উপ সম্পাদকীয় দৃষ্টিপাত

সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৯-২০১৯ ইং ০১:১০:০৮ | সংবাদটি ৬৫ বার পঠিত

‘আমাকে অসত্য থেকে সত্যে নিয়ে এসো, আমাকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে এসো’-মানুষ যুগ যুগ ধরে এ কামনাই করে আসছে। একমাত্র শিক্ষা ও জ্ঞানই পারে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে আনতে, অসত্য থেকে সত্যে পৌঁছে দিতে। ইংরেজিতেও একটি প্রবাদ আছে I IIiteracy is a curse প্রবাদটি ধ্রুব সত্য। এই নিরক্ষরতা মানব সভ্যতার জন্য কলঙ্ক। ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, শিল্প, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক উন্নতি প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে এবং দুনিয়ার প্রগতিশীল জাতিসমূহের মধ্যে স্থান করে নিতে হলে অবশ্যই শিক্ষা দরকার।
শিক্ষার মত পরশপাথর আর নেই। দুঃখজনক বাস্তব ঘটনা হচ্ছে এই যে, জাতিকে নিরক্ষরমুক্ত করতে বাংলাদেশ সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করলেও এখন পর্যন্ত জাতিকে শতভাগ নিরক্ষরমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে এখনো ২৬.১% লোক নিরক্ষর, অথচ শিক্ষার অধিকার পাওয়াটা জনগণের মৌলিক অধিকার। শিক্ষার আলো থেকে ২৬.১% লোক বঞ্চিত থাকাটা একটি স্বাধীন দেশের জন্য মোটেই সুখবর নয়। পৃথিবী যখন বিভিন্ন দিক দিয়ে দুর্বার বেগে এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও বাংলাদেশে ২৬.১% লোক নিরক্ষর থাকবে (বাংলাদেশ প্রতিদিন ঃ ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯) এটা কেমন কথা?
শিক্ষার উন্নয়নে আর্থিক ব্যয় হচ্ছে অনেক। সেমিনার-সিম্পোজিয়ামও কম হচ্ছে না। তাহলে সাক্ষরতার ক্ষেত্রে দেশ পিছিয়ে থাকবে কেন? ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ তথা জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন। জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের প্রবেশদ্বার হচ্ছে সাক্ষরতা। সাক্ষরতার সংজ্ঞা সময়ের পরিক্রমায় পরবর্তিত হচ্ছে এবং বিস্তৃতি লাভ করেছে। অতীতে সাক্ষরতা বলতে অক্ষরজ্ঞান বা স্বাক্ষর করাকে বোঝানো হতো। কিন্তু বর্তমানে সাক্ষরতা (Literaey) বলতে বোঝায় ‘মাতৃভাষায় পড়তে পারা, পড়ে অনুধাবন করতে পারা, পড়ে অনুধাবন করতে পারা, লিখতে পারা, লিখিতভাবে বিভিন্ন বিষয় ব্যাখ্যা করতে পারা, যোগাযোগ স্থাপন করতে পারা এবং গণনা করতে পারা’। সাক্ষরতার বর্তমান সংজ্ঞা যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব, আমরা সাক্ষরতা অর্জনে অনেক পিছিয়ে আছি। এসএসসি পাশ হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে যদি পরীক্ষা করি তাহলে দেখব, এরা সাবলীলভাবে বাংলা পড়তে পারে না। এইচএসসি পাশ হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে যদি পরীক্ষা করি তাহলে দেখব, এরা মাতৃভাষায় শুদ্ধ করে লিখতে পারে না। ডিগ্রি পাশ হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে যদি আমরা পরীক্ষা করি তাহলে দেখতে পাব, এরা শুদ্ধ করে বাংলা ভাষায় একখানা দরখাস্ত লিখতে পারে না। সাক্ষরতা অর্জনে আমাদের অবস্থান কতটুকু তা এখান থেকেই সহজে প্রতীয়মান।
১৯৬৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ইউনেস্কো প্রথম সাক্ষরতা দিবস পালন করে। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সাক্ষরতা দিবস পালন করা হয় ১৯৭২ সালে। এবারের সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল Literaey and Multilingualism বাংলায় যার সারমর্ম হল ‘বহুভাষায় সাক্ষরতা, উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা’। শিশুরা মাতৃভাষার পাশাপাশি অন্য ভাষা শিখতে পারলে তা বিভিন্ন দেশ ও জাতির মধ্যে সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরো দৃঢ় করবে। একই সাথে নতুন নতুন অভিজ্ঞতালব্দ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নিজের জীবনমান উন্নয়ন এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অনবদ্য ভূমিকা রাখতে পারবে। জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১৯৩টি দেশের অধিকাংশ মানুষ বহুভাষিক। বর্তমান বিশ্বে ৭০৯৭টি ভাষা মৌখিক যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হয়। ২৩টি ভাষা বেশি ব্যবহৃত হয়; বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ এই ২৩টি ভাষায় কথা বলে। বহুভাষায় সাক্ষরতা অর্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। মাতৃভাষার পাশাপাশি অন্য ভাষায় সাক্ষরতা অর্জন এবং সর্বত্র বাস্তবায়ন দেশ ও জাতিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
শিক্ষা হলো জ্ঞান অর্জনের মূল ভিত্তি। আর সাক্ষরতাই শিক্ষার প্রথম সোপান। জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতি ও প্রযুক্তি নির্ভর উন্নয়নের এ বিশ্বের সাক্ষরতার বিকল্প নেই। এ বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রেখেই বর্তমান সরকার উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি বৃহৎ কর্মসূচিভিত্তিক প্রস্তাবনা Non-Formal Eduction Development Program (NFEDP) তৈরি করেছেন যা বর্তমানে অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এনএফইডিপি’র আওতাভুক্ত বিভিন্ন কম্পোনোট হচ্ছে (১) ১৫+ বয়সী ৫০ লক্ষ নিরক্ষরকে মৌলিক সাক্ষরতা প্রদান করা হবে, (২) ১৫-৪৫ বৎসর বয়সী ১৫ লক্ষ যুব ও বয়স্ক নব্য সাক্ষরকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে, (৩) ৮-১৪ বৎসর বয়সী ১০ লক্ষ বিদ্যালয় বহির্ভূত শিশুকে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করা হবে, (৪) ৬৪টি জেলায় ৬৪টি জীবিকায়ন দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে, (৫) দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ১টি করে এবং কিছু শহর এলাকায় সর্বমোট ৫০২৫টি ICT বেইজড স্থায়ী কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার (সিএলসি) নির্মাণ করা হবে। এসব কর্মসূচি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে সাক্ষরতার ক্ষেত্রে দেশ এগিয়ে যাবে এবং বিশ্বের বুকে জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শব্দের অত্যাচারে নিঃশব্দ ক্ষতি
  • এমন মৃত্যু কাম্য নয়
  • কোন সভ্যতায় আমরা!
  • দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ রোল মডেল
  • বৃক্ষ নিধন রোধে চাই জনসচেতনতা
  • আফ্রিকা-চীনের দ্বিতীয় মহাদেশ
  • শিশুরা নিরাপদ কোথায়?
  • অপেক্ষার অশেষ প্রহরগুলি
  • ঘুষ-জুয়া বন্ধে কঠোর হোন
  • মা ইলিশ রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে হবে
  • ছাত্ররাজনীতি হোক কল্যাণ ও বিকাশের
  • পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক গবেষক আতিকুর রহমান
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • ‘জঙ্গি’ অপবাদ প্রসঙ্গে
  • ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে
  • মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই বদলে দেবে বাংলাদেশ
  • Developed by: Sparkle IT