সাহিত্য

বানর

জাহেদ মোতালেব প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১০-২০১৯ ইং ০০:৩৯:০১ | সংবাদটি ৪৬ বার পঠিত

শাহজাহান শাহর ওরসের মেলা থেকে বাবা খালেককে একটি হরিণ কিনে দিয়েছিল। সে বাড়ি ফিরছিল। বাস জোরে ব্রেক করে। ঝাঁকি খেয়ে হরিণের শিং ভেঙে যায়।
বাড়ি ঢুকে দেখতে পায়, উঠানে সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে কী যেন দেখছে। সে ফাঁক দিয়ে ঢুকে দেখে, এক লোক বানরের খেলা দেখাচ্ছে। বানরটা তার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকায়, ভেঙচায়, ভয় দেখায়। মুহূর্তেই তার কী যে হয়, মনে হয় সে বানরের চোখের মধ্যে ঢুকে গেছে। তার মাথা ঘুরায়, মাথার মধ্যে বানরটা ঘুরপাক খায়।
ঘরে ঢুকে হরিণের অন্য শিংটি ভেঙে দেয়। এরপর সে মনে করে ওটা হরিণ নয়, বানর। রংটা গাঢ় খয়েরি। পিঠে কয়েকটা ধূসর দাগ আছে। বানরটাকে (হরিণ) ছোট কালো কাপড়ের থলেয় ভরে বালিশের পাশে রেখে দেয়।
রাতে স্বপ্ন দেখে, সে বানর হয়ে গেছে। পেছনে একটা লেজও আছে। ডাল থেকে ডালে লাফাচ্ছে।
তারপর অনেক বছর চলে গেছে। এখন সে দুই ছেলে, এক মেয়ের বাবা। মেয়েটা স্কুলে পড়ে।
কয়েক দিন আগে কী একটা কথার পিঠে বউ বলেছিল, মানুষ অইলু বাঁদরর জাত। শুধু ল্যাজগান নাই।
খালেক মানুষের বিবর্তনের ছবি মেয়ের বিজ্ঞান বইয়ে দেখেছে। সে ভাবে, বানর থেকে মানুষ হলো কেন?
শেষ পর্যন্ত বানরটা বিক্রি করে দিতে হলো। এ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
ফুলকড়ইয়ের নিচে বসে খালেক তাই ভাবছিল। কড়ইগাছের দিকে একবার তাকায়। বানরটা যেন গাছ থেকে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ঝংকার সিনেমা হলের উত্তর-পশ্চিম পাশে খুপরিতে থাকা যাযাবর যখন বানরটা নিয়ে যাচ্ছিল, তখনকার চাহনি ভুলতে পারবে না।
ছোটকালে তাদের একটা কুকুর ছিল। একদিন হঠাৎ করে ওটা মরে যায়। তখন সে দুদিন ভাত খায়নি। খুব কেঁদেছিল। সেই কান্না আবার আসছে।
বউ টের পায়, বানরটা বিক্রি করার পর থেকে জোবেদার বাপের খাওয়ায় মন নেই, চাকরিতেও মন নেই। কেমন ছাড়া ছাড়া। কিছু বলতে চায়; কিন্তু বলে না। রাতে আদর করেও ওর মুখে হাসি ফোটাতে পারেনি।
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বউ ঘুঘুর মতো ডাকে। ডাক না শুনে সে হাঁটতে শুরু করে। সকালে উঠে তাকে ছুটতে হয়। ঝংকার সিনেমার মোড়ে ময়দার মিলে কাজ করে। জোড়া কবুতর মার্কা ও জোড়া লাঙল মার্কা আটা ও ময়দা তৈরি হয় তাদের মিলে।
একপাশে গমের বস্তার স্তূপ। বস্তায় হেলান দিয়ে একজন গায়, ভালোবাসা তুই কই গেলি।
ভালোবাসা কোত্থেকে আসে? প্রয়োজন, নাকি অন্য কিছু থেকে! আদিম মানুষের উঠে দাঁড়ানোর ছবিটার কথা ভাবে খালেক।
সহকর্মীদের চোখের ভ্রুতে, মুখে, চুলে ময়দার গুঁড়া। গমের বস্তায়ও ধুলার আস্তর। ধুলা উড়ে উড়ে যেন বানরের রূপ নিচ্ছে। ভাবে, ময়দা কিংবা ভুসির গুঁড়া দিয়ে বানর বানাবে। শ্রমিকরা দুষ্টুমি করছে। তাদের দুষ্টুমি দিয়েও বানাতে পারে।
কাজে মন বসছে না। আলপথে হাঁটা এক নারীর পায়ের গোড়ালি দেখে বিভ্রমে পড়ে। মনে হয়, বানরটা হেঁটে আসছে।
বারো শ টাকায় মানিকছড়ি থেকে কিনেছিল। কেনার কয়েক মাস পর হঠাৎ বন্য হয়ে যায়। একদিন কড়ইগাছে ওঠে। শিলকড়ই একটু পিচ্ছিল ধরনের। অনেক চেষ্টা করল, নামাতে পারল না। পরে বানর গনায়, খেলা দেখায়Íএ রকম এক যাযাবরকে ডেকে আনতে হলো। সে মদ্দা বানর সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। নামিয়ে দেওয়ার জন্য নিয়েছিল তিন শ টাকা। এর কিছুদিন পর আবার একই ঘটনা। তখন খরচ হয় পাঁচ শ টাকা। শেষে রাগ করে পাঁচ শ টাকায় বিক্রি করে দিল।
এখন বাড়িতে ঢুকলে খালি খালি লাগে। তাই বেশিক্ষণ থাকে না। একা একা হাঁটে। এদিক-ওদিক তাকায়, মানুষের মুখও দেখে। মানুষের মধ্যে কী যেন নেই।
আকাশের এদিক-ওদিক লেগে আছে নানা রং। রং দিয়ে সে একটা বানর বানাতে চেষ্টা করে।
সন্ধ্যা হতে হতে খালেকের মনে আঁধারের রং লাগে। অন্ধকার দিয়েও কি বানর বানাবে!
বানর নাকি অনেক বছর বাঁচে। একটা স্বপ্ন ছিল, বানরটা তার ছেলের হাত হয়ে নাতি-পুতির কাছে যাবে।
ধানের পাতায় জমা শিশিরের মতো নিজেকে কোথাও জমিয়ে রাখতে ইচ্ছা হয়। বিড়ি ধরায়। খুলুক খুলুক কাশে। বিড়ির কারণে কি না কে জানে, কাশি ইদানীং বেড়েছে।
রাতে স্বপ্ন দেখে : ক্ষুব্ধ হয়ে বানর গাছে উঠে গেছে। হৈহৈ করে ডাকে। বানর শোনে না। সে-ও লাফিয়ে উঠে যায়। ওঠার পর দেখে, গাছটা পিচ্ছিল। নামতে পারে না।
দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা চলে যায়। তারা গাছেই থাকে। দিনে বানর চোখ পিটপিট করে তার দিকে তাকিয়েছে, এডাল-ওডাল লাফিয়েছে। সন্ধ্যার পর কাছে আসে। কোলের কাছে এসে হাঁটুতে মাথাটা রাখে। তারপর তাদের ঘুম আসে; অমাবস্যার রাতের মতো ঘুম। সে গাছে দুই ডালের ফাঁকে বসে ঘুমায়। ঘুমের মধ্যে বানর হয়ে যায়। কিন্তু তার চোখ ফোটেনি, তাই কিছু দেখতে পায় না।
সকালে পুকুরের ঘাটে বসে কুলি করে। পানিতে নিজের মুখটা দেখে স্বপ্নের কথা মনে পড়ে। বানরের জন্য শোক উথলে ওঠে। সাঁতরাতে ইচ্ছা করে। ইচ্ছা করে, হালদা নদীতে সাঁতার কাটবে।
সাঁতরে নদী পার হলে দেখে, একটা শটিবন। শটিবনের মাঝে কয়েকটা হিজলগাছ। গাছে বানররা খেলা করছে। সেখানে তার বানরটাকে দেখতে পায়। হাসি ফোটে মুখে। হাসি দেখে বানরটা কিচকিচ করে। এক লাফে কোলে ওঠে। বানরটার মাথায় হাত বোলায়। বানর চোখ বোজে। হয়তো ভাবছে, মুক্তজীবনে যে আনন্দ, মানুষের আদরে সেই আনন্দ নেই।
মানুষ তো নিজেকে নিজের মধ্যে বেঁধে রাখে। যদি ছেড়ে দিত! হয়তো এ রকম চিন্তায় খালেক পুলকিত হয়। ভাবে, নিজেকে আমি ছেড়ে দেব। কোনো নোংরামির মধ্যে থাকব না।
শটিবন থেকে আসার পর খালেকের চোখে-মুখে ঘোর। কাঁধে লুঙ্গি নিয়ে ঘাটে যায়। গোসল করে এসে বউকে বলে, ঘি দিয়ে বেগুন ভাজা করো।
বউ বলে, এখন ভাদ্র মাসে বেগুন কোথায় পাব?
সে কিছু বলে না। বউ তাকে বরবটি ভাজা আর ধোঁয়া ওঠা আউশ চালের ভাত দেয়। গরম গরম খেতে গিয়ে গাল পোড়ে। খেয়ে তাড়াহুড়া করে মিলে চলে যায়।
পরের দিন আবার যায়। সাঁতার কেটে ক্লান্ত। বালিতে চিত হয়ে পড়ে ছিল। নদীর পাড়ে টং দোকান। বলে, রং কড়া এক কাপ চা দাও।
অডা, কডে যঅর?
কাঠমিস্ত্রির প্রশ্নের জবাব খালেক দেয় না। কোথায় যাচ্ছে নিজেও কি জানে! একটু আগে আসার সময় মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রাগ হয়েছিল। অনেকটা নাটকীয় ঢঙে বলেছিল, কালো আর ধলো বাহিরে কেবল...
মেয়েটা ফরসা হতে চায়। রং ফরসা হওয়ার জন্য প্রায় প্রতিদিন ক্রিম মাখে। তবে মুখ ফরসা হয়নি, মেছতায় ভরে গেছে। চামড়ায় কালচে, ছোট ছোট দাগ।
দোকানে চা খেয়ে আপনমনে হাঁটে। সামনেই শটিবন; বিশাল সে বন। শটিপাতা বাতাসে দুলছে। হিজলগাছে কয়েকটি চঞ্চল বানরের চোখ ফুলের মতো ফুটে আছে। সম্ভবত বৈশাখ মাসে শটিফুল ফোটে। ফুলের স্নিগ্ধ গন্ধের কথা ভাবে। ক্লান্তি হাওয়ায় উড়ে যায়, কোমল হয় মন।
কয়েকটা বানর গাছের ডালে বসে ঘুমাচ্ছে। দুটো বানর আর দুটোর গা থেকে পোকা খুঁজছে। পেলেই মুখ দিয়ে নিয়ে নেয়। একটা শিশুর মতো উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে। আরেকটা অনবরত পায়চারি করছে। একবার পূর্ব দিকে, আরেকবার পশ্চিমের দিকে যায়। দুটো বাচ্চা উদাস চোখে দূরের পানে চেয়ে আছে। ওর বানরটা ডালে ডালে লাফাচ্ছে।
খালেক ভাবে, মানুষের মাঝে থেকে মরে যাচ্ছিল। থাকুক, বনেই থাকুক।
কষ্টটা ঢোক গেলার মতো গিলে ফেলে। সে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে। ভাবসমপ্রাসরণ পড়েছে নিশ্চয়। বন্যেরা বনে সুন্দর এ কথা হয়তো মনের গভীরে উঁকি দিয়েছিল।
খালেকের মুখটা একটু লম্বাটে। চঞ্চল ছিল, তাই ছোটকালে সবাই তাকে বানর ডাকত। দুষ্টুমির জন্য বাবা বেশ কয়েকবার শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিল। বলত, তোর জন্য একটা খাঁচা আনব, সেখানে থাকবি।
আজ শটিবনে এসে অনেক কথা মনে পড়ছে। কয়েকটা বানরের নাচন দেখে সেও নাচে। নাচতে নাচতে দেখে, গায়ের রং পাল্টে বাদামি হয়ে যাচ্ছে।
দুনিয়ায় কত কত রং! মনে হয়, সব রং এখন তার হাতের মুঠোয়। রং দিয়ে সে বানর বানায়। সেটা মনের মধ্যে ছেড়ে দেয়। দুষ্টু বানর দৌড়ায়, লাফায় আর তার ভেতরে একটা ইচ্ছা ঘূর্ণিপাক তোলে।
খালেক ভাবে, সে আর ফিরে যাবে না।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT