ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সিলেটে আরবি ভাষাচর্চা

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ০২-১০-২০১৯ ইং ০০:৪২:২৪ | সংবাদটি ৬৫ বার পঠিত


বিশ্বের প্রাচীনতম ভাষাসমূহের মধ্যে আরবি অন্যতম। জীবন্ত সমৃদ্ধ এ ভাষা ইসলামী সভ্যতার সাথে সাথে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছিল। মুসলমানদের প্রতিদিনের জীবনে ধর্মীয় কাজে আরবি ভাষা ব্যবহার করতে হয়। সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম আসমানী কিতাব কোরআনুল করীম আরবি ভাষাতেই নাজিল হয়েছে। বিশ্বে কোরআনুল করীমই একমাত্র গ্রন্থ যা লক্ষ লক্ষ মুসলমানের কণ্ঠস্থ। হাদীস তফসীর ফেকাহসহ বিভিন্ন বিষয়ে হাজার হাজার গ্রন্থ রচিত হয়েছে আরবিতে। আরব জগতের বাইরেও প-িত ব্যক্তিবর্গ এ ভাষায় জ্ঞানের চর্চা করেছেন। এ ধারা এখনো অব্যাহত আছে। আরবি সাহিত্যও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাই ভাষা শেখার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজও আরবি সাহিত্যের চর্চা হয়। এ উপমহাদেশে ইসলামের আবির্ভাবের আগে থেকেই আরবীয় বণিকদের আনাগোনা ছিল। ইসলামের প্রসার এবং উপমহাদেশে মুসলিম রাজ শক্তির প্রতিষ্ঠার ফলে আরবি ভাষাচর্চা ব্যাপকতা লাভ করে। এ উপমহাদেশে মুসলিম শাসন আমলে আরবি ভাষাভাষী কোনো সম্রাট ছিলেন না। রাজ ভাষা রূপেও আরবি প্রচলিত হয়নি। আবার ইসলামও এ দেশে এসেছে মূলত পারস্য বা ইরান হয়ে। পারস্যের ভাষা ফারসি। এর পরও আরবি ভাষার চর্চা ব্যাপক আগ্রহ ও আন্তরিকতার সাথে এ উপমহাদেশে চলেছে। ধর্মীয় চেতনা এবং অন্তরের তাগিদ থেকে আরবি ভাষাচর্চার বহমান ধারা প্রান্তিক জনপদ সিলেটকেও সিক্ত করেছে। এখানেও আরবিতে রচিত হয়েছে উন্নতমানের গ্রন্থাদি।
হযরত শাহজালালের আগমন সিলেটের সামগ্রিক জীবন-প্রবাহে যুগান্তকারী এক ঘটনা। তাঁর সাথে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষী প-িত ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। তার সঙ্গীদের কেউ কেউ অনারব হলেও মুসলমান হিসেবে আরবি ভাষার সাথে তাদের পরিচিতি ছিল। সিলেটে শাহজালালের আগমনের পর মুসলিম বিশ্বের বিশেষ করে তৎকালীন দিল্লীর সাথে এ জনপদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। এ সুবাদে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানচর্চারও একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয় সিলেটে। আরবি এবং ফারসির সাথে এ অঞ্চলের মানুষের পরিচয় ঘটে। পরবর্তীকালে উপমহাদেশে ফারসি রাজভাষা রূপে প্রতিষ্ঠিত হলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ফারসি শেখার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এর অনেক পরে আসে উর্দু। তিনটি ভাষারই চর্চা সিলেটে হয়েছে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে এই যে, অধিকাংশ লেখক তিনটি ভাষাই জানতেন। একই লেখকের গ্রন্থ একাধিক ভাষায় রয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় কোরআন হাদিসসহ আরবি ভাষা শিক্ষার মাধ্যম ছিল উর্দু ভাষা হিসেবে উর্দু চালু হওয়ার পর। এতে একই ব্যক্তির পক্ষে একাধিক ভাষা আয়ত্ত করা সম্ভব হয়েছে। উর্দু ভাষার প্রসারের আগে আরবি এবং ফারসি ভাষা ছিল আকর্ষণীয় শিক্ষণীয় ভাষা। বিদ্যানুরাগী বিশিষ্ট ব্যক্তিরা নিজ উদ্যোগে মক্তব মাদ্রাসা চালু করেছিলেন। এ গুলোতে আরবি-ফারসি শিখতেন হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোক। এ যুগে মাদ্রাসা মক্তব বলতেই শুধু মুসলমানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বোঝায়। অতীতে এ রকম কোনো সীমাবদ্ধতা মাদ্রাসা মক্তবের ছিলনা। সিলেটে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এ ধরনের কোনো কোনো মাদ্রাসা দিল্লীর স¤্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছে। সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে সিলেট শহরে মুফতী পরিবারের মাওলানা জিয়া উদ্দিন একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেন। এতে হিন্দু মুসলমানরা আরবি ও ফারসি শিখতেন। এ মাদ্রাসার জন্য মোগল বাদশাহরা লাখেরাজ ভূমি দান করেছিলেন।
১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে ফারসি আদালতের ভাষা হিসাবে বাতিল হলে এটি বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় টোল ও চতুম্পাঠীর মত বর্তমান হবিগঞ্জ, কানাইঘাটের ঝিঙ্গাবাড়ী ও গাছবাড়ী, গোলাপগঞ্জের ফুলবাড়ী এলাকায় অনেক মাদ্রাসা গড়ে উঠেছিল। সৈয়দ মুর্তাজা আলী শিক্ষা ক্ষেত্রে সাবেক সিলেটের পর্যালোচনা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য জেলার চেয়ে সিলেট জেলায় আরবি ও ফারসি ভাষার চর্চা বেশি ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হওয়ার আগে থেকে সিলেটে বিদেশী ভাষা চর্চার ঐতিহ্য ছিল। অন্যান্য জেলার তুলনায় এখানে আরবি-ফারসি চর্চা ছিল বেশি। কারণ হযরত শাহ জালালের আগমনে এখানকার পরিবেশ বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে স্বাতন্ত্র্য লাভ করেছিল। এ ছাড়া সেই পঞ্চম শতাব্দী থেকে সংস্কৃতচর্চা ছিল সিলেটে। পরবর্তীকালে এর অনুসরণে আরবি-ফারসি চর্চা সহজ ও বেগবান হয়ে ওঠে। ভাষা শেখার সাথে গ্রন্থ রচনার আবশ্যিক কোনো সম্পর্ক নেই। ভাষায় সুপ-িত অনেকের কোনো গ্রন্থ নেই। এ ছাড়া তখনকার যুগে মুদ্রণের ব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল। এর পরও সিলেটের অনেক গুণী ব্যক্তির গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এখানে নানা হিসেবে কয়েকজন লেখকের আরবি গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হলো।
মাওলানা আব্দুল কাদির, ১। আদ্দারুল আজহার ফি শরহীন ফেকহিল আকবর। (১২৭৬ হি. কানপুর)। ২। আল জাওয়ামী আল কাদেরীয়া ফি মুতাকাদে আহলিল সুন্নাতুল জামাত (১২৯৮ হি. কানপুর) ৩। আরদ্দুল মকুল আলা নিসহুল মাকবুল। (১২৯৮ হি.)। ৪। আল ফাওয়াইদুল কাদেরীয়া ফি শরহিল আকাইদান নাসাফী। (১৩০৪ হিঃ কানপুর)।
এলাহী বখশ হামিদ মজুমদার দেওয়ানে হামিদ (কাব্য গ্রন্থ) (মৃত্যু ১২৭৭ হি.)।
আবু নসর মোহাম্মদ ওহীদ (শামসুল উলামা)। ১। বাকুরাতুল আদব (সিরিজ)। ২। সালসিলু কিরাত। ৩। মাদারিজুল কিরাত ২খন্ড। ৪। নুখারুল উলুম ৩ খন্ড। ৫। মিরকাতুল আদব। ৬ খুতাবুন্নবী ওয়াস সাহাবা।
মাওলানা মোহাম্মদ হোসেন (বাহরুল উলুম) ১। শরহে তিরমিজি (বাহরুল উলুম)। ২। তালিকুল খাওয়াজা আলা তাখলিছে সুননে ইবনে মাজাহ।
মাওলানা মছদ্দর আলী ১। ইনশাউল মাজামিন ওয়ার রাসাইল (১৩৬০ হি. কলকাতা)। [অপ্রকাশিত ৩টি]। হরমুজ উল্লা শায়দা। শরহে দেওয়ানে হামাসা (১৯২৯ খ্রী. কানপুর)
এ ছাড়া আল্লামা মুশাহিদ বাইয়মপুরী, মাওলানা ফাজিল ফজলে হক, মাওলানা শফিকুল হক চৌধুরী বাহাদুরপুরী, ক্বারী মোহাম্মদ হরমুজ আলী, মাওলানা মীর সৈয়দ ওজিউল্লাহ, কাজী আব্দুর রউফ প্রমুখ অনেকের অপ্রকাশিত আরবি ভাষায় লিখিত গ্রন্থের পা-ুলিপি রয়েছে।
আরবিতে রচিত এ সব গ্রন্থের মান উন্নত। অনেকগুলোই বাংলার বাইরেও মাদ্রাসার পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত ছিল।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়
  • সিলেটে ফারসি চর্চা
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • আদিত্যপুরের গণহত্যা
  • জালালাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্য
  • বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ
  • সিলেটে আরবি ভাষাচর্চা
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় এবং সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যবাহী গ্রাম আজিজপুর
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আরেক অধ্যায়
  • কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঐতিহাসিক নানকার আন্দোলন
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয়
  • শত বছরের ঐতিহ্যের ধারক দাউদিয়া মাদরাসা
  • পৃথিবীর প্রাচীন লাইব্রেরিগুলো
  • আল হামরা : ইতিহাসের অনন্য কীর্তি
  • Developed by: Sparkle IT