শিশু মেলা

মিমের মা

আফরীন সুমু প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১০-২০১৯ ইং ০০:২৮:৩৯ | সংবাদটি ১২৭ বার পঠিত

আমাদের মিমের মা। ওনাকে পেয়ে আমি ভীষণ খুশি। এই সময়ে ঢাকা শহরের মতো একটি জায়গায় একজন ভালো মিমের মা পাওয়া সাত কপালের ভাগ্য। কারণ এই সময়ের মিমের মায়েদের নিয়ে নানা যন্ত্রণা। কেউ ফাঁকিবাজ, কেউ অলস, কেউ ধান্দাবাজ, আবার কেউ কেউ চোর। মিমের মা হলেন আমাদের হেল্পিং হ্যান্ড। ভুলক্রমেও ওনাকে কেউ বুয়া বললে পরদিন থেকে উনি আর ওই বাসায় কাজ করেন না। যদিও এই লেখা ওনার পড়ার সম্ভাবনা নেই, তবু রিস্ক নিলাম না। মিমের মায়ের কাজ পরিষ্কার; ঝকঝকে, তকতকে। ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া, থালাবাসন ধোয়া থেকে শুরু করে সব কাজ উনি মেশিনের মতো দ্রুত করে ফেলেন। কাজের কোনো হিসাব নাই। দু-একটি কাজ বাড়তি হলেও আপত্তি করেন না।
চাঁদেরও কলঙ্ক আছে। মিমের মায়ের কলঙ্ক হলো ওনার কথা। কথা না বলে উনি এক মুহূর্তও থাকতে পারেন না। উনি কাজ করতে করতে কথা বলতে থাকেন। কথা বলতে বলতে কান-মাথা ঝালাপালা করে দেন। ওনার কথা রেডিও জকিদের থেকেও দ্রুত। প্রথম যে শুনবে, সে এক বর্ণও বুঝতে পারবে না। মনে হবে, টেপে ফিতা জড়িয়ে গেছে। প্রথম দিকে ওনাকে আমার হুনুলুলুর অধিবাসী মনে হতো। ওনাকে যে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল, সে দোভাষীর কাজ করেছিল। নইলে ওনাকে রাখাই হতো না।
উনি কাজ শুরু করলেন, সেই সঙ্গে কথা। ওনার একটা মুদ্রাদোষ আছে, কথায় কথায় উনি বলবেন, ‘ঠিক কি না কইন?’ এই এক ঠিক কি না কইন বুঝতেই আমার লেগেছে এক মাস। প্রথম প্রথম বুঝতামই না। এরপর মনে হলো- এটা হতে পারে, ঠিহিনা হুইন। তারপর ময়মনসিংয়ের কিছু বাংলা নাটক দেখার পর বুঝলাম- এটা হবে ঠিক কি না কইন। এটা বোঝার পর তার সঙ্গে আলাপজনিত সমস্যার অনেকখানি সমাধান হয়ে গেল। উনি হরবর করে কথা বলতে থাকেন। যখনই জিজ্ঞেস করেন, ঠিক কি না কইন? আমি বিজ্ঞের মতো মাথা ঝাঁকিয়ে বলি, ‘হ্যাঁ, একদম ঠিক।’ ব্যস, মিমের মা খুশি।
একদিন মিমের মা মাছ কাটছিলেন। আমি অন্য কাজ করছি। মিমের মা সব সময়ের মতো আপন মনে বলে চলছে, ‘আফা, কাইলকা আমার সোয়ামির লগে ঝগড়া অইছে। আমি খুঁজ পাইছি, হ্যায় আরেক মাইয়্যার লগে গুরাফিরা করে। আমি হ্যারে জিগাইছি। পরথমে স্বীকার যায় নাই। ফরে কয়, হ হেইলার ওই ছেড়িরে বালা লাগে। আমি কইছি, আমি ওই ছেড়িরতুন কম কিও। ঠিক কি না কইন?’
আমি বললাম, ‘একদম ঠিক।’
-হেইলায় আমারে কী কয় জানেন?
আমি বললাম, ‘একদম ঠিক।’
-আমার চেহারা বলে বালা না।
-একদম ঠিক।
-আমার দাঁত বলে তেঁতুলের বিচির লাহান কালা।
-একদম ঠিক।
-আমি বলে বাইট্টা, খাইট্টা।
-একদম ঠিক।
মিমের মা মাছ কাটা রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনেরে আমি এত বালা জানি। আফনেও আমারে এম্বা কতা কইতে ফারলেন?’
অমি অন্যমনস্কভাবে বলেই যাচ্ছি, ‘একদম ঠিক।’
এবার মিমের মা রেগে টং হয়ে সব ছেড়েছুড়ে উঠে বললেন, ‘করুম না আর আফনের কাম। আফনে ওই ব্যাডার ফক্ক লইয়া কতা কইছেন। থাহেন আফনে আফনের কাম লইয়া।’
এতক্ষণে আমার টনক নড়ল। হায় হায়! এ আমি কী করেছি? ওই এক ‘ঠিক কি না কইন’-এর উত্তর সব জায়গায় কপি পেস্ট করে মিমের মায়ের মেজাজের ১২টা বাজিয়ে দিয়েছি। জিবে কামড় দিয়ে তাড়াতাড়ি মিমের মাকে বোঝাতে লেগে গেলাম। আর ঠিক করলাম, যে করেই হোক মিমের মায়ের হুনুলুলু ভাষা রপ্ত করতে হবে। ‘একদম ঠিক’ দিয়ে আর কাজ চালানো যাবে না। কারণ কোনোভাবেই মিমের মাকে হারানো চলবে না।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT