পাঁচ মিশালী

সাদা পাথরের দেশ ও রাতারগুলে নিসর্গে

নামব্রম শংকর প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৯-২০১৯ ইং ০০:২৬:২৮ | সংবাদটি ৩২৪ বার পঠিত

পাথর আর পাথর। বড় পাথর, নুড়ি পাথর, ছোট পাথর। মাটিতে পাথর পানিতে পাথর। সাদা পাথর। চারদিকে শুধুই পাথর। পাথরের গাঁ বেয়ে কল কল শব্দে পাথরের পাহাড় থেকে নেমেছে ধলাই নদী। এঁকে বেঁকে চলেছে ভোলাগঞ্জ জুড়ে। পাথরের সীমাহীন দিগন্ত গিয়ে মিশেছে মেঘের রাজ্য মেঘালয়ের বৃষ্টি কন্যা চেরাপুঞ্জি পাহাড়ে। পাহাড় চূঁড়ার সাথে লুকোচুরি খেলে দুরন্ত মেঘের দল। বিশাল পাথরের উপর বসে উন্মত্ত ধলাই-এ পা ডুবিয়ে দুর পাহাড়ের দিকে তাকালে মনে হয়, সাদা সাদা মেঘ যেন হেলান দিয়ে আছে সবুজ পাহাড়ের গাঁয়ে।
দি সিলেট খাজাঞ্চিবাড়ী ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের অভিভাবকদের একটি দল গত ৯ সেপ্টেম্বর কোম্পানীগঞ্জ ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর পর্যটন স্পট এবং দেশের একমাত্র জলাবন গোয়াইনঘাটের রাতারগুলে আনন্দ ভ্রমণ করে। আজাদ ভাই, আতাউল হক মেজু, আতিকুল ইসলাম আতিক, সেলিম আহমদ, শামসুল ইসলাম চৌধুরী, শফিউল আলম, সৈয়দ মোশারফ আলী তুহিন, কয়েস আহমদ, মঈন ভাই, দিদার আহমদ রুবেল, রাসেল আহমদ, মো: মুস্তাক আহমদ, নোমান আহমদ এবং আমি মোট চৌদ্দ জনের দল সেজেছিল কমলা রঙের টি সার্ট এবং ব্লু ক্যাপ মাথায় পড়ে। ভ্রমনের শেষ সময়ে শারিরিক অসুস্থতার জন্য আনন্দ থেকে বঞ্চিত হলেন দলের সবচেয়ে সিনিয়র সদস্য আজাদ ভাই।
পরিষ্কার ঝলমলে রোদেলা সকাল না হলেও যাত্রাকালে বৃষ্টি ছিলনা, অসহ্য গরমও ছিলনা। দুটি নোহা এবং সেলিম ভাই’র ব্যাক্তিগত কারে উনার সহধর্মিনী, মেয়ে অতুসী এবং ছেলে তাওহিদসহ ষোল জনের এ আনন্দ ভ্রমন সকাল সাড়ে ১০টায় সিলেট খাজাঞ্চিবাড়ী ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের গেইট থেকে যাত্রা শুরু করে। নবনির্মিত সিলেট- কোম্পানীগঞ্জের আরসিসি সড়কের উপর দিয়ে আমাদের গাড়ি চলে দ্রুত গতিতে। বছর খানেক আগের এ সড়কের কথা চিন্তা করলে এখনো অনেকের মাথা ধরা শুরু হয়ে যায়। ধুলোর উপর ধুলো, প্রচন্ড রকমের ভাঙা রাস্তা, খানা খন্ড, অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করেছে এ সড়কের যাত্রীরা। সম্প্রতি হাইটেক পার্ক সিলেট নির্মাণ কাজের উদ্ভোধন করা হয়েছে। ভোলাগঞ্জ যাওয়ার পথে দেখলাম বালু ভরাটসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ চলছে পঞ্চাশ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের এ প্রকল্পের।
ভোলাগঞ্জ পৌঁছে গাড়ি পার্কিং করে আমরা দুটি নৌকা ভাড়া করলাম প্রত্যেক নৌকা আটশত টাকা করে। ঘাটে অনেক নৌকা। নৌকায় অনেক নীতিবাক্য লেখা ছিল। তার মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ বাক্যটি ছিল, যারা সাঁতার জানেন না তারা যেন লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করেন। খর¯্রােতা এ নদীতে ভ্রমনে আসা যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেটের অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। তবে এ নীতিবাক্য কেবল লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নৌকায় কোন যাত্রীকে লাইফ জ্যাকেট দেয়া হয়নি। নৌকা থেকে নেমে যখনই হেটে যাব নির্ধারিত স্পটে, তখনই তুমুল বৃষ্টি। নোমান ভাই, কয়েস ভাই তারা অনেকেই নৌকা থেকে নেমেই বৃষ্টিতে ভিজে হাঁটা শুরু করেছেন আর আমাদের ডাকছেন। জ¦র নিয়ে মেজু ভাই বৃষ্টিতে। আমি, রাসেল ভাই শামসুল ভাই নৌকার ভেতরে বসে বৃষ্টিতে বেরুবো কি বেরুবনা ভাবছি। কিন্তু তাদের ডাকাডাকি আর বৃষ্টির মধুর আবেদন আমরা নৌকায় বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারিনি। খোলা আকাশ থেকে বৃষ্টির তীক্ষ ফলা আমাদের শরীর বিদ্ধ করে ভেজাতে লাগলো। কতদিন আগে এভাবে ভিজেছি মনে নেই। তবে সন্দেহ নেই সেটা অনেক অনেক দিন আগে। ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ, পর্যটকদের আনন্দ চিৎকার, ধলাই নদীর কল কল ধ্বনি সব মিলিয়ে অপূর্ব সুর, ছন্দ আমাদেরকে আন্দোলিত করেছিল।
বৃষ্টিতে সবগুলো মোবাইল ফোন একটি পলিথিন ব্যাগে করে রাখা হয়েছিল। এ সুন্দর মুহূর্তগুলোর স্মৃতি আমরা ধরে রাখতে পারছিলামনা বৃষ্টিতে ভিজে মোবাইল নষ্ট হবে বলে। প্রায় ঘন্টাখানেক বৃষ্টিতে ভিজেই পাথরের উপর হাঁটাহাটি, বাতাস ভর্তি গাড়ীর টিউবে করে নদীতে সাতার কাটলো অনেকে। অবশেষে বৃষ্টি থামলো, ব্যাগ থেকে মোবাইল বেরুলো, ডিএসএলআর ক্যামেরার সার্টার অন হল ক্লিক ক্লিক, আনন্দ ভ্রমনের আনন্দময় স¥ৃতিগুলো ধরে রাখতে সমর্থ হলাম আমরা। আমরা দেখলাম টাবু করে কোন এক নাটকের স্যুটিং চলছে, বাতাস ভর্তি টিউব-এ করে প্রেমিক যুগল নদীতে ভেসে বেড়াচ্ছে। দেখলাম নদীতে, নদীর তীরে যত্রতত্র ভাসছে পলিটিন, টিসু, পানির খালি বোতল, চিপস’র প্যাকেট, বাচ্চার ন্যাপী, আবর্জনা ইত্যাদি। এভাবে প্রতিদিন আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেললে অল্প কয়েকদিনেই পর্যটনের এ সন্দর স্পটটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য হারিয়ে ফেলবে। আামরা যারা এসব পর্যটন স্পটে যাচ্ছি, আমাদের সচেতনতা খুবই জরুরি। এসব দূষন থেকে স্পটকে বাঁচাতে অতি শীঘ্র এ ব্যাপারে ময়লা আবর্জনা রাখার নির্দিষ্ট বিন ব্যাবহারসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। ধলাই নদীকে বিদায় জানিয়ে আমরা সিলেটের গোয়াইঘাটে ‘দ্বিতীয় সুন্দরবন’ খ্যাত দেশের একমাত্র জলাবন রাতারগুলের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর থেকে দেরিতে রওয়ানা হওয়ায় সব মিলিয়ে প্রায় এক ঘন্টায় আমরা রাতারগুলে পৌঁছেছি শেষ বিকেলে। হিজল তমালের এ বনের ভিতর নৌকা নিয়ে ভ্রমনের প্রথম আনন্দ আমাদের প্রত্যেককে অন্যরকম অনুভুতি জাগিয়েছে। পানির উপর অর্ধেক জেগে থাকা গাছ, গাছের ডালপালা, শিকড়, ঝোপ ঝোপ বেতের বন, এক কথায় অনন্য। নৌকায় বসে অনেকে গলা ছেড়ে গান গেয়েছেন, সৌন্দর্য্যে অবাক হয়ে নির্বাক হয়েছেন অনেকে, আবার অনেকেই কবি হয়ে কবিতার ছন্দমালা বিড়বিড়িয়ে আওড়াচ্ছিলেন। রাতারগুলের মাঝখানের প্রায় ছয়তলা উচ্চতার ওয়াচ টাওয়ারে উঠে চারদিকের সবুজ, নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখতে কেউ ভুল করেনা।
রাতারগুলে নৌকা ভ্রমনের শেষ পর্যায়ে আমরা যখন ঘাটের দিকে ফিরছি তখন চারদিকে অন্ধকার নেমে আসছিল। আকাশে চাঁদ সন্ধ্যা প্রদীপ জালিয়ে দিয়েছেন। সে চাঁদের ছায়া পড়েছে রাতারগুলের ঘোলা পানিতে। নৌকার মাঝির বৈঠা পানিতে চাঁদের সে ছায়াকে কাঁপিয়ে চিচ্ছে। অপরূপ সন্ধ্যা। অসাধারণ তুমি, হে রাতারগুল।
গাড়ি থেকে নেমে নৌকা নিয়ে ভেতরে যাওয়ার তিনটি ঘাট রয়েছে। এত সুন্দর পর্যটন স্পটগুলোর উপযোগী যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যটন সুবিধা কেন এখনো পর্যটন মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করছেন না প্রশ্ন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বেড়াতে আসা পর্যটকদের। দিনের বেলা বৃষ্টি পড়াতে দ্বিতীয় ঘাট দিয়ে আমরা যারা গিয়েছিলাম তাদের একটু অসুবিধা হয়েছিল, হেটে যাওয়ার রাস্তার কিছু অংশ ছিল অত্যন্ত পিচ্ছিল।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT