স্বাস্থ্য কুশল

রোগ প্রতিরোধে কচু শাক

মো. জহিরুল আলম শাহীন প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৯-২০১৯ ইং ০১:৪১:০৮ | সংবাদটি ৬১ বার পঠিত

কচু শাক বাংলাদেশের অতি পরিচিত একটি শাক। গ্রাম বাংলার প্রতিটি বাড়ির আশে পাশে পতিত জমিতে, ডোবাতে এবং রাস্তার পাশে প্রচুর কচু শাক জন্মে। তাছাড়া গ্রামাঞ্চলে অনেকেই কচু শাক বা কচু চাষ করে। কচু গাছের লম্বা ডগা, পাতা, শাক হিসেবে খাওয়া হয়। আবার কচুর মূল মুকি বা মোড়া মাছ, মাংস, শুটকির সাথে তরকারি করে খাওয়া হয়। আবার কচু গাছের মূল থেকে যে লম্বা আকৃতির লতি বের হয় তাও খাওয়া যায়। মোট কথা কচু গাছের সমগ্র অংশই খাদ্য হিসেবে খাওয়া যায় যা অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং মানব দেহের রোগ প্রতিরোধক। এখানে কচুশাকের গুরুত্বই তুলে ধরা হলো। কচু শাকের রং দুই রকম। একটি সবুজ রঙের আরেকটি কালো রঙের। পুষ্টির দিকে দিয়ে কালো কচু শাকের পুষ্টিমান বেশী।
কচু শাকের বৈজ্ঞানিক নাম : অষড়পধংরধ রহফরপধ উদ্ভিদ জগতের অৎধপবধব গোত্রের বীরুৎ জাতীয় উদি¢দ। কচুতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, সি, আয়রণ ও ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। তাছাড়া মানব দেহের জন্য অতি প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ লবণও পাওয়া যায়। অতি অনাদরে অবহেলায় বড় হওয়া এ সবজিটি মানব শরীরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি খাবার। দামেও অতি সস্তা। অতি সহজে বাড়ি-ঘরের আশে পাশে পাওয়া যায়। কিন্তু পুষ্টিমানে অত্যন্ত দামী।
রাসায়নিক উপাদান : পুষ্টিবিদদের মতে কচু গাছের পাতা ও মূলে প্রচুর পরিমাণে সূচাকর দ্রবণীয় অক্সালেটের দানা থাকে। মূলের রাইজোম ছাড়া উদ্ভিদের সকল অংশে ট্রিগলো চিনিন, আইসোট্রিগলোচিনিন, বিটা-গ্লুকোসাইড এবং হাইড্রোলাইজিং এনজাইম তাকে। তাছাড়া এতে আরো আছে একটি ফ্ল্যাভোন, স্যাপোনিন এবং পত্রবৃন্তে ০.১৮% পর্যন্ত হাইড্রোজেন সায়ানাইড থাকে।
পুষ্টি উপাদান : পুষ্টিবিদদের মতে প্রতি ১০০ গ্রাম খাবার উপযোগী কচু শাকে পুষ্টি উপাদান:-
কালো কচু শাকে : খাদ্য শক্তি ৭৭ কিলোক্যালরী, আমিষ ৬.৮ গ্রাম, চর্বি ২ গ্রাম, শর্করা ৮.১ গ্রাম, ক্যারোটিন ১২০০০ মাইক্রোগ্রাম। যা হতে ভিটামিন এ রুপান্তরিত হয়। ভিটামিন বি-১ (থায়ামিন) ০.০৬ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি-২ রাইবোফ্লাবিন ০.৪৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৬৩ মিলিগ্রাম, লৌহ (আয়রণ) ৩৮.৭ মিলিগ্রাম।
সবুজ কচু শাকে : খাদ্য শক্তি ৫৬ কিলোক্যালরি, আমিষ ৩.৯ গ্রাম, চর্বি ১.৫ গ্রাম, শর্করা ৬.৮ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ২২৭ মিলিগ্রাম, আয়রণ ১০ মিলিগ্রাম, ক্যারোটিন বা ভিটামিন এ ১০ হাজার ২৭৮ মাইক্রোগ্রাম, ভিটামিন বি-১ ০.২২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি-২ ০.২৬ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ১২ মিলিগ্রাম, তাছাড়া আরো সামান্য পরিমাণে অন্যান্য খনিজ উপাদান রয়েছে। যা আমাদের দেহের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে।
উপকারিতা : মানবদেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণে কচু শাকের ভূমিকা খুবই বেশি। অতি সহজেই এ শাক পাওয়া যায়। শুধু আমাদের প্রয়োজন এ সবজি সম্পর্কে জানা ও খাদ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা।
এ শাকের অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তুলে ধরা হলো : কচু শাকে ভিটামিন এ থাকে তাই চোখের দৃষ্টি শক্তি প্রখর রাখতে ভালো কাজ করে। বিশেষ করে রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে। এ ভিটামিন দেখতে সাহায্য করে। রোড পমিন নামক এক ধরণের দর্শণ সংক্রান্ত রঞ্জক পদার্থ তৈরী করে। যা অন্ধকারে দেখতে সাহায্য করে। শারিরীক বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আমিষ তৈরীতে ভিটামিন এ সাহায্য করে ফলে শরীরে এন্টিবডি তৈরী হয়। ফলে দেহ নানারোগের হাত থেকে রক্ষা পায়। কচু শাক দেহের চামড়ার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে মুখের উজ্জলতা বৃদ্ধি করে। শিশুদের বুকের দুধ দানকারী মহিলাদের কচু শাক খুবই উপকারি। এতে শিশুদের ভিটামিন এ চাহিদা পূরণ করে। মায়ের বুকে প্রচুর দুধ উৎপন্ন হয়। কচু শাকের ভিটামিন সি মুখের ঘা, ক্ষত, কাটা স্থান শুকাতে সাহায্য করে। তাছাড়া দাঁতের মাড়ির রোগ প্রতিরোধ করে এবং রক্ত সঞ্চালন ভালো রাখে। কচু শাকে প্রচুর আঁশ থাকে যা হজমের সাহায্য করে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে মল বৃদ্ধি করে, অন্ত্রের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। কচু শাকে প্রচুর ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। যা দেহের হাঁড় ও দাঁত গঠনে ও শক্ত করতে বলিষ্ট ভূমিকা পালন করে। দেহের হাঁড়ের জোড়া গুলো সুস্থ রাখে। পেশী সংকোচন, হৃদ স্পন্দন ও রক্ত সঞ্চালণসহ শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে ক্যালসিয়াম। ক্যালসিয়াম হাঁড়ের ক্ষয় রোগ প্রতিরোধ করে। কচু শাকে প্রচুর পরিমাণ আয়রণ বা লোহা পাওয়া যায়। যা রক্তশূণ্যতা দূর করে। এ শাকের আয়রণ ও ফোলেট রক্তের পরিমাণ বাড়ায় ফলে দেহে অক্সিজেন সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকে। কচু শাকের ভিটামিন এ রাতকানা রোগ, চোখে ছানিপড়াসহ চোখের নানা রোগ প্রতিরোধ করে এবং চোখের দৃষ্টি প্রখর রাখে। কচুশাক নিয়মিত খেলে রক্তের কোলেস্টরল কমে। কচু শাক খেলে কোলন ক্যান্সার ও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যায়। কচুশাক উচ্চরক্তচাপ ও হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।
সতর্কতা : কোনো কোনো কচু শাক বা মুকি খেলে গলায় চুলকায়। এর কারণ হলো কচুতে অক্সালিক এসিড থাকে তা মানুষের গলায় নালী পথের প্রাচিরে এই এসিডের দানা গুলো আটকে যায় ফলে চুলকানির সৃষ্টি করে। তবে সব কচু শাকের এ সমস্যা সৃষ্টি করে না। এমন সমস্যার সৃষ্টি হলে সাথে সাথে এক টুকরা গুঁড় মুখে নিয়ে চুষে খাবেন। সমস্যা কমে যাবে। কচু শাক বা যেকোনো সবজি কেটে টুকরো টুকরো করে ফ্রিজে ভরে রাখবেন না। এতে ভিটামিন সি ও আয়রণ কমে যায়। টুকরো টুকরো করে পানিতে ধোবেন না। কচু শাক খাওয়ার পর কোন প্রকার সমস্যা দেখা দিলে তা খাবেন না। নিয়মিত পুষ্টিকর শাক-সবজি খান সুস্থ থাকুন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT