উপ সম্পাদকীয়

খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ

মো: আব্দুল ওদুদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৯-২০১৯ ইং ০০:৪০:১৯ | সংবাদটি ৯২ বার পঠিত

সমগ্র বাজার ভেজালে সয়লাভ। নির্ভেজাল কোন কিছু পাওয়া যেন দুষ্কর হয়ে উঠেছে। যেকোন কিছুর একটা সীমা থাকে। ভেজাল কিন্তু সর্বাবস্থায় সব সীমা অতিক্রম করে দুর্দমনীয় হয়ে উঠেছে। তাই দেশের সর্বশ্রেণীর মানুষ ভেজালের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন। খাঁটি জিনিস থেকে বঞ্চিত মানুষজন ভেজালের এই দুরূহ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক কঠোর আইনি ব্যবস্থার দিকে সদা সর্বদা তাকিয়ে আছেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
বর্তমানে দিন দিন ভেজালের রাজত্বের ব্যাপকতা আরও দুর্দান্ত প্রতাপে এগিয়ে চলছে। যার প্রতাপে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্ত গরীবসহ সর্বশ্রেণীর মানুষ নিদারুনভাবে অসহায়। মানুষ মনে করে সবকিছুতেই ভেজাল। ভেজাল ছাড়া কিছু নেই। রাজধানী সহ বড় বড় শহরের সর্বাধুনিক হোটেল ও রেস্তোরাগুলিও ভেজালের জালে আবদ্ধ। আর দেশের সর্বত্র ছোট বড় হোটেলগুলিও ভেজালে সয়লাব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যখন হোটেলগুলিতে অভিযান পরিচালনা করেন তখন প্রায় টিভি চ্যানেলগুলো উপস্থিত থেকে প্রচার করেছে কিভাবে খাবারের হোটেলগুলো আমাদের কাছে বিক্রি করছে ভেজাল আর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর খাবার। পাশাপাশি দেশের সংবাদপত্রগুলিতে নিয়মিত এই সমস্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়ে আসছে। রাজধানীতে প্রতিদিন হাজার হাজার মরা মুরগীর অধিকাংশ চলে যায় খাবার হোটেলগুলোতে। এ পর্যন্ত রাজধানীর সিটি কর্পোরেশনের ডাস্টবিন বা অন্য কোথাও কোনো মরা মুরগী পাওয়া যায়নি। দেশের সবশহর বাজারগুলিতে একই অবস্থা বিরাজমান।
কিছুদিন পূর্বে ঢাকার তেজগাঁও হিমাগারে পাওয়া যায় শত শত টন পঁচা গরুর মাংস। কিন্তু আমরা আধুনিক ভোক্তারা সরল বিশ্বাসে রেস্তোরা থেকে খাচ্ছি গ্রিল, রোস্ট, বিফ, ফেলে দেওয়ার উপযোগী মরা মুরগী আর পঁচা গরুর মাংস খেয়ে আমাদের পাকস্থলীকে ধ্বংস করে ফেলছি। স্বাবলম্বী ভোক্তারা পণ্য কিনছেন বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে। তাদের অনেকেই জানেন না যে, ঐ সমস্ত নামী দামী প্রতিষ্ঠান বিক্রি করছে পঁচা মাংস, ফরমালিনের মাছ, বিষাক্ত মেলামিন মেশানো দুধ। যে ফরমালিন তৈরি হচ্ছে মৃত মানুষের দেহকে সংরক্ষণ করার জন্য আমরা সেই ফরমালিন মেশানো মাছ, মাংস, দুধ সহ বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী নিরুপায় হয়ে খেয়ে চলছি। আর ধীরে ধীরে চলছি মৃত্যুর দিকে। খাদ্য সামগ্রীতে ভেজাল মিশানোকারীরা এতই নিষ্ঠুর হয়েছে যে, ঢাকার সাভার সহ বিভিন্ন জায়গায় পচা গরুর মাংসে লাল রং মিশিয়ে বিক্রি করছে।
সাভারে এই সমস্ত ব্যবসায়ীরা হাতে নাতে ধরাও পড়েছে। এমনকি টমেটো ও পঁচা কুমড়ায় কাপড়ের ও কাঠের রং মিশিয়ে খাবারের ‘সস’ বানানো হচ্ছে। আদিকাল থেকে প্রচলিত আছে, ‘আমরা মাছে ভাতে বাঙালি’। সেই মাছে ভাতে ভেজালের খাবার আমাদের প্রত্যেকদিনের খাবার হয়ে গেছে। মাত্রাধিক মেলামিন মেশানো গুঁড়ো দুধ শিশুদেরকে আমরা খাওয়ানোর ফলে তাদেরকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি। বাজারে এমন কোনো ফল নেই যাতে ফরমালিন সহ বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে না। গত মে মাসে ঢাকার মীরপুরের বিভিন্ন আড়ত হতে ভ্রাম্যমান আদালত ফরমালিনসহ বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে কাঁচামাল পাঁকিয়ে বিক্রি করার দায়ে প্রায় ৮০ হাজার কেজি আম জব্দ করে ধ্বংস করেছেন। প্রায় সব ধরনের খাবার সামগ্রীতে ভেজাল থাকায় মানুষের রোগ ব্যাধি বাড়াটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক। অর্থাৎ খাদ্যে ভেজাল মানুষের জীবনকে ধ্বংস করার একটি ব্যবসা যা ভোক্তাদের চির রোগী করছে। ভেজাল খাবার গ্রহণ করায় দেশে গ্যাস্টিক, আলসার, ডায়বেটিকস, কিডনী, হৃদরোগ, জন্ডিস, ক্যান্সার সহ বিভিন্ন রোগে মানুষ ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন। দুঃখজনক হলেও বাস্তব সত্য যে, রাজধানী সহ সারাদেশে ভেজাল ও মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধের বিক্রি ও মজুদ ব্যাপকভাবে চলছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে শুধু ঢাকা মহানগরীতেই ৯৩ ভাগ ঔষধের দোকানে ভেজাল ও মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ রয়েছে। তাতে বুঝা যায় যে, সারাদেশের ফার্মেসীগুলোতে বিপুল পরিমাণ ভেজাল ও মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ রয়েছে।
