উপ সম্পাদকীয়

‘জাতীয়’ শব্দের ব্যবহার প্রসঙ্গ

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১০-২০১৯ ইং ০০:০৭:৫৪ | সংবাদটি ৭২ বার পঠিত

আমাদের এই দেশে যে ভুলটি হয়ে যায় অসচেতনভাবে আমাদের দ্বারা তা হলো জাতীয় শব্দটির যথেচ্ছা ব্যবহার। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৃথিবীর অনেক দেশ সহ বাংলাদেশের অনেক কিছুই স্বীকৃতি পায় জাতিসংঘের মাধ্যমে। স্বীকৃতি প্রাপ্তির খবর তখন ঘোষিত হয় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে। উদাহরণ হিসেবে এখানে বলা যায় আমাদের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কথা যা প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বে পালিত হয়। এটি মূলত বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে ১৯৫২ খ্রিষ্টীয় সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া ভাষা আন্দোলন। সেই আন্দোলনের মাধ্যমে শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার সহ আরো বহুজনের প্রাণের বিনিময়ে বাঙালির মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়ে যায়। এমনিভাবে আমাদের দেশের আভ্যন্তরীণ অনেক কিছু আছে যা আমাদের জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয় এবং পরবর্তীতে নানান দিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তা জাতীয় হিসেবে স্বীকৃত হয়। কোনো কিছুর জাতীয় স্বীকৃতি এমনি এমনি হয়ে যায় না। যে কোনো কিছু জাতীয় স্বীকৃতি পায় সমাজ, দেশীয় সংস্কৃতি এবং বিশেষ করে মানুষের মাঝে তার কতোটা প্রভাব আছে এসব বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়েই। তবে এ কাজটি যে কোনো নাগরিকের ঘোষণায় বা কোনো সংস্থা কর্তৃক প্রকাশ পেলেই তা প্রকৃত অর্থে জাতীয় বলে স্বীকৃত হয় না। অথচ এমনি ধরণের অনেক ভুল আমরা সহজেই করে চলেছি প্রতিনিয়ত অসচেতনভাবে। এসব ভুল না করাই উত্তম। হ্যাঁ আমাদের দেশের জাতীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অনেক কিছু আছ, যা আমাদেরকে সচেতনভাবে মনে রাখতে হবে। তাহলে আর যে কেউ যে কোনো বস্তু, সংগঠন বা প্লাটফর্মের নামের আগে ‘জাতীয়’ শব্দটি ব্যবহার করতে চেষ্টা করবেন না। আবার কেউ কেউ তেমনটি করলে না ভেবেই সকল মানুষ একসাথে সেটিই মেনে নিবে না। তাহলে আসুন আমার এ পর্যন্ত জাতীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে জানতে চেষ্টা করি এবং পাশাপাশি সহজে একটি ভুল ব্যবহার সম্পর্কে জানতে সচেষ্ট হই।
নিশ্চয়ই সকলেরই জানা, আমাদের জাতীয় প্রতীক আছে যা দুই পার্শ্বে ধানের শীর্ষ বেষ্টিত, পানিতে ভাসমান জাতীয় ফুল শাপলা, শীর্ষ দেশে পরস্পর সংযুক্ত তিনটি পাট গাছের পাতা এবং তার উভয় পার্শ্বে দু’টি করে তারকা চিহ্ন। এগুলো আমাদেরকে চিনে রাখতে হয় নিজেকে জানার জন্যেই। লাল-সবুজের পতাকা নামে আমাদের কাছে খুব বেশি পরিচিত বাংলাদেশের একটি জাতীয় পতাকা সরকারিভাবে স্বীকৃত আছে। এমনিতে পতাকাটি আয়তাকার এবং পতাকার সবুজ জমিনে লাল বৃত্ত। ১৯৭১ খ্রিষ্টীয় সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একটি পতাকা ব্যবহৃত হয়েছিলো যা সবুজ জমিনে লাল বৃত্তের ভিতর তৎকালীন বাংলাদেশের হলুদ মানচিত্র। ওই পতাকার উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে নক্সা ঠিক করে ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি বর্তমান জাতীয় পতাকাটি সরকারিভাবে গৃহীত হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, কোনোকিছু জাতীয় স্বীকৃতি পেতে হয় রাষ্ট্রীয়ভাবে। সেদিক থেকে যে কোনো প্রতিষ্ঠান, বস্তু, দল বা প্ল্যাটফর্ম এর সাথে জাতীয় শব্দ সংযুক্ত করে মুখে মুখে প্রচার করাও সমীচীন হবে না।
আমাদের জাতীয় সংগীত যেমন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ তদ্রুপ আমাদের জাতীয় ফুল ‘শাপলা’ স্বীকৃত। আমরা জানি বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েল, জাতীয় মাছ ইলিশ, জাতীয় বৃক্ষ আম গাছ, জাতীয় বন সুন্দরবন, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জাতীয় পার্ক শহীদ জিয়া শিশু পার্ক এমনকি বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ হলো বায়তুল মোকাররম মসজিদ। জাতীয় ফল হচ্ছে কাঁঠাল। এসব কিছুই জাতীয়ভাবে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে জাতীয় স্বীকৃতি পাওয়া। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক কিছু আছে যা ব্যক্তি পর্যায়ে মুখে মুখে জাতীয় নাম নিয়ে উচ্চারিত হয় এবং তা অনেকের মাঝে চলতে থাকে। যেমন ধরুন, ঢাকা থেকে কয়েকজন মিলে একটি সংগঠন গড়ে তুললেন, নাম দিলেন ‘জাতীয় ক সংঘ’। এমনও দেখা যায় কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা আর্থিক কোনো প্রতিষ্ঠানের নামের আগে জাতীয় শব্দটি জুড়ে দিয়ে বহুল প্রচার চলছে সারাদেশে। আমার কথা হলো, যেহেতু কোনোকিছু রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় ঘোষিত হলে তা জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ হয় তাই জাতীয় শব্দটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। নিশ্চয়ই এমন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বাধীনতার এতোগুলো বছর পরেও এতোটা উদাসীন থাকা ঠিক নয়। পাশাপাশি জনসচেতনতা জরুরী। আমি খুব ভালোভাবেই লক্ষ্য করে দেখেছি, যে কোনো বিষয়ের সাথে ভুলভাবে জাতীয় শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের লেখাপড়া জানা মানুষই অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। আমাদের অতি সাধারণ একটি ভুল হলো, রাজধানী থেকে কোনো পত্রিকা এলে বাংলাদেশের সকল জায়গার মানুষ এটিকে জাতীয় পত্রিকা বলে ফেলি। কিন্তু যদি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসি, আমাদের জাতীয় পত্রিকা কি? উত্তর হবে, অন্যান্য অনেক জাতীয় স্বীকৃত বিষয়ের মতো আমাদের এখনো জাতীয় কোনো পত্রিকা নাই। অথচ ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাকে আমরা সহজে না ভেবেই জাতীয় পত্রিকা বলে থাকি। বাস্তবতা হলো সিলেট থেকে যেমন দৈনিক সিলেটের ডাক সহ অন্যান্য পত্রিকা তেমনি ঢাকা থেকে প্রথম আলো, যুগান্তর ইত্যাদি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। সেদিক থেকে বাংলাদেশে জাতীয় পত্রিকা বলে কোনো ঘোষণা নাই। এসব বিষয়ে এখন থেকেই সচেতন হতে হবে। দৈনিক সিলেটের ডাকে গত ২১ জুন ‘বৃদ্ধাশ্রম নয় বৃদ্ধালয়’ শিরোনামে আমার একটি লেখা ছাপা হয়েছিলো। সেখানে আমি উল্লেখ করেছি শব্দ প্রয়োগে আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে। যেনতেন রূপে যে কোনো বিষয়ে যে কোনো শব্দ ব্যবহার পরিহার করতে হবে। এই লেখাটির মূল বিষয় বুঝানোর জন্যে লেখার পরিসর বাড়ানোর আর প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনা।
পরিশেষে বলছি, আমাদেরকে শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটু সচেতন হতে হবে। রাজধানী ঢাকা কিংবা বন্দর নগরী চট্টগ্রাম থেকে যে কোনো কিছুর সাথে ‘জাতীয় শব্দ’ ব্যবহার করলেই আমরা সেটা মেনে নেবোনা। অনেক সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামের আগে ‘জাতীয়’ শব্দের ব্যবহারে সাধারণ মানুষ অধিক আস্থা রেখে বিভ্রান্ত হয়, প্রতারিত হয়। এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • ‘জঙ্গি’ অপবাদ প্রসঙ্গে
  • ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে
  • মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই বদলে দেবে বাংলাদেশ
  • যানজটে লোকসান ও ভোগান্তি
  • বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস
  • আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?
  • আবরার হত্যা ও বুয়েট শিক্ষার্থীদের দশ দফা
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে রেগিং প্রসঙ্গ
  • মানব পাচার মামলা নিষ্পত্তি প্রসঙ্গ
  • মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য উপসাগর ও বৃহৎ শক্তির রাজনীতি
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথ ভর্তি পরীক্ষা
  • হিমশীতল মৃত্যু উপত্যকা
  • আমাদের ও এই গ্যাংরিনাক্রান্ত সমাজকে তুমি ক্ষমা করো আবরার
  • টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ
  • শতবর্ষী রিক্সা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা
  • দেশের অর্থনীতিতে ইলিশের সম্ভাবনা
  • কোন পথে ছাত্ররাজনীতি
  • আর নয় ছাত্র হত্যা
  • Developed by: Sparkle IT