উপ সম্পাদকীয়

আমার পাহাড়, আমার সিলেট

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৯-২০১৯ ইং ০০:৪৮:৪৬ | সংবাদটি ৯৫ বার পঠিত

এখানে ‘আমার’ বলতে ইংরেজী ‘MY’ বুঝানো হচ্ছে না। ‘আমার’ এখানে ‘Our’ অর্থাৎ আমাদের। কারণ বিশ্বের কোন পাহাড়ই সত্যিকার অর্থে কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সমাজ বা দেশ-মহাদেশের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না। সম্পত্তিই যদি হতে হয় তবে তা ‘পৃথিবী’ নামক এই গ্রহটির। এ গ্রহের মানব সমাজ সহ সকল প্রাণীর। সেই অর্থে সিলেটও। সিলেটে আমরা যারা বসবাস করি সিলেট শুধু আমাদেরই নয়। সিলেট প্রকৃতির। প্রকৃতির লীলাভূমি। পাহাড় ঘেরা সিলেটের সৌন্দর্য সবাইকে টানে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার সিলেট এসে সিলেটকে ‘শ্রীভূমি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এই শ্রীভূমির শ্রী বৃদ্ধির প্রধান কারণই হলো ছোট ছোট পাহাড়-টিলা ঘেরা সিলেট। খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের পাদদেশে উঁচু-নীচু-সমতল যেন সবুজ শাড়িতে ঢাকা পাহাড় কন্যা, রবি ঠাকুরের শ্রীভূমি। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম পাহাড়ের গম্ভীর ভাব দর্শন করে বলেছিলেন, ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ’। ঘুমন্ত পাহাড়ের রূপ তীব্রভাবে আকর্ষণ করেছিল নজরুলকে। নজরুলের ঘুমন্ত পাহাড়ই হয়তো বিশ্ব কবির শ্রীভূমি।
কিন্তু শ্রীভূমির সেই ‘শ্রী’ কি আজ চোখে পড়ে? পড়ে না। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। বা হারিয়ে যেতে বসেছে। মনের চোখ দিয়ে দেখলে দেখা যাবে নীরবে কাঁদছে আমার পাহাড়। কেউ এতোটুকু শান্ত¦না দেবার প্রয়োজনই বোধ করছে না। দেখলে মনে হবে এই বুঝি কে বা কারা আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়ে গেছে পাহাড়ের সবুজ শীতল নরম দেহ। জ্বলছে সিলেট সদর, সিটি কর্পোরেশন, জাফলং, ফেঞ্চুগঞ্জ, বিয়ানীবাজারসহ অনেক পাহাড়ী বনভূমি। কেউ কাটে প্রকাশ্য দিবালোকে, কেউ বা রাতের আঁধারে। আলো আঁধারের খেলা চলে পাহাড়ে পাহাড়ে। আগুন আগুন খেলা যেমনি আজ চলছে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ব্রাজিলে। কি ঘটে চলছে ব্রাজিলে। পৃথিবীর বৃহত্তম বনাঞ্চল হচ্ছে আমাজন বনাঞ্চল। আমাজন নদীর তীরে। ২ দশমিক ১ মিলিয়ন বর্গমাইল নিয়ে বিশাল বনাঞ্চল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বনাঞ্চল। এই বিশাল আমাজন জঙ্গলকে বলা হয়ে থাকে Lungs of the Planet Lungs মানে হলো ফুসফুস। যে ফুসফুসের মাধ্যমে বেঁচে থাকে মানুষ। Planet এর বাংলা হলো গ্রহ অর্থাৎ পৃথিবী নামক গ্রহের শ্বাসযন্ত্র অর্থাৎ ফুসফুস হলো এই আমাজন জঙ্গল মানে বনাঞ্চল। মানুষের বেঁচে থাকতে অক্সিজেনের প্রয়োজন। পৃথিবীর মানুষ বেঁচে থাকতে হলে যে অক্সিজেনের প্রয়োজন এর ২০ শতাংশই আমরা পেয়ে থাকি এই আমাজন থেকে। আমাজনে আগুন জ্বলেছে কয়েকদিন ধরেই। তার মানে উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল। অভাব দেখা দেবে অক্সিজেনের। এতে তো শুধু ব্রাজিলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না ক্ষতিগ্রস্ত হবে পৃথিবী।
সায়েন্স জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয় The Amazon Connot be recouered once its gone অর্থাৎ একবার আমাজন ধ্বংস হলে আর ফেরত পাওয়া যাবে না। আর আমাজন ফেরত পাওয়া না যাওয়ার অর্থই হলো পৃথিবী বঞ্চিত হবে ২০ শতাংশ অক্সিজেন থেকে। এ ছাড়াও ‘পৃথিবীর’ দ্বিতীয় ফুসফুস’ আফ্রিকার ১০ লাখ বর্গ মাইলের বেশি বনাঞ্চল পুড়ছে বলে জানিয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। এদিকে ২৪.৮.২০১৯ তারিখের ‘দৈনিক সিলেটের ডাক’ এ প্রসঙ্গে একটি শিরোনাম লিখে ‘জ্বলছে পৃথিবীর ফুসফুস’ এবং এর ভেতরের খবরটি আরো উদ্বেগজনক। তাতে বলা হয় আসন্ন জি-৭ সম্মেলনে আমাজনে অগ্নিকান্ড আলোচ্যসূচির শীর্ষে থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তিনি বলেছেন ‘আমাদের ঘর জ্বলছে’। ফরাসি প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে ক্ষেপে যান ব্রাজিলের ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো। তিনি বলেন, মাক্রোঁ ‘রাজনৈতিক সুবিধা লাভের’ জন্য আমাজনের অগ্নিকান্ডকে ব্যবহার করছেন। তাহলে ব্যাপারটা আসলে কি দাঁড়ালো? তাতো দেখাই যাচ্ছে। আমাজন সহ পৃথিবীর ফুসফুসগুলো জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার হতে চলছে আর তা নিয়ে পৃথিবী জুড়ে চলছে যার যার স্বার্থবাদী রাজনীতির খেলা। স্বার্থে এতোই বিভোর যে কেউই বুঝতে চাইছেন না যে, তোমার জঙ্গল বা বৃক্ষের পাতা থেকে নির্গত অক্সিজেন আমার বাড়ীতে আসবেই আর আমার বনের অক্সিজেনও তোমার ঘরে জীবনকে বাঁচিয়ে রাখবে। অক্সিজেনে অধিকার সবার। এটা কারো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়।
এখানে তো প্রশ্ন আসতেই পারে-কেন এমন হয়? এর নেপথ্যে কি অন্য কিছু? অবশ্যই অন্য কিছু। অবৈধ ব্যবসা। এখানেও রবীন্দ্রনাথ ‘তোরা যে যা বলিস ভাই আমার সোনার হরিণ চাই’। না। ওরা সোনার হরিণ নয়। চায় সোনার হাতি, সোনার গন্ডার বা বিশাল দেহী সোনার তিমি-ওজন যার শত শত টন। অর্থাৎ আমাজন জুড়ে খোঁজ করা হচ্ছে সোনার খনি। আর সোনার খনি খুঁজতে আমাজনের গভীর জঙ্গল শত শত বাদামী মেশিনের মাধ্যমে উজার করা হচ্ছে বন। এদের রুখতে নিষ্ক্রিয় এবং দুর্বল ব্রাজিল সরকারের আইন। অভিযোগ রয়েছে ব্রাজিলের ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো সরকারের সাথে আমাজনের জঙ্গল ধ্বংসকারী বিভিন্ন কোম্পানী, শিল্প কারখানা ও সোনার খনির সন্ধানকারীদের রয়েছে খুবই মধুর সম্পর্ক। বিশ্ব কবির চাওয়া সেই ‘সোনার হরিণ’ তাদের চাওয়া নয় তারা চায় সোনার খনি। সারা বিশ্বে সোনার দাম বৃদ্ধির খবরে ওরা, ঐ ব্যবসায়ীরা পাগলা হাতির মতো উজাড় করে চলছে আমাজন। পৃথিবীর ফুসফুস। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট তথাকথিত উন্নয়নের নামে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে তুলছে পৃথিবীর ফুসফুস।
কিন্তু আমার পাহাড়? আমার পাহাড় কি ফুসফুস নয়। একসময়ে সবুজ পাহাড়ে ঢাকা সবুজ সিলেট। সিলেটের সত্যিকার ফুসফুস আজ আক্রান্ত। হতভাগ্য আমাজনের মতোই একদল ‘সোনার হাতি’ খুঁজে বেড়াচ্ছে। বিবর্ণ চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে অসহায় পাহাড়গুলো পাহাড়ের বুকে বহুতল দালান। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোন দিনই জানতে পারবে না এখানে পাহাড় ছিলো। সিলেটের পাহাড় দেখতে আর আসবে না কেউ! বনের সুন্দর বানর গোষ্ঠী আজ ঘর ছাড়া লোকালয়ে আগমন। তাদের সহ্য করতে হচ্ছে গাল-মন্দ-অত্যাচার-নির্যাতন। আমরা কেউ একটি বারও ভাবি না আমাদের জন্যই তো আজ বানর কুলের এমন নির্বাসন! পাহাড় জুড়ে সোনার খনি খোঁজার ফলই হলো বানরের দুর্ভোগ। আর আমরাও কিন্তু সুখে নাই; পাহাড়ের ফুসফুস আক্রান্ত হলে আমাদের ফুসফুসেরও রেহাই নাই।
২৫.৮.২০১৯ তারিখের দৈনিক ‘সিলেটের ডাক’ পত্রিকার একটি শিরোনাম-বনরক্ষায় গাছ চুরি প্রতিরোধে প্রয়োজনে জিরো টলারেন্স গ্রহণ করা হবে ঃ বনমন্ত্রী। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী ও বনাঞ্চল রক্ষায় গাছ চুরি প্রতিরোধে প্রয়োজনে জিরো টলারেন্সের মাধ্যমে বিহীত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বনের গাছ চুরিতে বনকর্মী ও পাহারাদার জড়িত থাকলে তদন্তক্রমে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। খুবই ভালো কথা, আশার কথা, ভরসার কথা কিন্তু ঐসব বনকর্মী ও পাহারাদার তো চুনোপুটি মাত্র। সিলেট শহরের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ে পাহাড়ে কতো গাছ কাটা হয়েছে সে হিসেব তো কারো অজানা থাকার কথা নয়। কারা কারা এর সাথে জড়িত, কারা কারা এই পাহাড় খেকোদের সহযোগীতা করেছেন সেটাও তো আন্তরিক হলে খুঁজে বের করা কোন কঠিন কাজ নয়। ওনারা তো রুই কাতলা অর্থাৎ চুনোপুটি নয়। দুদকের চেয়ারম্যান মহোদয় বলেছেন বড়দেরও ছাড় দেয়া হবে না, ধরা হবে। বন, পরিবেশ ও জলবায়ূ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় মোঃ শাহাব উদ্দিন এর সমীপে বিনীত অনুরোধ রাঘব-বোয়ালদের ধরুন! ওদের ধরতে পারলে চুনোপুটিরা এমনিতেই পাহাড় থেকে নেমে যেতে বাধ্য হবে। সিলেটের ফুসফুস পাহাড়গুলোর যতটুকু এখনও সুস্থ আছে তা বাঁচতে পারে।
পাভেল পার্থ নামের একজন প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়ক গবেষক তার এক নিবন্ধে বলেছেন, আসুন আমরা সবাই প্রাণের গভীর থেকে আমাদের আমাজন বনের জন্য প্রার্থনা করি। আমি বলি, আমাদের সিলেটের ফুসফুস বলে খ্যাত পাহাড় রক্ষায় আসুন আমরা প্রার্থনার পাশাপাশি সকলে মিলে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আসুন সবাই মিলিত কন্ঠে আওয়াজ তুলি-আমার পাহাড়, আমার সিলেট-আমরা আছি তোমার সাথে, তোমার পাশে। আমরা দেখাই জিরো টলারেন্স।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শব্দের অত্যাচারে নিঃশব্দ ক্ষতি
  • এমন মৃত্যু কাম্য নয়
  • কোন সভ্যতায় আমরা!
  • দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ রোল মডেল
  • বৃক্ষ নিধন রোধে চাই জনসচেতনতা
  • আফ্রিকা-চীনের দ্বিতীয় মহাদেশ
  • শিশুরা নিরাপদ কোথায়?
  • অপেক্ষার অশেষ প্রহরগুলি
  • ঘুষ-জুয়া বন্ধে কঠোর হোন
  • মা ইলিশ রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে হবে
  • ছাত্ররাজনীতি হোক কল্যাণ ও বিকাশের
  • পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক গবেষক আতিকুর রহমান
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • ‘জঙ্গি’ অপবাদ প্রসঙ্গে
  • ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে
  • মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই বদলে দেবে বাংলাদেশ
  • Developed by: Sparkle IT