পাঁচ মিশালী

স্বর্গ চাই, মরতে চাই না

শেখ ছালেহ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৯-২০১৯ ইং ০০:৫৪:৪০ | সংবাদটি ১৬৩ বার পঠিত

মানুষের আশা তার জীবনকালের শেষ সীমার অদূরে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু ঐ আশা পর্যন্ত পৌঁছার পূর্বেই তার জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। এই অংশটুকু বুখারী শরীফ থেকে সংকলিত। মৃত্যু প্রকৃতির একটি অসাধারণ কৌশল এবং একটি অনবদ্য শিল্পও বটে। আর স্পষ্টত বিচিত্র একটি বিষয় হল যে, প্রতিটি মানুষের আয়ু তার দু’চোখের মধ্যখানে লেখা আছে। মৃত্যু সম্ভবত হতে পারে একটি আঘাত অথবা জীবন নাটকের শেষ অংশের দুর্দান্ত একটি অভ্যূত্থান। প্লেটোর দৃষ্টিকোণ থেকে মৃত্যু হল শারীরিক অবস্থা থেকে মুক্তি। বিখ্যাত লেখক হেরল্ড এস কুশনারের মতে “ঈশ্বর চান না যে তুমি রুগ্ন হও। এই সমস্যা নিয়ে তিনি কাউকে সৃষ্টি করেননি। তিনি চান না যে তুমি এই নিয়ে জীবন অতিবাহিত কর। কিন্তু তিনি নিজে থেকে তা নিরাময় করতে পারেন না। মানুষের সকল সমস্যার মূল হল তার নিয়তি।
মানুষ মরণশীল। এই পৃথিবী থেকে তাকে চলে যেতেই হবে। যা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মাত্র। এই আসা যাওয়ার নিরন্তন প্রক্রিয়ায় মানুষই মুখ্য। আগমন আর প্রস্থানের সুন্দর এই অনুষ্ঠানটি মানুষের সামাজিক মিলন মেলার জমজমাট ইতিহাস। আর এই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ অংশীদার আমরা মানব জাতির ছোট বড় সকলেই। পৃথিবী নামক এই গ্রহে মানুষের আচরণের ইতিহাস তার মৃত্যুতে একাটি সাময়িক সময়ের উপর এসে দন্ডায়মান হয়ে থাকে। পটপরিবর্তনের কৌশলগত অবস্থানের মাঝে অংশীদার হয়ে মানব জাতির অবিচ্ছেদ জীবন প্রণালী আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবতর রূপেই সঞ্চালন ঘটে। যা এক অনন্তর অবিনশ্বর জীবনের রূপান্তর মাত্র।
সত্তর দশকের জামাইকান বংশো™ূ¢ত কিং অব র‌্যাগি খ্যাত সংগীত শিল্পী বব মার্লির জনপ্রিয় গান আমার মনে আজও একটি জীবন্ত জিজ্ঞাসার যোগান দিয়ে চলছে। গানটি হল-এভরি বডি ওয়ান্ট টু গো হ্যাভেন, বাট নো বডি ওয়ান্ট টু গো ডাই-আমরা সবাই স্বর্গে যেতে চাই তবে কেউ মরিতে চাই না। এটুকুই মর্মার্থ। স্বর্গ প্রাপ্তির প্রতিযোগিতার দৌঁড়ে যেকোন মানদন্ড উন্মুক্তকরণ মাত্র। এতে উত্থান-পতনের আশংকায় ক্রমাগত আমাদের উদ্বেলিত করেই চলছে। যে কোন প্রতিযোগিতার অন্যতম আকর্ষণ হল মূল্যবান পুরষ্কারপ্রাপ্তি। তাই পরকালে আরামদায়ক স্বর্গীয় ব্যবস্থা আমাদের জন্য শতভাগ প্রত্যাশার অনুকূল একটি ব্যাপার বটে। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো এই যে পরিচর্যা আছে, অনুশীলন আছে আর প্রতিযোগিতার মত একটি বিষয় তো সব সময় উন্মুক্ত হয়ে আছে। কিন্তু প্রতিযোগিতার ফলাফল স্বভাবত এই পৃথিবীতে প্রকাশিত হবার রীতি প্রচলন নাই। অতএব অনুশীলন আর প্রতিযোগিতার বিরামহীন পদযাত্রা আমৃত্যু চলতেই থাকবে। তারপর কোন এক সময় জীবন নিয়ে মৃত্যুর অদৃশ্য লোকে পাড়ি দেওয়ার সেই শুভক্ষণই জীবন নাটকের শেষ অংশ সফল মঞ্চায়নের ইতিটুকু হল মৃত্যু।
একটি নির্দিষ্ট সৃজনশীল পদ্ধতির দুর্দান্ত প্রদর্শনীর বাস্তবতার আলোকে পৃথিবীতে মানুষের আগমন এবং ঠিক অনুরূপভাবে প্রকৃতির অসাধারণ তত্ত্বাবধানেই মানুষ পৃথিবীর পথ পাড়ি দেয় একটি নির্দিষ্ট সময় অবদি। পৃথিবীতে মানুষের আগমনকে ঘিরে নয় এমনকি তার মৃত্যুতেও আমার কাছে জবরদস্ত কোন প্রশ্নের অবতারণা নেই। নেই কোন উদ্বেগ, উত্তাপ তবে একটি মাত্র প্রশ্ন সর্বদা আমাকে বিচলিত করে আর তা হল কি পরিমাণ আস্থাশীল সৎকর্ম সে সাথে নিয়ে যেতে পারল অথবা কিছুই না?
মানুষের সকল স্বাভাবিক আচরণ বিশ্লেষণ করে আমার কাছে পরিস্কার একাটি বিষয় এই যে, আমাদের প্রাপ্তি তালিকায় স্বর্গ যেন একটি অবিচ্ছেদ সহজাত বিষয়। অর্থাৎ পৃথিবীর সকল মানুষ স্বর্গে যেতে আগ্রহী। তবে মানুষের জীবনের চাহিদাপত্রে নরক যেন একেবারেই বেমানান। অধিকন্তু পারলৌকিক সা¤্রাজ্যে চির অমরতেœ আমরা সকলেই বিশ্বাসী। কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি হতে আমরা কেউ আগ্রহী নয়। কিন্তু কেন এই মানবীয় আচরণে তারতম্য? এটা এখন একবারেই পরিস্কার অর্থাৎ কাল মহাকাল ভেদ করিয়া এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজিবে মানব জাতির আগত অনাগত অনুসন্ধানী সকল মানব-মানবী। পৃথিবীর শেষ সময় পর্যন্ত এই একটি প্রশ্ন জটিল জিজ্ঞাসার চিহ্ন হয়ে আমাদেরকে অবিরত রহস্যের জটিলতার মুখোমুখি দাঁড় করে রাখবে।
মানুষের অনবরত প্রত্যাশা ও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ঝামেলায় সে তার অতি কাছাকাছি অবস্থানে দন্ডায়মান মৃত্যুকে সহজে মেনে নিতে চায় না। যা মৃত্যুকে এড়িয়ে চলার বড় ধরণের একটি দুঃসাহস এবং বোকামীও বটে। অনবরত জীবনকে উদযাপনের উৎসাহে মৃত্যু মানুষের কাছে ভুল বিবেচনায় একটি অবহেলিত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT