উপ সম্পাদকীয়

মায়ের আগমনে দূর হোক সব অকল্যাণ

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১০-২০১৯ ইং ০০:১৬:১৪ | সংবাদটি ৯৩ বার পঠিত

পৃথিবীতে হিন্দু ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর মধ্যে দুর্গাপূজা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান। বাংলাদেশে এটি হিন্দু ধর্মের প্রধান অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের মানুষ সপ্তাহব্যাপি আনন্দৎসবে নানান অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সকল বয়সের মানুষ একাত্মতায় মিলিত হয়, পূজামন্ডব ঘিরে শুরু হয় নানা রকম কর্মযজ্ঞ, নানা বর্ণে, নানা আয়োজনে উৎসবে ভরে থাকে প্রতিটি পূজা মন্ডবের এলাকা, প্রতিটি বাড়িঘর। কাঁসর ঘন্টা আর ঢাকের তালে আন্দোলিত হয়ে ওঠ পূজার সকল আয়োজন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে মানুষ জেগে ওঠে প্রেম-ভালোবাসা আর সম্প্রীতিতে।
দুর্গাপূজা কবে কখন কোথায় প্রথম শুরু হয়েছিল তার সঠিক তথ্য জানা যায় না। মাতৃতান্ত্রিক দ্রাবিড় জাতির মধ্যে ভারতে মাতৃদেবীর পূজার প্রচলন ছিল। দেবতাদের প্রাধান্য ছিল আর্য সভ্যতায়। অনার্য সভ্যতায় প্রাধান্য ছিল দেবীদের। দেবীগণ পূজিত হতেন শক্তির প্রতীক রূপে।
মহাভারত অনুসারে, দুর্গা বিবেচিত হন কালীশক্তির আরেক রূপে। দুর্গা শিবের অর্ধাঙ্গিনী তাই দেবী মাতা হিসেবেও তার পূজা হয়ে থাকে।
তাছাড়া, দেবীর অঙ্গ ও রূপ বর্ণনায়ও বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। একদিকে দেবী রণ-রঙ্গিনী ও ভয়ঙ্করী, অ্যদিকে তিনি প্রসন্নবদনা, বরাভয় দায়িনী, দেবী দুর্গাকে প্রাচীন ভারতে, সাধারণত দ্বিভুজা ও চতুর্ভুজারূপে চিন্তা করা হত। প্রাচীন মহিষাসুর মূর্তিগুলি তার প্রমাণ। পরে চিন্তায় বিচিত্রতায় দেবী দুর্গা ষড়ভুজা, অষ্ঠাদশভুজা এমনকি সহ¯্রভুজারূপও পরিদৃষ্ট হয়েছেন। হাতের সংখ্যার সঙ্গে হাতে ধরা বিভিন্ন অস্ত্রাদি শূল, চক্র, খড়গ প্রভৃতি ও বস্তুর বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। তবে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে দেবী দুর্গার দশভুজারূপটি বেশি প্রতিষ্ঠিত। দেবী দুর্গার চালচিত্রে বা কাঠামোতে একই সঙ্গে যারা অবস্থান করেছেন অর্থাৎ লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গনেশ এবং শিব।
সমস্ত পৌরাণিক ও তান্ত্রিক ধারণার দেবী মূল উৎস বৈদিক অদিতি, উষা, সরস্বতী। তাছাড়া অথর্ববেদ, শতপথ ব্রাহ্মণ, নারায়ণ উপনিষদ প্রভৃতি থেকেও উদ্ধৃতি দিয়ে বেদে দুর্গার অবস্থানকে দৃঢ় ওপর প্রতিষ্ঠিত।
অগ্নি, মৎস্য, নারদীয়, বরাহ, ভবিষ্য, বিষ্ণু, কালিকা, ব্রহ্মবৈবর্ত, দেবী ভাগবত, বামন প্রভৃতি পুরান-উপপুরানে দেবী দুর্গার বৈচিত্রপূর্ণ নানারূপ ও পরিচয় পাওয়া যায়। দেখা যাচ্ছে, দেবী দুর্গার চরিত্র ও রূপের পরিণতি ঋগবেদ থেকে শুরু করে অন্যান্য বেদ, ব্রাহ্মণ, উপনিষদ প্রভৃতির মধ্যে দিয়ে পৌরানিক যুগে এসে পূর্ণতা লাভ করেছে। মহিষ মর্দিনী দেবী দুর্গার যেমন বিচিত্র নাম, তেমনি তার বিচিত্র রূপ।
বৈদিক যুগ ও মহেঞ্জোদারো-হরপ্পার যুগ থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত এই পূজার মোটামুটি ধারাবাহিক ইতিহাস পাওয়া যায়। ‘পূজা’ কথাটি দ্রাবিড় জাতির, এর অর্থ পুষ্পকর্ম। আর্য জাতি অনার্য জাতির সংস্পর্শে আসার ফলে দ্রাবিড় পূজা শব্দটি আর্য ভাষা সংস্কৃতে স্থান পায়। তখন পূজা তথা পুষ্পকর্মের অর্থ দাড়ায় ফুল বেলপাতা নৈবেদ্য প্রভৃতি উপকরণ দ্বারা ভগবানের আরাধনা। বৈদিক শাস্ত্র বলে যজ্ঞের কথা, তন্ত্রশাস্ত্র বলেছে পূজার কথা। ভারতীয় সংস্কৃতিতে বৈদিক ও পৌরানিক তান্ত্রিক সভ্যতা যখন অঙ্গাঙ্গিভাবে মিলিত হয়ে গেছে, তখন সকল বিশিষ্ট অনুষ্ঠানগুলিতে যজ্ঞ ও পূজা পাশাপাশি বিদ্যমান রয়েছে। দুইয়ের মূল উদ্দেশ্য একই-মুখ্যত মোক্ষ ও ব্রহ্মপদ লাভ।
বৈদিক যুগের শারদ উৎসব বা রুদ্রযজ্ঞ, সিন্ধু উপত্যকায় আবিস্কৃত প্রাগৈতিহাসিক যুগের বহু পোড়ামাটির স্ত্রী মূর্তি প্রভৃতি দুর্গাপূজার প্রাচীনত্বের পরিচায়ক। ছান্দোগ্য উপনিষদ, তৈত্তিরীয়, আরন্যক, মন্ডু কোপনিষদ, ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ, মার্কন্ডেয় পুরাণ, কালিকা পুরাণ, বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণ, দেবী ভাগবত, কালিবিলাস তন্ত্র প্রভৃতি বিভিন্ন পুরাণতন্ত্রাদি গ্রন্থে কোথাও কোথাও কিছুটা রূপকাশ্রিত হলেও প্রায় ধারাবাহিকভাবে দুর্গাপূজার কথা জানা যায়।
বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বৃহৎ জাতীয় উৎসব দুর্গাপূজা। আদিতে চৈত্র মাসে তথা-বসন্তকালে দুর্গাপূজা হত। যা ‘বাসন্তী পূজা’ নামে খ্যাত। তবে শরৎকালে অনুষ্ঠিত শারদীয় দুর্গাপূজাই অধিক জনপ্রিয়।
মার্কন্ডেয় পুরাণ অনুযায়ী প্রকৃত পক্ষে রাজা সুরথই প্রথম বাংলাদেশে দুর্গাপূজা করেছিলেন। গবেষকদের মতে, সুরথের রাজধানী বলিপুর হল বর্তমান বোলপুর। তবে বাংলায় প্রথম সাড়ম্বরে দুর্গাপূজার প্রচলন করেন স¤্রাট আকবরের বারভুঁইয়ার অন্যতম রাজশাহী জেলার তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ। কথিত আছে, রাজা কংসনারায়ণ এই শারদীয় দুর্গোৎসবে তখনকার দিনে সাড়ে আট লক্ষ টাকা ব্যয় করেছিলেন। তার দেখাদেখি ভাদুরিয়ার জমিদার জগৎনারায়ণ ঐ বৎসরই বসন্তকালে বাসন্তী দুর্গোৎসব করেছিলেন নয় লক্ষ টাকা ব্যয়ে। কিন্তু তার পূজা কংসনারায়ণের অনুরূপ জনপ্রিয়তা পায়নি। মারাঠী বর্গী প্রধান ভাস্কর পন্ডিত ১৭৪২ সালে কাটোয়ায় দুর্গাপূজা করেছিলেন। তবে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সময় থেকে এবং তার পৃষ্ঠপোষকতায় সারাবঙ্গে বিশেষত কলকাতা ও বঙ্গদেশে সাড়ম্বরে মৃন্ময়ী প্রতিমার দুর্গা পূজার প্রচলন হয়। কলকাতার নবকৃষ্ণদেব ও জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির দর্পনারায়ণ ঠাকুর জাঁকজমক সহকারে দুর্গা পূজা করতেন।
স্মার্ত রঘুনন্দন রচিত ‘দুর্গোৎসবতত্ত্ব’ গ্রন্থ দু’টি থেকে অনুমান করা যায় তার সময়ে (এখন থেকে ৪০০ বছর পূর্বে) শরৎকালে দশভুজা মৃন্ময়ী দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল।
প্রায় সমসাময়িক বৃন্দাবন দাশের ‘চৈতন্য ভাগবতে’ আছে ঃ
মৃদঙ্গ মন্দিরা শঙ্খ আছে সর্র্বঘরে/ দুর্গোৎসবে বাদ্য বাজাবার তরে।
এ থেকে বুঝা যায়, ষোড়শ শতাব্দীর আগেই দুর্গাপূজা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
দুর্গাপূজার সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। জীবনে অশুভ অসূর শক্তির বিনাশ করে শুভ সুর শক্তির প্রতিষ্ঠা দুর্গা পূজার শাশ্বত দর্শন। দুর্গা পূজা জাতীয় মহা আলোড়ন সৃষ্টিকারী ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এতে জড়িত হয় সর্বস্তরের মানুষ। ব্রাহ্মণ, শুদ্র, ধনী, দরিদ্র, উচ্চ-নীচ এমনকি জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষের মহামিলনের ক্ষেত্র এই দুর্গাপূজা। এর ফলে সামাজিক বন্ধন যেমন দৃঢ় হয়, তেমনি মানুষ অর্থনৈতিক দিক দিয়েও নানাভাবে উপকৃত হয় এই দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে।
দশভুজা দুর্গার কাঠামোতে দেশ ও জাতির সংহতি সাধনের স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। দুর্গা প্রতিমায় লক্ষ্মি ধনের সরস্বতী জ্ঞানের, কার্তিক বীরত্বের, গবেশ সাফল্যের প্রতীক। আর দুর্গার দশটি হাত প্রহরণ (অস্ত্র) অপরিমেয় বলবীর্যের প্রতীক। সিংহ বশ্যতার প্রতীক আর মহিষাসুর সমস্ত অশুভের প্রতীক। একটি বলিষ্ট জাতি, সমস্ত অশুভকে দলিত করে পরিপূর্ণতা লাভ করে। দেবী দুর্গার আরাধনাকে কেন্দ্র করে আমাদের মনেও এই ধারণাই দৃঢ়ীভূত হয়।
দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয় সামাজিক মিলন উৎসবও বটে। এই পূজার সময় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠে। জনকল্যাণের জন্যই দুর্গাপূজা। জাতির ক্রাহিক ও পারত্রিক তথা সামগ্রিক কল্যাণই দুর্গাপূজার মূল লক্ষ্য। তাই মায়ের আগমনে দূর হোক সকল জরা, ব্যাধি, গ্লানী, দূর হোক সকল অশান্তি, অকল্যাণ। মানুষে মানুষে জেগে উঠুক ভ্রাতৃত্ববোধ, মায়া, মমতা, প্রেম-ভালোবাসা দুর্গামায়ের কাছে এই প্রার্থনা।
সকল বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্খীকে জানাই শারদীয় দুর্গাপূজার আন্তরিক অভিনন্দন, শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • ‘জঙ্গি’ অপবাদ প্রসঙ্গে
  • ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে
  • মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই বদলে দেবে বাংলাদেশ
  • যানজটে লোকসান ও ভোগান্তি
  • বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস
  • আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?
  • আবরার হত্যা ও বুয়েট শিক্ষার্থীদের দশ দফা
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে রেগিং প্রসঙ্গ
  • মানব পাচার মামলা নিষ্পত্তি প্রসঙ্গ
  • মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য উপসাগর ও বৃহৎ শক্তির রাজনীতি
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথ ভর্তি পরীক্ষা
  • হিমশীতল মৃত্যু উপত্যকা
  • আমাদের ও এই গ্যাংরিনাক্রান্ত সমাজকে তুমি ক্ষমা করো আবরার
  • টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ
  • শতবর্ষী রিক্সা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা
  • Developed by: Sparkle IT