সাহিত্য

বীভৎস সময়

কানিজ আমেনা প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৯-২০১৯ ইং ০১:২৬:১৪ | সংবাদটি ১৩৮ বার পঠিত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সর্বপ্রথম ছোটগল্পের সার্থক সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন, ‘ছোট প্রাণ ছোট কথা, ছোট ছোট দুঃখ ব্যথা... শেষ হইয়াও হইল না শেষ।’ ছোটগল্প আকারে ছোট হলেও একে ছোট দৃষ্টিতে দেখার কোন অবকাশ নেই। বরং কয়েক পাতার ছোটগল্পের মাঝে জীবনের বিশেষ মুহূর্তের ছবি অঙ্কিত থাকে যাতে সমাজের জন্য জরুরি কোন বার্তা লুক্কায়িত থাকে। তেমনই একটি ছোটগল্পের বই ‘বীভৎস সময়’। লেখক শাহিদা হক শাপলা। ‘বীভৎস সময়’ বইটিতে রয়েছে মোট এগারোটি ছোটগল্পের সমাহার যার মধ্যে আবার তিনটি হলো অণুগল্প। সমকালীন বিভিন্ন বিষয় ফুটে উঠেছে এই গল্পগুলোর মাঝে।
বইটির শিরোনাম যে গল্পের নামে সেই ‘বীভৎস সময়’ গল্পটি শুরু হয়েছে একটি বীভৎস দৃশ্য দিয়ে। ওসি মতিন তার অফিসে ধর্ষণের মামলায় গ্রেফতার হওয়া আসামী ২৪ বছর বয়সী এক যুবক বিজয়ের কাছ থেকে জোরপূর্বক জবানবন্দী নেওয়ার চেষ্টায় সংগ্রামরত। অথচ বিজয় প্রকৃত আসামী নয় যেটা স্বয়ং ওসি সাহেবও জানেন। আসল ধর্ষক ও খুনীর কাছ থেকে চৌদ্দ লক্ষ টাকা ঘুষ খেয়ে ইতিমধ্যেই পেট ফুলিয়েছেন ওসি সাহেব। বন্দীর উপর কয়েকদিন ক্রমাগত নির্যাতন চালালেন তিনি। শার্ট ও প্যান্ট জায়গায় জায়গায় ছিড়ে গিয়ে রক্তজমাট বাঁধা মাংস দেখা যাচ্ছিলো আসামীর। তারপরেও আসামী মুখ খুলছে না। আর এদিকে ওসি সাহেবও যেভাবেই হোক জবানবন্দী আদায়ের কঠিন ব্রত গ্রহণ করেছেন। এদিকে বিজয় দিবস চলে এলো। প্রতি বছর এই দিনে ওসি সাহেবের স্ত্রী আসেন কারাগার পরিদর্শনে। নিজের হাতে রান্না করা ভাত-মাংস যতœ সহকারে খাইয়ে দেন বন্দীদের। ‘অপরাধ, ক্রাইম, অন্যায় অসুন্দর। কিন্তু অপরাধী বা আসামীর চোখে শ্রদ্ধা এলে শহরের সমস্ত সৌন্দর্য ওই টলমলে শ্রদ্ধার সৌন্দর্যের কাছে হার মেনে যায়। ওসি সাহেবের স্ত্রী ওটা দেখেন, কষ্ট পান, সহানুভূতি থেকে উপচে পড়া জলে পাপড়ি ভেজানোর সুখে আপ্লুত হয়ে পড়েন।’
বিজয় কিছু খেলো না তবে ওসির স্ত্রীর দিকে হা করে তাকিয়ে রইলো এবং তার গালের তিল নিয়ে একটি মন্তব্য করলো। এতে ওসি সাহেব রেগে গেলেও যেহেতু বিজয় আজ মার খাওয়ার আগেই কথা বলা শুরু করেছে তাই তার পরবর্তী কথা শোনার জন্য তিনি রাগ হজম করে অপেক্ষা করতে লাগলেন। বিজয় মিষ্টি করে হেসে বললো, ‘আমি সেই ধর্ষক, আমিই খুনি।’ সেই সাথে সে একটি শর্ত জুড়ে দিলো আদালতে তার বিরুদ্ধে রায় হয়ে যাবার পর কারাগারে প্রবেশের পূর্বে তাকে যেন একটিবার ওসি সাহেবের সাথে দেখা করতে দেওয়া হয়। এরপর রায় হলো, বিজয়ের যাবজ্জীবন কারাদ- হয়। শর্তানুযায়ী বিজয়কে ওসি মতিনের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়। সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যবশত সেদিন উনার স্ত্রীও সেখানে ছিলেন। তাদের উভয়কে লক্ষ করে বলা বিজয়ের শেষ ডায়লগ ছিল, ‘আমার তো দুটো যাবজ্জীবন হবার কথা। আমার তো আরেকটা অপরাধ আছে, জন্মের পরই আপনার স্ত্রীর স্তন ছুঁয়েছিলাম যে!’ তখন তার কপালের লম্বা দাগটি দেখে ওসি মতিনের স্ত্রী বুঝতে পারলেন এ হলো চৌদ্দ বছর আগে কমলাপুর রেলস্টেশনে হারিয়ে যাওয়া তারই গর্ভজাত সন্তান। আর তখনই তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন। গল্পের শেষ দৃশ্য খুবই করুণ। চৌদ্দ বছর পর সন্তানকে হাতের কাছে পেয়েও তাকে চিনতে না পেরে এবং সেইসাথে লোভের বশবতী হয়ে অন্যায়ের সাথে আপোষ করার কারণেই সেই সন্তানকে আবারো হারিয়ে ফেললেন ওসি মতিন ও তার স্ত্রী।
“পুরুষ এবং প্রজন্ম' গল্পে একজন পুরুষের নিজের মুখে তার বিবাহ পরবর্তী অভিজ্ঞতার কথা ফুটে উঠেছে। তিনি সারা জীবন দেখে এসেছেন তার বাবা প্রায় প্রতিটা দিনই তার মায়ের রান্নার দোষ ধরেন। অথচ তাদের কাছের লোক ও আত্মীয়স্বজনের মতে তার মায়ের হাতের রান্না সবচেয়ে সেরা। তারপরো তরকারিতে লবণ কম/ লবণ বেশি, তেল কম/ তেল বেশি, ঝাল কম/ ঝাল বেশি, এতো মশলা কেন তরকারিতে? গাঁজা খেয়ে রাঁধতে বসো’ এসবই ছিল তার বাবার নিত্যদিনের অভিযোগ। তার মা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতেন আর রাঁধতেন। পরে আবার সব ভুলে গিয়ে হাসিমুখে সংসারটাকে আগলে রাখতেন। তখন থেকেই গল্পের সেই নায়কের চিন্তাধারা ছিল যে সে অমনটি হবে না। তাই বিয়ের পর তার স্ত্রী রোশনি যখন প্রথম রান্না করলো তখন সেই রান্নাতে লবণ-মরিচ বেশি থাকলেও তা খেয়ে সে তার স্ত্রীর রান্নার প্রশংসা করলো। কোন খুঁত ধরলো না। আবার একই সাথে সে তার মাকে সতর্ক করে দিলো এই রান্না যেন তার বাবার সামনে পরিবেশন করা না হয় এবং সেই সাথে এটাও বললো তার স্ত্রী পরের বার রান্না করার সময় তার মা যেন কিছুটা শিখিয়ে পড়িয়ে দেন। এতে তার মা খুশি হয়ে বললেন, 'আমি গর্বিত এবং আনন্দিত যে আমি অমন কাপুরুষ জন্ম দেইনি যে কি না সামান্য রান্নার একটু আধটু ভুলেও ঘরের বউকে যা তা বলে নিজের চরম হীনতার পরিচয় দেয়। আমি পুরুষ জন্ম দিয়েছি। I am proud of you, একজন বাবা তার ছেলের জন্যে যে শিক্ষাটা রেখে যেতে পারেননি ছেলে তার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সেই শিক্ষাটাই রেখে যাবে বলে ঠিক করলো। এটাই ছিল এই গল্পের মোরাল। গল্পের শেষ দৃশ্যটা বেশ রোমান্টিক। দুপুরের খাওয়া শেষ করে নায়ক বেলকনিতে এসে বসেছে। একটু পর তার স্ত্রীও তার পেছনে এসে দাঁড়ালো। তখন সে পেছন ফিরে তার স্ত্রীর দিকে না তাকিয়ে সামনে তাকিয়েই চোখ বন্ধ করে আস্তে করে বললো, ''I love you, Rashni' তার বউয়ের গায়ের রং কালো, কিন্তু এই কালো রং-ই তাকে মুগ্ধতায় স্তব্ধ করে দিতো। তার বউয়ের রান্নার হাত ভালো না। তবে সেজন্য সে তার বাবার পথ অনুসরণ করে বউকে গালাগালি করেনি, বরং কিছুদিন ট্রেনিং নিলে ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে এই ছিল তার বিশ্বাস।
‘তুমিটা কেমন’ এই গল্পটি একটি বিরহের গল্প। ‘তুমিটা কেমন’ একটি প্রেম-বিরহের গল্প যেখানে দেখা যাচ্ছে প্রেমিকা বিয়ের পর প্রেমিকের সাথে যোগাযোগ রাখলেও সংসার-সন্তানের বাস্তবতায় এক সময় প্রেমিককে ভুলে গিয়ে স্বামীকে নিয়ে সুখে সংসার করছে। তবে আসলেই কতটুকু সুখী সে হয়েছে এ ব্যাপারে গল্পের শেষ দৃশ্যে চোখের জল টলমল করে নড়ে ওঠা থেকে মনে সংশয় দেখা দেয়। প্রেমিকা বাস্তবের কাছে পরাজিত হয়ে স্বার্থপর হলেও অবুঝ প্রেমিক তেমনটি হতে পারেনি। সে কাঁটা মেহেদীকে বনসাই মনে করে অর্থাৎ তার প্রিয়া মনে করে এই কাঁটাকে আলিঙ্গন করেই বেঁচে থাকতে চায় বাকিটা জীবন।
‘অদৃষ্ট’ গল্পটি এই বইয়ের সবচেয়ে দীর্ঘ গল্প। একে বড় গল্পও বলা যায়। এটি মোট ৮টি পর্বে সাজানো। এক এতিম বালক অনিমের কাহিনি দিয়ে এই গল্পের সূচনা।
‘বীভৎস সময়’ বইটি প্রকাশ করেছে সিলেটের বাসিয়া প্রকাশনী। মূল্য ১২৫ টাকা। পৃষ্ঠা ৪৮। প্রচ্ছদ শিল্পী অবিনাশ আচার্য। প্রকাশকাল অমর একুশে বইমেলা ২০১৯।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT