উপ সম্পাদকীয়

যদি দৃষ্টি ফেরাই পেছন পানে

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১০-২০১৯ ইং ০০:২৫:২৬ | সংবাদটি ৭৬ বার পঠিত

বাংলাদেশের জনসাধারণ অত্যন্ত আনন্দের সাথে একটি সংবাদকে গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করেছেন যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের নেপথ্য নায়ক, কুশীলব, সহযোগী সহ সকল ধরনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় উদঘাটনের উদ্দেশ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এটিকে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হিসাবে অভিহিত করতে চাই। বিদেশে অবস্থানরত হন্তারকবৃন্দকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত আছে শুনেই আসছি। কিন্তু ফলদায়ক কিছুই দেখছিনা। অন্যদিকে আমাদের দেশটিতেও নানা রূপ ধরে তারা যে বিচরণ করছে বুক চিতিয়ে সেদিকে কেউই যেন দৃষ্টিপাত করছেন না। বিস্ময়ের ব্যাপারটি হলো এদের গুটিকয়েক তো সরকারী দলের হোমরাচোমড়াদের পা চাটা হিসাবে অবস্থান করছে, অন্যদিকে সুযোগ বুঝে নিজ স্বার্থ উদ্ধারে দলীয় নেতারা তাদেরকে ব্যবহার করে চলেছেন আপন বিবেক, বিবেচনাবোধ সমূহ বিসর্জন দিয়ে। তারা জানেন নিজ প্রয়োজনে কোন নিষ্ঠুরতম কর্ম সম্পাদনের প্রয়োজন যদি পড়েই তাহলে এদেরকে ব্যবহার করা যাবে। সাবেক বেশ কয়েকজন স্বৈরশাসক আপন স্বার্থ নির্বিঘœ করতে এদের অনেককে শক্তপোক্তভাবে পূনর্বাসিত করেছিলেন। সেই সূত্র ধরে আজ এ সকল অবাঞ্চিতরা বর্তমান সমাজে বেশ শক্ত এবং প্রভাবশালী অবস্থানে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে।
বেশ কয়েকবছর আগে আমাদের সিলেটের স্থানীয় একটি দৈনিকে বঙ্গবন্ধুর খুনি আজ শিক্ষাবিদ শিরোনামে একটি সংবাদ বেরিয়েছিলো। জানিনা প্রকাশিত বিবরণধর্মী প্রতিবেদনটি কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পেরেছিলো কি না, বা আইনী কোন ব্যবস্থা সেইমত নেওয়া বা গৃহীত হয়েছিলো কিনা। দন্ড হিসাবে ফাঁসিতে মৃত্যুবরণকারী লেঃ কর্ণেল ফারুক রহমান এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডটি সংগঠিত হওয়ার পর পরই একজন সাবেক বিচারপতি ও রাষ্ট্রপতি তাকে (কর্ণেল ফারুক) ফোন করেছিলেন এই বলে যে তাকে যেন একটি ভালো পদ বা মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয়। তার অনুরোধটি রক্ষিত হয়েছিলো। তিনি একজন ভ্রাম্যমান দূত হিসাবে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক সাহেবের বার্তা বহন করে বিশ্ব পরিক্রমন করেছিলেন। প্রেক্ষাপট কারণ এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের অবশ্যম্ভাবীতা পরিষ্কার করে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সামনে তুলে ধরেছিলেন। ত্যাগী, তুখোড় আর দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন ন্যাপ নেতা খোন্দকার মোশতাক সাহেবের বিশেষ দূত হিসাবে তড়িঘড়ি রওয়ানা হয়েছিলেন তার আরাধ্য কেন্দ্র মস্কোতে। রাষ্ট্রপতি মোশতাক জানতেন সেই ন্যাপ নেতা জনাব মহিউদ্দীন সোৎসাহে প্রস্তাবটি গ্রহণ করবেন এবং তদানীন্তন শক্তিধর সোভিয়েট ইউনিয়ন সরকার এর শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের কাছে মোশতাক সরকার এর পক্ষে যুক্তি তর্ক তুলে ধরেন সফল ওকালতির মাধ্যমে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ বা সদ্য বিলুপ্ত বাকশালের প্রভাবশালী শীর্ষ নেতাদের মধ্য থেকে আব্দুল মালেক উকিলকে পাঠানো হয় লন্ডনে পরিবর্তন আর নতুন সরকার এর বৈধতা প্রমান সাপেক্ষে যুক্তিতর্ক উত্থাপনের জন্য। তিনি তার কর্মটি সমাপন করেছিলেন।
মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর একান্ত সহচর বাংলার অবিসম্বাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব সেই সময়কার ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতি গড়ে তুলতে আর কৃষক, মজদুরদের শোষণের যাতাকল থেকে মুক্ত করতে সাময়িক একটি ব্যবস্থা হিসাবে বাকশাল নামক দলীয় ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। সংসদে যখন প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয় মাত্র পনেরো মিনিটে সেটি পাশ হয়ে বিলটি পুরো দস্তুর আইনে পরিণত হবার প্রক্রিয়া সমাপনার্থে যথাযথ স্থানে প্রেরিত হয়। তড়িঘড়ি সবকিছু সম্পন্ন হয়। কারণ প্রয়োজন আর সংকট মোচনার্থে এ জাতিয় ত্বড়িত ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজন পড়েছিল। সকল মহলেই ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত থেকে থাকে। তদ্রুপ তৎকালীন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন আর জেনারেল ওসমানী দু’জনেই পদত্যাগ পূর্বক তাদের সংসদ সদস্য পদ ত্যাগ করেন। কারণ স্বরূপ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে বিচ্যুতির উল্লেখ করেন এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামে নিজেদের সর্বাত্মক সমর্থন এবং কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন বলে ঘোষণা করেন। বাকি সকল সংসদ সদস্যরাই বাকশাল ব্যবস্থার সমর্থনে অবিচল থাকেন। পরবর্তীতে তাদের অনেকেই জেলা গভর্ণর হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন, বাকিরা অন্যান্য পদ পদবীধারী হিসাবে নিজেদের কেউকেটা ভাবতে শুরু করেন। খোন্দকার মোশতাক সাহেব তার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানটি বহাল রাখেন মন্ত্রীপরিষদে, বাকশালের ক্রমিক অবস্থানে এবং দলীয় কর্মকান্ডে।
পটপরিবর্তনের ফলস্বরূপ নতুন রাষ্ট্রপতি হিসাবে খোন্দকার মোশতাক আহমেদ সাহেব শপথ গ্রহণের পর পরই জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ প্রদান করেন। বিস্ময়করভাবে তিনি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সমূহ অক্ষুণœ রাখেন। জাতীয় সংসদ বহাল রাখেন আবার সংবিধানও অক্ষুণœ রাখেন। এখানেও তিনি কোন বিরোধীতার মুখে পড়েন নাই। তিনি নতুন একটি নির্বাচন এর অঙ্গীকার প্রদান করেন এবং সেইমত ব্যবস্থা গ্রহণে পদক্ষেপ নেন। বহাল থাকা জাতীয় সংসদের কোন সদস্যই বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ স্বরূপ পদত্যাগও করেন নাই। রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক সকল সংসদ সদস্যদের সম্মেলন আহবান করেন বঙ্গভবনে। শোনা যায় সেখানে সমবেত সকল সংসদ সদস্যদের মাঝে কেউই উচ্চবাচ্য না করলেও হাতেগোনা অকুতোভয় দুই একজন সংসদ সদস্য এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের ব্যাপারে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অতি চাতুর্যের সাথে রাষ্ট্রপতি হিসাবে খোন্দকার মোশতাক তার মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেছিলেন পুরাতন সকল মন্ত্রীবর্গদের নিয়ে মাত্র দু’জনকে বাদ দিয়ে। নতুন বোতলে পুরাতন মদ ভরে নিয়ে তিনি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র এবং দলীয় ফোরামকে আপন বলয়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। তিনি তার এক বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের নায়কদের সূর্যসন্তান হিসাবে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এতো কিছুর পরও কোন জাতীয় সংসদ সদস্য পদত্যাগ করেছেন বা করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে সেটাও শোনা যায় নাই। যারা আপন মন্ত্রে দীক্ষিত ছিলেন বা নীতিভ্রষ্ট হন নাই তারা ছিলেন অনঢ়, অবিচল। এ জাতিয় চার নেতাকে পদ পদবী গ্রহণ করতে বলা হলেও তারা তা করেন নাই বরং স্বেচ্ছা বন্দীত্ব গ্রহণ করেন এবং নানা ঘাতপ্রতিঘাতে তাদের কয়েকজন কেন্দ্রীয় কারাগার অভ্যন্তরেই ঘাতকের নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হোন। প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ায় খোন্দকার মোশতাক এক অর্ডিন্যান্স জারী করে তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাতে মোহাম্মদ সায়েমকে। জনাব সায়েম নতুন রাষ্ট্রপতি হিসাবে বরিত হন। তিনি এবং বিদায়ী রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক একই সময়ে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। নতুন রাষ্ট্রপতি জনাব সায়েম বিদায়ী রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক সাহেব এর ভূয়সী প্রশংসা করেন তার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াসও জাতির জন্য কল্যাণকর পদক্ষেপ সমূহ গ্রহণ করার জন্য।
আমি এই করুণ, বিয়োগান্তক আর নিষ্ঠুরতম আখ্যানটি বর্ণনা করতে বাধ্য হলাম এই মানসে যাতে করে প্রস্তাবিত তদন্ত কমিশন সঠিক কুশীলবদের চিহ্নিত করতে সচেষ্ট হন আর উদ্দেশ্য সাধনে সফল হন। নানা সংবাদ মাধ্যমে মাঝে মাঝে বলা হচ্ছে এখনও নাকি সরকারী মহলে নানা ধরণের ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকান্ড চলছে। এখনও হাইব্রীড নেতাদের দাপটে পুরনো ত্যাগী নেতৃবৃন্দ কোনঠাসা হওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্য লাভ করেছেন এমন নেতৃবৃন্দের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন কোন রকমে বেচে বর্তে আছেন। শোনা যায় তাদেরকেও কেন জানি আড়ালে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
আজ সারাদেশে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড অব্যাহত আছে। বিগত নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক রয়েছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কর্মকুশল রাজনীতি তাকে এমনিতেই বিজয়ী করতে সহায়ক ছিলো সেখানে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হোক এমন পরিস্থিতির অবতারনা করতে কে বা কারা তাকে বুদ্ধি পরামর্শ জুগিয়েছিলো সেটাও তদন্তের আওতায় আনা উচিত বলে মনে করি। মিডনাইট নির্বাচন, কুত্তামার্কা নির্বাচন জাতিয় কটু মন্তব্যগুলি কেনো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সেটাও তলিয়ে দেখা উচিত। কারণ আপামর জনসাধারণ বর্তমান উন্নয়নমূলক রাজনীতিকেই স্বাগত জানাতে চায়। বিভ্রান্তি আর ছলচাতুরী কখনোই কাম্য নয়। রাজা পূজ্যতে রাজ্যে।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • ‘জঙ্গি’ অপবাদ প্রসঙ্গে
  • ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে
  • মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই বদলে দেবে বাংলাদেশ
  • যানজটে লোকসান ও ভোগান্তি
  • বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস
  • আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?
  • আবরার হত্যা ও বুয়েট শিক্ষার্থীদের দশ দফা
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে রেগিং প্রসঙ্গ
  • মানব পাচার মামলা নিষ্পত্তি প্রসঙ্গ
  • মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য উপসাগর ও বৃহৎ শক্তির রাজনীতি
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথ ভর্তি পরীক্ষা
  • হিমশীতল মৃত্যু উপত্যকা
  • আমাদের ও এই গ্যাংরিনাক্রান্ত সমাজকে তুমি ক্ষমা করো আবরার
  • টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ
  • শতবর্ষী রিক্সা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা
  • Developed by: Sparkle IT