ধর্ম ও জীবন

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের কৃতকর্মেরই ফল

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-১০-২০১৯ ইং ০০:৪৩:২২ | সংবাদটি ২৮৪ বার পঠিত

পৃথিবীতে নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, সুনামি, খরা, ভূমিকম্প, বন্যা, নদী ভাঙন, শিলাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি ইত্যাদি প্রাকৃতি দুর্যোগ পৃথিবীতে কোনো না কোনো অঞ্চলে ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে উপস্থিত হয়। কখনো কখনো এমন প্রলয়রূপে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে যে, ঘটিয়ে যায় মহা ধ্বংসযজ্ঞ। বড় বড় জনপদ শেষ হয়ে যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জন্য মহাবিপদ, মহাবিপর্যয়। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের উপর বিপদ-বিপর্যয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে তাদের পাপের কারণে, তাদের লাগামহীন জীবনযাপন এবং আল্লাহর বিধি নিষেধের অবাধ্যতার কারণে। পবিত্র কুরআনের অগণিত আয়াতে বর্ণিত হয়েছেÑ পূর্বেকার বহু জাতি আল্লাহর অবাধ্যতা, নবী ও রাসুলগণের প্রতি ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চরম বিরোধিতার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাধ্যমে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের ‘সুরা শুআ’রার’ ১০৫ নম্বর আয়াত থেকে ২০৯ নং আয়াতে বিশেষভাবে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে মানুষের অন্যায় অপকর্মের কারণে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে; যার ফলে তাদেরকে তাদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করান যাতে তারা ফিরে আসে’। (সূরা : রুম, আয়াত : ৪১)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘কল্যাণ যা তোমার হয় তা আল্লাহর নিকট হতে এবং অকল্যাণ যা হয় তা তোমার নিজের কারণে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৭৯)
উক্ত আয়াতগুলোর ব্যাখায় বিভিন্ন তাফসির গ্রন্থে বলা হয়েছে, বিপর্যয় অকল্যাণ বলতে বন্যা, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, খরা, অগ্নিকান্ড, মহামারী, দুর্ভিক্ষ ও শিলাবৃষ্টি ইত্যাদি আপদ-বিপদকে বুঝানো হয়েছে। আর এসব পার্থিব বিপদাপদের কারণ হচ্ছে মানুষের কুকর্ম ও গুনাহ। অতএব মানুষকে যেসব বিপদাপদ স্পর্শ করে, সেগুলো তাদেরই কৃতকর্মের কারণে। অনেক গুনাহ তো আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। প্রত্যেক গুনাহর কারণে বিপদ আসে না। প্রত্যেক গুনাহর কারণে যদি বিপদ-বিপর্যয় আসতো তাহলে পৃথিবীতে একটি প্রাণীও বেঁচে থাকতো না। আল্লাহপাক যে গুনাহগুলো ক্ষমা করেন না; সেগুলোর পুরোপুরি শাস্তি দুনিয়াতে দেন না; বরং সামান্য স্বাদ আস্বাদন করানো হয় মাত্র। মানুষের গুনাহের কারণে আল্লাহপাক প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিয়ে থাকেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আরো ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘বলো, তিনিই শক্তিমান যে, তোমাদের উপর শাস্তি উপর দিক থেকে (বৃষ্টিতে প্লাবন, তীব্র ঝড়ো হাওয়া অথবা শিলাবৃষ্টি) অথবা তোমাদের পদতল থেকে (ভূমিকম্প) প্রেরণ করবেন অথবা তোমাদেরকে দলে-উপদলে বিভক্ত করে সবাইকে মুখোমুখি করে দেবেন এবং একে অন্যের উপর আক্রমণের স্বাদ-আস্বাদন করাবেন। দেখ, আমি কেমন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিদর্শনাবলী বর্ণনা করিÑ যাতে তারা বুঝে নেয়’। (সুরা : আনআম, আয়াত : ৬৫)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘তাদের প্রত্যেকেই তার অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিলাম; তাদের কারো প্রতি প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচন্ড ঝটিকা, তাদের কাউকেও আঘাত করেছিল মহানাদ, কাউকে আমি প্রোথিত করেছিলাম ভূগর্ভে এবং কাউকে করেছিলাম নিমজ্জিত। আল্লাহ তাদের প্রতি কোনো জুলুম করেন নি; তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিলো।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪০)
আল্লাহপাক আরো ইরশাদ করেনÑ ‘তোমরা কি নিশ্চিত আছ যে, আকাশে যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদেরকেসহ ভূমিকে ধ্বসিয়ে দিবেন না আর উহা আকস্মিকভাবে থর থর করে কাঁপতে থাকবে। অথবা তোমারা কি নিশ্চিত আছ যে, আকাশে যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদের উপর কংকরবর্ষী ঝঞ্ঝা প্রেরণ করবেন না? তখন তোমরা জানতে পারবে কিরূপ ছিলো আমার সতর্কবাণী!’ (সুরা : মুলক, আয়াত : ১৬-১৭)
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জন্য মহাবিপদ। পরাক্রমশালী আল্লাহর আদেশেই ধ্বংসাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে থাকে। কাজেই এগুলো রোধ করার ক্ষমতা কারো নেই, হতেও পারে না। এক্ষেত্রে মানুষ অসহায় এবং ক্ষমতাহীন। মানুষ যখন লাগামহীন পাপাচারে লিপ্ত হয় তখন তাদেরকে পাপ থেকে বিরত রাখার জন্য ধমকি স্বরূপ আপদ-বিপদ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিয়ে আল্লাহপাক তাদেরকে পরীক্ষা করে থাকেন। আর মানুষের উপর আপদ-বিপদ আসে আল্লাহর নির্দেশেই। আল্লাহর হুকুম ব্যতিত কোনো বিপদ আসে না, আল্লাহর হুকুম ব্যতিত একটি পাতাও নড়ে না। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘আল্লাহর অনুমতি ব্যতিত কোনো বিপদই আপতিত হয় না।’ (সুরা : তাগাবুন, আয়াত : ১১)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘জলে ও স্থলে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত; তাঁর অজ্ঞাতসারে একটি পাতাও পড়ে না।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৫৯)
প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু মানুষের জন্য নয়; বরং সমস্ত সৃষ্টির জন্য মহাবিপদ। কারণ এতে সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই মহাবিপদ থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হলো মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনে ক্ষমা প্রার্থনা করা। আল্লাহপাক দয়াপরবশ হয়ে ক্ষমা করে দিলে আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের তান্ডব থেকে রক্ষা পাব। রাসুলে পাক (সা.) এ ব্যাপারে আমাদের জন্য মহান আদর্শ স্থাপন করে গেছেন। যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্ভাবনা দেখা দিতো, যখন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হতো, ঝড়-তুফান আসতো তখন রাসুল(সা.) এর চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে যেতো এবং তিনি বিপদের আশঙ্কায় একবার বাইরে যেতেন, একবার ঘরের ভিতরে প্রবেশ করতেন এবং একবার সামনে অগ্রসর হতেন, একবার পিছনে সরে আসতেন। এ সময় বারবার মহান আল্লাহর দরবারে বিপদ মুক্তির জন্য দোয়া করতেন। তারপর যখন স্বাভাবিকভাবে বৃষ্টি হতো, তখন তাঁর চেহারা মোবারক পরিস্কার হয়ে যেতো। (বুখারী ও মুসলিম)
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেন, ‘যখন বায়ু প্রবাহিত করতে শুরু করতো, তখন রাসুল (সা.) জানু ঠ্যাস দিয়ে বসতেন এবং বলতেন, আল্লাহ! এটাকে রহমত স্বরূপ করো, আজাব স্বরূপ করো না। আল্লাহ! এটাকে বাতাসে পরিণত কর এবং ঝড়ে পরিণত করনা। (বায়হাকী)
হযরত আয়শা (রা.) বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) যখন আকাশে মেঘ দেখতেন, তখন কাজকর্ম ত্যাগ করে তার দিকেই নিবিষ্ট হয়ে যেতেন এবং দোয়া করতেন হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই এতে যা মন্দ আছে তা হতে। এতে যদি আল্লাহ মেঘ পরিস্কার করে দিতেন তিনি আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করতেন। আর যদি বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হতো তখন তিনি দোয়া করতেন, হে আল্লাহ! উপকারী পানি দান করো’। (আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেন, রাসুল (সা.) যখন মেঘের গর্জন ও বজ্রপাতের শব্দ শুনতেন তখন দোয়া করতেন ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে তোমার গজব বা রোষের দ্বারা হত্যা করো না এবং তোমার আজাবের দ্বারা আমাদেরকে ধ্বংস করো না; বরং এর আগেই আমাদেরকে শান্তি দান করো’। (আহমদ, তিরমিজি, মিশকাত শরীফ : পৃষ্ঠা-১৩৩)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT