ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ

জামান মাহবুব প্রকাশিত হয়েছে: ০২-১০-২০১৯ ইং ০০:৪২:৪৮ | সংবাদটি ২৪৩ বার পঠিত

ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘সংস্কৃতি জীবনের সঙ্গে জড়িতÑ সেই জন্য এর চরম রূপ কোনোও এক সময়ে চিরকালের জন্য বলে দেওয়া যেতে পারে না। জীবনের সঙ্গে সঙ্গে সভ্যতা আর সংস্কৃতিও গতিশীল ব্যাপার।’ অর্থাৎ, সংস্কৃতি চলমান, সংস্কৃতি জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। জাতি টিকে থাকে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে জীবন্ত সংস্কৃতির বহমান ধারা সৃজনের মধ্য দিয়ে। জাতীয় প্রাণ ময়তার সামগ্রিক অভিব্যক্তিই সংস্কৃতি। মানুষ তার কথাবার্তায় খেলাধুলায় আমোদ প্রমোদে প্রতি মুহূর্তে তার বিচিত্র সংস্কৃতি ধারা রচনা করে চলেছে। সেই সাথে রক্ষা করছে সংস্কৃতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রবহমানতা। সেই জাতি মৃত, যে জাতির সংস্কৃতি মৃত। সমগ্র জাতির প্রাণস্পন্দন অনুভূত হয় সংস্কৃতির মধ্যেই। ভারতীয় উপমহাদেশে নানা জাতি এসেছে। বাঙালি কাউকেই ঠেলে দেয়নি। বরং সকলের সংস্কৃতির মধুভান্ড সংগ্রহ করে সে রচনা করেছে অনবদ্য বাঙালি সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির লালন ও বিকাশে আমাদেরকে সচেষ্ট হতে হবে।
বাঙালির ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’ বহু প্রচলিত। এ কথার গভীরে রয়েছে এদেশের লোক সংস্কৃতির গৌরবময় ঐতিহ্য। মানুষ তার প্রাত্যহিকতার আচার অনুষ্ঠানকে ধারণ করে আত্মিক শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করে চলেছে। খেতে হাল বাইতে, ফসল তুলতে, নদীতে নাও বাইতে যে বহুমাত্রিক রূপ সুষমা পরিলক্ষিত হয়, তা-ই বাঙালির জীবনকে দিয়েছে নবতর দ্যোতনা। জীবন ও জীবিকার তাগিদে বাঙালি নানা পেশা বেছে নিয়েছে। সন্ধ্যায়, অবসর মুহূর্তে গানের আসর, পুঁথি পাঠ, বাউল গান, পদাবলি, কীর্তন, কবি গান ইত্যাদি নানা আয়োজনের মাধ্যমে সে খুঁজে পেয়েছে প্রাণের খোরাক। এ ধারাতেই বাঙালির ঐতিহ্য সমৃদ্ধতর হয়েছে। আর এভাবে বাংলার লোক সংস্কৃতির বিকাশ ও বিস্তৃতি ঘটেছে। বাঙালি সংস্কৃতির উজ্জ্বলতম প্রকাশ ঘটেছে লোকজ সংস্কৃতিতে।
এক্ষেত্রে বাংলা নববর্ষকে উপলক্ষ্য করে বৈশাখী মেলা ও নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রসঙ্গটি এসে যায়। বাংলার সনের পয়লা মাস বৈশাখ। এ মাসকে ঘিরে রয়েছে বাঙালির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র। এর নিবিড় যোগ রয়েছে আমাদের ঐতিহ্য চেতনার সাথে এর মূল আকর্ষণ ব্যবসায়ীদের হালখাতা এবং মেলা। বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, ইতিহাস, লোকাচার, সামাজিকতা এবং সঙ্গীতে এর প্রভাব পড়েছে খুবই গভীরভাবে। বাংলা বর্ষবরণ রবীন্দ্রকাব্যে ঠাঁই পেয়েছে অতুলনীয় সৌন্দর্যে। তাঁর রচিত গান নববর্ষে বাঙালির আবাহন সংগীত ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’।
নববর্ষকে বরণ করে নেওয়ার জন্য শহর-নগর বন্দরে বাঙালিরা মেতে ওঠে নানা আয়োজনে। তাতে ঠাঁই পায় যাত্রা, বাউল সংগীত, ভাটিয়ালি, জারি, লোকনৃত্য ইত্যাদি। গ্রামের মতো এখন নগরজীবনেও বৈশাখী মেলা বাঙালির অন্যতম আকর্ষণ। শহরের যান্ত্রিকতা থেকে মুক্ত হয়ে এদিন মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় এসব মেলা। মেলায় নানা স্টলে পাওয়া যায় কাঠের আসবাবপত্র, কাঁসা, পিতল অ্যালুমিনিয়ামের কলস, হাতপাখা, থালা-বাসন, বাটি, হাঁড়ি-পাতিল ছাড়াও খই, মুড়ি, মুড়কি, মোয়া, বুট, বাদাম, তিলের খাজা, বাতাসাসহ অনেক কিছু। এছাড়া এদিন ‘ইলিশ পান্তা’ খাওয়ার ধূম লেগে যায়। বৈশাখী মেলার পাশাপাশি নববর্ষে বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করাও একটা ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিকাশে বাংলা নববর্ষ উদযাপন অত্যন্ত তাৎপর্যবহ।
দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশে বর্তমান সরকার অত্যন্ত আন্তরিক। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ১১টি প্রকল্প সমাপ্ত করেছে এবং ৮টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯টি জেলা শিল্পকলা একাডেমি ভবন সংস্কার, জাতীয় চিত্রশালা নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়), ৩৯টি জেলার গ্রন্থাগার নির্মাণ, বাংলা একাডেমি ভবন নির্মাণ, কুমিল্লায় নজরুল ইন্সটিটিউট কেন্দ্র স্থাপন ইত্যাদি। এছাড়া রাজস্ব বাজেটমুক্ত কর্মসূচির আওতায় ৪০টি কর্মসূচি (পিপিএনবি) বাস্তবায়িত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, রামুতে রাখাইন সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট স্থাপন, মীর মোশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্র মেরামত ও সংস্কার, বাংলাদেশ জাতীয় যাদুঘরে ২টি বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শনী স্থাপন, জাতীয় ঋতুভিত্তিক উৎসব, ৬৪টি জেলায় সাংস্কৃতিক মেলার আয়োজন ইত্যাদি। নজরুল ইন্সটিটিউট জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অ্যালবাম প্রকাশ করেছে। এখানে শুদ্ধ সুর ও বাণীতে নজরুল সংগীতের ওপর ৩৫ জন প্রশিক্ষককে ৩ মাস মেয়াদে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এছাড়া ৭টি জেলায় বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির বিকাশ, মাতৃভাষা ও বর্ণলিপি সংরক্ষণ, পুস্তক প্রকাশনা, অ্যালবাম ও ডকুমেন্টারি তৈরি করা হয়েছে। মাতৃভাষা শিক্ষা, ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র, শাস্ত্রীয় সংগীত, তাঁত বুনন ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য সৃজনশীল বই সংগ্রহ ও বিতরণ করা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে সারা দেশব্যাপী ১ বৈশাখ উদযাপন সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৬৪টি জেলা শাখা ও ৬টি উপজেলা শাখা স্থাপনের মধ্য দিয়ে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। আবৃত্তি, নৃত্য, সংগীত, চিত্রাঙ্কন, গিটার ইত্যাদি প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে লক্ষ লক্ষ শিশুর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেয়েছে। জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা ও মৌসুমী প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে শিশু প্রতিভার অন্বেষণ ফলপ্রসূ হয়েছে।
মোদ্দা কথা, দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ সামাজিক সমস্যা নিরসনে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে। দিন বদলের স্বপ্নযাত্রায় ভিশন ২০২১ কে সামনে রেখে এ অর্জন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সুনামগঞ্জের সাচনা: ইতিহাসের আলোকে
  • বদলে গেছে বিয়েশাদীর রীতি
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ঐতিহ্যবাহী পালকী
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ইতিহাসের আলোকে নবাব সিরাজ উদ-দৌলা
  • ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জল শতবর্ষ
  • পুরান পাথরের যুগ থেকে
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • Developed by: Sparkle IT