উপ সম্পাদকীয়

এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে

আব্দুল আহাদ প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৯-২০১৯ ইং ০১:০৮:৪৬ | সংবাদটি ২৬২ বার পঠিত
Image

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিগত ক’বছর থেকে বাংলাদেশ বেশ অগ্রগতি অর্জন করে আসছে । সম্প্রতি এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক কর্তৃক এক সমীক্ষার ফলাফলে ঘোষণা করা হয়েছে বাংলাদেশ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ১৩তম অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সুখবরটি দেশের প্রতিটি মানুষকে আশান্বিত করেছে। পৃথিবীর একটি জনবহুল রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিবছর বন্যা, খরাসহ প্রাকৃতিক নানা প্রতিকূলতা সামাল দিয়ে যে অগ্রগতি অর্জন করছে তা দেশ ও জাতিকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাবে বলে অনেকেই আশাবাদি। এডিবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর ও হংকং এর চেয়ে ও বেশি সফলতা অর্জন করেছে। এ সফলতা বাংলাদেশের মত একটি রাষ্ট্রের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি বলে এশিয়ার অর্থনীতিবিদদের অনেকেই অভিমত প্রকাশ করেন। এডিবি প্রতি বছর এশিয়ার দেশগুলোর জিডিপি অথ্যাৎ মোট দেশীয় উৎপাদনের উপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এক্ষেত্রে এশিয়া প্যাসিফিক দেশগুলোর জনগণের ক্রয় ক্ষমতা বিবেচনা ও অর্থনীতির আকৃতি নির্ধারণ করে ২০১৮ সালের হিসাব অনুসারে ঘোষণা করে বাংলাদেশ এশিয়ার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ১৩তম অবস্থানে আছে। এডিবির প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ২০১৮ সালে পণ্য ও সেবা উৎপাদনে পৃথিবীর অন্যতম শিল্প উন্নত রাষ্ট্র সিংগাপুর ও হংকংকে পেছনে ফেলে সামনের সারিতে নিজের অবস্থান নিয়ে এসেছে।
এশিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল অবস্থানে রয়েছে চীন। তাদের মোট জিডিপি ২৫.৩৬ বিলিয়ন ডলার। ২য় স্থানে রয়েছে ভারত, তাদের জিডিপি ১০.৪৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের মত একটি আমদানিনির্ভর রাষ্ট্র বিগত ক’বছর ধরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে সফলতা অর্জন করেছে তা নিয়ে দক্ষিণ এশিয়া তথা এশিয়ার অর্থনীতিবিদরা রীতিমত গবেষণা করছেন বলে এডিবির এক তথ্যে প্রকাশ পায়। বিশ^ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে অর্থনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। প্রতিবছর বন্যায় দেশের উল্লেখযোগ্য অংশ প্লাবিত করে বড় ধরনের ক্ষতি সাধন করে। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে দেশের বিভিন্নস্থানে ফসল উৎপাদন করা ব্যয়বহুল ও কষ্টকর হয়ে পড়ে। তারপরও বাংলাদেশে খাদ্য ঘাটতি নেই। বিগত এক দশক আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ ছিল বিদেশী সাহায্য নির্ভর একটি রাষ্ট্র। দাতা গোষ্ঠীর সহায়তার আশ^াস পেয়ে বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়ন করা হত। আজ বিদেশীদের দিকে তাকাতে হয় না, নিজেরাই নিজস্ব তহবিল দিয়ে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সমৃদ্ধ একটি দেশ। এখানকার রূপ সৌন্দর্য অবলোকন করতে সেই হাজার বছর পূর্বে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকরা এসেছিলেন। বিশ^ বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলাদেশের রূপ সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বাংলাদেশের রূপ সৌন্দর্য বিশ^বাসীর সামনে তুলে ধরা সম্ভব হলে আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আরো বড় ধরনের গতিশীলতা আসবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ প্রতি বছর পর্যটন শিল্প থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করছে। বাংলাদেশে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, পৃথিবীর বৃহত্তম বন সুন্দরবন, পার্বত্য চট্রগ্রামের দৃষ্টিকাড়া সবুজ শ্যামলীমা ও টাঙ্গুয়ার হাওরের মত রুপালী জলরাশি পর্যটন এলাকা থাকার পরও বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পে এখনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। নেপালের মত রাষ্ট্র প্রতি বছর পর্যটন শিল্প থেকে যে আয় করে তা দিয়ে তাদের বার্ষিক বাজেটের একটি বড় অংশ পূরণ হয়। মালদ্বীপের মত রাষ্ট্র পর্যটন শিল্পের উপর নির্ভর করে পরিচালিত হচ্ছে। অথচ আমরা এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছি।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের প্রচুর সম্ভাবনার বিষয়টি বিশ^বাসীর সামনে আমরা এখনো তুলে ধরতে পারিনি। আমাদের হাজার হাজার বছরের ঐতিহাসিক স্থান ও স্থাপনাগুলো বিশ^ ঐতিহ্যে স্থান পেলেও বিশে^র পর্যটকদের সামনে আমরা তা তুলে ধরতে না পারায় বিষয়গুলো অজানা রয়েছে । আমরা আমাদের দেশের রূপ সৌন্দর্যের চিত্র বিশ^বাসীর সামনে তুলে ধরে পর্যটন ক্ষেত্রে প্রতিবছর বড় অংকের আয় করতে পারি। যা আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা আনতে পারে। আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের প্রশংসা বিশে^র সর্বত্র থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে অজানা কারণে এ শিল্প যেন পশ্চাদমুখি হয়ে যাচ্ছে। বিগত ৬ মাসে দেশের সম্ভাবনাময় এ খাতের ৪৬টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২৫ হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। আশংকা করা হচ্ছে এভাবে আরও অনেক গার্মেন্টস শিল্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে তৈরি পোষাক। পৃথিবীর তৈরি পোষাক উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চীনের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। যে খাতে প্রায় ৬০ লক্ষ নারী পুরুষের জীবন জীবিকা জড়িয়ে আছে। কোনভাবেই এ খাত টিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে অর্ধশত গামেন্টস শিল্প বন্ধ হয়ে ২৫ হাজার শ্রমিক বেকার হওয়ার দুঃসংবাদটি বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বেশি করে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। যেহেতু আমরা পন্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে আজ এশিয়ার প্রথম সারির অনেক দেশকে পিছনে ফেলে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি, আমাদের এই অগ্রযাত্রাকে অবশ্যই ধরে রাখতে হবে।
বাংলাদেশের প্রায় ৭০ লক্ষ লোক বিভিন্ন দেশে কর্মরত আছে। তাদের প্রেরিত রেমিটেন্স আমাদের জাতীয় অগ্রগতিতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করছে। অথচ প্রবাসীরা দেশে বিদেশে মূল্যায়ন পায় না এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশী কর্মীরা যে বেতন পায় তার চেয়ে দ্বিগুন বেতন পায় আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপালের লোকজন। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিকরা বিপদে পড়লে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তা পায়না, অনেকেই কাগজপত্রের সমস্যার কারণে অবৈধভাবে আছেন। তাদের প্রতি বাংলাদেশ দূতাবাসের আচরণ সন্তেুাষজনক নয় বলে অনেক অভিযোগ রয়েছে। আমাদের প্রবাসীদেরকে যথাযথ সহযোগিতা ও সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে আরো বেশী রেমিটেন্স অর্জন করতে পারি। প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিটেন্স যেভাবে আমাদের জাতীয় অগ্রগতিতে অবদান রাখছে এক্ষেত্রে আরো বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক সফলতা অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করায় শুধু এশিয়া নয় পৃথিবীর অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিশালী অঞ্চল সিঙ্গাপুর ও হংকংকে বাংলাদেশ পিছিয়ে সামনের সারিতে স্থান লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। এদেশের মানুষ আশা করে সকল প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আগামীতে আর বেশি সফলতা অর্জন করবে। অর্থনৈতিক উন্নতির ধারাবহিকতা অক্ষুন্ন রেখে বাংলাদেশ একটি উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশে^ নিজের অবস্থান তুলে ধরতে পারবে, দেশের প্রতিটি মানুষ এ প্রত্যাশা করে।
লেখক : সাংবাদিক

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • চীন-ভারত সংঘাতের আশংকা কতটুকু
  • করুণাধারায় এসো
  • করোনাকালের ঈদোৎসব
  • মহাপূণ্য ও করুণার রাত শবে-কদর
  • মাহে রামাজান: যাকাত আদায়ের উত্তম সময়
  • দারিদ্র দূরীকরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
  • চীন-আমেরিকার শীতল যুদ্ধ
  • চাই আশার বাণী
  • কোভিড-১৯:সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • Image

    Developed by:Sparkle IT