পাঁচ মিশালী

ভদ্রলোকের সন্ধানে

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১০-২০১৯ ইং ০০:০৫:৩১ | সংবাদটি ৪৬ বার পঠিত

গায়ে হাওয়াই সার্ট, মাথায় আলবাট, পাতলুন যার আঁটসার্ট তিনি ভদ্রলোক। ভদ্রলোক কে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এ ধরণের কিছু বাক্য স্মৃতির জানালায় এসে ধাক্কা দেয়। অনেক আগে, তা বছর ত্রিশ আগে তো হবেই, বঙ্কিম বাবুর বরাত দিয়ে কার যেন একটা লেখা পড়েছিলাম। বড় রসালো ভাষায় কিছুটা ছান্দসিক কারুকাজে ভদ্রলোকের আলামত বয়ান করা হয়েছিল ঐ লেখায়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যিনি পাল উড়াতে জানেন সম্ভবত তাঁকেই ঐ লেখায় ভদ্রলোক আখ্যায়িত করা হয়েছিল। না, হুবহু মনে নেই সেই ভাষা। তবে যতদূর মনে পড়ে, ঐ রচনায় এমনও কিছু আলামত ছিল যা সব যুগের ভদ্রলোকের উপর প্রযোজ্য। এই ধরুন নিজের বউয়ের রান্নায় যার পেট ভরেনা, পরের বউর হাতের খেয়ে যার আনন্দ ধরেনা, সিনেমার নায়িকা যার মেয়ের খালা, ঘরের বউ যার চোখের জ্বালা তিনি ভদ্রলোক। কিন্তু পাঠক কেবল এসব আলামতেই সন্তুষ্ট হতে পারেন না। আসামীকে হাতে নাতে ধরার বাসনা থাকা স্বাভাবিক।
আর তাই সব যুগেই ভদ্রলোককে খোঁজাখুঁজি হয়েছে। বঙ্কিম বাবুর সময়, তার পর এবং এখনো এ অনুসন্ধান চলছে। সিলেটের ডাকের চিঠিপত্র কলামে একবার জনৈক পাঠক জানতে চেয়েছিলেন ভদ্রলোকের সংজ্ঞা। এর রেশ ধরে প্রথমেই স্মৃতির জানালায় ধাক্কা দিয়েছিল ঐ লেখাটি। কিন্তু উদ্ধার সম্ভব হয়নি। তারপরই মনের পর্দায় ভেসে উঠছে প্রাথমিক স্কুলের সেই শুভ্র টিপটপ স্যার-কে যমের মত ভয় করতো সবাই। মাথায় ধবধবে সাদা টুপি-দূর থেকে দেখেই শত শত ছেলে-মেয়ে মুহূর্তে চুপ। তাঁকে বলতাম ভদ্রতা স্যার। তিনি ক্লাশে এসেই দেখতেন নখ, দাঁত, চুল আর পরনের কাপড়। অনেকেরই হাতে তখন পড়তো সপাং সপাং বেতের বাড়ি। যেহেতু ঐ স্যারকে সবাই বলতো ভদ্রতা স্যার তাই আমার এমন একটা ধারণা হয়ে গিয়েছিল যে, ভদ্রতার সাথে নখ, চুল আর দাঁতের সম্পর্কই প্রধান। অর্থাৎ সুন্দর করে ছাঁটা চুল, দৈনিক কর্তিত নখ, ধবধবে সাদা দাঁত যার তিনি ভদ্রলোক না হয়ে পারেন না।
কিন্তু ঐ ধারণা শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। কারণ ভদ্র, অভদ্র, ভদ্রতা অভদ্রতা শব্দাবলী এত ব্যবহৃত এবং উচ্চারিত যে শৈশবের বিদ্যা এর চাপে পড়ে গুলিয়ে গেছে। তাই নতুন করে খুঁজতে হয় ভদ্রলোককে।
টিপটপ লেটেস্ট মডেলের আনকোরা গাড়ী, গা থেকে ভুর ভুর করে ছড়ায় বিদেশী সেন্টের সুগন্ধ; এমন লোককে এক বাক্যে কি সবাই ভদ্রলোক মেনে নেবেন? ভেতরে জিলিপির পেচ, মুখে মিষ্টি হাসির ছররা, কথা বলতে গিয়ে বিনয়ে গলে পড়েন-তিনি কি ভদ্রলোক? কূটনীতির এই যুগে কেউ কেউ মনে করে জানের শত্রুকে সামনে পেলেও ঠোঁটে হাসি ছড়িয়ে কথা বলাটা ভদ্রতার দাবি। মনে মনে লোকটাকে নিকুচি করবেন আর মুখে তাকে আপ্যায়ন করবেন হাসি দিয়ে। এমন আচরণকে ভদ্রতা বলবেন?
এক যুগে তো ভদ্রলোকের সন্তান বলে বিশেষ এক শ্রেণীর লোক মৌরসী সুবিধা ভোগ করেছেন। একটু চোখে লাগে এমন তরুণের প্রতি সবচেয়ে ভালো যে বাক্যটি ছুঁড়ে দেয়া হত সেটি ‘ও দেখে তো মনে হয় ভদ্রলোকের ছেলে।’
ভদ্রলোক এর আবার স্ত্রীলিঙ্গ হচ্ছে ভদ্রমহিলা। অতএব ভদ্রমহিলাদের ব্যাপারেও সংজ্ঞা খোঁজা যেতে পারে। কিন্তু বোধ করি ভদ্রলোক খুঁজে বের করার চেয়ে সে কর্মটি বেশি বিপজ্জনক তাই থাক। দেখা যাক ভদ্রলোক নিয়ে শাস্ত্রে কি বলে। জ্ঞানী-গুণীরা কি বলে গেছেন।
বার্টান্ড রাসেল (সম্ভবত) বলেছেন A man becomes a gentleman only by overcoming his natural instinct. প্রকৃতিদত্ত প্রবৃত্তিকে জয় করেই একজন লোক ভদ্রলোক হতে পারে। এই বাটখারায় দেখা যেতে পারে কারা ভদ্রলোক। প্রবৃত্তি নিশ্চয়ই মন্দ অর্থে। এ যুগে ক’জন লোক একান্ত আপন জগতে প্রবৃত্তির সেবা থেকে বিরত? নিশ্চয়ই মানদন্ডটি বড় জটিল। তাই ওদিকে না গিয়ে আমরা এ যুগে ধুপদুরস্ত লেবাস, মালদার টি.ভি, ফ্রিজ, গাড়ীওয়ালা ব্যক্তিদের সহজে ভদ্রলোক বলে চিহ্নিত করে নেই। কিন্তু এ রাসেলই আবার বলেছেন, সভ্যতা ভদ্রতা প্রভৃতি বস্তুর সাথে নয় বরং মানসিক চেতনার সাথে জড়িত। ভদ্রতা মাল সামানার বিষয় নয়, বিত্তের নয়, চিত্তের ধন। ডাঃ লুৎফুর রহমানও অনুরূপ বলেছেন-ঐ যে পায়ে দামী জুতা নেই, বুকে ঘড়ি নেই শত শত লোক তোমাকে দেখে মাথা নোয়ালো না, তাতে ভয় পেয়োনা ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথও বলেছেন, টাকা থাকিলে বড় মানুষী অথবা নবাবী করা চলে কিন্তু ভদ্রতা অর্জন করা যায় না।
এরপরও ভদ্রলোকের জীবন্ত কোনো চিত্র শব্দে ফুটিয়ে তোলা যাচ্ছেনা। হ্যাঁ, শেখ সাদীর বাণী: ভদ্রলোক সেই, বড় সেই, যে সত্যের উপাসক। যে মনুষ্যত্বকে সমাদর করে, চরিত্র ও মহত্ব যার গৌরব। ডাক্তার লুৎফুর রহমানের আরেকটি সংজ্ঞা ভদ্রলোক চিনে নিতে সাহায্য করে। তাঁর ভাষায়, পরের জন্য ত্যাগ স্বীকার, নিজের সুখের সঙ্গে সঙ্গে পরের সুখের প্রতি দৃষ্টি রাখা, পরকে আঘাত না দেয়া, অর্থ দিয়ে হোক বা পরিশ্রম করে হোক অন্যকে সাহায্য করার নাম ভদ্রতা। এসব সংজ্ঞা এবং প্রয়াস থেকে ভদ্রলোকদের মোটামোটি একটি আইডিয়া নেয়া যায়। আসলে ভদ্রতা চরিত্রের একটি গুণ। একটি নয় অনেক গুণের সমাহার। এ সব গুণাবলীরর প্রকাশ যিনি চিন্তায় কথায় আচার আচরণে ঘটান তিনিই ভদ্রলোক।
ভদ্রতার বিপদ ও আছে। প্রকৃত ভদ্রতাকে এ যুগে অনেকেই দুর্বলতা ধরে নেয়। ভদ্র হলে অন্যজন কাঁধে চড়ে বসতে পারে। আবার ভদ্রতার আকালে কেউ কেউ ভদ্র ব্যবহারকে বিপরীতভাবে ব্যঙ্গ হিসেবে ধরে নেয়। এই সিলেট শহরে প্রদীপ অর্থ বোধক একটি ‘ব্রাদার্স’ যুক্ত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে একজন খদ্দের তৃতীয় বার একটি এ্যালবাম দেখানোর সময় ভদ্রলোকের মত বললেন ‘ভাই কষ্ট না হলে দয়া করে আরেকটি এ্যালবাম দেখান।’ মালিক ম্যানেজার ঐ ভদ্রতাকে বিদ্রƒপ ধরে নিয়ে চটে লাল। কিতা সাব, তেড়াবেড়া মাতইন কেনে? কষ্ট অইলে আর বইছি কেনে? বুঝতেই পারছেন মাছ বাজার অথবা পান বিড়ির হাঁটে যদি ভদ্রতা দেখান তাহলে পৈত্রিক প্রাণ বিপন্নও হতে পারে।
গায়ের হাওয়াই সার্ট, মাথায় আলবাট দিয়ে ভদ্রলোক চেনা যায় না। এমনকি সংজ্ঞা দিয়েও নয়। তবে একটি চরিত্রকে সামনে রাখলে ভদ্র এবং ভদ্রতা বিষয়ক জটিলতা শেষ হয়ে যেতে পারে। আর সে চরিত্র আল কোরআনের ভাষায় উসওয়াতুন হাসানা। মহত্তম আদর্শ হযরত মুহম্মদ (সাঃ)। উপদেশ, কাব্য শব্দ প্রভৃতির চেয়ে উদাহরণ সব সময়ই উত্তম।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT