উপ সম্পাদকীয় বিশ্ব শান্তি দিবস

অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান

মনোরঞ্জন তালুকদার প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৯-২০১৯ ইং ০০:৫৬:৫৭ | সংবাদটি ১০৬ বার পঠিত

আজ ২১শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব শান্তি দিবস। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রত্যেক দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করবে। সারা বিশ্বের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করলে ২০১৯ সালের বিশ্ব শন্তি দিবস বাংলাদেশ সহ গোটা বিশ্বের সকল মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করবে।
সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা সারা বিশ্বের জনগণকে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রথমত বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা অচিরেই সমাধান না করলে সমগ্র দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার জন্য বড় ধরনের সংকট হয়ে দেখা দিতে পারে। বিশ্বের প্রথম পাঁচ শক্তির মধ্যে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে অবিলম্বে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে নিয়ে বসে চলতি জাতিসংঘ অধিবেশনে এর সমাধান করা অত্যন্ত জরুরী প্রয়োজন। মিয়ানমার যেভাবে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি লংঘন করে যাচ্ছে বিশ্ব নেতারা তাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সসম্মানে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের নাগরিকত্ব সহ সব ধরণের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরী। দ্বিতীয় ভারতের জম্মু-কাশ্মীর সম্যাসার পাশাপাশি আসামের নাগরিক সমস্যা নিয়ে জাতিসংঘকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।
যদিও ভারত সরকার বলছে এটি তাদের দেশীয় অভ্যন্তরীণ বিষয়। এরপরেও এ বিষয়টি বিশ্ব নেতাদের দেখা উচিত। এছাড়াও ফিলিস্তিনি সমস্যা, হংকং সমস্যা সহ বিশ্বের যত সমস্যা আছে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে সকল সমস্যার সামধান হলে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ শান্তি পাবে। শান্তির জন্য মানুষের আকুলতা চিরন্তর। খাদ্যের পরই মানুষের প্রধান অন্বেষা শান্তি। ধন, মান, সম্পদ যতো কিছুই থাক শান্তি মানুষের চিরকালীন প্রার্থনা। শান্তি ছাড়া কি ব্যক্তি জীবন, কি সমাজ জীবন দুইই মূল্যহীন। মানুষ যা কিছুই করে, যা কিছুই চায় সব এই শান্তির জন্যই। জীবনে শান্তি কতো মূল্যবান তা বোঝা যায় জীবনে শান্তি যখন দুর্লভ হয়ে পড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর রাশিয়া তথা পূর্ব ইউরোপের লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন অস্থির ও দিশেহারা, অসংখ্য মানুষ যখন অড্রিয়াটিক সাগর পার হয়ে পশ্চিমের দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছে, যখন কিছুই আর কোথাও চলছে না, অরাজকতা, নৈরাজ্য, অপরাধ গ্রাস করছে সমাজ জীবন তখন রাশিয়ার কোনো এক বিপন্ন বিধ্বস্ত মানুষ এই বলে দুঃখ করছিলেন যে, আগে সুখ না থাকলেও শান্তি ছিলো, এখন সুখও নাই শান্তি নাই। অর্থাৎ শান্তি না থাকলে সুখও নিরর্থক হয়ে যায়। আরো আগে বিশ শতকের ষাটের দশকে কিউবা সংকটের সেই বিপর্যয়কর দিনগুলোতে সারা পৃথিবী যখন টানটান উত্তেজনা আর অস্থিরতার মধ্যে তখন কেনেডী ও ক্রশ্চেভের কাছে বার্ট্রান্ড রাসেল বিশ্বে শান্তি কত জরুরী একথা বলেই সেই ঐতিহাসিক তার বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গত শতকের শেষ ভাগ পর্যন্ত চলেছে স্নায়ুযুদ্ধ, সন্দেহ, অবিশ্বাস ও গানবোট ডিপ্লোমেসি। সেই সময়ই একজন বিখ্যাত সাংবাদিক বলেছিলেন যে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পৃথিবীতে আরও একটি মহাযুদ্ধ বাধেনি ঠিকই কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পৃথিবী একটি দিনের জন্য যুদ্ধমুক্ত থাকেনি।
পৃথিবীর কোথাও না কোথাও যুদ্ধ, সংঘর্ষ বা রক্তপাত হচ্ছেই। বলা যায় এটাই এখনো বিশ্বের বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতার মধ্যেই আরও একটি বিশ্ব শান্তি দিবস পালিত হবে। কিছুকাল আগে ম্যানহাটনের এক সুধী সমাবেশে নোবেল বিজয়ী জার্মান লেখক গুন্টার গ্রাস একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। গ্রাসের এই বক্তৃতাটি সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছিলো। ‘টিন ড্রাম’ আর ‘ডগ ইয়ার্সের’ লেখক সে দিন তীক্ষè ভাষায় একটি কথাই বারবার বলেছিলেন ‘যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়’। গ্রাস নাৎসী জার্মানির নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যুদ্ধের ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়েছিলেন। ইরাক যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বিশ্বে নতুন করে যে উদ্বাস্তু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তার রূপ ভয়াবহ। এই বাস্তবতার কথা মনে রাখলে বিশ্বশান্তির প্রত্যাশা সুদূরপরাহতই থেকে যাবে। এজন্যই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘শান্তির ললিত বাণী শুনাইবে ব্যর্থ পরিহাস’। আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি সেখানে শান্তি ও মানবতা লঙ্ঘিত হচ্ছে। জাতিসংঘ মহাসচিব এ্যান্তনি গুতেরস বলেছেন শান্তির জন্য মানবাধিকার অপরিহার্য। জাতিসংঘ মহাসচিব গত বিশ্ব শান্তি দিবসে তাঁর বাণিতে বলেছেন আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসে আমি যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও ক্ষুধার বিরুদ্ধে এবং সবার জন্য মানবাধিকার রক্ষায় সম্মিলিত পদক্ষেপ নিতে আহবান জানাই। খাদ্য সংকট, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশ্বশান্তির প্রতিষ্ঠার পথে বড়ো প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অপুষ্টি, অশিক্ষা-কুসংস্কার দূর করা না গেলে শান্তি আসবে না। শান্তির জন্য প্রয়োজন উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি। আশা করা হয়েছিলো স্নায়ুযুদ্ধের যুগের অবসানের পর বিশ্বে শান্তির প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে। বাস্তবে তা হয়নি।
সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর এককেন্দ্রিক বিশ^ ব্যবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই ঠান্ডা যুদ্ধের অবসান প্রত্যাশা করা হয়েছিলো। কিস্তু বাস্তবে দেখা গেলে শক্তির ভারসাম্যের অভাবে দুনিয়াব্যাপী একক শক্তির প্রাধান্য ও দম্ভ। এই মনোভাব বিশ্ব শান্তির ক্ষেত্রে সুফল বয়ে আনেনি। বিশ্বে আবার নতুন সংঘর্ষ ও উত্তেজনা সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। ইউরোপে নতুন করে অস্ত্র মোতায়েনের বিরুদ্ধে মাত্র কিছুদিন আগেই কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে রাশিয়া। বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে এখনো বহু অন্তরায় বিদ্যমান। বর্তমান সিরিয়া সংকট একটি ভয়াভহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট সিরিয়া হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্য দিকে রাশিয়া এর বিরোদ্ধে সুচ্ছার হচ্ছে। তবে আশার কথা এই যে, পৃথিবীর মানুষ আজ আরো বেশি করে শান্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। রঁম্যা রঁলা, রাসেল, সর্বত্র বিশ্বে শান্তির জন্য যে ভূমিকা পালন করেছিলেন এখনো গুন্টারগ্রাসের মতো লেখক-বুদ্ধিজীবীরা সেই শান্তি প্রায়স অব্যাহত রেখেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও অনেকবারই বিশ্ব শান্তির গুরুত্বের কথা বলেছেন। তিনি নিজে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির সমর্থক। বর্তমানে গান্ধীর জীবনদর্শন ও অহিংস নীতির প্রতি বিশ্বের মানুষের যে আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে তাকেও বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রযাত্রা রূপে অভিহিত করা যায়। এইসব উদ্যোগ ও চিন্তা সত্ত্ব্ওে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পৃথিবী জোড়া এখনো অশান্তি, উত্তেজনা, সহিংসতা ও সংঘর্ষের চিত্রই প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। মানুষ যে শান্তি পূর্ণ বিশ্বের প্রত্যাশা করেছিলো তা এখানো সুদূর পরাহতই রয়ে গেছে। হিংসা, হানাহানিই এখনো পৃথিবীর বাস্তবে । এই চিত্র অস্বীকার করার উপায় নেই। এজন্যই মনে হয় এতো কিছুর পরও সেই আঁধার যেন গেলো না। শান্তির পথে বাধা তো আরো অনেক আছে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অপুষ্টি। এগুলোও শান্তির পথে কম বড়ো বাধা নয়। পৃথিবীতে একদিকে প্রাচুর্য ও অপচয়, অন্যদিকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর করা না গেলে বিশ্বে শান্তির সুবাতাস প্রত্যাশা করা যায় না। এইজন্যই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এতো জরুরি। বিশ্বে নতুন করে খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধি ও খাদ্যসংকট দেখা দেয়ার বাস্তবতায় কোটি কোটি মানুষের জীবনে আরো দুর্দশা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি বিশ্ব শান্তির অনুকূল নয়। বিশ্ব শান্তির স্বার্থেই বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা পড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যে মানুষ খেতে পায় না, যে মানুষ অভূক্ত ও ক্ষুধার্ত তার শান্তি থাকার কথা নয়। কিস্তু শান্তির আজ মানুষের প্রায় শেষ আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব শান্তি ছাড়া এই বিশ্ব সভ্যতাই অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে। শান্তির কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শব্দের অত্যাচারে নিঃশব্দ ক্ষতি
  • এমন মৃত্যু কাম্য নয়
  • কোন সভ্যতায় আমরা!
  • দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ রোল মডেল
  • বৃক্ষ নিধন রোধে চাই জনসচেতনতা
  • আফ্রিকা-চীনের দ্বিতীয় মহাদেশ
  • শিশুরা নিরাপদ কোথায়?
  • অপেক্ষার অশেষ প্রহরগুলি
  • ঘুষ-জুয়া বন্ধে কঠোর হোন
  • মা ইলিশ রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে হবে
  • ছাত্ররাজনীতি হোক কল্যাণ ও বিকাশের
  • পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক গবেষক আতিকুর রহমান
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • ‘জঙ্গি’ অপবাদ প্রসঙ্গে
  • ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে
  • মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই বদলে দেবে বাংলাদেশ
  • Developed by: Sparkle IT