ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৯-২০১৯ ইং ০১:১৬:৪০ | সংবাদটি ৮২ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
অতঃপর হযরত হাজেরা দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে জন-মানবহীন প্রান্তরে কালাতিপাত করতে থাকেন। এক সময় দারুণ পিপাসা তাঁকে পানির খোঁজে বের হতে বাধ্য করলো। তিনি শিশুকে উন্মুক্ত প্রান্তরে রেখে ‘সাফা’ ও ‘মারওয়া’ পাহাড়ে বারবার ওঠানামা করতে লাগলেন। কিন্তু কোথাও পানির চিহ্নমাত্র দেখলেন না এবং এমন কোনো মানুষ দৃষ্টিগোচর হলো না, যার কাছ থেকে কিছু তথ্য জানতে পারেন। সাত বার ছোটাছুটি করার পর তিনি নিরাশ হয়ে শিশুর কাছে ফিরে এলেন। এ ঘটনাকে স্মরণীয় করার উদ্দেশেই ‘সাফা’ ও ‘মারওয়া’ পাহাড়দ্বয়ের মাঝখানে সাত বার দৌড়ানো কেয়ামত পর্যন্ত ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্যে হজের বিধি বিধানে অত্যাবশ্যকীয় করা হয়েছে। হযরত হাজেরা যখন দৌড়াদৌড়ি শেষ করে নিরাশ হয়ে শিশুর কাছে ফিরে এলেন, তখন আল্লাহর রহমত নাযিল হলো। জিবরাইল (আ.) আগমন করলেন এবং শুষ্ক মরুভূমিতে পানি একটি ঝর্ণাধারা বইয়ে দিলেন। বর্তমানে এ ধারার নামই যম্যম্। পানির সন্ধান পেয়ে প্রথমে জীব-জন্তু আগমন করলো। জীব-জন্তু দেখে মানুষ এসে সেখানে আস্তানা গড়লো। এভাবে মক্কায় জনপদের ভিত্তি রচিত হয়ে গেলো। জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় কিছু আসবাবপত্রও সংগৃহিত হলো।
হযরত ইসমাইল (আ.) নামে খ্যাত এই সদ্যজাত শিশু লালিত-পালিত হয়ে কাজ-কর্মের উপযুক্ত হয়ে গেলেন। হযরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর ইঙ্গিতে মাঝে মাঝে এসে বিবি হাজেরা ও শিশুকে দেখে যেতেন। এ সময় আল্লাহ তাআলা স্বীয় বন্ধুর তৃতীয় পরীক্ষা নিতে চাইলেন। বালক ইসমাইল অসহায় ও দীন-হীন অবস্থায় বড়ো হয়েছিলেন এবং পিতার ¯েœহ-বাৎসল্য থেকেও বঞ্চিত ছিলেন। এমতাবস্থায় পিতা খোলাখোলি নির্দেশ পেলেন : এ ছেলেকে নিজ হাতে জবাই করে দাও। কুরআনে বলা হয়েছেÑ ‘বালক যখন পিতার কাজে কিছু সাহায্য করার যোগ্য হয়ে ওঠলো, তখন ইবরাহিম (আ.) তাকে বললেন, হে বৎস, আমি স্বপ্নে তোমাকে জবাই করতে দেখেছি। এখন বলো, তোমার কি অভিপ্রায়? পিতৃভক্ত বালক আরয করলেন, ‘পিতঃ, আপনি যে আদেশ পেয়েছেন, তা পালন করুন। আপনি আমাকেও ইনশাআল্লাহ এ ব্যাপারে ধৈর্যশীল পাবেন।’
এর পরবর্তী ঘটনা সবাই জ্ঞাত আছেন যে, হযরত খলীল (আ.) পুত্রকে জবাই করার উদ্দেশে মিনা প্রান্তরে নিয়ে গেলেন। অতঃপর আল্লাহর আদেশ পালনে নিজের পক্ষ থেকে যা করণীয় ছিলো, তা পুরোপুরিই সম্পন্ন করলেন। কিন্তু প্রণিধানযোগ্য যে, এখানে উদ্দেশ্যে পুত্রকে জবাই করানো ছিলো না, বরং পুত্রবৎসল পিতার পরীক্ষা নেয়া উদ্দেশ্য ছিলো। স্বপ্নের ভাষা সম্পর্কে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, হযরত ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নে ‘জবাই করে দিয়েছেন’ দেখেন নি, বরং জবাই করছেন অর্থাৎ, জবাই করার কাজটি দেখেছেন। অতঃপর হযরত ইবরাহিম (আ.) তা’ই বাস্তবে পরিণত করেছিলেন। প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমে কাজটি দেখানো হয়েছে। এ কারণেই বলা হয়েছে যে, স্বপ্নে যা দেখেছিলেন আপনি তা পূর্ণ করে দিয়েছেন। হযরত ইবরাহিম (আ.) যখন এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন, তখন আল্লাহ তাআলা বেহেশত থেকে এর পরিপূরক নাযিল করে তা কুরবানী করার আদেশ দিলেন। এ রীতিটিই পরে ভবিষ্যতের জন্য একটি চিরন্তন রীতিতে পরিণতি লাভ করে।
এগুলো ছিলো বড়ই কঠিন পরীক্ষা, যার সম্মুখীন হযরত খলীলুল্লাহকে করা হয়। এর সাথে সাথেই আরও অনেকগুলো কাজ এবং বিধি-বিধানের বাধ্যবাধকতাও তাঁর উপর আরোপ করা হলো। তন্মধ্যে দশটি কাজ খাসায়েলে ফিতরত (প্রকৃতিসুলভ অনুষ্ঠান) নামে অভিহিত। এগুলো হলো শারীরিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কিত ভবিষ্যত উম্মতের জন্যেও এগুলো স্থায়ী বিধি-বিধানে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর উম্মতকে এসব বিধি-বিধান পালনের জোর তাকিদ দিয়েছেন।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT