উপ সম্পাদকীয়

সাহসী অভিযান সফল হোক

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-১০-২০১৯ ইং ০১:১০:৩৩ | সংবাদটি ৫৮ বার পঠিত

স্বাধীনতার পর পর রেডিওতে একটা গান প্রায়ই শুনতে পেতাম আর সেটি হলো ‘মুজিব বাইয়া যাও রে, নির্যাতিত জনগণের নাও, মুজিব বাইয়া যাও রে।’ এই নাওই হলো আওয়ামী লীগ তথা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নৌকা। ’৭০-এর নির্বাচনে মুজিবের নৌকার যাত্রী ছিলেন সাড়ে সাত কোটি। অবশ্য গুটিকয় পাকিপ্রেমীর কথা ভিন্ন। কান্ডারী ছিলেন মুজিব। শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন। পাশে ছিলেন নজরুল-তাজ-কামরুজ্জামান-মনসুর আলী সহ লাখো লাখো মুজিব সৈনিক। উত্তাল সমুদ্রে এগিয়ে চলছে নৌকা। কান্ডারী মুজিব চার পাশের কোন বাঙালিকেই অবিশ্বাস করতে পারেননি। তাঁর অগাধ বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে বেঈমান খোন্দকার মোস্তাক সহ অনেক পাকি দালাল বা এজেন্ট নৌকায় যাত্রী বেশে আরোহন করেছিলো। তারপরও চলতে চলতে শুরু হলো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। পেলাম বিজয় দিবস, স্বাধীনতা, পেলাম গৌরবের পতাকা। নিন্দুকেরা যে যাই বলুক, এটাই সত্য, এটাই ইতিহাস। আর এটাও চরম সত্য যে, ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার করার যারা ব্যর্থ চেষ্টা করে ইতিহাস তাদের ইতিহাসের পাতায় কখনো স্থান দেয় না। যার যা প্রাপ্য তা দিতেও কিন্তু ইতিহাস কৃপণতা করে না। ইতিহাস কাউকে ক্ষমাও করে না।
তারপর এলো বাঙালির জীবনে দুঃখ-বেদনা-কলঙ্কের ইতিহাস পনরই আগস্ট। দেশী-বিদেশী পরাজিত ষড়যন্ত্রকারীরা ডুবিয়ে দিতে চাইলো মুজিবের নৌকা। কিন্তু সেতো ক্ষণকালের। নৌকাকে কান্ডারীবিহীন করতে চাইলো কিন্তু ব্যর্থ হলো। জেগে উঠলো বঙ্গবন্ধুর রক্ত। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা হাল ধরলেন। মুজিবের নৌকায় কান্ডারীর ভূমিকায় শেখ হাসিনা। ডুবে যেতে বসা নৌকার পালে আবারো হাওয়া লাগলো। এগিয়ে চললো নৌকা। এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। বিশ্ব দরবারে বিশেষ মর্যাদার আসন দখল করে নিলো বাংলাদেশ। অনেক বিশ্ব নেতা স্বীকার করে নিলেন দক্ষিণ এশিয়ায় নাকি উন্নয়নের রোল মডেল বাংলাদেশ। প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভারত-পাকিস্তানকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে অনেকেই মনে করেন। আজকের এমনি অবস্থা দেখে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র প্রবক্তা সেই কিসিঞ্জার কি বলছেন জানি না। একাত্তরে তার পিয়ারের পাকিস্তানের ঝুড়ির তলার খবর শুনে তিনি আজ কি বলছেন তিনিই জানেন। পাকিস্তানের আজকের অর্থনৈতিক তথা সর্বপ্রকার অবস্থার কথা জেনে অবশ্যই সুখ নিদ্রায় নিশি যাপন করতে পারেন না। নৌকার পালে হাওয়া লাগলে বা বাংলাদেশ এগিয়ে গেলে ওনাদের তো কষ্ট পাবারই কথা! কিন্তু বাংলাদেশ এগিয়ে যাবেই।
তবে আত্মতুষ্টির কোন অবকাশ নেই। সাম্প্রতিক কালের পত্রপত্রিকার খবরাখবর নানা শঙ্কার জন্ম দেয়। যেন অশনিসংকেত। কান্ডারী হাসিনার নৌকায় যেন কিছু কিছু ইঁদুরের উৎপাত বেড়ে গেছে। ভয় লাগে কখন ওরা নৌকা ফুটো করে দেয়। ঐ ইঁদুরের দলে যে ছদ্মবেশী মোস্তাকের প্রেতাত্মা নেই সেটাই বা নিশ্চিত করে কে বলতে পারে! সাম্প্রতিক কালের দৈনিক কালের কন্ঠ, ভোরের কাগজ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, দেশ রূপান্তর, আমাদের সময় পত্রিকাগুলোতে যে সমস্ত শিরোনাম আসে তাতে শঙ্কা লাগারই কথা।
যেমন-‘শাওন স¤্রাটের ব্যাংক হিসাব তলব’, ‘শামীমের অ্যাকাউন্টে ৩০০ কোটি, খালেদের ১০০ কোটি টাকার বেশী’, ‘বহিরাগতদের হাতেই নিয়ন্ত্রণ যুবলীগের, গডফাদারদের সুবিধা দিয়ে বেপরোয়া ওরা’ ‘ক্লাবে ক্লাবে ক্যাসিনো ও মাদকের প্যাকেজ! রং পাল্টানো ইয়াবা আর ফেনসিডিল সেবনে পৃথক কক্ষ অভিযানে গিয়েও ‘বিশেষ ফোনে’ ফিরে আসতে হয় ডিএনসিকে’, ‘ক্যাসিনো চালিয়েই টাকার কুমির হন লোকমান, ক্যাসিনো থেকে আয় হওয়া অর্ধশত কোটি টাকা অস্ট্রেলিয়ার দুই ব্যাংকে জমান’, ‘ফুওয়াং ক্লাবে মদের ভান্ডার, পুলিশ পায়নি কিছুই, র‌্যাবের অভিযানে উদ্ধার’, ‘স¤্রাটকে নিয়ে লুকোচুরি, শুদ্ধি অভিযান ক্যাসিনো ‘স¤্রাট’ গ্রেফতার কিনা জানা যাবে শিগগির ঃ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’, ‘কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না পুলিশের অপরাধ সংযোগ! অপরাধ কনস্টেবল থেকে এস.আই পর্যায়ে অপরাধ সম্পৃক্ততা বেশি’, অভিযুক্তকে সাজার বদলে শ্রেষ্ঠ পুলিশ সুপার হিসেবে পুরস্কার’, ‘দৈনিক কোটি টাকা পেতেন এনু-রূপন’ ‘হুইপপুত্রের অস্ত্র মহড়ার ভিডিও ভাইরাল’, ‘ঘরে ৫ কোটি টাকা ৮ কেজি সোনা, আ’লীগ নেতা দুই ভাইয়ের বাসায় অভিযান, বিপুল পরিমাণ অর্থ রাখার জায়গা হতো না বলে একটি অংশ সোনায় রূপান্তর করেন এনামুল। সম্প্রতি ইংলিশ রোডের একটি দোকানে অর্ডার দিয়ে বিশেষ ধরনের পাঁচটি সিন্দুক তৈরি করান। যুবলীগ নেতা খালেদ গ্রেফতারের পরই আত্মগোপনে রূপন’, ‘রিমান্ডে খালেদ ভূঁইয়া-জি.কে শামীমের তথ্য বাটোয়ারা যাদের ঘরে ক্যাসিনো কালচার, তালিকায় সাংসদ, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীর নাম, রাজধানীর ২১ ফ্ল্যাটে ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণেও যুবলীগ, খালেদের অস্ত্র ও মাদক মামলার তদন্ত করবে র‌্যাব।’ ‘ক্যাসিনো ইস্যু, মেনন-মাহবুবসহ পাঁচজনকে নোটিশ।’
লিখতে গেলে তালিকা শুধু লম্বাই হবে। তাতে হতাশার মাত্রা শুধু বেড়েই চলবে। যা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো একটু তলিয়ে দেখলেই মনে হচ্ছে জাতিরজনকের নৌকার আজকের কান্ডারীর নৌকায় সুযোগ বুঝে কিছু ইঁদুর ঢুকে পড়েছে। ওরা নৌকাকে ফুটো করতে না পারলেও ওদের বিষাক্ত দাঁত দিয়ে নৌকার পালে ছিদ্র করে ফেলতে পারে। ওরা ছদ্মবেশী ইঁদুর; এঘরে ওঘরে ওদের বিচরণ। আপন আপন স্বার্থ উদ্ধারে ‘জয় বাংলা’ বলে প্রয়োজনে ওরা রাজপথে চিৎকার করে, অন্তরে অন্তরে জিন্দাবাদি নিশান বগলে ধারণ করে। আমি বলি ওরা মোস্তাকী ইঁদুর কেউ বা বলে কাউয়া। বলেন ‘কাউয়া ঢুকেছে দলে’ কিন্তু কে তাদের তাড়াবে? ‘ইঁদুর-কাউয়া’ যে যা-ই বলি না কেন, বঙ্গবন্ধুর নৌকার কান্ডারীর ভাবমূর্তি রক্ষার্থে যে কোন মূল্যে ওদেরকে ধরতে হবেই। নৌকা থেকে নামিয়ে দিতেই হবে। তা না হলে একদিন ওরা আমাদের লাল সবুজের পতাকাকে খামছে ধরবে।
কিন্তু না। ওরা পারবে না। একাত্তরে পারেনি। ২০১৯ এও ওরা পরাভূত হবেই। নির্যাতিত জনগণের নাও এর কান্ডারী আজ খুবই সতর্ক, হুশিয়ার সাবধান। তিনি এদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। চলছে অভিযান। ইঁদুর-কাউয়ার দল ইতিমধ্যেই পালাতে শুরু করেছে। দেশপ্রেমিক রাজনীতিকদের অনেকেই এ অভিযানে সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছেন। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তথা বঙ্গবন্ধুর নৌকার কান্ডারীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানসহ চলমান দুর্নীতি ও অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেওয়া কঠোর অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছেন সেনা প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। অভিযানে সরকারের ভাবমূর্তি বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম পীর চরমোনাই। কিন্তু একি কথা শুনি নৌকার একজন সম্মানিত যাত্রী সাবেক মন্ত্রী মহোদয় রাশেদ খান মেননের মুখে? তিনি বলেছেন-‘সাময়িক অভিযানে দুর্নীতি বন্ধ হয় না।’ প্রশ্ন হলো তিনি কি করে বুঝলেন বা জানলেন এ অভিযান সাময়িক হবে? আমাদের মতো অতি সাধারণ নাগরিকের মনে তো এমন প্রশ্ন জাগতেই পারে-এবারের মন্ত্রী সভায় তিনি যদি অধিষ্ঠিত হতেন তাহলে প্রধানমন্ত্রীর এ অভিযানকে ‘সাময়িক’ বলতে পারতেন?
যাক গে সে কথা। শুরু করেছিলাম সেই গান ‘মুজিব বাইয়া যাও রে, নির্যাতিত জনগণের নাও মুজিব বাইয়া যাও রে।’ নির্যাতিত জনগণের সেই নাও এর কান্ডারী আজ মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা। সব কিছু ভুলে আসুন আমরা চলমান অভিযানকে স্বাগত জানাই। আসুন নির্যাতিত জনগণের নাও এর কান্ডারীর পাশে এসে দাঁড়াই। সফল হোক সাহসী পিতার সাহসী কন্যার সাহসী অভিযান।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা কলামিস্ট সাবেক ব্যাংকার।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • ‘জঙ্গি’ অপবাদ প্রসঙ্গে
  • ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে
  • মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই বদলে দেবে বাংলাদেশ
  • যানজটে লোকসান ও ভোগান্তি
  • বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস
  • আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?
  • আবরার হত্যা ও বুয়েট শিক্ষার্থীদের দশ দফা
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে রেগিং প্রসঙ্গ
  • মানব পাচার মামলা নিষ্পত্তি প্রসঙ্গ
  • মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য উপসাগর ও বৃহৎ শক্তির রাজনীতি
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথ ভর্তি পরীক্ষা
  • হিমশীতল মৃত্যু উপত্যকা
  • আমাদের ও এই গ্যাংরিনাক্রান্ত সমাজকে তুমি ক্ষমা করো আবরার
  • টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ
  • শতবর্ষী রিক্সা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা
  • Developed by: Sparkle IT