গত ১৭ই জুন ঢাকার পূর্ব জুরাইনের একটি ঔষধ কারখানায় র‌্যাব অভিযান চালিয়ে অবৈধ ঔষধ মজুদ করার কারণে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা সহ কারখানা জব্দ করেছে। রোগীরা ভেজাল ও মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ ব্যবহার করায় রোগ ভাল হওয়াতো দূরের কথা বরং এই সমস্ত ঔষধ খেয়ে রোগীরা মৃত্যুর দিকে পতিত হচ্ছেন। হাতুড়ে এবং স্বশিক্ষিত চিকিৎসকরা ঢালাওভাবে এন্টিবায়োটিক ঔষধ দিচ্ছেন। ফার্মেসীগুলোর ঔষধ বিক্রেতারা সব সময় রোগীদেরকে ডাক্তাদের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই এন্টিবায়োটিক ঔষধ দিয়ে থাকেন। মূলত ভেজাল খাবারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আর ভেজাল চিকিৎসায় এই দেশ কদর্য হয়ে যাবে একথা কেউ এভাবে না ভাবলেও ভেজালের দৌরাত্ম অস্বাভাবিক গতিতে বাধাহীনভাবে চলছে। ভেজালের দূর্দান্ত গতি লাগামহীন চলায় সমাজ তথা দেশে একটা নৈরাজ্যকর পরিবেশ ও পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত নির্মম ও নিষ্ঠুর। আমাদের দেশের এ পরিস্থিতি এত নির্মম যে, অসৎ অতি মুনাফালোভীরা ব্যবসার নামে জুলুম করে যাচ্ছে এবং তারা যা খুশি তাই-ই করছে। আমাদের দেশে এ সংক্রান্ত আইন-কানুন থাকলেও সেটা সময়ের প্রয়োজনে অত্যন্ত দুর্বল, আইনে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংশোধন ও সংযোজন প্রয়োজন। আমাদের লোকবল ও প্রশাসন কাঠামো ও আইন কাঠামো এত দুর্বল যে, মুনাফাখোররা বেশি অংশে ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। ভেজাল বিরোধী অভিযান বর্তমান সরকারের আমলে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপকভাবে শুরু হলেও সারাদেশে কিন্তু ভেজাল বিরোধী অভিযান ততটা সক্রিয় নয়।
হাইকোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ৫২টি পণ্য এখনও রাজধানী সহ জেলা, উপজেলা শহরে ও গ্রামের বাজারগুলোতে বিক্রির কার্যক্রম অব্যাহত আছে। সাধারণ জনগণের টাকায় যে, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বেতন পান সেই কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা যদি মুনাফাখোর অসৎ ভেজালদানকারী ব্যবসায়ীদের নিকট হতে বখরা বা উৎকোচ গ্রহণ করে সাহায্য সহযোগিতা করেন তাহলে ভেজাল বিরোধী অভিযান কখনও পুরোপুরি সফল হবে না। এর সমাধান না করলে সমগ্র জাতিরই অপমৃত্যু ঘটবে। এমতাবস্থায় নতুন আইন করে ভেজালের ধরণ অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর করার ব্যবস্থা নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনে যদি সৎ খাঁটি মানুষ থাকেন এবং সঠিকভাবে কাজ করেন তাহলে মাননীয় সফল প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য নেতৃত্বে ও নির্দেশে অবশ্যই বাংলাদেশ থেকে একদিন না একদিন ভেজাল বিরোধী অভিযানের মাধ্যমে খাদ্য সামগ্রী ভেজাল মুক্ত হবে।
লেখক : প্রবীণ রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শব্দের অত্যাচারে নিঃশব্দ ক্ষতি
  • এমন মৃত্যু কাম্য নয়
  • কোন সভ্যতায় আমরা!
  • দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ রোল মডেল
  • বৃক্ষ নিধন রোধে চাই জনসচেতনতা
  • আফ্রিকা-চীনের দ্বিতীয় মহাদেশ
  • শিশুরা নিরাপদ কোথায়?
  • অপেক্ষার অশেষ প্রহরগুলি
  • ঘুষ-জুয়া বন্ধে কঠোর হোন
  • মা ইলিশ রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে হবে
  • ছাত্ররাজনীতি হোক কল্যাণ ও বিকাশের
  • পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক গবেষক আতিকুর রহমান
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • ‘জঙ্গি’ অপবাদ প্রসঙ্গে
  • ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে
  • মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই বদলে দেবে বাংলাদেশ
  • Developed by: Sparkle IT