ধর্ম ও জীবন

দায়ী’র প্রতি ইসলামের নির্দেশনা

আলী আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৯-২০১৯ ইং ০১:২০:৫৬ | সংবাদটি ১৪৭ বার পঠিত

ইসলাম সর্বজনীন ধর্ম। যুক্তি, দর্শন ও বিজ্ঞানের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সাহস রাখে কেবল ইসলামই। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে আমরা লক্ষ্য করি, যুক্তি, দর্শন ও বিজ্ঞানকে পিঠ চাপড়ে পথ প্রদর্শন করছে ইসলাম। মনুষ্যসৃষ্ট কোনো দর্শনের প্রতি ইসলাম কোনোদিনই মুখাপেক্ষী হয়নি, হবে না। মহাপ্রলয় অবধি মানব ও জিন জাতির জন্য অবশ্যপালনীয় পরিপূর্ণ জীবনবিধান হিসেবে মহান ¯্রষ্টা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতরণকৃত এই ধর্ম সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ঘোষণা করছে, “আর এটা হচ্ছে আপনার প্রতিপালকের সরল পথ। (এটাকে মেনে চলো) এর সমস্ত বিষয় আমি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণকারী জাতির জন্য।” আনআম: ১৬২
অন্যত্র বর্ণিত, “আর যে ব্যক্তি ইসলামকে রেখে অন্যধর্মকে জীবনবিধান হিসেবে কামনা করবে সেটা কিছুতেই গ্রহণীয় হবে না। আর সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” আলে ইমরান: ৮৫
আল্লাহ তাআলার মনোনীত এই ধর্মের অনুসারীদের প্রতি তাঁর পক্ষ থেকে রয়েছে করণীয়, বর্জনীয়। নির্দেনা ও উপদেশাবলী। রয়েছে পুরস্কারের আগ্রহ-উদ্দিপক ঘোষণা আবার শাস্তির কঠোর সতর্কবার্তা। অসংখ্য করণীয় থেকে বিশেষ একটি করণীয় হচ্ছে, ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা অন্যধর্মের লোকজনকে ইসলামের প্রতি দাওয়াত দিবে বা আহ্বান করবে।
অধুনা ইউটিউব, ফেসবুক, ব্লগ, ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদি যোগাযোগ মাধ্যমের দ্বারা অনেক মুসলিম ভাইকে দেখা যাচ্ছে ইসলামের প্রতি অন্যজনকে দাওয়াত দিচ্ছেন অতি-উৎসাহের সাথে। ইসলামের বিধিবিধানের সাবলীল ও সঙ্গত ব্যাখ্যা করছেন। জবাব দিচ্ছেন প্রতিপক্ষ থেকে ধেয়ে আসা অনেক অসাড় প্রশ্নের। এই তৎপরতা ইসলামপ্রিয় ব্যক্তিদের কাছে অসামান্য সুখকর। তবে পর্যবেক্ষণে পরিলক্ষিত হয়েছে যে, অনেক মুসলিম দাঈ দাওয়াত দিতে গিয়ে স্বজ্ঞানে বা অজ্ঞানে অতিক্রম করে ফেলেন ইসলাম কর্তৃক নির্ধারিত সীমাকে। এমনকি ভুলে বসেন যে, তিনি দাওয়াতের মতো মহান কাজ করছেন। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে যেয়ে কটু শব্দ ও শ্লেষপূর্ণ বাক্য ব্যবহারে এতটুকুন বাধে না। ব্যক্তিগত মত যদি কেউ গ্রহণ না করে তাহলে তাকে মূর্খ, জাহিল ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয় মুহূর্তের মধ্যে। মতবাদগত পার্থক্যের কারণে কাফির, মুশরিক, দালাল, লাল কুত্তা, ইহুদি, খ্রিস্টান, নাস্তিক, মুরতাদ ইত্যাদি অভিধা ব্যবহার করা এখন অনেকের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক। তারা ভুলে যান যে, বক্তব্যের মঞ্চে কিংবা টেলিভিশন অথবা গণমাধ্যমে কীভাবে কথা বলতে হবে সেক্ষেত্রে রয়েছে ইসলামের সুবিস্তার দিকনির্দেশ। এমনটাইপ দায়িত্বগুলোকে দাঈদের জন্য এই নিবন্ধে আমরা আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। একজন দাঈকে কী গুণের অধিকারী হতে হয়, দাওয়াতের ক্ষেত্র কী, পদ্ধতি কী? চলুন পবিত্র কুরআন ও হাদীস থেকে খোঁজার চেষ্টা করি।
একটা কথা বেশ প্রচলিত যে, উটের মতো কষ্ট সহিষ্ণু, আকাশের মতো উদার, মাটির মতো নরম, কৃষকের মতো ধৈর্যশীল, পাহাড়ের মতো অটল, সূর্যের মতো দাতা আর নাবীদের মতো প্রজ্ঞা না থাকলে দাওয়াতের মাঠে না নামাই শ্রেয়। অভিজ্ঞতা বলে, এইসব গুণাবলী যদি একজন দাঈর মধ্যে না থাকে তাহলে তিনি বেশিভাগ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার শিকার হোন; এমনকি কোথাও কোথাও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় তার মাধ্যমেই। যিনি আল্লাহ তাআলার পথের দাঈ হবেন তার একমাত্র কাজ হচ্ছে দাওয়াত দেওয়া, অন্যকিছু না। ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়া, জবরদস্তিমূলক গেলানো নয়। পবিত্র কুরআন বলছে, “তোমাদের মধ্যে একটি গোষ্ঠী থাকা আবশ্যক যারা কলাণের পথে মানুষজনকে আহ্বান করবে, ভালো কাজের আদেশ দিবে, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। (যারাই এই কাজ করবে) তারাই হবে সফলকাম। আর তোমরা তাদের মতো হয়ো না -যাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ আসার পরও- বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং মতানৈক্য করেছে। আর তাদের জন্য রয়েছে বিরাট শাস্তি।” আলে ইমরান: ১০৪-১০৫
বিজ্ঞজন বুঝতে পারছেন, এই আয়াতে পরিষ্কারভাবে দাওয়াতের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে, দলবদ্ধ হয়ে থাকতে আর পরমতসহিষ্ণু হতে। সাম্প্রতিক দাঈদের মধ্যে এইসব বিষয়সহ আরো যেসব বিষয়ের অনুপস্থিতি বিদ্যমান তা সংক্ষেপে উদ্ধৃতির মাধ্যমে বলছি।
জেনে রাখুন, আপনি ক্লাসিক মাহফিলে কথা বলুন কিংবা আধুনিক সেমিনারে, অথবা ফেসবুক লাইভে আসুন বা লেখা পোস্ট করুন, ইউটিউবে ভিডিও আপলোড দিন কিংবা যেকোনো মাধ্যমেই আপনি জনগণের মুখোমুখি হোন, বেলাশেষে আপনি একজন আল্লাহর পথের দাঈ। আপনার থাকতে হবে বিশেষ কিছু গুণ; যা ছিলো নাবী সা., সাহাবা রা. বা পূর্বযুগের মণীষীদের। পূর্বসূরীগণ মন্দকে ভালো দ্বারা প্রতিহত করতেন। বর্ণিত হচ্ছে, “ভালো আর মন্দ কোনোভাবেই সমান নয়। তুমি মন্দকে ভালো আচরণ দ্বারা প্রতিহত করো। দেখবে, যার সাথে তোমার শত্রুতা সে-ও তোমার কেমন আপন হয়ে যায়।” ফুসসিলাত: ৩৫
নাবী সা. তার উম্মতকে পূর্ণ বিচক্ষণতার সাথে দাওয়াত দিতেন। “বলুন, এ হচ্ছে আমার পথ। আমি এবং আমার অনুসারীরা আল্লাহর মনোনীত ধর্মের প্রতি আহ্বান করি পূর্ণজ্ঞান ও বিচক্ষণতার সাথে।” ইউসুফ: ১০৮
যারা দাঈ হয় তাদের কথায় নরমভাব থাকতে হয় প্রকটভাবে। “তোমরা ফিরআউনের কাছে যাও। অনন্তর তাকে নরম ভাষায় ধর্মের প্রতি দাওয়াত দাও। হতে পারে সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।” ত্বা-হা: ৪৩-৪৪
নাবী সা.-কে কোমল হৃদয়ের অধিকারী হতে বলা হয়েছে। “হে নাবী, আল্লাহর অনুগ্রহে আপনি তাদের প্রতি নরম আচরণ করুন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠিন কথা বলেন তাহলে তারা আপনার চারপাশ থেকে চলে যাবে। তাদেরকে ক্ষমা করুন, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করুন।” আলে ইমরান: ১০৯
প্রজ্ঞা দ্বারা দাওয়াত দিতে বলা হয়েছে। “আপনি আপনার প্রতিপালকের পথে প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে মানুষকে আহ্বান করুন এবং উত্তমপন্থায় তাদের সাথে তর্ক করুন।” নাহল: ১২৫
একজন দাঈর শ্রোতা বা সম্ভোধিত ব্যক্তি যদি কোনো অসংলগ্ন বা অসমীচীন আচরণ করে তাহলে তাকে বারবার ক্ষমা করতে হবে। “আর আপনি ক্ষমাকে আঁকড়ে ধরুন, ভালো কাজের আদেশ দিন এবং অজ্ঞদেরকে এড়িয়ে চলুন।” আরাফ: ১৯৯
আল্লাহর পথের দিকে যিনি ডাকবেন তার কর্মপন্থা কী, তার মধ্যে কী গুণ থাকা আবশ্যক, তার কর্মক্ষেত্র কী? এসব বিষয়ে পবিত্র কুরআনে সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে। আমরা কেবল মোটাদাগের কিছু নমুনা পেশ করলাম। অনুসন্ধানী পাঠক বিস্তারিত জানার জন্যে কুরআন, হাদীস, পূর্বসূরীদের জীবনী খুললেই যথেষ্ট তথ্য পেয়ে যাবেন। মহান আল্লাহ আমাদেরকে প্রজ্ঞা ও উপদেশের মাধ্যমে দাওয়াতের কাজ করার তাওফীক দান করুন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT