শিশু মেলা

রাশেদ লন্ডনী জুনিয়র

এম আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৯-২০১৯ ইং ০১:০৩:২৮ | সংবাদটি ১৭১ বার পঠিত

রাশেদ এসেছে লন্ডন থেকে। এসেছে ওর বাবা-মা, ভাই-বোন। সবার বড় সে। বয়স ন’বছর। শান্ত সুবোধ চেহারা। বয়সের তুলনায় অনেক বেশি বাড় বেড়েছে। যেন হাতির বাচ্চা। ওজন প্রায় ৮০ কেজি। উচ্চতা পাঁচ ফুট। ও হাঁটলে যেন মাটি কাঁপে। আর কাঁপে মাংস পিন্ড। উরু, বুক, নিতম্ব হাঁটার সময় ঢেউ খেলে যায়। খেলে বাচ্চাদের সাথে। ভয় হয় যদি কারো বাচ্চার উপর পড়ে যায় তো গেছে। জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। সে সরতে সরতেই রে জান আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।
ও শান্ত সুবোধ মনে হলেও দুষ্টের হাড্ডি। সব সময় একটা না একটা খেলা নিয়েই থাকে। বল খেলে, হাডুডু খেলে। কুস্তিও খেলতে চায়। ওর সমবয়সী ছেলে মেয়েদের তাড়া করে। ওরা ওর ভয়ে দৌড়ায়। ও মাগো। ও আল্লাহ। যেন বাঁচাও। বাঁচাও চিৎকার কানে আসে। ও ধরলে আর রেহাই নেই। কোনটাকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যায়। কোনটাকে মাটিতে ফেলে উপরে বসতে চেষ্টা করে কিন্তু উপরে বসার আগেই বাঙালি পিচ্চিরা গড়িয়ে দূরে সরে যায়। ও কিন্তু নাছোড়বান্দা। বসবে তো বসবেই। ধরেও আটকানো যায় না। যেই অন্য ছেলের উপরে বসল অমিন পড়ল গিয়ে মাটিতে। যেন ধপাস করে পড়ল কলা গাছ। অন্য সবাই হাত তালি দিচ্ছে আর হাসছে। সে লজ্জা পায় না। গাড়াগড়ি দিয়ে আবার ওঠে। গায়ে ধুলোবালি লাগে। এদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। দরকার হলে কাঁদা পানিতেও সে নামতে পারে। এমন কি গড়াগড়িও দিতে পারে। ওর মা ও দেখতে অনেকটা মাদী হাতির মত। ভূড়ি অসম্ভব নিচে নেমে গেছে। চেয়ারে বসলে ভূড়ি হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছে। দাঁড়ালে দু’হাত দিয়ে পেট বেড় পায় না। দু’হাতের আঙ্গুল যেন দুই কাদি সবরি কলা। হাতের চেটো মাংসল। উচ্চতায় তুলনায় মাঝখানের ঘের মাপ বেশীই হবে। সবসময় সেজে গুজে লিপস্টিক মেখে ঠোট লাল করে হাঁটে। শাড়িতে কুলোয় না। তাই অর্ডারি মেক্সিই ভরসা।
মাঝে মধ্যে ওর মা উঁচু জুতোতে খট খট করে বেরোয়, হেই রাশেদ, নটি করে না নটি করে না বলে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। তখন ছিল বৈশাখ মাস। শবে মাত্র বৃষ্টি বাদল শুরু হয়েছে। গ্রামের বাড়ির উঠোনের মাটি বৃষ্টিতে ভিজে নরম হয়েছে। রাশেদ বারান্দা থেকে লাফ দিয়ে পড়ে উঠোনে, পা দেবে যায় নরম মাটিতে। হো হো করে হাসে। পাথের ছাপ মাপে সে। ওর সঙ্গীদের ডাকে। হেই আও, আও See, See How many গর্ত হইছে? রাশেদের পাঁচ ফুফুদের