পাঁচ মিশালী

গীতিকার রজনীকান্ত সেন

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৯-২০১৯ ইং ০০:৫০:৫৮ | সংবাদটি ১১৩ বার পঠিত

কবি গীতিকার এবং সুরকার হিসেবে বাঙালির শিক্ষা সংস্কৃতিতে চিরস্মরণীয় একটি নাম রজনীকান্ত সেন। তার জন্ম ১৮৬৫ সালের ২৬ জুলাই। দ্বিজেন্দ্র লাল রায়ের সমসাময়িক এই গীতিকারের গানগুলো ভক্তি ও দেশের প্রতি মমত্ববোধে উজ্জ্বল। তিনি ছিলেন গুরুপ্রসাদ সেন ও মনোমোহিনী দেবীর তৃতীয় সন্তান। গুরুপ্রসাদ ছিলেন কবি, মনোমোহিনী ছিলেন সাহিত্যানুরাগী। চারশো বৈষ্ণব ব্রজবুলী কবিতা সংকলনকে একত্রিত করে ‘পদ চিন্তামণিমালা’ নামে একটি কীর্তন গ্রন্থ প্রকাশ করেন গুরুপ্রসাদ সেন। রজনীকান্তের জন্মের সময় তার বাবা কটোয়ায় কর্মরত ছিলেন। রজনীকান্তের শৈশবে তিনি অনেক জায়গায় চাকুরি করেন। ১৮৭৫ সালে বরিশালের সাব-জজ পদ থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। এ সময় তার বড় ভাই আইনজীবী গোবিন্দনাথ সেন সংসারের হাল ধরেন।
শৈশবে রজনীকান্ত ছিলেন খুবই দুষ্টু প্রকৃতির। সব সময় খেলাধুলায় মেতে থাকতেন। তবে তার নৈতিক চরিত্র ছিল আদর্শস্থানীয়, অতিশয় মেধাবী ছিলেন, ফলে পড়াশোনা বেশি সময় না করলেও আশাতীত ফল অর্জন করতেন। গোপালচন্দ্র লাহিড়ীর কাছে বাল্য শিক্ষা এবং প্রতিবেশী রাজনাথ তর্করতেœর কাছে সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা শেষে রজনীকান্ত বোয়ালিয়া জিলা স্কুলে (বর্তমান রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল) ভর্তি হন। ১৮৮৩ সালে কুচবিহার জেনকিন্স স্কুল থেকে এন্ট্রান্স, রাজশাহী কলেজ থেকে এফ এ পাশ, কলকাতার সিটি কলেজ থেকে ১৮৮৯ সালে বিএ পাশ এবং একই কলেজ থেকে ১৮৯১ সালে আইন বিষয়ে বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন। ইতোমধ্যে ১৮৮৩ সালে হিরন্ময়ী দেবীর সঙ্গে তার পরিণয় সম্পন্ন হয়েছে। তাদের ছিল চারপুত্র শচীন্দ্র, জ্ঞানেন্দ্র, ভুপেন্দ্র ও ক্ষীতেন্দ্র এবং দুই কন্যা শতদল বাসিনী ও শান্তিবালা। অল্প বয়সে ভূপেন্দ্রের মৃত্যু হলে রজনীকান্ত দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে পর দিন রচনা করেন এক বেদনাবিধুর গান-‘তোমারি দেওয়া প্রাণে তোমারি দেওয়া দুঃখ-তোমারি দেওয়া বুকে, তোমারি অনুভব।
মা-বাবার সাহিত্যপ্রীতি কিশোর রজনীকান্তের জীবনে বিরাট প্রভাব ফেলে। স্ত্রীও ছিলেন বিদূষী, তিনি রজনীর কবিতা নিয়ে আলোচনা করতেন। ভাঙ্গা কুটির তারকেশ্বর চক্রবর্তীর সংগীত সাধনা রজনীর মনে গভীর ছাপ ফেলে। শৈশব থেকেই তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাংলা ও সংস্কৃতে কবিতা লিখতে পারতেন। আর কবিতাগুলোকে গানে রূপ দিতেন। পরবর্তীকালে বাদ্যযন্ত্র সহযোগে গাণ পরিবেশন করতেন। রজনীকান্তের কবিতা স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হত। তিনি তাৎক্ষণিক গান রচনা করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইতেন। এরকম একটি গান রাজশাহী গ্রন্থাগারের সমাবেশে মাত্র এক ঘন্টার মধ্যে রচনা করেছিলেন- ‘তব, চরণ নি¤েœ উৎসবময়ী শ্যাম-ধরনী সরসা-উর্ধ্বে চাহ অগণিত-মণি-রঞ্জিত নভো-নীলাঞ্জনা-সৌম্য-মধুর-দিব্যাঙ্গনা শান্ত-কুশল দরশা।’
স্বদেশী আন্দোলনে তার গান ছিল বাঙালি জাতির প্রেরণার উৎস। ১৯০৫ সালে বঙ্গবঙ্গের বিরুদ্ধে কলকাতার টাউন হলের জনসভায় বিলাতী পণ্য বর্জন এবং স্বদেশী পণ্য গ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তিনি লেখেন সেই অবস্মরণীয় গান-মায়ের দেয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই-দীন দুঃখিনি মা যে তোদের তার বেশি আর সাধ্য নাই। এই একটি গান রচনার ফলে রাজশাহীর পল্লী কবি রজনীকান্ত সমগ্র বঙ্গের জাতীয় কবি রজনীকান্ত হয়ে ওঠেন ও জনসমক্ষে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
তার গান কান্ত গীতি নামে অভিহিত হতে থাকে। এ গানটি বাংলায় অদ্ভুত গণ-আন্দোলন ও নবজাগরণের সৃষ্টি করে।
তার আরেকটি বিখ্যাত প্রার্থনা সংগীত- ‘তুমি, নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে-তব, পূণ্য কিরণ দিয়ে যাক, মোর মোহ কালিমা ঘুচায়ে। তার গানে ছিল দেশাত্মবোধ, ভক্তি, প্রেম ও হাস্যরসের উপাদান। তবে তার দেশাত্মবোধক গানের আবেদনই বেশি। স্বদেশী কবি হিসেবেও যথেষ্ট সুখ্যাতি অর্জন করেন। বিএল ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষা জীবন শেষ করে ১৮৯১ সালে তিনি রাজশাহীতে আইন পেশায় নিয়োজিত হন। তার জ্যেঠামশাই তখন সেখানে প্র্যাকটিস করতেন। ফলে আইন পেশায় রজনীর দ্রুত উন্নতি হতে থাকে। কিন্তু আইন পেশার চেয়ে সাহিত্য সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে বেশি সম্পৃক্ত থাকায় তিনি মক্কেলদের চাহিদা মাফিক সময় দিতে পারতেন না। পরবর্তীকালে কিছুদিন তিনি নাটোর এবং নওগাঁ জেলায় অস্থায়ী মুন্সেফ হিসেবে কাজ করেন। রজনীকান্ত শারীরিক কসরৎ এবং খেলাধুলায় আগ্রহী ছিলেন, তিনি ফুটবল ও ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করতেন। গ্রামের নিরক্ষর মহিলাদের শিক্ষা প্রসারেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
জীবদ্দশায় তার বাণী (১৯০২) কল্যাণী (১৯০৫) ও অমৃত ১৯১০) নামে তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। মৃত্যুর পরে অভয়া (১৯১০), আনন্দময়ী (১৯১০), বিশ্রাম (১৯১০), সদ্ভাব কুসুম (১৯১৩) ও শেষদান (১৯১৬) নামে তার আরও পাঁচটি বই প্রকাশিত হয়। রজনীকান্তের গান প্রধানত হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সংগীত ঘরানার। এতে কীর্তন, বাউল ও ঠপ্পার যথাযথ সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তিনি সংগীতানুরাগীদের মন জয় করেন।
১৯০৯ সালে তিনি কন্ঠনালীর প্রদাহজনিত রোগে আক্রান্ত হন। ব্রিটিশ ভান্ডার পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে তার ল্যারিঙ্কস ক্যান্সার সনাক্ত করেন। ১৯১০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ক্যাপ্টেন ভেনহ্যাম হুয়াইটের তত্ত্বাবধানে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার ট্রাকিওটোমি অপারেশন হয়। এতে কিছুটা আরোগ্য মিললেও তিনি চিরতরে বাকশক্তি হারান। মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দী ও শরৎ কুমার রায় তাকে আর্থিক সহযোগিতা করেন। ১৯১০ সালের ১১ জুন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রজনীকান্তকে দেখতে হাসপাতালে আসেন। রবীন্দ্রনাথ এর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি এ গানটি রচনা করেন ‘আমার সকল রকমে কাঙাল করেছে-গর্ব করিতে চুর-তাই যশও অর্থ মান ও স্বাস্থ্য, সকলি করেছে দূর-ঐগুলো সব মায়ামল রূপে ফেলেছিল মোরে অহমিকা কূপে-তাই সব বাধা সরায়ে দয়াল করেছে দীন আতুর।’
গানটি কবিতা আকারে লিখে বোলপুরে রবীন্দ্রনাথের কাছে পাঠানো হলে রবীন্দ্রনাথ ৩০ জুলাই ফিরতি চিঠিতে রজনীকান্তের সাহিত্য প্রতিভা ও গৌরবময় ভূমিকার প্রশংসা করে লেখেন, এর মাধ্যমেই তার অন্তর আত্মা শক্তি ও সাহস জুগিয়ে সর্বপ্রকার ব্যথা-বেদনা থেকে তাকে মুক্ত রাখবে। ১৯১০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটায় এই ক্ষণজন্মা সংগীতকার পরলোকগমন করেন। আজ তার প্রয়ান তিথিতে তাকে স্মরণ করি বিন¤্র শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায়।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT