওকে খোঁজতে শুরু করেছে। তবে এখন ওর গ্রামে ফেরা সমীচিন নয়। কেউ না কেউ দেখে ফেলবে। শেষে আবার সারা গ্রাম জুড়ে একটা জট পাকানো শুরু হবে। তাই লহরি ঠিক করল রাত অবধি সে কোথাও লুকিয়ে থাকবে।
দুদুলদের গ্রামের পেছনে বেশ মাঝারি এক বন। এদিক ওদিক চেয়ে দেখলো লহরি। না কোন জন মানব নেই। চট করে সে ঢুকে পড়ল জঙ্গলে। কিন্তু বনের ভিতরের অবস্থা আরও জটিল। বেতস বনে সে যেন বীণা বাজাতে এসেছে। কাঁটা ওয়ালা গল্লা বেতের ডগাগুলো মারাত্মক। কাপড়ে ধরলে আর ছাড়ে না। টানাটানি করলে অনেক সময় কাপড় ছিড়ে যায়। অনেক বিষধর সাপ ঘুরা ফেরা করছে। ওকে দেখে কটা বেজী দৌড়ে পালাল। উঁচু গাছের কান্ডে লাফালাফি করছে কাঠবিড়ালি। একটা গাছে জড়ো হয়েছে অনেক কাক। কা কা শব্দে বন মাতিয়ে রেখেছে। সামনে বড় একটা হিজল গাছ। লাল পিঁপড়ারা বাসা বেঁধেছে ওর পাতা জড়ো করে। কয়েকটা বাসা লক্ষ্য করল সে। ছোট ছোট গাছে দেখল লাল বিছা। বাব্বা.. এ যেন আমাজন বন...।
লহরির মনে পড়ল গেল বছর একটা কাজে পৃথিবীর ফুসফুস নামে খ্যাত আমাজন বনে নেমে ছিল সে। ঐ বনের ভিতর রয়েছে একটা গরম জলের নদী। পৃথিবীর বিস্ময় এটি। প্রায় ৮০০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার গরম জল। ভাত রান্না করার সময় যেভাবে পানি উতরায় ঠিক সেভাবে নদীর পানি উতরাচ্ছে। লহরি সেদিন অবাক হয়েছিল আল্লাহর সৃষ্টি রহস্য দেখে। রয়েছে মানুষ খেকো গাছ। আর বিশাল আকারের বিছাগুলো অনেক ভয়ংকর। পিপিলিকাগুলো আকৃতিতে অনেক বড়। সেই বনে রয়েছে বন মানুষ। ওরা আধুনিক পৃথিবীর কোন খবর রাখে না। আদিম যুগ আর আধুনিক যুগ- কত যুগ যাচ্ছে... কিন্তু ওদের কোন পরিবর্তন নেই। ওরা সেই বনের বাদশা আর বেগম। বনই হচ্ছে ওদের রাজ্য।
কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে কি- এই পৃথিবীর ফুসফুসটা পুড়িয়ে দিচ্ছে আধুনিক যুগের মানুষেরা। উদ্দেশ্য একটাই লোকালয় তৈরি করা। আর কথিত আছে পূর্বে লোকেরা আমাজন বনে নাকি সোনাদানা মণি মুক্তা লুকিয়ে রাখত। জঙ্গল সাফ না হলে সেগুলোও উদ্ধার করা সম্ভব নয়। তাই কৃত্রিমভাবে সেখানে অগ্ন্যুৎপাতের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মানুষ কত ভয়ংকর। নিজের ফুসফুস নিজেই জ্বালিয়ে দিচ্ছে। কারণ পৃথিবীতে উৎপাদিত প্রায় সত্তরভাগ কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে এ বন। তেমনিভাবে সত্তর ভাগ অক্সিজেন উৎপাদন করছে। তাই জীববৈচিত্র টিকে আছে। কিন্তু বর্তমান বৈরি পৃথিবীর দশা মানুষ দেখছে না। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে উত্তর গোলার্ধে বরফ গলতে শুরু করেছে। ফলে সমস্ত ইউরোপ জুড়ে এখন এশিয়ার মত গরম অনুভূত হচ্ছে। আর বাংলাদেশের আকাশটা তো এক সাক্ষাৎ জমদূত। আকাশের কী রাগ রে বাবা....। একটু আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হলেই শুরু হয় প্রলয়ংকরী বজ্র নিনাদ। আর এখানে ওখানে হচ্ছে বজ্রপাত। আগে সারা বছরে দু’চারজন বজ্রপাতে মারা যেত। আর এখন একটা বজ্রপাতে ৫/৭ জন লোক মারা যাচ্ছে। এই বিভীষিকা কেমন করে তৈরি হলো? মানুষই এর জন্য দায়ী। পৃথিবীর ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে যে বন-জঙ্গল বা টিলা পাহাড় দরকার- মানুষ এগুলো ধ্বংস করছে আর এ কারণে নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনছে লহরি এসব ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। অন্ধকার ঢেকে ফেলছে সারা পৃথিবী। মানুষেরও এ রকম প্রকৃতি- দিন ও রাতের মত। মানুষের বাহিরের আকৃতি হচ্ছে দিনের মত আর ভিতরের আকৃতি হচ্ছে রাতের মত। বাহিরটা দেখে ঠিক ভিতরটা অনুমান করা যায় না।
লহরি বন থেকে বেরিয়ে দুদুলদের বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। একটু এগিয়েই সে থমকে দাঁড়ালো। অন্ধকারে কারা যেন নড়ছে। দেখতে চেষ্টা করল সে। হ্যাঁ স্পষ্টই দেখতে পেল। দুদুলের চাচী সোনাবান পাশের বাড়ির কালা চাঁদের সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়েছে। কী চুম্বকীয় আকর্ষণ ওদের মধ্যে। হায়রে মানুষ... এত মায়া তোদের অন্তরে এত ভালবাসা তোদের বুকে। আর এই বুকে কীভাবে হিংসা পুষিস। নিজ হাতে নিজের স্ত্রীকে গলাটিপে খুন করিস...। লহরি এসব ভাবতে ভাবতে... দুপুরের ঘরে... প্রবেশ করল...।

 

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT