ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-১০-২০১৯ ইং ০০:৩৮:৪৭ | সংবাদটি ১৮৬ বার পঠিত

কুরআনের অন্য এক জায়গায় এ বিষয়টি এভাবে বর্ণিত হয়েছে : ‘যখন তারা শরীয়ত বিরুদ্ধ কাজে সংযমী হলো এবং আমার নিদর্শনবলীতে বিশ্বাসী হলো, তখন আমি তাদেরকে নেতা করে দিলাম, যাতে আমার নির্দেশ অনুযায়ী মানুষকে পথ প্রদর্শন করে।’
এই আয়াতে ‘সংযম ও বিশ্বাস’ শব্দদ্বয়ের মধ্যে পূর্বোক্ত ত্রিশটি গুণ সন্নিবেশিত করে দেয়া হয়েছে। সংযম হলো শিক্ষাগত ও বিশ্বাসগত পূর্ণতা আর বিশ্বাস কর্মগত ও নৈতিক পূর্ণতা।
পঞ্চম প্রশ্ন ছিলো এই যে, পাপাচারী ও জালেমকে নেতৃত্বলাভের সম্মান দেয়া হবে না বলে ভবিষ্যত বংশধরদের নেতৃত্বলাভের জন্যে যে বিধান ব্যক্ত রয়েছে, তার অর্থ কি?
এর ব্যাখ্যা এই যে, নেতৃত্ব এক দিক দিয়ে আল্লাহ তা’আলার খেলাফত তথা প্রতিনিধিত্ব। আল্লাহর অবাধ্য ও বিদ্রোহীকে এ পদ দেয়া যায় না। এ কারণেই আল্লাহর অবাধ্য ও বিদ্রোহীকে স্বেচ্ছায় নেতা বা প্রতিনিধি নিযুক্ত না করা মুসলমানদের অবশ্য কর্তব্য।
হযরত খলীলুল্লাহ্র মক্কায় হিজরত ও কা’বা নির্মাণের ঘটনা :
এই আয়াতে কা’বা গৃহের ইতিহাস, হযরত ইবরাহিম ও হযরত ইসমাইল (আ.) কর্তৃক কা’বা গৃহের পুনঃনির্মাণ, কা’বা ও মক্কার কতিপয় বৈশিষ্ট্য এবং কা’বা গৃহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন সম্পর্কিত বিধি-বিধান উল্লেখিত হয়েছে। এ বিষয়টি কুরআনের অনেক সুরায় ছড়িয়ে রয়েছে।
হরম সম্পর্কিত মাসায়েল :
১. ‘মাছাবাহ’ শব্দ থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা কা’বা গৃহকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। ফলে তা সর্বদাই মানবজাতির প্রত্যাবর্তনস্থল হয়ে থাকবে এবং মানুষ বরাবর তার দিকে ফিরে যেতে আকাঙ্খী হবে। মুফাসসির শ্রেষ্ঠ হযরত মুহাজির বলেন, অর্থাৎ, কোনো মানুষ কা’বা গৃহের যেয়ারত করে তৃপ্ত হয় না, বরং প্রতি বারই যেয়ারতের অধিকার বাসনা নিয়ে ফিরে আসে। কোনো কোনো আলেমের মতে কা’বা গৃহ থেকে ফিরে আসার পর আবার সেখানে যাওয়ার আগ্রহ হজ কবুল হওয়ার অন্যতম লক্ষণ। সাধারণভাবে দেখা যায়, প্রথমবার কা’বা গৃহের যেয়ারত করার যতোটুকু আগ্রহ থাকে, দ্বিতীয়বার তার আরও বৃদ্ধি পায় এবং যতবারই যেয়ারত করতে থাকে, এ আগ্রহ উত্তরোত্তর ততোই বেড়ে যেতে থাকে।
এবিষ্ময়কর ব্যাপারটি একমাত্র কা’বারই বৈশিষ্ট্য। নতুন জগতের শ্রেষ্ঠতম মনোরম দৃশ্যও এক-দু’বার দেখেই মানুষ পরিতৃপ্ত হয়ে যায়। পাঁচ-সাতবার দেখলে আর দেখার ইচ্ছাই থাকে না। অথচ এখানে না আছে কোনো মনোমুগ্ধকর দৃশ্যপট, না এখানে পৌঁছা সহজ এবং না আছে ব্যবসায়িক সুবিধা, তা সত্ত্বেও এখানে পৌঁছার আকুল আগ্রহ মানুষের মনে অবিরাম ঢেউ খেলতে থাকে। হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে অপরিসীম দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে এখানে পৌঁছার জন্যে মানুষ ব্যাকুল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।
২. এখানে ‘আ’মান্না’ শব্দের অর্থ ‘মা’মিন’ অর্থাৎ, শান্তির আবাসস্থল ‘বাইত’ শব্দের অর্থ শুধু কা’বা গৃহ নয়, বরং সম্পূর্ণ হরম। অর্থাৎ, কা’বা গৃহের পবিত্র প্রাঙ্গণ। কুরআনে ‘বাইতুল্লাহ ও কা’বা’ শব্দ বলে যে সম্পূর্ণ হরমকে বোঝানো হয়েছে, তার আরও বহু প্রমাণ রয়েছে। যেমন, এক জায়গায় বলা হয়েছে : ‘হাদিয়াম বালিগাল কা’বাতি’ এখানে ‘কাবাতি’ বলে সমগ্র হরমকে বোঝানো হয়েছে। কারণ, এতে কুরবানীর কথা আছে। কুরবানী কা’বা গৃহের অভ্যন্তরে হয় না এবং সেখানে কুরবানী করা বৈধও নয়। কাজেই আয়াতে অর্থ হবে যে, ‘আমি কা’বার হরমকে শান্তির আলয় করেছি।’ শান্তির আলয় করার অর্থ মানুষকে নির্দেশ দেয়া যে, এ স্থানকে সাধারণ হত্যা ও যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদি অশান্তিজনিত কার্যকলাপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। (ইবনে আরাবী)
৩. এখানে মকামে ইবরাহিমের অর্থ ঐ পাথর, যাতে মু’জেযা হিসাবে হযরত ইবরাহিম (আ.) এর পদচিহ্ন অঙ্কিত হয়ে গিয়েছিলো। কা’বা নির্মাণের সময় এ পাথরটি তিনি ব্যবহার করেছিলেন। (সহীহ বুখারী)
হযরত আনাস (রা.) বলেন, আমি এই পাথরে হযরত ইবরাহিম (আ.) এর পদচিহ্ন দেখেছি। যেয়ারতকারীদের উপর্যুপরী স্পর্শের দরুন চিহ্নটি এখন অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। (কুরতুবী)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে মকামে ইবরাহিমের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বর্ণিত রয়েছে যে, সমগ্র হরমটিই মকামে ইবরাহিম। এর অর্থ বোধ হয় এই যে, তওয়াফের পর যে দু’রাকআত নামায মকামে ইবরাহিমে পড়ার নির্দেশ আলোচ্য আয়াতে রয়েছে, তা হরমের যে কোনো অংশে পড়লেই চলে। অধিকাংশ ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদ এ ব্যাপারে একমত।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT