উপ সম্পাদকীয় খোলা জানালা

ওজোন স্তর

আলম শাইন প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১০-২০১৯ ইং ০০:২১:৪৬ | সংবাদটি ৫৬ বার পঠিত

ওজোন গ্যাস সম্পর্কে সর্বসাধারণের খুব একটা ধারণা নেই। অধিকাংশ মানুষ বিষয়টির বিপরীত বোঝেন। যেমন, ওজোন দিবস এলে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, কোন ধরনের ওজোনকে বোঝানো হচ্ছে? পরিমাপ নাকি অন্য কিছু! তাই ওজোন সম্পর্কে বিস্তারিত জানানোর প্রয়োজন বোধ করছি আমরা। তার আগে শব্দটার বাংলা বানানের পার্থক্য ও অর্থ জানিয়ে দিচ্ছি। যেমন বাংলা শব্দ ‘ওজন’ হচ্ছে পরিমাপ আর ইংরেজি ‘ওজোন’ হচ্ছে একধরনের গ্যাস, যার অবস্থান বায়ুম-লের ১৫-৩০ কিলোমিটারের উচ্চতায়, মতান্তরে ২৫-৫০ কিলোমিটার উচ্চতায়। ওজোনস্তর তীব্র গন্ধযুক্ত হালকা নীল বর্ণের গ্যাসীয় পদার্থ। এটি ক্ষতিকর গ্যাস হলেও পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যকে প্রত্যক্ষভাবে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে। ফলে বলা যায়, এটি হচ্ছে প্রকৃতির পর্দা, যে পর্দা বায়ুম-লের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে অথবা ভূপৃষ্ঠে বিকিরণ ঘটাতে বাধা সৃষ্টি করে। সোজাসাপটা, ওজোনস্তর হচ্ছে পৃথিবীর ফিলটার। সূর্যের প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে ছেঁকে বিশুদ্ধ করে পৃথিবীর জন্য ১০-৪২ (কমবেশি হতে পারে) ডিগ্রি সেলসিয়াস পাঠায়।
আমরা জানি, সূর্য থেকে বিচ্ছুরিত অতিবেগুনি তেজস্ক্রিয় রশ্মি পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। এই রশ্মি ওজোন গ্যাসের কারণে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বা ওজোন গ্যাস তেজস্ক্রিয় রশ্মি শোষণ করে নেওয়ার ফলে ভূপৃষ্ঠের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। ফলে জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় থাকে এবং ক্ষতিকর রোগ থেকে মানুষ মুক্তি পায়। বিশেষ করে সূর্যের তেজস্ক্রিয় রশ্মি ওজোন গ্যাস শোষণ করে নেওয়ায় ত্বকে ক্যানসার ও চোখের রোগ থেকে মুক্তি মেলে। সেই প্রকৃতির রক্ষাকবচ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ভূপৃষ্ঠে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের কারণে ওজোনস্তর ক্ষয়ে যাচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ‘সিএফসি’ (এই গ্যাস বিভিন্ন ধরনের স্প্রে, এয়ারকন্ডিশনের যন্ত্র ও রেফ্রিজারেটরে বেশি থাকে) গ্যাসের বহুল ব্যবহারের কারণে ওজোনস্তর দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে। এতে বড়ো ধরনের গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে ওজোনস্তরে। সেই গর্ত গলে তেজস্ক্রিয় রশ্মি ভূপৃষ্টে নেমে আসছে। বলে নেওয়া ভালো, ওজোনস্তরের পুরুত্ব খুব বেশি নয়। মৌসুমভেদে ও ভৌগোলিক কারণে এই পুরুত্বের পরিমাণ কমবেশি হয়।
ওজোনস্তরের পুরুত্ব পাতলা হয়ে দক্ষিণ মেরুতে এন্টার্কটিকার ওপরে বিশাল গতের্র সৃষ্টি হয়েছে, যে গর্তের আয়তন প্রায় ৪০ লাখ বর্গ কিলোমিটার। সুখবর হচ্ছে, সেই গর্ত ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে বিশ্ববাসীর সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে।
১৯৮৬ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী সুজান সলোমন গবেষণা করে নিশ্চিত হন, বায়ুম-লের ওজোনস্তর ক্ষয়ে যাচ্ছে, যার জন্য দায়ী হচ্ছে সিএফসি গ্যাস। উল্লেখ্য, আশির দশকে এই গ্যাস প্রচুর নির্গত হয়েছিল বিশ্বে। পরিবেশবিদদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীকালে বিশ্ববাসী এই গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে দিতে শুরু করলে ওজোনস্তর স্থিত অবস্থায় থাকে, যা সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে ২০৫০-৬০ সাল পর্যন্ত। কারণ বায়ুম-লে এখনো প্রচুর পরিমাণে সিএফসি গ্যাস রয়ে গেছে, যা শোষণ করে নিঃশেষ করতে হলে আমাদের প্রচুর বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি অবশ্যই সিএফসি গ্যাস নির্গমন পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের নির্গমন। অর্থাৎ, কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে হবে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা, নির্বিচারে গাছপালা নিধন ও কালো ধোঁয়ার প্রকোপ বন্ধ করতে হবে। এসব নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে; পাচ্ছেও; যার প্রমাণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ঘন ঘন বজ্রপাত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ নানান দুর্যোগের শিকার হচ্ছে বিশ্ববাসী। এর মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বেশি শিকার হচ্ছে বাংলাদেশসহ এশীয় দেশগুলো। এর মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। কারণ ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের নিচু এলাকাগুলোর একটি। ফলে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে। তথ্যমতে জানা যায়, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে ১ মিটারের মতো, যার কারণে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ ভূমি সমুদ্রে তলিয়ে যাবে। ওজোনস্তর রক্ষা করতে না পারলে কিংবা জলবায়ুর পরিবর্তনে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে এন্টার্কটিকার বরফ গলে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে দুই মিটারের কাছাকাছি। সে ক্ষেত্রে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। কাজেই আমরা এখনই সর্তক হই।
শিল্লোন্নত দেশগুলোর কাছে আমাদের আর্জি, কার্বন নিঃসরণের মাত্রা শূন্যের কোটায় নামিয়ে এনে বাংলাদেশসহ এশীয় দেশগুলোকে রক্ষা করা হোক। পাশাপাশি বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের আবেদন, বেশি বেশি বনায়ন সৃষ্টি করুন। পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত আমাজান, সুন্দরবনসহ সমস্ত বনায়ন রক্ষা করুন। সুতরাং আমরা বনায়ন সৃষ্টি করে বজ্রপাত ঠেকাই এবং কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোটায় নামিয়ে এনে বায়ুম-লের ওজোনস্তর রক্ষা করি।
লেখক : পরিবেশবিদ।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • ‘জঙ্গি’ অপবাদ প্রসঙ্গে
  • ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে
  • মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই বদলে দেবে বাংলাদেশ
  • যানজটে লোকসান ও ভোগান্তি
  • বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস
  • আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?
  • আবরার হত্যা ও বুয়েট শিক্ষার্থীদের দশ দফা
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে রেগিং প্রসঙ্গ
  • মানব পাচার মামলা নিষ্পত্তি প্রসঙ্গ
  • মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য উপসাগর ও বৃহৎ শক্তির রাজনীতি
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথ ভর্তি পরীক্ষা
  • হিমশীতল মৃত্যু উপত্যকা
  • আমাদের ও এই গ্যাংরিনাক্রান্ত সমাজকে তুমি ক্ষমা করো আবরার
  • টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ
  • শতবর্ষী রিক্সা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা
  • Developed by: Sparkle IT