পাঁচ মিশালী

লজিং জীবন

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১০-২০১৯ ইং ০০:১০:০৭ | সংবাদটি ১৭১ বার পঠিত

১৯৭৪ সাল শান্তিতে বসবাস করার জন্য যে পরিমাণ ধৈর্য্য, সক্ষমতা ও অর্থ সম্পদ সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকার প্রয়োজন ছিল, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে তখন তা ছিল না। কেননা মনের মধ্যে শান্তি না থাকলে শান্তি পাওয়া অসম্ভব। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ পাকসেনাদের বিভিন্ন ধরনের অত্যাচারের কারণে প্রচুর প্রাণহানিসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছিল এবং ভারতে শরণার্থী হিসাবে থাকা বাংলাদেশীরা নিজ দেশে এসে তখনও সঠিকভাবে পুনর্বাসিত হতে পারছিল না। এরই মধ্যে টানা দুই বছর আমন, আউশ ও বোরো ধানসহ খাদ্য উৎপাদন ব্যহত হয়েছিল। কৃষকের গোলায় ধান না থাকলে কৃষকের মনে শান্তি না থাকাই স্বাভাবিক। তাছাড়া ১৯৭৩ সালের অনাবৃষ্টি ও খরা এবং ১৯৭৪ সালের প্রলয়ংকরী বন্যার কারণে খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ফলে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল।
তখনকার সময় ¯œায়ুযুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী তেল সংকট, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও আর্থিক মন্দার কারণে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশেও তার ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। ফলে ১৯৭৪ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নবীন দেশটির সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ও ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের প্রভাব পড়েছিল। যা ’৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নামে পরিচিত। সিলেট শহর বা শহরতলী এলাকায় বন্যার প্রভাব তীব্র না হলেও গ্রামাঞ্চলে বন্যার কারণে জনসাধারণের মধ্যে চরম অভাব দেখা দিয়েছিল। তাছাড়া দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে আমাদের লজিং অভিভাবকদের মধ্যেও আতঙ্ক পরিলক্ষিত হয়েছিল। সে সময় অনেক লজিং মাস্টারের লজিং চলে গিয়েছিল।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ২৭ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ মারা গিয়েছিল। ১৯৭৪ সালের মার্চ থেকে মধ্যস্বত্বভোগী দালাল, মজুতদার ও দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী নেতৃত্বের কারণে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিলে ধান, চাল লবণসহ খাদ্য সামগ্রীর দাম সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে খাবারের খোঁজে গ্রাম-গঞ্জ সহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ শহরগুলোর দিকে ছুটে আসতে থাকে। প্রতিদিন সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমে দুর্ভিক্ষের নানাবিধ খবর ছাড়াও ক্ষুধার্ত মানুষের ছবি ছাপা হচ্ছিল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সরকার এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন এবং তারই অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে লঙ্গরখানা খোলা হয়েছিল। ঢাকা শহরের ১৩৫টি সহ সারাদেশে মোট ৪৩০০টি লঙ্গরখানা খোলার অনুমতি দিয়েছিলেন। আমাদের সিলেট জেলাতেও বিভিন্ন স্থানে লঙ্গরখানা খোলা হয়েছিল। তথাপি দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষকে সান্ত¦না দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।
’৭৪ সালের বন্যায় দেশের অন্যান্য স্থানের ন্যায় আমাদের গ্রামটিরও ভীষণ ক্ষতি হয়েছিল। পাহাড়ি ঢলের কারণে গ্রামটির মাঝামাঝি মরাচেলা নদী থেকে বালু উঠে ফসলী জমিগুলো ভরাট হয়ে গিয়েছিল। ফলে ধান উৎপাদনের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল, তাই গ্রামবাসীরা খাদ্য উৎপাদন করতে না পেরে গ্রামের অনেকেই অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটিয়েছিল। আমাদের অর্ধেক জমিতে বালু উঠায় আমাদের আর্থিক অবস্থাও ততটা ভালো ছিল না। তাই আমার লেখাপড়ার খরচ চালাতে আমার পিতাকে হিমশিম খেতে হয়েছিল। টাকার অভাবে আমাকেও প্রচুর কষ্ট করতে হয়েছিল।
সিলেট সদরের মোল্লারগাঁও ইউনিয়ন এলাকায় বন্যার কারণে তেমন ক্ষয়ক্ষতি না হওয়ায় আমার লজিং অভিভাবকের ফসলী জমির ক্ষতি হয়নি। তারপরও পিঁয়াজ, তেল, লবণসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রয় সীমার ঊর্ধ্বে থাকায় তিনিও বেশ কষ্টের মধ্যে ছিলেন। আমার পাশের বাড়ির গৃহশিক্ষককে তার অভিভাবক অভাবের কারণে লজিং থেকে বিদায় করে দিয়েছিলেন। আমি অবশ্য দেশের অবস্থা ও প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে লজিং বাড়ির আর্থিক অবস্থা দেখে ভীষণ দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম। কেননা আগামী কিছুদিনের ভিতর আমার ইন্টারমিডিয়েট ফাইনাল পরীক্ষা হবে, এই মুহূর্তে যদি আমার লজিং চলে যায় তবে আমি মারাত্মক বিপদে পড়ে যাব। তাই যতটুকু সম্ভব ছাত্রছাত্রী ও বাড়ির অন্যান্যদের সাথে উত্তম সমন্বয় রক্ষা করে চলছিলাম এবং পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
১৯৭৫ সালের প্রথম দিকে আমাদের পরীক্ষা শেষ হলো। কিন্তু পরীক্ষা ভালো হলেও ফলাফল ততটা ভালো হয়নি। কেননা এ বছর বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে পাশের হার ছিল মাত্র ১৯ শতাংশ অর্থাৎ শতকরা ৮১ জনই ছিল অকৃতকার্যের তালিকায়। ভাগ্য ভালো আমি পাশের তালিকায় ছিলাম। লজিং বাড়িতে যাতে লেখাপড়া ছাড়া অনর্থক বসে থাকতে না হয় তাই সিলেট মেডিকেল কলেজে ‘ডিপ্লোমা ইন ফার্মেসী’ কোর্সে ভর্তি হয়েছিলাম। তাই পরবর্তী দুই বছর ডিগ্রীতে ভর্তি হইনি। একদিন বিকালে হঠাৎ করে আমার লজিং অভিভাবক আমাকে ডেকে নিয়ে বল্লেন, তিনি বর্তমানে ভীষণ আর্থিক অনটনে আছেন তাই তিনি আমাকে আর লজিং রাখতে চাইছেন না। আমি যেন কিছুদিনের মধ্যে অন্যত্র লজিং ঠিক করার পর উনার বাড়ি থেকে চলে যাই। হঠাৎ করে লজিং অভিভাবকের কথায় আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল। কিন্তু তারপরও চলে যেতে হবে। আমার লজিং অভিভাবকের ভাতিজা খালিকুজ্জামান বাচ্চু ও আং মন্নান ভাইকে বলায় উনারা আমার জন্য লজিং খোঁজতে আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। একদিন আব্দুল মন্নান (লন্ডন প্রবাসী) আমাকে বল্লেন, ভাই গতকাল উপর হাজরাই গ্রামে তোমার জন্য একটি লজিং এর সন্ধান পেয়েছি। চল যাই লজিং অভিভাবকের সাথে কথা বলে জেনে আসি। বিকালে মন্নান লন্ডনীকে নিয়ে উপর হাজরাই গ্রামের লজিং বাড়িতে গেলাম এবং আমাদের সমবয়সী উনার নামও আব্দুল মন্নœান মজনু ভাই এর সাথে আলাপ আলোচনা করে জানলাম উনার ছোট ভাই বোনকে পড়ানোর জন্য তাদের একজন গৃহশিক্ষক প্রয়োজন। মন্নান ভাই (লন্ডনী) আমার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে আলাপ আলোচনা করে মনজু ভাই এর বাড়িতে আমার লজিং এর ব্যবস্থা করেছিলেন এবং দুইদিন পর খানুয়া লজিং বাড়ি হতে বিদায় নিয়ে হাজরাই লজিং বাড়িতে চলে আসলাম। মোল্লারগাঁও ইউনিয়নের উপর হাজরাই গ্রামের জনাব আবুদ মন্নান মজনু ভাইয়ের বাড়িতে আমার লজিং জীবনের ৬ষ্ঠ লজিং এবং সিলেট শহরতলীতে দ্বিতীয় লজিং এর ব্যবস্থা হলো।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT