উপ সম্পাদকীয়

মাতৃবোধন ও মাতৃভাবনা

প্রফেসর ডা. মৃগেন কুমার দাস চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১০-২০১৯ ইং ০০:২৩:৩৫ | সংবাদটি ১৯৮ বার পঠিত

শারদীয় দুর্গোৎসব। শীতের আবহে শিশির ভেজা সকাল শিউলী ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা। মনে দোলা দেয় পূজার আগাম বার্তা। হৃদয় জুড়ে রাঙিয়ে উঠে এক অনাবিল আনন্দের সাগর। আশ্বিনের দেবীপক্ষের সুশীল সমীরণ গেয়ে বেড়ায় মায়ের আগমনী সঙ্গীত ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু, মাতলো যে ভুবন...’। সমস্ত ইন্দ্রিয় ছাপিয়ে জেগে উঠে এক শিহরণ। প্রকৃতি এক অপূর্ব রূপে উথলা ওয়ে ওঠে। মায়ের আরাধনায় হৃদয়ে পুলক জাগে, মন জুড়ে মাতৃভাবনা বিকশিত হয়।
চৈতন্যময় মহাশক্তির আধার মাতৃশক্তি
পূজার বেদীতে দেব দেবীর বহরে দুর্গাদেবীর শীর্ষ অবস্থান দৃষ্টি নিবদ্ধিত হয়ে দেবীর প্রতি হৃদয় মন নিবেদিত হয়। মহিষাসুর সৈন্য বধে উদ্ধত কালে দৃশ্যত সমস্ত দেবতার অস্ত্রে ও শক্তিতে শক্তিমান মা দুর্গাদেবী। তত্ত্বতঃ সমস্ত দেবদেবীর শক্তির আধার মা। একটা প্রাণশক্তি যেন এ বিশাল ব্রহ্মান্ডকে বিধৃত করে রেখেছে। সকল দেবতার শরীর সষ্ণুাত সে তেজ সমূহ একত্র হয়ে সে জ্যোতিতে ত্রিভুবন পরিপূর্ণ হয়ে এক নারী শক্তিতে রূপ নিল (চন্ডি-২/১৩)। অসুররাজ শুম্ভ যুদ্ধে অনেক সহায়ক মাতৃকা শক্তি অবলোকন করে ক্রুদ্ধযুক্ত হয়ে দেবীকে কঠোর ভৎসনা বাক্যে অবজ্ঞা করলে দেবী প্রত্যুত্তরে বললেন- ‘একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা র্মমাজরা, পশ্যেতা দুষ্ট ময্যের বিশন্ত্যো মদবিভুতয় (চন্ডি ১০/০৫)।
আমার বিভূতি আমাতেই প্রবেশ করছে। সাথে সাথে ব্রহ্মানী বৈষ্ণবী প্রমুখ সকল মাতৃকা শক্তি মহাদেবীর অঙ্গে মিশে গেলেন। ব্রহ্মময়ী মহাশক্তি দুর্গা। তাহার দর্শনে একত্বে বহুত্ব ও বহুত্বে একত্বের অনুভব হয়। তিনি সংহার করছেন আবার নিজের মাঝে গুটিয়ে নিচ্ছেন।
এ বিশ্বজগৎ দেখেই আমরা সে অবিচিন্ত্যমাইমময়ী মহাশক্তির পরিচয় লাভ করি। মহাদেবীর অপূর্ব সৃষ্টি শক্তি ও অপুর্ব পালনী শক্তি তৎসঙ্গে অদ্ভুৎ সংহারিনী শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি একাধারে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্র শক্তিধারিনী। হিন্দু ঋষিরাই ঈশ্বরে পরম মাতৃত্বের রূপ দর্শন করেছেন।
মায়ের চিত্তে কৃপা, সমরে নিষ্ঠুরতা
শ্রীমদ্ভগবদগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন ‘অন্তকালে আমাকে স্মরণ করতে করতে যিনি দেহ ত্যাগ করে প্রস্থান করেন তিনি আমারই ভাব প্রাপ্ত হন সন্দেহ নাই (০৮/০৫) অসুরেরা দেবীর প্রতি দৃষ্টি রেখে ও মনে দেবীর প্রতি প্রচন্ড ক্ষোভ ধারণ করে অস্ত্র সম্পাত করতে করতে যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করে। দেবীর অশেষ কৃপায় মৃত্যু পরবর্তীতে তারা দেবীর শরণ লাভ করে। দুষ্কর্মের প্রতিবিধানে মৃত্যুপরিণামী কঠোরতা প্রদর্শন করলেও মৃত্যু পরবর্তীতে পরম করুণাময়ী মাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হন অসুরদের সাথে। এভাবে অসুরেরাও আদর্শ ¯েœহময়ী মায়ের কৃপা থেকে বঞ্চিত হননি।
মাতৃপূজায় জগৎময় মাতৃদর্শন
মাতৃপূজা ও মাতৃভাবে অনুধ্যানে অন্তর জুড়ে মাতৃ¯েœহের উদাত্ত ফল্গুধারা অনুক্ষণ বহমান থেকে হৃদয়কে সঞ্জীবীত রাখে। প্রকৃতিতে সর্বত্র মায়ের অস্তিত্ব প্রতিভাত হয়। অন্তর জুড়ে সর্বদা নিনাদিত হয় মাতৃত্বের অনুভুতি জগৎ হয়ে উঠে মাতৃময়। পবিত্র ভাবনায় অন্তর কলুষমুক্ত হয়। বিশ্বের প্রতিজন নারীতে মাতৃভাব উপজাত হয়। সংকট কালে সন্তানের আর্তি মাকে উদ্বেল করে তুলে। ধরাধামে এসে বা দৈবপ্রভাবে তিনি সংকট মোচন করে শান্তি সংস্থাপন করেন। দেবীর দুর্দন্ড প্রতাপ যে কোন আসুরিক শক্তি বিনাশে সমর্থ। মাতৃভাব জাগতিক বা পারত্রিক যে কোন উৎপীড়ন প্রশমনের সর্বোত্তম পন্থা। সন্তানের আর্তিতে মা বাৎসল্য প্রেমে বিগলিত হন ও মায়ের কৃপায় পরিত্রাণ লাভ করেন সন্তানেরা। বিভিন্ন মতান্তরে আসুরিক শক্তিতে পরাক্রান্ত দেবতারা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হলে ও মা দেবীর শরণাপন্ন হলে মহিষাসুর ও শুম্ভ নিশুম্ভ প্রমুখ অসুরদেরে সসৈন্য বধ করে দেবলোক প্রশান্ত করেন। দেবতাদের স্তুতিতে তৃপ্ত হয়ে দেবী ভবিষ্যত আপদ ব্যাপারেও অভয় প্রদান করেন। আর্য ঋষিরা বিশ্বের সর্বভুতে এই মাতৃত্বের প্রকাশ দেখিয়েছেন ‘যা দেবী সর্বভুতেষু মাতৃরূপেন সংস্থিতা’ ‘সর্বভূতে মাতৃত্বের দর্শনে সাধক কামজিৎ হন। কামের বিনাশে প্রেমের উদয়’ (মহানাম)।
মাতৃশক্তির অবমাননায় ধ্বংস
দেবী অম্বিকার সুমনোহর রূপে মোহিত ভৃত্যদ্বয় চন্ড-মুন্ড দেবীকে সাধারণ নারীজ্ঞানে তাদের প্রভু অসুররাজ শুম্ভ-নিশুম্ভকে রমনীরতœ হিসেবে গ্রহণ করতে প্রলুব্ধ করে। অসুররাজ শুম্ভ দূত সুগ্রীবকে প্রস্তবনা নিয়ে দেবীর সকাশে প্রেরণ করল। প্রস্তাব গ্রহণে দেবীর প্রতিজ্ঞার শর্ত হেতু অসুররাজ দেবীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলে দুই ভাই একে একে সসৈন্য দেবীর হাতে নিহত হন। মাতৃভাবের স্খলনে মাতৃত্বের অবজ্ঞায় অসুর শক্তির পতন নিশ্চিত হলো। শ্রীচন্ডী উত্তরচরিতে শুম্ভ-নিশুম্ভ বধ বর্ণনায় ঘটনার পটভূমি ও পরিণতির চিত্র প্রাণবন্ত ধারায় বিবৃত রয়েছে। রামায়নে শ্রীরামচন্দ্রের সতী সাদ্ধি স্ত্রী সীতা দেবীকে অপহরণ ও অবমাননা হেতু অসুর রাবন সবংশে ধ্বংস হয়। মহাভারতে উন্মুক্ত জনসমক্ষে দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের ফলশ্রুতিতে কৌরব কুল নির্বংশ হয়। মাতৃশক্তির অবমাননাকারী আসুরী স্বভাব সম্পন্ন দুর্জনরা পৃথিবীকে বিষাক্ত করে তোলে-পরিনতি হয় বিদ্ধংসী। দেবীর প্রতি প্রার্থনা-
‘নাশায় চাসুরভয়স্য মতিং করোতু।’ (অসুরভয় বিনাশার্থে অভিলাষিনী হউন)

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • উহান সিটি কি ব্যাংকরাপ্টেড হচ্ছে!
  • পড়িলে বই আলোকিত হই
  • জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য
  • জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি পুনর্গঠন ও কিছু প্রত্যাশা
  • চাই মানসম্পন্ন বই
  • প্রসঙ্গ : রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • করোনা ভাইরাস
  • মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ আল আজাদ
  • শহীদ মিনার সাহসী কথা বলে
  • একুশে ফেব্রুয়ারি
  • ভাষা আন্দোলন এবং একুশে
  • ফুলতলী কামিল মাদ্রাসা : প্রাপ্তির ১০০ বছর
  • টিলায় থাকা ছেলেটি
  • ভাষা বিপ্লব থেকে স্বাধীনতা
  • স্বপ্নগুলো থাকে অধরাই
  • বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রসঙ্গে হাইকোর্টের রুল
  • মাইক্রোপ্লাস্টিক ও পরিবেশ
  • সিলেটে হিজড়া ও বেদে গোষ্ঠীর উৎপাত
  • ইসহাক কাজল : মেহনতি মানুষের বন্ধু
  • ভয় করো না করোনাকে
  • Developed by: Sparkle IT