শিশু মেলা

একতার শক্তি

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১০-২০১৯ ইং ০০:২০:১৫ | সংবাদটি ৭১ বার পঠিত


ওফ, আর ভাল্লাগেনা
সারাদিন শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি
কোথাও না যাওয়া যায়, না কোন কাজ করা যায়।
এভাবেই বৃষ্টিতে বন্দি আলিম উদ্দিন খেদ ঝারছে ছেলের সাথে। আসলেও আজ কয়দিন বৃষ্টি। মাঠ ঘাট পানিতে থই থই। বন্যা বন্যা ভাব। প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের দামও বেড়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের একটি কথা এত বৃষ্টিতে মালামাল আনা যাচ্ছে না। তাহলে কি দাম বাড়িয়ে দিতে হবে? এই প্রশ্ন ভোক্তাদের। কিন্তু কে দেবে উত্তর? কোন উত্তর দাতা নেই। প্রশ্নকারীকেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজতে হয়।
বিকালের আকাশও মেঘে ঢাকা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। আলিম উদ্দিন স্ত্রীকে বলে ছাতাটা দাওতো ঘরে বসে থাকতে থাকতে বিরক্তি লাগছে একটু করিম চাচার বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। রহিমা বেগম ছাতা এগিয়ে দিতে দিতে বলে বেশী দেরী কইরেন না, সন্ধার আগেই চলে আইসেন। আপনার তো আবার করিম চাচার সাথে কথা শুরু করলে বাড়ি আওয়ার মনে থাকব না। আজ কিন্তু অমাবস্যার রাইত আন্ধাইর বেশী অইব।
ও আচ্ছা তুমি ভাল কথা মনে করছ। টর্চ লাইটা দিয়ে দাও।
আলিম উদ্দিন ছাতা আর টর্চ হাতে রওয়ানা হয়। এদিকে ছেলে মেয়েদের সিম বিচি ভেজে দেয় রহিমা বেগম। বৃষ্টিতে সিম বিচি ভাজা খেতেই আলাদা। অবশ্য শহুরে জীবনের গ্রামের সেই আনন্দ মেলা ভার। সামাজিকতা নেই। প্রতিবেশীর কোন খবর নেই। শুধু চার দেয়ালের মাঝে বসবাস করা এক বন্দি জীবন।
কাদা মাখা রাস্তায় আস্তে আস্তে আলিম উদ্দিন করিম চাচার বাড়ির দিকে যায়। গিয়েই জোরে সালাম দিয়ে বলে চাচা বাড়ি আছেন। করিম চাচা কাশতে কাশতে ঘরের বারান্দায় এসে ওয়ালাইকুমুস সালাম বলে জবাব দিয়ে বলে। কে আলিম উদ্দিন যে, আসো বাবা আসো।
আজ কয়দিনতো ঘরের বাইরে যাওয়া যায় না। তোমাদেরতো এখন শরীর শক্ত, বৃষ্টিতে ভিজলেও তেমন কোন সমস্যা হয় না। এই দেখ আমার একটু বৃষ্টির ঠান্ডাতেই কাশি বেড়ে গেছে। এমন সময় ছিল শরীরে শক্তি ছিল কী রোদ কী বৃষ্টি কোন তোয়াক্কাই করতাম না। আর এখন সবকিছুকে হিসাব করে চলতে হয়। এভাবেই আয়ু ফুরিয়ে যাচ্ছে। একদিন হঠাৎ করে আজরাইল সামনে এসে হাজির হবে। আমি না চাইলেও আমাকে নিয়ে যাবে। কোন বাহানা ওজর আপত্তি চলবে না।
দেখ বেশ কয়েকদিন হল, তোমার সাথে দেখাে নেই। আমিতো অসুখ বিসুখে তেমন বের হইনা। আগে এদিক সেদিক যাইতাম। গল্প করতাম। সময় কাটত। এখন গল্প করার মানুষ পাইনা। সবাই ব্যস্ত। সামাজিক রীতি নীতি দায় সারা। মানুষে মানুষে মমতা বিরল। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। নিজেকে নিয়ে বললেও ভুল হবে, শুধু রুটি রোজি, অর্থ সম্পদ নিয়ে ব্যস্ত। আমাদের সময়ে দেখ বিকালে খেলাধুলা থাকতই। তোমাদের সময়ও এটা ছিল। কিন্তু আজ বিকালে খেলা দুরের কথা বন্ধুদের আড্ডাও দেখা যায় না। সবাই আধুনিক প্রযুক্তি নামক নেয়ামতকে ধ্বংসের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ঐ দেখ আমার আরিফের ছেলে আরিয়ান মোবাইল নিয়ে খেলছে। এতো খেলা নয় ধ্বংস। কয়দিন পর দেখা যাবে, তার চোখে সমস্যা, চিন্তায় সমস্যা আরো কত কী।
এই আরিয়ানের মা কই। এদিক দেখতো আলিম উদ্দিন এসেছে। আমাদেরকে চা দাও।
না চাচা চা লাগবেনা।
আরে বেটা বেশ কয়েকদিন আসো না। আজ এসেছ আবার বৃষ্টির দিন। আমারও চায়ের পিয়াস লেগেছে। দুজনে বসে কথা বলব আর চা খাব।
আচ্ছা চাচা। আমিও টর্চ লাইট নিয়ে এসেছি যে চাচার সাথে অনেক দিন গল্প করা হয় না। আজ দেরী হলে যাতে অন্ধাকারে বাড়ি যেতে সমস্যা না হয়। জানেন চাচা আমি যখন আপনার বাড়ি আসার জন্য রহিমার কাছে ছাতা চাইলাম অমনি সে বলে আজ অমাবস্যার রাত তাড়াতাড়ি চলে আইসেন। তখন আমি বললাম তাহলে টর্চ লাইটটা দিয়ে দাও।
শোন আলিম উদ্দিন, তোমার বউ রহিমা খুব ভাল মেয়ে। এই দেখ তুমি শুধু দুটো টাকা রোজগার করে দাও। বলতো ছেলে মেয়েদের নিয়ে কি তোমার কোন চিন্তা করা লাগে? তাদের লেখাপড়া, সুবিধা অসুবিধা কোন কিছু কি তুমি চিন্তা করো? না করো না। তোমার করা লাগে না। ঘরের বউ ভাল হওয়া একজন পুরুষের জন্য আল্লাহ তায়ালার বিরাট নেয়ামত।
জি চাচা আলহামদু লিল্লাহ।
চাচা কয়েকদিন ধরে আমার মাথায় একটি চিন্তা কিলবিল করছে, আমি কোন সদুত্তর পাচ্ছি না। আচ্চা চাচা মুসলমানদের মধ্যে এতো ভেদাভেদ কেন? আমরা চতুর্দিক শুধু মার খাচ্ছি কেন? প্রতিদিনই খবরের কাগজে মুসলমানদের নির্যাতনের খবব পড়ি?
আলিম উদ্দিন তুমি খুব সহজে এই তিনটি প্রশ্ন করে ফেলেছ। এর উত্তরও খুব সোজা। যে আমরা ইসলামের পথে নেই। কিন্তু ভাবনা অনেক। এই তিনটি প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে পারলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এমনকি আমরা প্রত্যেকে আল্লাহ ওয়ালা হয়ে যেতে পারব। দেখ আমাদের শক্তির অভাব নেই। সম্পদেরও অভাব নেই। বিভিন্ন হিসাবে আমাদেরকে গরীব বলা হয়। আসলে তা ভুয়া। পৃথিবীর সব সম্পদের বেশীর ভাগই আমার পায়ের তলায়। যা ছাড়া আধুনিক পৃথিবী এক্কেবারে অচল। আজ ঐ দিকে না যাই। অন্যদিন এই আলোচনা করব। দেখ হয়রত উসমান রাঃ এর আমল থেকে মুসলমানদের মধ্যে এই ভেদাভেদ আর দলাদলি শুরু। তখন ইবনে সাবা নামে একজন ইয়াহুদী মুসলমান ছদ্দাবরণে মুসলমানদের মধ্যে বিভাজনের সৃষ্টি করে। এই বিভাজন উসমান রাঃ শাহাদাত, আলী রাঃ সাথে উষ্টের যুদ্ধ, সিফফিনের যুদ্ধ এমনকি কারবালার হৃদয় বিদারক ঘটনা একেরপর ঘটতে থাকে আজো তা থেমে নেই, চলমান। কেউ আবেগের বসবতি হয়ে, কেউ কিছু না জেনে আমরা অনেক সময় সত্যের বিপরীত ঝাপিয়ে পড়ছি। এতে করে উম্মাহ ক্ষতিগ্র¯ত হচ্ছে। বেদ্বীনরা লাভবান হচ্ছে। এখন মুসলমানদের মধ্যে ইবনে সাবার অনুসারীর অভাব নেই। আর অন্য দিকে সত্য পথ যাত্রীরা শতদা বিভক্ত। এই দেখ ফরজ ওয়াজিব, হালাল হারাম নিয়ে আমাদের মধ্যে কোন মতবিরোধ নেই। ফরজ ওয়াজিব, হালাল হারাম নিয়ে কোন দলাদলি গালাগালিও নেই। ছোট ছোট বিষয় নিয়ে আমরা একে অন্যে মতপার্থক্য করি। মত পার্থক্য থাকতেই পারে। থাকাটা স্বাভাবিক। একটি পরিবারে কয়েকজন সদস্য থাকে, পারিবারিক প্রয়োজনে সকল কাজে সবাই একমত হতে পারে না। মত পার্থক্য থাকে। এখানো মতবিরোধ থাকে না। জেদাজেদি থাকে না। মিল মহব্বাতের মধ্যে মত পার্থক্য থাকা সত্বেও ঐ কাজ বাস্তবায়নে সবাই আঞ্জাম দেয়। কারন পরিবারের প্রতি ভালবাসা, দরদ, শ্রদ্ধা। এখানে একটি লক্ষ্য কাজ করে যে মতবিরোধ করলে পারিবারের ক্ষতি হবে। মানুষ হাসাহাসি করবে। সমাজের মানুষ অন্য চোখে দেখবে। নিজেদের লজ্ঝা হবে ইত্যাদি। আমরা মুসলিম মিল্লাতকে যদি একটি পরিবার ভাবতে পারতাম আর এই পরিবারের প্রতি দরদ ভালবাসা শ্রদ্ধা মায়া থাকত তবে আমাদের এই দশা হত না। কারন তখন আল্লাহর ভালবাসা হৃদয়ে মজবুত আসন গড়ে নিত। এখন আমাদের বিভক্তিতে কেউ আমাদের তোয়াক্কা করে না। আমাদের সমিহ করে না। কারন আমরা ভাইয়ে ভাইয়ে মিল নেই। আলেম সমাজও একে অন্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার। কেউ কাউকে সম্মান করতে চায় না। কারন ইলমের মাধ্যমে আমরা গর্ব অহংকার অর্জন করেছি। আল্লাহ ভীতি ও প্রীতি অর্জন করতে আমরা সক্ষম হইনি।
জি চাচা।
শোন আলিম উদ্দিন, একতার শক্তি অনেক। একতাবদ্ধ কোন জাতিকে কেউ সহজে ধ্বংস করতে পারে না। এমনকি এক পরিবারের তিন ভাই যদি এক থাকে কেউ তাদের দিকে আড় চোখে তাকাতে ভয় পায়। মনে কর তিনটি ১ আলাদা ভাবে লিখে যোগ করলে ১+১+১ =৩ হয়। কিন্তু তিনটি এককে আলাদা না লিখে পাশাপাশি লিখলে তিনটি এক এ ৩ হয় না, ১১১ হয়ে যায়। পাঁচটি পাঁচকে আলাদা করে লিখলে ৫+৫+৫+৫+৫ =২৫ হয়। কিন্তু একসাথে জোড়ে দিলে ৫৫৫৫৫ হয়। একতার শক্তি বহুগুন। তার সাথে যত একত্র হতে থাকে তার শক্তি তখন অনেক অনেক গুন বেড়ে যায়। আজ মুসলিম বিশে^র রাষ্ট্র সংখ্যা, জনসংখ্যা সম্পদ সবগুলো একসাথে হলে কোন নির্যাতন নিপিড়নের কল্পনাও করা যেত না। পৃথিবীর সব জাতি হিসাব করে কথা বলত।
জি চাচা বুঝতে পেরেছি। আচ্ছা চাচা আমাদের কথাতো কেউ শোনবে না। আমরা সাধারণ মানুষ। আমাদের কি করা উচিত?
শোন আলিম উদ্দিন, আমরা মিল্লাতের জন্য দোয়া করতে পারি। তাছাড়া কারো ভুল থাকতে পারে তারপরও আমরা সকলকে ভাই মনে করব। অন্য ভাইয়ের কল্যাণ করব এবং কল্যাণ কামনা করব। যেখানে কাদা ছুড়াছুড়ি আর বদনাম রটনা করা হয় ঐ সকল স্থান এড়িয়ে চলব। তবে আশা করা যায় আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপর সন্তুষ্ট হবেন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT