ধর্ম ও জীবন

ঐশী গ্রন্থ আল কুরআন

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৯-২০১৯ ইং ০১:১৭:৩৫ | সংবাদটি ৯৫ বার পঠিত

ইসলাম শান্তির ধর্ম, মানবতার ধর্ম। আর ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ হচ্ছে আল কুরআন। মহান আল্লাহ তাআলার বাণীসমূহ এতে সংকলিত হয়েছে। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হলেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)। নবুয়ত লাভের পর দীর্ঘ তেইশ বছর যাবৎ হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর নিকট এ বাণীসমূহ ক্রমে ক্রমে অবতীর্ণ হয়। সম্পূর্ণ কুরআনে ৩০টি পারা, ১১৪টি সূরা, ৭টি মঞ্জিল, ১৬টি সিজদাহ এবং ৬৬৬৬টি আয়াত রয়েছে (আয়াত সংখ্যা সম্পর্কে মতভেদ আছে)। সুরাগুলির কিছু মক্কায় এবং কিছু মদিনায় অবতীর্ণ হয়।
মুসলমানরা বিশ্বাস করে আল কুরআন একটি ঐশী গ্রন্থ যা কোনো মানুষের পক্ষে রচনা করা সম্ভব নয়। অবশ্যই এ কুরআন জগৎসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। (২৬ নং সূরা-আশ শু’আরা, আয়াত : ১৯২)
কুরআনের অনেকগুলি নামের মধ্যে বিশেষ চারটি নাম হলোÑ আল -কুরআন, আল-ফুরকান, আল-কিতাব ও আয-যিক্র। ‘আল-কুরআন’ নামের অর্থ যাহা পঠিত হয়। এটি বহু আয়াত ও সুরার সংকলন। উল্লেখ্য যে, কুরআনের প্রথম আয়াতের প্রথম শব্দ ‘ইকরা’ পাঠ কর। ‘আল-কুরআন’ নামের অর্থ পার্থক্যকারী, সত্য ও মিথ্যার আলোও অন্ধকারের এবং ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্যকারী। ‘আল-কিতাব’ অর্থ লিখিত গ্রন্থ যা যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ‘আয যিক্র’ নামের অর্থ উপদেশ যা আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের নিমিত্তে দিয়েছেন।
কুরআনের ভাষা ও প্রকাশভঙ্গি সমসাময়িক আরবি সাহিত্য থেকে আলাদা। এতে একদিকে যেমন রয়েছে কাব্যের মাধুর্য, তেমনি অন্যদিকে রয়েছে গদ্যের সহজ সাবলীল গতি ও গাম্ভীর্য। কুরআনের সর্বপ্রথম ব্যাখ্যাদাতা ছিলেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)। তিনি কুরআনের সে অংশ যখন অবতীর্ণ হতো তখনই তার ব্যাখ্যা দিতেন। পরবর্তীকালে ইসলামি চিন্তাবিদগণ তাঁদের স্ব স্ব জ্ঞান ও প্রতিভার আলোকে কুরআনের তাফসির রচনা করেন। কয়েকটি প্রসিদ্ধ তাফসির গ্রন্থ হলোÑ তাফসির জামি’উল বায়ান, তাফসির আল কাশশাফ, তাফসির আল বায়দাবী ইত্যাদি।
কুরআন একটি সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ। মুসলমানগণ নামাযে কুরআনের আয়াত পাঠ করে। কুরআনের বিষয়াবলী ব্যাপক। ইসলামের মূল ভিত্তি তাওহীদ এবং ইসলামের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে বিস্তারিত ও স্পষ্ট আলোচনা রয়েছে। কুরআনের বিষয়াবলীর মধ্যে চারটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য : ১. ¯্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্ক। ২. ¯্রষ্টার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। ৩. মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। ৪. মানুষের সঙ্গে অন্যান্য সৃষ্টির সম্পর্ক।
সামগ্রিকভাবে কুরআন মানুষের মধ্যে সাম্য, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। এমনকি অন্যান্য ধর্ম সম্বন্ধেও কুরআন উদার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছে এবং ঘোষণা করেছে যে, পৃথিবীর কোনো জাতিই আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত নয়; আল্লাহ প্রত্যেক জাতির হিদায়াতের উদ্দেশ্যেই নবী ও রাসুল প্রেরণ করেছেন। কুরআন বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য। কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার কারণে সেই রাত কল্যাণময়। সেই রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। সেই রাতে বিরাজ করে শান্তি আর শান্তি। কারণ কুরআন সকল মানুষের পথ প্রদর্শক এবং হিদায়াতের সুষ্পষ্ট বর্ণনা ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। কোন ভাষায় নাযিল? ‘সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়’। (২৬নং সুরা-আশ শু’আরা, আয়াত : ১৯৫)
ভাগ্যের রাত বা কল্যাণময় রাত বা বরকতময় রাত বলা হয়। আর তা হলো রমজান মাসের শেষ দশকে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকে এ রাত তালাশ করো’। (সুনান আত তিরমিযী, হা-১৯২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ওফাতের পূর্বে কুরআন পরিপূর্ণ গ্রন্থরূপে সংকলিত হয়নি কারণ তাঁর ওফাত পর্যন্ত কুরআনের অবতরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিলো। অবতীর্ণ অংশসমূহ তখন চামড়া, গাছের ছাল, পাথর, চওড়া হাড়ের খন্ড ইত্যাদিতে লিপিবদ্ধ করা হতো। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী কুরআনের সমুদয় আয়াতের বিন্যাসক্রমে ঠিক করে দিয়েছিলেন এবং তিনি ও তাঁর বহু সাহাবী সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করেছিলেন। যাঁরা কুরআন মুখস্থ করেন তাঁদের বলা হয় হাফিজ। ইয়ামামার যুদ্ধে (৬৩৩ খ্রি.) অনেক হাফিজ শহীদ হওয়ায় হযরত উমর (রা.) কুরআনের সঠিক সংরক্ষণ বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং তাঁর প্রস্তাবেই খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) কুরআনের বিচ্ছিন্ন অংশগুলি একত্র করে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। হযরত আবু বকর (রা.) এর নিকট ইন্তেকালের পর খলিফা হযরত উমর (রা.) এর নিকট কুরআনের অনুলিপিটি সংরক্ষিত থাকে। তৃতীয় খলিফা উছমান (রা.) কুরআনের কিছু সংখ্যক অনুলিপি তৈরি করে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করেন। এজন্য হযরত উছমান (রা.) কে বলা হয় আল কুরআনের সংকলক (জামি’উল কুরআন)।
‘তোমরা ঈমান আনো আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসুলের প্রতি আর সেই নূর (কুরআন) এর প্রতি যা আমি অবতীর্ণ করেছি। তোমরা যা করো সে ব্যাপারে আল্লাহ পুরোপুরি অবগত।’ (৬৪নং সুরা : আত্-তাগাবুন, আয়াত : ৮)
ইসলাম শব্দের অর্থ শান্তি। মানুষ থেকে শুরু করে প্রতিটি প্রাণীই শান্তি খুঁজছে। সবাই চায় সুখ শান্তিতে জীবন অতিবাহিত করতে। মানুষের আত্মার পরিতৃপ্তি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য আমাদেরকে জ্ঞান অনুশীলন করতে হয়। বই পড়লে জ্ঞানের পরিধি বাড়ে। তেমনি এক মহাগ্রন্থ হলোÑআল কুরআন। এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে সৃষ্টি জগতের সকল রহস্য। কুরআনের সকল শব্দের অর্থ এখনও পর্যন্ত আমাদের জানার সাধ্য হয় নাই। অর্থসহ কুরআন পাঠ করলে আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের জীবন শান্তিময় হবে। এর অমিয় বাণী পাঠ করে আমরা স্বর্গীয় সুখে আমাদের আত্মাকে পরিতৃপ্ত কররে পারি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT