উপ সম্পাদকীয়

সামাজিক ব্যাধি

মো. শামসুল ইসলাম সাদিক প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৯-২০১৯ ইং ০১:১৩:৩৪ | সংবাদটি ১৬১ বার পঠিত

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা একটি সামাজিক সমস্যা। মানুষের মধ্যে যে আদিম প্রবৃত্তি, তা দমিয়ে রাখতে হলে শৈশব থেকে স্কুল-কলেজ ও মাদরাসায় যথাযথ জ্ঞানচর্চা, নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। বর্তমানে যেভাবে শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন আতঙ্কিত করে তুলেছে। সমাজ কলুষমুক্ত করতে হলে সব অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
শিশু অধিকার দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারি হতে জুন পর্যন্ত দেশে শিশু ধর্ষণের শিকার ৪৯৬ জন। ২০১৮-এর জানুয়ারি হতে জুন পর্যন্ত ৩৫১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। চলতি বছরের এপ্রিল ও মে দুই মাসে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২১৪ জন। বাকি চার মাসে শিশু ধর্ষণের শিকার হয় ২৮২ জন। প্রতি মাসের গড় হিসেব প্রায় ৮৩ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।
২০১৮ সালের জানুয়ারি হতে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল ৫৭১ জন। ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে শিশু ধর্ষণ বেড়েছে শতকরা ৪১ শতাংশ যা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন আশংকাজনক। ২০১৯ সালের প্রথম ৬ মাসে ধর্ষণ হওয়া এই ৪৯৬ জন শিশুর মধ্যে গণধর্ষণ স্বীকার ৫৩ জন শিশু এবং ২৭ জন প্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে এছাড়াও ধর্ষণ পরে হত্যা করা হয়েছে ২৩ জন শিশুকে। এমনকি এই ৬ মাসে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৭৪ জন শিশুকে।
২০১৯ সালের শিশু ধর্ষণের ঘটনা অতীতের তুলনায় অনেক গুণ বেশি। শিশু অধিকার দপ্তরের তথ্যানুযায়ী- ধর্ষণের সব ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় না। তাই এই সংখ্যা আরও বেশি হবে বলেই মনে করে সংস্থাটি। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী- ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হওয়া বেশিরভাগ শিশুর বয়স ৭ থেকে ১২ বছর। ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী যৌন নির্যাতনের শিকার। বিশেষ করে পুরুষ শিক্ষকের দ্বারা নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটে।
গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১২৯ জন। এদের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৭ জন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যানুযায়ী- ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে সারাদেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩১ জন নারী ও শিশু। যাদের মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ২৬ জনকে। ২০১৮ সালে সারাদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯৪২ জন। এর মধ্যে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয় নারী ও শিশুসহ ৬৩ জন। ২০১৮ সালে যে পরিমাণ ধর্ষণ হয়েছে তার চেয়ে ২০১৯ সালের অর্ধেক সময়ে ধর্ষণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় দেড়গুণ। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী- ২০১৭ সালের প্রথম আট মাসে ধর্ষণ মামলা হয়েছে ১৯৪৪টি, শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৫২টি। ২০১৬ সালে ধর্ষণ মামলা হয় ৬০১টি, ২০১৫ সালে ৫২১টি, ২০১৪ সালে ১৯৯টি, ২০১৩ সালে ১৭০টি এবং ২০১২ সালে ৮৬টি।
ধর্ষণ শুধু একটি ব্যাধি নয়। দেশ ও জাতির জন্য অভিশাপ। এই অভিশাপের কালো অধ্যায় থেকে সমাজকে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। শিশু নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দান ও মৌলিক অধিকার রক্ষা রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব। ভবিষ্যতের কান্ডারি শিশুদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির বিকল্প নেই। এ শিশুর সামাজিকীকরণের প্রথম প্রতিষ্ঠান তার পরিবার। আচরণ, মূল্যবোধ, ধারণা, বিশ্বাস, নৈতিকতা, সাহস, শিক্ষা ইত্যাদির ভিত্তি তৈরি করে দেয় তার পরিবার। এটাই তার সারা জীবনের আচরণের মূল চাবিকাঠি। সন্তানকে পারিবারিকভাবে সঠিক শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা দেয়া হলে সেই সন্তান কখনও বিপথগামী হবে না। পরিবারে যা শিখবে, সারাজীবন সে তাই করবে। পরিবারে সে ভালো কিছু শিখলে ভালো হবে, না হলে সে হবে খারাপ।
বাংলাদেশ জনবহুল একটি রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের কোথায় কী ঘটছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর পক্ষে সব খোঁেজ বের করা সম্ভব নয়। ধর্ষণ ব্যাধি থেকে মুক্ত হতে জাতিকে নৈতিকতাসমৃদ্ধ করে তুলতে হবে। জোর দিয়েই বলতে চাই, দেশের অপরাধ বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সমাজবিশারদ, রাজনৈতিক নেত্রীবৃন্দ সবাই এক হয়ে ধর্ষণপ্রবণতার কারণগুলো চিহ্নিত করে নিরাময়ের উপায় বের করতে হবে। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ যে মাত্রায় বেড়েছে, তা লাগাম টেনে না ধরা গেলে সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নেবে। সমাজ থেকে ধর্ষণ নামক ব্যাধি দূর করতে সবার আগে আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন ও বৈষম্য দূর করতে হবে। দুর্বল ভিকটিমদের পক্ষে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণদের সুস্থ-সুন্দর মন ও মূল্যবোধ সম্পন্ন করে গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সমাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে। অপরাধ তদন্তে ও অপরাধীদের আইন আমলে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতকরণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিরপেক্ষ ভূমিকা ও সঠিক তদন্ত অত্যন্ত জরুরি।
লেখক : শিক্ষার্থী

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শব্দের অত্যাচারে নিঃশব্দ ক্ষতি
  • এমন মৃত্যু কাম্য নয়
  • কোন সভ্যতায় আমরা!
  • দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ রোল মডেল
  • বৃক্ষ নিধন রোধে চাই জনসচেতনতা
  • আফ্রিকা-চীনের দ্বিতীয় মহাদেশ
  • শিশুরা নিরাপদ কোথায়?
  • অপেক্ষার অশেষ প্রহরগুলি
  • ঘুষ-জুয়া বন্ধে কঠোর হোন
  • মা ইলিশ রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে হবে
  • ছাত্ররাজনীতি হোক কল্যাণ ও বিকাশের
  • পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক গবেষক আতিকুর রহমান
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • ‘জঙ্গি’ অপবাদ প্রসঙ্গে
  • ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে
  • মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই বদলে দেবে বাংলাদেশ
  • Developed by: Sparkle IT