ইতিহাস ও ঐতিহ্য

গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় এবং সুফি-সাধকদের কথা

এডভোকেট মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০২-১০-২০১৯ ইং ০০:৪২:০১ | সংবাদটি ৩১৫ বার পঠিত

১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে সিলেটের প্রভাবশালি মোগল ফৌজদার ইসপিনদিয়ার বেগের উদ্যোগে মালদাস্থ গৌড়/ পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদের ন্যায় পীরমহল্লাস্থ হযরত সৈয়দ জালাল (রাহ.) মুলকে তুরানির মাজারের পূর্বদিকে একটি বিরাট মসজিদ নির্মাণ করে পীর সৈয়দ জালালের বংশধরদের রওজা শরীফের খেদমত এবং মসজিদের ইমামতির ভার দেন। কিন্তু ঈদের জামাতে সময়মত না আসায় ফৌজদারের জন্য অপেক্ষা না করেই ঈদ-জামাতের নামাজ শেষ করায় ফৌজদার ইসপিনদিয়ার বেগ অপমানিত বোধ করায় নব-নির্মিত মসজিদটি ভেঙ্গে দেন তবে পরবর্তিতে অনুতপ্ত হয়ে ফৌজদার দরগা-মহল্লাস্থ হযরত শাহ জালালের দরগার দেউড়ির কাছে আরেকটি মসজিদ নির্মাণ আরম্ভ করলেও সম্পূর্ণ না হওয়ায় তাও বিনষ্ট হয়ে যায়। ফৌজদার ইসপিনদিয়ার বেগের বিমুখিতার কারণেই পীর-মহল্লাস্থ সৈয়দ জালাল (রাহ.) তুরানির মাযার শরীফ গুরুত্ব হারাতে থাকে এবং দরগা মহল্লাস্থ হযরত শাহ জালাল (রাহ.) ইরানির দরগা শরীফের গুরুত্ব বাড়তে থাকে।
দরগার খেদমতের জন্য ফৌজদার হযরতের সাথী হাজী মোহাম্মদ ইউসুফের বংশধর হিসাবে দাবিদার ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিত্ব পীর বক্স কে খাদেম নিয়োগ দেন এবং মাজার শরীফ রক্ষণাবেক্ষণ ও আলোকিত রাখার জন্য সরকারি দানও মঞ্জুর করেন। এ সময়েই পীর মহল্লাস্থ সৈয়দ জালালের রওজা শরীফ থেকে অনেক মূল্যবান এমনকি সৈয়দ জালাল (রাহ.) নামে খোদিত করা পাথর খ-টিও দরগা মহল্লায় হযরত শাহজালাল (রাহ.) দরগায় স্থানান্তর করা হয়। সাথে সাথে স্বার্থান্বেষি মহল কর্তৃক অপ-প্রচার হতে থাকে যে, পীর মহল্লাস্থ পীর সৈয়দ জালাল এবং দরগা মহল্লাস্থ পীর শাহ জালাল (রাহ.) একই ব্যক্তি যা মোটেই সঠিক নহে-উভয় পীরই ভিন্ন ব্যক্তিত্ব এবং প্রথমজন সৈয়দ জালাল তোরান/ তুর্কিস্থান এবং অপরজন শাহজালাল ইরান থেকে বিভিন্ন সময় সিলেট এসে সিলেটের মাটি ধন্য করেছেন।
ইতিমধ্যে সুরমা নদী নিজ পলিমাটি দ্বারা ভরাট হয়ে দক্ষিণ দিকে সরে যাওয়ায় শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনবসতি ও নদী তীরের দিকে সরে আসায় এবং রাজা গোবিন্দের সময় আখালিয়াস্থ বন্দর এলাকাটিও পূর্বদিকে বর্তমান বন্দর বাজার এলাকায় সরে আসলে সিলেটের ইসলাম ধর্মীয় শিয়া মতাবলম্বী মুসলিম ফৌজদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং শহর কেন্দ্রের নিকটবর্তি হওয়ায় দরগা মহল্লাস্থ হযরত শাহজালাল (রাহ.) এর দরগা শরীফের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। অন্যদিকে বর্তমান শহর কেন্দ্র এবং জনবসতির দূরে টিলাটুলি ও জঙ্গলাকীর্ণ ভয়ংকর বন্যপশুর ভয়ের কারণে পীর মহল্লাস্থ প্রথম মুসলিম পীর-দরবেশ ও ধর্ম প্রচারক সৈয়দ জালাল (রাহ.) তুরানির পবিত্র ও সুন্দর স্থাপত্য শৈলিতে নির্মিত মাজার শরীফ সাধারণ লোক চক্ষুর আড়ালে চলে গিয়ে গুরুত্ব হারাতে থাকে। তবুও ইতিহাস সচেতন শিক্ষিত ধর্মানুরাগি জনগণ খোঁজে খোঁজে পীর-মহল্লাস্থ সিলেটের প্রথম পীরদরবেশ ও ইসলাম ধর্মপ্রচারক সৈয়দ জালাল (রাহ.) তুরানির আকর্ষণিয় রওজা মোবারক পরিদর্শন ও জিয়ারত করেন এবং নিকটস্থ আক্কল কূয়ার পবিত্র পানি পান করে তৃপ্ত হন।
এদিকে উত্তর সিলেটে মোগল শাসনের প্রারম্ভেই সিলেট আসা হযরত শাহ জালাল (রাহ.) ইরানির রওজা মোবারক শহরের নব-বর্ধিত নদী তীর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন ও বসতির কাছে থাকায় ইসলাম ধর্মের শিয়া মতাবলম্বী সিলেটের শাসক/ ফৌজদারদের কাছে হযরত শাহ জালাল (রাহ.) এর মাজারের গুরুত্ব বাড়তে থাকায় ফৌজদার লুৎফুল্লাহ শিরাজি কর্তৃক ১৬৬০ সনে হযরত শাহ জালালের (রাহ.) টিলার উপরস্থ মাজার শরীফের উত্তর-পূর্বদিকে মজবুত দেয়াল দিয়ে মাজারের লাগোয়া পশ্চিম দিকে নামাজসহ ধর্মিয় উপাসনার জন্য একটি ছোট মসজিদও নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে ১৬৭৭ সালে ফৌজদার ফরহাদ খাঁন বড় গম্বুজ হলঘর নির্মাণ করে দরগাহ ই শাহজালালের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেন। ফৌজদার এনায়েত উল্লাহ বেগের উদ্যোগে ১৬৯৫ সালে খাদেম মুরাদ বকস কর্তৃক জাহাঙ্গির নগরবাসি জনৈক আবু সাইদ এর কাছ থেকে দান স্বরূপ উরুসের সময় বেশি সংখ্যক ভক্তদের জন্য রান্নার সুবিধার্থে বড় বড় তিনটি ডেকচি সংগ্রহ করায় দরগার গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। সংগ্রহিত বড় বড় ডেকচিগুলো আজো দরগায় সংরক্ষিত আছে। ১৭৪৪ খ্রিস্টাব্দে সুবে বাংলার সুবেদার আলিবর্দি খানের আমলে সিলেটের ফৌজদার বাহরাম খাঁন হযরত শাহ জালালের মাজারের দক্ষিণ দিকে প্রসস্থ বারান্দা নির্মাণ করে দেন। ফৌজদার ফরহাদ খাঁন হযরতের সাথি সামসুদ্দিন কামালির জনৈক বংশধরকে ইমামতি করার ভার দিলে তিনিই দরগাহ-মসজিদের মুফতি হিসাবে খ্যাত হন এবং তাঁর বংশধরেরা পরবর্তিতে মুফতি উপাধিতে ভূষিত হতে থাকেন। স্মরণীয় ফার্সি/ আরবি ভাষায় ধর্মিয় জ্ঞানে জ্ঞানি ইমামদেরকেই মুফতি বলা হয় যারা নামাজে ইমামতির সাথে সাথে ধর্মীয় ব্যাপারে ফতোয়া বা ব্যাখ্যা দিতেও সক্ষম। পরবর্তিতে ফৌজদার আব্দুল্লাহ সিরাজি কর্তৃক মুসল্লিদের স্থান সংকুলের জন্য বড় গুম্বুজের লাগোয়া দক্ষিণ দিকে দরগার প্রধান মসজিদ নির্মাণ করে দেন। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিলেটস্থ প্রথম এবং প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জন উইলিস জং বাহাদুর শ্রদ্ধার স্মারক হিসাবে দরগায় দূর থেকে আগত সম্মানি মুসাফিরদের বিশ্রামের জন্য দরগার আঙ্গিনায় একটি পাকা মুসাফিরখানা নির্মাণ করে দেন যা আজো বর্তমান। পাকিস্তান আমলে বড় জামাতের স্থান সংকুলানের জন্য দরগার লাগোয়া পূর্বদিকের পুকুরটি অনতিদূরে উত্তর-পূর্ব কোণে স্থানান্তর করা হয়। স্থানান্তরিত করা হয় সৌন্দর্যবর্ধনে সংরক্ষিত গজার মাছগুলোও। ইতিপূর্বেই বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য দরগা টিলার পশ্চিম দিকে পীর মহল্লার আক্কল কূপের আদলে একটি কূপও খনন করা হয়েছিল এবং সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য সে কূপে কিছু শিং ও কৈ মাছ পালনেরও ব্যবস্থা হয়েছিল যাতে দীর্ঘদিন অবস্থান এবং কূপের দেয়ালের সাথে অহরহ সংঘর্ষের কারণে মাছগুলো সোনালি রং ধারণ করায় সোনালি মাছ বলা হতো। উৎসাহি লোকজন কর্তৃক মাছের জন্য বিভিন্ন খাবার এবং দান স্বরূপ ধাতুর মুদ্রা ফেলার কারণে ইদানিং কূপটি শুকিয়ে গেছে।
১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে দরগা শরীফের খাদেম এবং প্রখ্যাত ফার্সি প-িত মুনসি এলাহি বক্স বাংলা ভাষায় হযরত শাহজালালের জীবনি সংক্রান্ত একমাত্র বিস্তারিত গ্রন্থ সোহালি এমনি নামক গ্রন্থের অনুবাদ করেন যা প্রথম ফার্সি ভাষায় লিখা হয়। সিলেটে বসবাসকারি ঢাকা নিবাসি কোম্পানি কর্মকর্তা মুনসি নাসির উদ্দিন হায়দারই বর্ণিত জীবনী গ্রন্থ সোহেলি এমনি লেখেন যাতে হযরত শাহ জালালের সিলেট আসার তারিখ ৫৬১ হিজরি/ ইং সন ১১৬৫ বর্ণিত আছে যদিও ঐ সময় স্থায়িভাবে ভারতসহ গৌড়-বঙ্গে কোন মুসলিম বিজয় হয়নি। বারশত সতাব্দির শেষে অর্থাৎ ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি বংশিয় গজনির শাসক মোহাম্মদ ঘোরিই প্রথম পানি পথের দ্বিতীয় যুদ্ধে ভারত জয় করে তার প্রতিনিধি কুতুব উদ্দিন আইবেকের মাধ্যমে ভারতে স্থায়ি মুসলিম প্রশাসন চালু করেন। রাজধানী ছিল গজনি। পরবর্তিতে কুতুব উদ্দিন আইবেকের তুর্কি বংশিয় সেনাপতি বখতিয়ার খিলজি ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বিহার জয় করে গৌড়ের শাসক লক্ষণসেনকে তাড়িয়ে ঐতিহাসিক গৌড়রাজ্য দখল করে স্বাধীনভাবে রাজ্য শাসন করতে থাকেন। পরবর্তিতে ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজি কামরূপ রাজ্যের রাজধানি পা-ুয়া যা বর্তমান আসামের রাজধানি শহর গোয়াহাটি জয় করেন যে বিজয়ের পাথর খোদিত স্মারক আজো তথায় বিদ্যমান।
বখতিয়ার খিলজির পথ অনুসরণ করেই ইসলাম ধর্ম প্রচারার্থে তথায় যান পারস্যের তাব্রিজ শহর থেকে আগত প্রখ্যাত পীর হজরত শেখ জালাল উদ্দিন তাব্রিজী। যিনি তথায় ইসলাম ধর্ম প্রচার করে ১২৪৪ খ্রিস্টাব্দে সেখানেই ইন্তেকাল করেন। পীর জালাল উদ্দিন তাব্রিজী তথায় প্রখ্যাত আদিনা মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনির মাজার শরীফই প্রাক্তন পা-ুয়া বর্তমানে গোয়াহাটিস্থ বাইশ হাজারি মাজার শরীফ নামে আজো খ্যাত। গোয়াহাটিতে যাওয়া প্রায় সকল পর্যটকই তা জিয়ারত/ পরিদর্শন করতে ভুলেন না। মুক্তিযুদ্ধের সময় সিলেটের জননেতা মরহুম দেওয়ান ফরিদ গাজীর সঙ্গে লেখকেরও সে প্রখ্যাত মাজার জিয়ারত করার সৌভাগ্য হয়েছিল। মোরক্কিয় পরিব্রাজক ইবনে বতুতা ১৩৪৫ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ পীর শেখ জালাল উদ্দিন তাব্রিজীর ইন্তেকালের প্রায় একশত বছর পর সোনারগাঁর শাসক ফখরুদ্দিন মোবারকশাহের আমলে সোনারগাঁ থেকে বখতিয়ার খিলজির রাস্তা তথা ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে কামরূপ গিয়ে তথায় সমাধিস্থ শেখ জালাল উদ্দিন তাব্রিজীর মাজার জিয়ারত করেন। তবে মাজারের কোন খাদেমকে হয়তো ভুলবশতঃ বা ঐ নামেরই দ্বিতীয় কোন পীর/ খাদেমের সাথে দেখা করেন।
ইবনে বতুতা দীর্ঘদিন পর নিজ দেশে ফিরে গিয়ে অন্য লোকের মারফত তাঁর সুদীর্ঘ ভ্রমণ কাহিনী লেখান বিধায় তাতে অনেক ভুল-ভ্রান্তি থাকাই স্বাভাবিক। ইবনে বতুতার কাহিনী অবলম্বনে ‘সোহেলি এমনি’ নামক হযরত শাহজালালের বর্ণিত জীবনীগ্রন্থ লেখায় তাতে অনেক ভুল-ভ্রান্তি থাকলেও বাস্তব ইতিহাসের আলোকে তা সংশোধন করা অবশ্যই প্রয়োজন। তাছাড়া শেখ জালাল উদ্দিন তাব্রিজী ইয়েমেন থেকে পারস্যে/ ইরানের তাব্রিজ শহরে হয়ে ভারতে এসে মুসলিম বিজয়ী গৌড় নগরি হয়ে বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক বিজিত কামরূপ/ পা-ুয়া গিয়ে ইসলাম ধর্ম প্রচার করে তথায় সমাধিস্থ হন যা বাইশ হাজারি দরগা শরিফ নামে খ্যাত। ঠিক একইভাবে সম্ভবতঃ মোগলামলে ইরান/ পারস্য থেকে ভারতের দিল্লীতে আসা এবং দিল্লীর প্রখ্যাত সাধক ও দরবেশ নিযাম উদ্দিন আউলিয়ার দরগা শরীফে সাধনায়রত হযরত শাহ জালাল (রাহ.) ও বাংলার নব-নিযুক্ত সুবেদার দিল্লীর পার্শ্বে আজম শরীফ শহরে সমাধিস্থ প্রখ্যাত সুফি-সাধক হযরত মঈন উদ্দিন চিশতির সুযোগ্য নাতি ইসলাম খাঁন চিশতির সাথি হয়ে সোনারগাঁ হয়ে নিজ সঙ্গীসহ মোগলদের অধিকারে আসা সিলেটে এসে সাবেক রাজার গল্লি এলাকায় বসতি স্থাপনসহ ইসলাম ধর্ম প্রচার করে তথায় সমাদিস্থ হলে ফার্সি ভাষায় এলাকার নাম হয় দরগা মহল্লা। স্মরণ করা প্রয়োজন হযরত শাহজালাল (রাহ.) পারস্য থেকে আসায়ই তাঁরও মাতৃভাষা ছিল ফার্সি যা মোগলামলে এদেশের রাজভাষা ছিল এবং হযরতের নামের পূর্বে ফার্সি সম্মানি উপাধি শাহ শব্দ যুক্ত থাকাই তার প্রমাণ। আরবিতে হয় শেখ/ সৈয়দ ইত্যাদি যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।
একইভাবে এ সম্পর্কে ১৬১০ সালে প্রথম লিখিত-গুলজারে আবরার-নামক জীবনি গ্রন্থে জালাল নামক যে পীরের বর্ণনা দেয়া হয়েছে সে পীর সাধকই সৈয়দ জালাল (রাহ.) মুলকে তুরানি। উল্লেখ্য তুর্কিস্থানকেই ফার্সি ভাষায় তুরান (ইরান-তুরান) বলা হয়। তুর্কিস্থানের কোনিয়া শহরের প্রখ্যাত সুফি-সাধক জালাল উদ্দিন রুমির অনুসারি সৈয়দ জালাল মুলকে তুরানিই প্রথম সিলেট বিজেতা পাঠানবীর ফতেহ খাঁন লোহানির সময়ই দিল্লী থেকে সম্ভবত গৌড়/ সোনারগাঁ হয়ে প্রথমে মুসলিম অধ্যুষিত তরফ রাজ্যে আসেন এবং পরবর্তিতে আরো সঙ্গী-সাথিসহ ইসলাম ধর্ম প্রচারার্থে সিলেট রাজ্যে এসে পলাতক রাজা গোবিন্দের পরিত্যাক্ত গড়/দুর্গ এলাকায় বসতি স্থাপন করে ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রসারে অবদান রেখে সেখানেই ইন্তেকাল করে সমাধিস্থ হওয়ায় এলাকার নাম হয় পীর মহল্লা । সম্ভবতঃ সেনাপতি সৈয়দ নাসির উদ্দিনের উদ্যোগেই তুর্কি স্থাপত্য শৈলিতে নির্মিত হজরত সৈয়দ জালাল রহ. এর সুন্দর মাজার শরীফ আজো খুঁজে খুঁজে আসা আশেকবৃন্দের হৃদয় আকর্ষণ করে। সৈয়দ নাসির উদ্দিনই সৈয়দ জালাল (রাহ.) রওজার প্রথম খাদেম ছিলেন বলে জানা যায়। মনে রাখা দরকার ভারতসহ গৌড়বঙ্গ ও সিলেটেও সর্ব প্রথম তুর্কি মুসলমানগণই এসে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে ইসলাম ধর্ম প্রচারে ও প্রসারে অবদান রাখেন।
সিলেটসহ সুবে বাংলায় মোগলামলে প্রথম বিস্তারিত ইতিহাস আইন-ই-আকবর গ্রন্থ ষোলশত শতাব্দির শেষের দিকে লিখিত হয়। এ গ্রন্থে সিলেট সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা থাকলেও সিলেটের দরগা মহল্লাস্থ প্রখ্যাত পীর দরবেশ এবং ইসলাম ধর্ম প্রচারক হযরত শাহ জালাল (রাহ.) এর কোনো উল্লেখ না থাকায় এমনকি সতের শত শতাব্দির মধ্যদিকে বাংলার প্রখ্যাত সুবেদার ইসলাম খাঁনের সময় বৃহত্তর সিলেটে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নেয়া মোগল সেনাপতি মির্জা নাথানের লেখা ‘বাহারিস্থানে গায়বি' নামক ইতিহাস গ্রন্থেও দরগা মহল্লাস্থ হযরত শাহজালালের কোন উল্লেখ না থাকায় হযরত শাহ জালাল (রাহ.) যে অনেক পরের তথা পরবর্তি মোগলামলে এসেছেন তাই স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। হযরতের সাথি তিনশত ষাট আউলিয়া সংখ্যাটি পবিত্র কাবা গৃহের সাথে সংশ্লিষ্ট বিধায় এ সংখ্যাটি উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ বাস্তবে তা আজো মেলানো যায়নি। এ সংখ্যাটি এসেছে সম্ভবত ব্রিটিশ কোম্পানি আমলে নিষ্কর ভূমি বন্দোবস্ত নেয়ার ব্যাপারে। ১৭৮২ সালে মহরম মাসের শোক দিবস দশ তারিখ বা আশুরার শোক দিবসের পবিত্রতা রক্ষার্থে আন্দোলন চূড়ান্তভাবে বঙ্গ-ভারতের প্রথম ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। এ উপলক্ষে স্থানিয় ঈদগাহ ময়দানে তখনকার সময়ের ইসলাম ধর্মিয় নেতৃবৃন্দ দু’ভাই সৈয়দ হাদি ও সৈয়দ মেহদির (হাদা মিয়া-মাদা মিয়া) নেতৃত্বে স্থানিয় মুসলমানগণ শোক মিছিল সহকারে জমায়েত হলে তখনকার সময়ের সিলেটস্থ ইংরেজ রাজস্ব কর্মকর্তা রবার্ট লিন্ডসে বাধা দিতে আসলে বর্ণিত নেতৃবৃন্দের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার্থে বর্ণিত সৈয়দ ভ্রাতৃবৃন্দসহ কিছু সাথিদেরকে পিস্তল দিয়ে হত্যা করেন। এতে সিলেটের মুসলিম সমাজে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ ক্ষোভকে প্রশমিত করতে এবং রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক প্রচুর পতিত ও অনাবাদি ভূমিতে আবাদ এবং বসতি সৃষ্টি করতে চালাক ইংরেজ কর্মকর্তা স্থানিয় মুসলিম ফৌজদারের সহায়তায় মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মিয় স্থানসমূহ রক্ষণাবেক্ষণসহ আলোকিত রাখার জন্য নিকটস্থ প্রচুর অনাবাদি ভূমি নিষ্কর বন্দোবস্ত দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হলে বিভিন্ন ভূয়া পীর এবং হিন্দু দেব-দেবীর নামে মাজার-মন্দির ইত্যাদি তৈরি করে হযরত শাহ জালালের সাথের বর্ণিত কথিত তিনশত ষাট আউলিয়ার কথা প্রচার করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে নিষ্কর ভূমি বন্দোবস্থ নেয়া হয়। যেমন বিভিন্ন এলাকায় চাঁন মোহাম্মদ নামকদেরকে শাহ চাঁন্দ নামে অপপ্রচার করে বলা হয় তিনি নাকি ৩৬০ আউলিয়ার লোকজন হিসাবে আরব দেশ থেকে হযরত শাহ জালালের সাথি হয়ে এসেছেন। অথচ শাহ চান্দ আরব থেকে আসলে বাংলা/ হিন্দি চাঁন্দ শব্দের আরবি প্রতিশব্দ হল আল কমর এবং সম্মানিত শব্দ-শাহ-ফার্সি ভাষার শব্দ যা আরবি ভাষার প্রতিশব্দ সৈয়দ/ শেখ ইত্যাদি। এমনকি বাংলা বা হিন্দি বর্ণ চ বা প আরবি বর্ণমালায়ও নেই। এসব মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে নিষ্কর ভূমি বন্দোবস্থ নেয়ায় তা পরবর্তিতে মামলার মাধ্যমে বাতিল হয়ে যায়। তবে দখল ভিত্তিতে এবং ধার্যকৃত কর প্রদানের শর্তে বন্দোবস্থ ভূমি প্রয়োজনে খ-ে-খ-ে বা ফার্সি শব্দ ছেগায় বিভক্ত করে পূর্ব নামেই দখল ভিত্তিতে পুনঃ বন্দোবস্থ দেয়া হয়। এতে রাজস্ব আদায়কারি ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে আজ পর্যন্ত এমনকি তখনকার সময়ে অগাধ পানিতে নিমজ্জিত এলাকায়ও সমাধিস্থ বলে প্রচার করা পীর-ফকির মিলিয়েও আজ পর্যন্ত বর্ণিত ৩৬০ সাথি আউলিয়ার সংখ্যা মেলানো যায়নি। পরবর্তিতে আঠারো শতাব্দির শেষের দিকে ঢাকা থেকে সিলেট আসা ইংরেজ রাজস্ব কর্মকর্তা রবার্ট লিন্ডসের বর্ণনায়ও সিলেট শহরের চারদিকে সমুদ্রের ন্যায় জলরাশির বর্ণনা উল্লেখ্য। এ বিষয়ে আরো গবেষণার প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে স্থান-কাল-পাত্রের সমন্বয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য ঘটনা বের করতে সঠিক ও নিরপেক্ষ গবেষণার বিকল্প নেই।
সূত্রাদি : (১) সোহেলি এমনি - বাংলা অনুবাদ ইলাহি বক্স।
(২) তওয়ারিখে জালালি-মৌলবী নাসির উল্লাহ
(৩) এ ফাষ্টবুক অব ইন্ডিয়ান হিষ্ট্রি -ওরিয়েন্ট লংম্যানস।
(৪) শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত -শ্রী অচ্যু

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সুনামগঞ্জের সাচনা: ইতিহাসের আলোকে
  • বদলে গেছে বিয়েশাদীর রীতি
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ঐতিহ্যবাহী পালকী
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ইতিহাসের আলোকে নবাব সিরাজ উদ-দৌলা
  • ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জল শতবর্ষ
  • পুরান পাথরের যুগ থেকে
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • Developed by: Sparkle IT