ঘরের ১৫ ভাই বোন এসেছে। কেউ বড় কেউ ছোট। সবাই দেখছে ওর কান্ড কারখানা। হাঁসতে হাঁসতে সবাই খুন। সবার হাসি দেখে সে আরও উৎসাহিত হয়। উঠোনে দৌঁড় দিতে গিয়ে পা পিছলে চিৎ হয়ে পড়ে সে। চতুর্দিকে হাসির রোল ওঠল। লন্ডনী শর্ট প্যান্ট আর সাদা টিস্যু গেঞ্জি পানি কাদায় একাকার। ওর বাবা ছুটে এলেন। বাঙালি, কিন্তু কেনিয়ান চেহারা। মাথায় কুকড়ানো চুল। উল্টো করে আঁচড়ানো। ঘাড়ের উপরের চুলগুলো কখনোই বাধ মানে না। কুকড়ানোই থাকে। বেঁটে খাটো মনে হয় পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি হবে। সেন্ডেল খুলে উঠোনে নামলেন। রাশেদের হাত ধরে দিলেন টান। উঠাতে তো পারলই না। বরং উনার পা গেল দেবে। যাই হোক কষ্টে সৃষ্টে ওকে টেনে তুলে নিয়ে গেলেন বাথ রুমে। দেশে আসবে বলে ওদের জন্য বাথরুম নতুন করে বানানো হয়েছে। শাওয়ার ছেড়ে গোসল করতে লাগলো রাশেদ।
ওর বাবা গেঞ্জি, শার্ট প্যান্ট খুলে গোসল করালেন পানি পড়ছে দেখে সে কি নাকচ। বাথ রুমে ধুম ধুম শব্দ হচ্ছে। রাশেদের বাবা চিৎকার করে ধমক দেয়। আর Don’t do this, don’t do this বলে। কিছু শোনে না সে। যাই হোক পনের মিনিট বাথ শেষ করে বেরোল রাশেদ। গায়ে একটুও কাপড় নেই। এতে সে লজ্জিত নয়। অর্থাৎ লজ্জার অনুভূতি নেই তার। বাঙালি সবাই দেখছে আর হাসছে। বয়সের তুলনায় অধিক বেড়ে ওঠা শরীর তুলতুলে বিড়ালের মত। রাশেদের মা আরেক জোড়া শর্ট প্যান্ট আর গেঞ্জি দিলেন স্বামীর হাতে। উনি জোর করে ওকে পরিয়ে দিলেন। আর বললেন Don’t go out side, Ok? রাশেদ বলল Ok papa.
দুপুরের রান্না হচ্ছিল কিচেন রুমে। ওর দাদী ও ফুফুরা রান্না বান্নায় মত্ত। কেউ তরকারি কুটছে, কেউ মাছ আর কেউ মুরগী। ওর বড় ফুফু বললেন কিরে রাশেদ কি খেতে ভালবাসিস? ও বলল মুরগীর ঠ্যাং।
রান্না ঘরে উপস্থিত ছোট বড় সবাই হেসে উঠল। রাশেদ বলল Why are you laughing? সানি বলল- মুরগীর ঠ্যাং পুরুষরা খায় না। রাশেদ বলল, Why?
-Becuase, মুরগীর ঠ্যাং থেকে একটা সমস্যা হয়।
-কি সমস্যা? What’s the problem?
-এই ধরো তুমি কোন মারামারিতে গেলে (Fighting আর কি?)
-তখন তোমার পা কাঁপবে।
-রাশেদ আবার উচ্চারণ করে পা কাঁপবে, মানে (leg treampling)
-সানি বলল- হ্যাঁ।
রাশেদ, পা কাঁপবে, পা কাঁপবে এ রকম উচ্চারণ করে ওর দুই পা কাঁপানো শুরু করল। এই দ্যাক- ঝবব বলে সবার নজর ওর দিকে আকর্ষণ করল। দুই পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে কাঁপাতে থাকলো। এটা দেখে সবাই হাসতে হাসতে একজন আরেক জনের উপর পড়তে থাকলো। অনেকক্ষণ এরকম করতে থামলো রাশেদ।
এই ফাঁকে মেঝো ফুফু বললেন, কিরে রাশেদ? ঠ্যাং খাবে? ও বলল না ফুফু ঠ্যাং খাবো না। তাহলে কি খাবে?
-মুরগীর ভিতরে কি থাকে যেন heart, kidney? প্রশ্নবোধক চোখে তাকানো মেঝে ফুফুর দিকে।-মেঝো ফুফু বললেন- কলিজা? হ্যাঁ হ্যাঁ কলিজা খাব।
সোনিয়া বলে উঠল আরে পাগল। পুরুষরা কলিজা খায় নাকি? ও প্রশ্ন করে খাইলে কি অয়? কলিজা কাঁপে heart trempling?
সোনিয়া বলল ঠিকই বলেছ। মারামারিতে গেলে সাহস পারে না। তুমি ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে।
রাশেদ একটু চিন্তা করে বলল- তাইলে heart কাঁপে কি করে? বলেই সে তার বুক উপর নিচ করতে শুরু করল। সবাই এসব কান্ড দেখে অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ল। হঠাৎ বুক উঠানামা বন্ধ করে রাশেদ বলল এখন যদি বলি I like head. এখন তোমরা বলবে পুরুষরা মাথা খায় না। মারামারিতে গেলে মাথা কাঁপবে। Head tremplingবলেই সে মাথা কাঁপাতে শুরু করল। আর বলল-এই দেখ See. আরেক দফা হাসির রোল উঠল কিচেনে।
রাশেদের বাবা-মা, ভাই-বোন দেশে আসার আরেকটি উদ্দেশ্য আছে। সেটি হল রাশেদের খৎনা দেয়া। দাদা দাদী সখ করে অনুষ্ঠান করবেন। সবাইকে দাওয়াত দিবেন আনন্দ ফুর্তি হবে। তাই কিছু দিনের মধ্যেই রাশেদের সাথে জাহাঙ্গীর, সানি, ফাহিম এদের সবাইকে খৎনা দেয়া হবে। নির্ধারিত দিনে বাড়িতে ডাক্তার এনে খৎনা দেয়া হল। বাঙালি ছেলেদের খৎনা দিতে অসুবিধা হলো না। কিন্তু যতসব সমস্যা হল রাশেদকে নিয়ে। ওর ছোট্ট লিঙ্গটির অবস্থান বর্ধিত মাংসের ভিতর। কোন রকম টেনে টুনে ডাক্তার প্রায় ঘন্টা খানেক চেষ্টা তদবির করে খৎনা দিলেন। এনেস্তেশিয়ার বিষক্রিয়া যখন শেষ হয়ে গেল তখন ওর চিৎকার দেখে কে? সারা বাড়ি মাথায় তুলেছে। ওর অশান্তি আর চিৎকারে ওর বাবা-মা, ফুফা-ফুফু, দাদা-দাদী সবাই অস্থির হয়ে পড়লেন। কেউ হাত পাখা এনে বাতাস করেন। কেউ মাথায় পানি দেন, কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। ওর শরীরে কোন কাপড় নেই। অনেকক্ষণ চিৎকার চেচামেচির পর ঘুমিয়ে পড়ল রাশেদ। একটা মশারি টাঙ্গিয়ে ওকে শুইয়ে রাখা হলো। শেষ রাতে উঠে আবারও শুরু করল চিৎকার। সবাই ঘুম থেকে উঠে এসে ওকে সান্ত¦না দিতে লাগল। বাতাস করল, মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, মাথায় পানি দিল। রাশেদ একটু শান্ত হয়ে বড় ফুফুকে জিজ্ঞেস করল ফুফু আমাকে কাটল কেন? Why, Dr. cut my penis? বড় ফুফু বললেন-তুমি যে নটি কর, তাই কেটেছে। তুমি Naughty করা ছেড়ে দাও, আর ডাক্তার আসবে না। রাশেদ বলল- is it? ফুফু বললেন- হ্যাঁ।
‘আচ্ছা ফুফু আমি আর Naughty করব না। আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি সবার কথা শুনবো।
পরদিন থেকে শান্ত হয়ে গেল রাশেদ। যখনই চিৎকার চেচামেচি শুরু করতে চায় তখনই বলা হয় হেই রাশেদ ডাক্তার আসবে। আবারও তোমাকে কাটবে। রাশেদ নীরব হয়ে যায়। No, no, Don’t call doctor। আমি আর Naughty করবো না। বলেই সে মশারির ভিতর ঘুমিয়ে পড়ে।
এক মাস পর রাশেদ পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলো। ওদের লন্ডনে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
আত্মীয় স্বজনের বাড়ি দাওয়াত খেতে খেতে শেষ করা যাচ্ছে না। রাশেদের বাবা এবার সাত বছর পর দেশে এসেছিলেন। লন্ডনে ফিরে গেলে আর কত বছর পর ফিরবেন তার হদিস নেই। কাজেই প্রতিটি আত্মীয় স্বজন দেখে যাওয়া তার কর্তব্য মনে করেন। বোন ভাগ্নি ওদের দোয়ায়ইতো তিনি লন্ডনের স্থায়ী বাসিন্দা হতে পেরেছেন। পরিবারের বেহাল দশায় তিনিই হাল ধরেছিলেন। পরিবারে আট বোন দুই ভাই আরও আছেন মা-বাবা। রাশেদের বাবা লাহিন আহমদ ভাই-বোনদের সিরিয়েলে তৃতীয়। তবে ভাইদের মধ্যে বড়। কাজেই সংসারের বোঝা বাবার পর্ েতার উপর বর্তায়। লাহিন আহমদের বাবা দেখলেন তার বয়স হয়েছে। সংসারের ঘানি ছেলেকেই টানতে হবে। কাজেই ছেলেকে কোন কাজে না লাগালে সৌদি আরবের রুজিতে আর বেশিদিন চলবে না। হাতে টাকা থাকতে একটা লন্ডনী কন্যার ব্যবস্থা করতে হবে। লন্ডনী কন্যাতো যেই সেই কথা নয়। বিশ ভরি স্বর্ণ, ২০ লক্ষ টাকার কাবিন আর পাঁচ কেদার আউশ জমি ছাড়াতো লন্ডনী কন্যা যোগাড় করা কঠিন। যাই হোক অনেক কষ্টে একজনের সন্ধান পাওয়া গেল। ওর এক বিয়ে হয়েছিল লন্ডনে। সন্তানও একটা হয়েছিল। উনার বডির ঢং, গায়ের রং আর আন সাইজ শেপ এর কারণে ১ম সন্তানের বাবা ফেলে গেছে ওকে। সেকেন্ড ম্যারেজ এর জন্য দেশে নিয়ে এসেছে কনের বাবা। ঘনিষ্ট আত্মীয়ের মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে লাহিন আহমদের বাবা দ্রুত লন্ডনী কন্যার বাবার সাথে যোগাযোগ করলেন। তখন লাহিন আহমদ শবে মাত্র মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছে। অর্থাৎ বয়স কাঁটায় কাঁটায় আঠার। তখন বর ১৮ ও কনের ১৬ বছর হলেই সে বিয়ে বৈধ ছিল। আলাপ আলোচনার পর উপরোক্ত মূল্যে কনের অবস্থা জেনেও, বাচ্চা আছে জেনেও, বয়স সাড়ে উনিশ জেনেও পিছালেন না লাহিনের বাবা। পাসপোর্ট চাই। একটা লাল পাসপোর্ট। যে পাসপোর্ট আরেকটা পাসপোর্টের ঠাঁই করে দেবে লন্ডনে। বিবাহ বন্ধন ছাড়া সে পাসপোর্ট সচরাচর জুটে না।
নির্ধারিত দিনে বিয়ে হয়েছিল ওদের। কনে বিস্তর অভিজ্ঞ। কাজেই কাঁচা বয়সী স্বামীকে নিজের আয়ত্বে নিতে মোটেই বেগ পেতে হল না। অল্প সময়ে ভিসা হলো লাহিন আহমদের। চলে গেলেন লন্ডনে। রেস্টুরেন্টে কাজ নিলেন। কাজ করেন ঠিকই কিন্তু বেতন নেয় স্ত্রী। ঘরের যাবতীয় কাজ কর্মও তাকেই করতে হয়। কাপড় কাঁচা থেকে শুরু করে রান্না বান্নার কাজ পর্যন্ত। আন সাইজ, ভাদাম্যা স্ত্রী শুধু ঘুমায়, টিভি দেখে আর স্বামীর অফের দিন শাড়ি কেনে। একটা শাড়ি এক মাস পরেই ঘরের কোণে ফেলে রাখে। আর কোমরে উঠায় না। আর কোমরই বা কোথায়? যে আস্ত করচ গাছ। কোন রকমে প্যাচ দেয় আর কি। লাহিন আহমদকে সবখানে ব্যবহার করে সে। তবে লাল পাসপোর্টের অনুমতি দেয় না। এক বছর, দুই বছর, তিন বছর যায়, সে চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করে না। এরই মধ্যে দু’সন্তানের জননী হয়েছে আবারও। বছর চারেক পর যখন দেখল যে ওর স্বামী পুরো বশিভূত; কোন উল্টা পাল্টা কিছু করবে না। দ্বিতীয়বার বিবাহ বা এরকম কিছু ঘটাবে না, তখন তাকে অনুমোদন দিয়ে এম্বেসির চিঠির জবাব দিল সে। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে লাহিন আহমদ লন্ডনের মাটিতে ঘাটি গাড়লেন। স্থায়ী বাসিন্দা হলেন তিনি।
লাহিন আহমদ গাড়িতে বসে এসব কথা স্মরণ করতে করতে সেটি পৌঁছে গেল বড় বোনের বাড়িতে। রাশেদও আছে সাথে। গাড়ি থেকে নেমেই দৌড়ে গিয়ে ওর ফুফুকে জড়িয়ে ধরল। ফুফু নাক মুখ চুম্বন করে সবাইকে বসতে দিলেন? লন্ডনী ভাই; ভাইয়ের স্ত্রী, ভাতিজা, ভাতিজী সবার জন্য রান্না বান্না করছেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই কিচেনে ব্যস্ত হলেন বড় ফুফু। এই ফাঁকে রাশেদ এবং ওর ফুফুতো ভাই-বোন গেল পুকুর পাড়ে। গাছের পাকা পেয়ারা দেখে ব্যস্ত হয়ে গেল রাশেদ ওগুলো পাড়বে বলে। কিন্তু সে গাছে চড়তে পারল না। অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হল। ওর এত বড় শরীরের ভার দু’হাত সহ্য করতে পারে না। বারবার হাত ফসকে আসে। অগত্যা সে একটা বাঁশের লম্বা কাঠিতে আকর্ষি বেঁধে ক’টা পাড়লো। গাছের মগডালে একটা টমটসে সাদা পেয়ারা পাড়তে এবার চেষ্টা করছে সে। ইতোমধ্যে এক পশলা বৃষ্টি হওয়ায় পুকুর পাড়ের মাটি হয়েছে বেশ পিচ্ছিল। অসাবধানতা বশতঃ হঠাৎ পা ফসকে পড়ে গেল পুকুরে। পুকুর তখন জলে টইটম্বুর। অঝোর বৃষ্টিতে পুকুর পানিতে ভর ভর। রাশেদ পড়েই পানিতে তলিয়ে গেল। ও সাঁতার জানে না। তাই ভেসে উঠারও সম্ভাবনা নেই। রাশেদের ফুফুতো ভাই-বোন এক সাথে চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে লাগলো। লাহিন আহমদ ও রাশেদের ফুফা দৌড়ে আসলেন। ওরা বলল রাশেদ পানিতে পড়ে গেছে। ওইখানে। লাহিন ও রাশেদের ফুফা লাফ দিয়ে পানিতে পড়লেন। ডুব দিয়ে চারিদিক হাতড়ে রাশেদের সন্ধান পেলেন রাশেদের ফুফা। হাত ধরে টেনে তুললেন তাকে। লাহিন আহমদও সাহায্য করলেন। এত ওজনের ছেলেকে তুলে আনতে অনেক কষ্ট হলো ওদের। রাশেদের হুশ ছিল না। পানি খেয়ে একেবারে ঢোল হয়ে উঠেছে। দু’জনে অনেক টেনে হিচড়ে রাশেদকে পুকুর পারে মাটিতে শুইয়ে পেটে চাপ দিতে লাগলেন লাহিন আহমদ। কয়েকটি চাপ দিতেই মুখ দিয়ে গলগল করে পানি বেরোতে লাগল। একটু পরে শ্বাস নিল রাশেদ। ইতোমধ্যে পুকুর পারে ভীড় জমে উঠেছে। গ্রামের ছেলে বুড়ো-পুরুষ মহিলা সবাই জড়ো হয়েছে সেখানে। শ্বাস নিচ্ছে দেখে রাশেদের ফুফা ভীড় ঠেলে সবাইকে সরালেন। দু’জনে ধরাধরি করে রাশেদকে ঘরে আনলেন। বাথরুমে নিয়ে পানি ঢেলে ওকে পরিষ্কার করে কাপড় পরালেন। একটা খাটে শুইয়ে দিলেন তাকে। একটু অসতর্কতার কারণে আজকের আনন্দটাই মাটি হয়ে গেল। রাশেদের মা, ফুফু কেঁদে কেটে অস্থির। কত বড় একটা বিপদ এই মুহূর্তে সরে গেল। রাশেদের ফুফু মসজিদে শিরনী দিতে মান্নত করলেন। রাশেদের মা হাত তুলে খোদার কাছে ক্ষমা চাইলেন আর শুকরিয়া আদায় করলেন। একটা গরু আল্লাহর ওয়াস্তে দিবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। আল্লাহ যে তার ছেলেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এজন্য বারবার সিজদা করতে লাগলেন। রাশেদের অবস্থা একটু ভাল হলে সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চললেন নিজ বাড়িতে। যে কয়দিন বাড়িতে ছিলেন আর বের হলেন না। আত্মীয় স্বজন এই ঘটনার কথা শুনে সবাই চলে আসলো রাশেদদের বাড়িতে।
আগামীকাল সকাল ছ’টায় ফ্লাইট। লাগেজ বেঁধে প্রস্তুত লাহিন আহমদ। রাশেদ বিদায়ের শেষ রাতে সবাইকে কাছে পেয়ে আবারো পুরনো তরিকায় দুষ্টুমী শুরু করল। একে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া, ওকে কাঁধে করে বয়ে চলা, কারো উপর বসতে যাওয়া, মাথা কাঁপানো, পা কাঁপানো বিভিন্ন অঙ্গ ভঙ্গি করে সবাইকে মাতিয়ে রাখল সে। কিন্তু যাবার বেলায় কান্নাকাটি শুরু করলো। এখানে ওর বয়সী বন্ধুদের সাথে মিশে কেমন মায়া পড়েছে। এদের ফেলে সে কী করে যায়? তবুও অশ্রু ভেজা নয়নে বিদায় চায় ওদের কাছে। গাড়ি এসেছে ভোর পাঁচটায়। ওদের নিয়ে এয়ারপোর্ট যাবে। রাশেদ গাড়িতে উঠার আগে সবার সাথে মিলতে গেল। কিন্তু সে কী কান্না। হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগলো সে। দু’গন্ড বেয়ে জল ঝরছে শুধু। রাশেদ ওর সরলতা আর চঞ্চলতায় সবাইকে বেঁধে ফেলেছে। ওর বাংলাদেশী বন্ধুরাও কান্নায় ভেঙে পড়ল। ওকে যেতে দেবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওদের বিদায় দিতেই হলো। রাশেদ সহ সবাই গাড়িতে উঠে বসল। বাড়ির সামনের পাকা রাস্তায় ভোর বেলা একত্রিত হয়েছে ওরা। অশ্রুভেজা চোখে সবাই বিদায় জানাল ওদের। রাশেদ হাত নেড়ে নেড়ে good by বলল সবাইকে। এ কয়দিনে সবার মনে দাগ কেটেছে সে। আজ বিদায় বেলায় সেটাই অনুভব করল সবাই। রাশেদের গাড়ি আস্তে আস্তে ছুটে চলল ওসমানী বিমানবন্দরের দিকে.....।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT