উপ সম্পাদকীয়

মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার

এম আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৯-২০১৯ ইং ০০:৪২:২৬ | সংবাদটি ১২৭ বার পঠিত

প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াসহ অজ¯্র মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে লোককে প্রভাবিত করলেও এর বিরুদ্ধে কোন প্রতিকার হচ্ছে কিনা তা অবশ্য মিডিয়াগুলোতে আসছেনা বললেই চলে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন হচ্ছে ‘প্রখ্যাত জ্যোতিষী লিটন দেওয়ান ..... আপনাকে দেখামাত্র আপনার অতীত বর্তমান ভবিষ্যত বলে দিতে পারেন ..... ছবিতে দেখা যায় চিত্র জগতের নামী দামী সেলিব্রেটিদের উপস্থিতি এবং লিটন দেওয়ান এর পক্ষে তাদের ভাষণ। কোথায় কিভাবে চেম্বার খুলে উনি তদবির করবেন তাও স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়। ঠিক একইভাবে স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকাগুলোতে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিভিন্ন দেশে স্টুডেন্ট ভিসা ওয়ার্ক পারমিট ভিসা ইত্যাদি প্রসেসের সুযোগ সুবিধার কথা ফলাও করে প্রচার করছে। প্রকৃতপক্ষে এদের বেশিরভাগই প্রতারক এবং ফাঁদ পেতে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছে।
আমাদের দেশে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। বেকারদের প্রতি দেশের প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি নমনীয় থাকা যেখানে উচিত সেখানে বেকাররাই নিষ্পেষণের শিকার হচ্ছে বেশি। এখানে ইন্টারভিউ, ওখানে ইন্টারভিউ, ওখানে পরীক্ষা সিভি জমা, যাতায়াত ইত্যাদি পারপাসে দেখা যায় একজন বেকারের অনেক টাকার প্রয়োজন। একটা উদাহরণ দেই-বর্তমানে বেসরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষকতার চাকরি পেতে হলে নিবন্ধন পরীক্ষা পাশ করতে হয়। অথচ যারা নিবন্ধন পরীক্ষা দিবে তারা পরীক্ষা দিতে দিতেই শিক্ষা জীবন শেষ করেছে এবং সার্টিফিকেট অর্জন করেছে। নিবন্ধনের জন্য যে সকল সার্টিফিকেট দরকার তা তারা অর্জন করেন বিধায় নিবন্ধনে অংশ নিতে পারেন। অথচ নিবন্ধন পাশ করার পর কি চাকরি মিলছে? না-কখনওই নয়। যদি দেখা যেত যে নিবন্ধন পাশের পর সিরিয়েলি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রভাইড করা হচ্ছে তাহলে এই পরীক্ষাটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু না। নিবন্ধিত হওয়ার পর যখন কোন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক লাগবে তখন আবারও ইন্টারভিউ দিতে হবে। ইন্টারভিউ দিয়ে যদি পাশ করে তাহলেই চাকরি। অন্যথায় নয়। তাহলে সার্টিফিকেট ওকে দেয়া হলো কেন? নিবন্ধন পরীক্ষা দিতে গিয়েও খরচাপাতির সম্মুখীন হতে হয়। কোন প্রতিষ্ঠান যদি লোক নেয় সে সেটা পত্র-পত্রিকায় দেয়। সেখানে সে অংশগ্রহণ করুক। পাশ করলে সে চাকরি পাবে না হলে নেই। এভাবে নিবন্ধনের বেড়াজালে তাকে আবদ্ধ করা হলো কেন?
এভাবে ইন্টারভিউয়ের পরে ইন্টারভিউ দিতে দিতে যখন বেকাররা হতাশ হয়ে পড়ে। বি.এ, এম.এ পাশ করে যখন নিজের পেটের ভাত সংকুলান করতে পারছেনা তখন-সে তার পরিবারের চোখে একটা অপদার্থ হয়ে দেখা দেয়। পাশের বাড়ির ছেলেরা যারা শিক্ষিত নয় অথচ কামলা খেটে ৩০০/৫০০ আয় করে মা বাবার হাতে দিতে পারছে অথচ উচ্চ শিক্ষিত হয়েও সে যখন পরিবারের বোঝাই থেকে যায় তখন সে যে কোনভাবে বিদেশে পাড়ি জমাতে চায়। উদ্দেশ্য একটাই অন্তত এ বেকারের মুখতো কেউ দেখবে না।
এই সুযোগে আমাদের দেশের প্রতারকচক্র জাল পেতে বসে আছে। অলিতে গলিতে ট্রাভেলস ট্যুরস ইত্যাদি খুলে দেদারছে প্রতারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ দুদক-প্রশাসন নিরব!
আমার এক বন্ধুর ছেলে স্টুডেন্ট ভিসায় বিদেশ যাবে। তিনি একটি ফার্মের শরণাপন্ন হলেন। ফার্ম বলল ঠিক আছে। কাগজপত্র দেন। ঠিক করা হলো হাঙ্গেরিতে স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করা হবে। পাসপোর্ট, পুলিশ ভেরিফিকেশন, সার্টিফিকেট, এটাস্টেশন, ইন্ডিয়ান ভিসা লাগিয়ে ইন্ডিয়ায় পাঠানো, ইন্ডিয়ায় থাকা-খাওয়া যাওয়া আসা ইত্যাদি খরচ স্টুডেন্ট এর বাবা বহন করবেন। আর ফার্ম শুধু হাঙ্গেরীর অ্যাম্বেসির ফি দেবে আর ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট বানিয়ে দেবে। আট লক্ষ টাকা ফার্মকে দিতে হবে। এর মধ্যে ৫৫০ হাজার টাকা হাঙ্গেরীর কলেজে আগেই পাঠাতে হবে। ভিসা হলে বাকী টাকা ফার্মকে দিতে হবে। যাই হউক-কথামত তিনি সমস্ত কিছুর আয়োজন করলেন।
আমার বন্ধুটি তেমনটা বুঝেন না বলে আমাকে সঙ্গে রাখলেন। ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসিতে ভিসার আবেদন দালাল মারফতই করা হলো। কারণ ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসী আর আগের মত নেই। নরমাল আবেদন করলে এক মাসেও ভিসা লাগে না। আর দালালের কাছে তিনগুণ টাকা দিলে এক সপ্তাহে হয়ে যায়। যাই হউক ইন্ডিয়ানদের গরম ভাবের কারণ দু’মাস পরে বুঝলাম। যখন ঐ স্টুডেন্ট ছেলেটি ভিসা না পেয়ে বাড়িতে আসল এবং দিল্লীর ভয়াবহ বর্ণনা দিল।
দিল্লীর অ্যাম্বেসি পাড়া থেকে বেশ দূরে ট্যাক্সিতে ১০০ রূপীর ভাড়া সেখানে বাঙালি স্টুডেন্টরা সস্তা হোটেলে অবস্থান নেয়। হাজার হাজার স্টুডেন্ট প্রায় ১০০টা হোটেল ভাড়া করে আছে। এরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেমন-পোলান্ড, হাঙ্গেরী, মালটা, ডুমিনিকা, ইউক্রেন, এস্তোনিয়া, লিথুনিয়া এভাবে অনেক দেশের অ্যাম্বেসী ফেইস করছে। ১০০ ভাগের দুই ভাগ বা তিন ভাগ ভিসা হচ্ছে। মিনিমাম ৭০ থেকে ৮০ হাজার ভিসা প্রার্থী অনবরত অবস্থান করছে দিল্লীতে। এদের যাতায়াত হোটেল ভাড়া, খানাপিনা ইত্যাদি বাবদ লক্ষ লক্ষ ডলার ব্যয় হচ্ছে সেখানে। অথচ যদি বাংলাদেশে এসব দেশের অ্যাম্বেসি থাকত তাহলে আমাদের মত গরীব মানুষের এত টাকা অপচয় হতো না। একজন স্টুডেন্টকে ২৫ হতে ৫০ দিন পর্যন্ত সেখানে থাকতে হয়। গড়ে যদি ৩৭ দিন হয় তাহলে হিসাবে দেখা যায় হোটেল ভাড়া রোজ ৩০০ রূপী, খানাপিনা ১০০ রূপী, অর্থাৎ ৪০০৩৭ = ১৪,৮০০ বা ১৫০০০ রুপী বা ২০,০০০ টাকা যাতায়াত ৪০,০০০ টাকা অর্থাৎ একজন স্টুডেন্ট এর পেছনে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। তাহলে ৮০,০০০ স্টুডেন্ট  ৭০,০০০ টাকা = ৫৬০,০০,০০,০০০ টাকা প্রতি সাঁইত্রিশ দিনে খরচ হচ্ছে। কাজেই ইন্ডিয়ানরা গরম হওয়ার পিছনে এটা একটা বড় কারণ।
দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার কারণে দেশের মেধাবী তরুণরা শুধু নিজেরা হতাশ নয়। পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারেই হতাশা বিরাজ করছে। দেশে তো নয়ই বিদেশেরও কোন দেশে জনসম্পদ রপ্তানির বিষয়টিও নিশ্চিত হচ্ছে না। যদি এভাবে স্বউদ্যোগে আমাদের ছেলেরা পিতা-মাতার ভিটেমাটি সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে বিদেশমুখী হয় তাহলে দেশে কি ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে তা ভেবে দেখছেন কি?
এছাড়া রয়েছে আরেকটি খাত। সেটি হচ্ছে চিকিৎসা খাত। দেশের নামী দামী মানুষেরা চেক-আপের নামে চট করে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, আমেরিকা, ইংল্যান্ড ইত্যাদি দেশে ছুটছেন চিকিৎসার জন্য। ফলে সাধারণ জনগণ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। যাদের টাকা আছে তারা ভারতের মাদ্রাজ, চেন্নাই দিল্লীসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসার নামে ছুটছে। ফলে ইন্ডিয়ানরা আরো গরম হচ্ছে। ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসিতে ভিসা প্রার্থী বাড়ছে। আর জরুরি ভিত্তিতে ভিসা পেতে তো বুঝতেই পারছেন ....।
আমাদের দেশের অনেক ডাক্তারদেরও রয়েছে হামবড়া ভাব। রোগীদের সাথে এরা আন্তরিক নয়। ডাক্তার মানেই ভীতির জায়গা। তাই পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি রোগীর প্রতি একটু আন্তরিক হলে আমার মনে হয় রোগীদের বিদেশগামীতা কমবে। পাশাপাশি রোগীদের হাসিমুখে বরণ করা তাদের অসুবিধাগুলো আন্তরিকভাবে শোনা এটাও তাদের উপর আস্থা ফেরাতে পারে। অবশ্য বর্তমানে অনেক ডাক্তার হাসিমুখে প্রাণ খুলে রোগীদের প্রতি যতœবান হচ্ছেন। এটা আমি নিজেও দেখেছি। এটা আমাদের জন্য একটা আশার বার্তা।
সবমিলিয়ে অর্থ পাচারের বিষয়টি আমাদের নিজেদের সৃষ্টি। যারা বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্বশীল চেয়ারে বসা তাদের আন্তরিকতার ছোয়া থাকলে আজ মহিলাদের বিদেশে গিয়ে যৌন দাসী হতে হতো না। বিশ্বনাথের কারিকোণায় ফরীদ উদ্দীনকে ইউক্রেনের জঙ্গলে প্রাণ দিতে হতো না। দেশের অজ¯্র মানুষকে ভূমধ্যসাগরে প্রাণ দিতে হতো না। তাই পাতাল ট্রেন বা স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠাই নয়-দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করুন।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শব্দের অত্যাচারে নিঃশব্দ ক্ষতি
  • এমন মৃত্যু কাম্য নয়
  • কোন সভ্যতায় আমরা!
  • দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ রোল মডেল
  • বৃক্ষ নিধন রোধে চাই জনসচেতনতা
  • আফ্রিকা-চীনের দ্বিতীয় মহাদেশ
  • শিশুরা নিরাপদ কোথায়?
  • অপেক্ষার অশেষ প্রহরগুলি
  • ঘুষ-জুয়া বন্ধে কঠোর হোন
  • মা ইলিশ রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে হবে
  • ছাত্ররাজনীতি হোক কল্যাণ ও বিকাশের
  • পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক গবেষক আতিকুর রহমান
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • ‘জঙ্গি’ অপবাদ প্রসঙ্গে
  • ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে
  • মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই বদলে দেবে বাংলাদেশ
  • Developed by: Sparkle IT