উপ সম্পাদকীয় বিনতা দেবী

মহাশক্তি দেবী দুর্গা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-১০-২০১৯ ইং ০০:৫২:৩১ | সংবাদটি ৭০ বার পঠিত

শরতের কাশফুলের শুভ্রতা ও শিউলি ফুলের সুভাস জানান দেয় মায়ের আগমনী। তাই প্রতি বছর শরতের আগমনে প্রতিটি বাঙালি হিন্দু গৃহে শুরু হয়ে যায় মঙ্গল জয়ধ্বনি। প্রতিটি বাঙালি হিন্দুই উৎসবমুখর দিনটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে।
মূর্তি পূজার প্রচলন হয় পৌরাণিক যুগে। রাম-রাবণের যুদ্ধের সময় এ উৎসবের প্রথম অবতারনা হয় বলে শোনা যায়। রাম-রাবণের যুদ্ধে রামচন্দ্র সীতা উদ্ধারের জন্য রাবনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় কামনায় দুুর্গা পূজা করেছিলেন। কুরুক্ষেত্র রনাঙ্গনে অর্জুনের বিজয় নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে শ্রীকৃষ্ণ বলেন- ‘পরাজয়ায় শত্রুণাং দুর্গাস্ত্রোত্রমুদীরয়;’- শত্রুগণের পরাজয়ের জন্য দুর্গাস্তব কর। নির্দেশ মত অর্জুন রথ হতে অবতরন করে কৃতাঞ্জলিপুটে নতজানু হয়ে দুর্গাস্তুতি আরম্ভ করেন। মোট ১৩টি মন্ত্র উচ্চারণ করে অর্জুন দুর্গাস্তব করেছিলেন। সর্বশেষ মন্ত্রটি হলো-
‘তুষ্ঠি: পুষ্টিধৃতিদীপ্তশ্চন্দ্রাদিত্য-বিবর্দ্বিনী।/ ভূতির্ভূতিমতাং সংখ্যে বিক্ষ্যসে সিদ্ধাচারনৈ।’
অর্জুনের স্তবে সন্তুষ্টি হয়ে দেবী আকাশ মার্গে অবস্থান করে বললেন- ‘হে পান্ডব! অচিরেই তুমি শত্রুগণকে জয় করবে’, এই বরদানে দেবী অন্তর্হিতা হলেন।
প্রাচীন কাল হতে ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তা রাজ্যে দু’টি ধারা প্রত্যক্ষ করা যায়, বৈদিক ও তান্ত্রিক। বৈদিক ধারার ভিত্তি বেদ ও উপনিষদ। তান্ত্রিক ধারার ভিত্তি অগনিত তন্ত্রগ্রন্থ। ভগ¦দগীতায় বৈদিক ধারার পূর্ণতা। অপরপক্ষে তান্ত্রিক ধারার চরম পরিণতি সপ্তশতী চন্ডীতে। শক্তিবাদ হলো ভারতীয় তন্ত্র শাস্ত্রের ভিত্তি। ‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা’ দেবী মহাশক্তি সর্বভূতে শক্তিরূপে বিরাজিতা- ইহাই শক্তিবাদের মূলমন্ত্র। শক্তি হতে জগৎপাত, শক্তিতেই জগৎস্থিত, শক্তিতেই জগৎবিলয় প্রাপ্ত। তন্ত্র শাস্ত্রে শক্তিই পরব্রহ্ম।
পরব্রম্মেরই এক ভয়ংকর শক্তির প্রকাশ দেবী দুর্গা রূপে। জাগতিক প্রয়োজনে তিনি কখনও সৌম্য কখনও রূদ্র মূর্তিতে প্রকট হন। অতি সৌম্যমূর্তিও তাঁর অতি ভয়ংকরী মূর্তিও তাঁর। স্নেহময়ী ও ভয়ংকরী এ দু’ভাবের এক অপূর্ব সমন্বয় মহাদেবীতে। চন্ডী গ্রন্থের তিন চরিতে বর্ণিত দেবতা যথাক্রমে মহাকালী, মহালক্ষী ও মহাসরস্বতী। এই তিনের প্রকাশ যে অখন্ড শক্তির মধ্যে তাঁরই নাম চন্ডী। ব্রহ্মের ভয়ংকর রূপই চন্ডিকা। শ্রীনারায়ণের নাভিপদ্ধতিসহ ব্রহ্মা মধুকৈটভ বধার্থ যাঁহার স্তব করেন, তিনি হলেন মহাকালী। তন্ত্র মতে ইনিই সৃষ্টির আদি। মহাকালিকা ঘোর অন্ধকারময়ী। সকল বর্ণ সেখানে সুপ্ত। বর্ণমালা অপ্রকাশিত। পক্ষান্তরে মহালক্ষ্মী অসংখ্য বর্ণ বৈচিত্রে প্রকটিত।
শতবর্ষব্যাপী দেবাসুরের যুদ্ধ চলছিল। দেবতারা পরাভূত। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের দারস্থ হয়ে তাদের করুণ কাহিনী বর্ণনা করেন। শুনে বিষ্ণু ক্রোধে ক্ষেপে ওঠেন। বিষ্ণুর সর্ব অঙ্গ আলোড়িত হয়ে বৈষ্ণবী, শৈবী ও ব্রহ্মাণী শক্তি নির্গত হয়। সমগ্র দেবতা হতে তেজরাশি একত্রীভূত হয়ে এক মহিয়সী নারী মূর্তিতে মহাশক্তি প্রকটিত হলেন। ইনিই তন্ত্রের মহালক্ষ্মী। মহালক্ষ্মীতে বিভিন্ন দেবতা শক্তি একই মাতৃ অঙ্গের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ রূপে পরিদৃষ্ট হয়েছে। এই সম্মিলিত দেবলক্ষ্মীর হাতেই মহিষাসুরের জীবনাবসান হয়। তখন দেবতারা পরমানন্দে মহালক্ষ্মীর স্তুতিপূর্বক এই বলে প্রার্থনা করেন-
‘সংস্মৃতা সংস্মৃতা তাংনো হিংসেথাঃ পরমাপদঃ।’/ যখনই স্মরণ করবো তখনই মহা বিপদ হতে রক্ষা করো।’
চন্ডী উত্তর চরিত্রের অধিষ্টাত্রী দেবী মহাসরস্বতী। ইনি মহাশক্তি চন্ডিকার জ্ঞান শক্তির প্রকট প্রতিমা। মহাসরস্বতী ‘ত্রিজগদাধারভূতা গৌরীদেহসমুদ্ভবা’। ইনিই শুম্ভাদি দৈত্যের বিনাশকারী। পরাক্রমশালী অসুর শুম্ভু, নিশুম্ভকে বধ করার মানসে গৌরী দেহ হতেই তিনি আবির্ভূত হন। মহাকালিকা অন্ধকার বর্ণা। সকল তত্ত্ব সেথায় অব্যক্ত। মহালক্ষ্মী বৈচিত্রময়ী, নিখিল তত্ত্ব সেথায় পরিস্ফুট। মহসরস্বতী শুভ্র জ্যোৎস্না ধবল, যার আবির্ভাবে আমাদের জীবনের ঘোর ঘনঘটা বিলীন হয়ে যায়।
দেবী দুর্গার আবির্ভাব সময়কালে দেবতাকুল যেমন অসুরদের অত্যাচারে জর্জরিত ছিলেন বর্তমান সময়েও বিশ্ববিবেককে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে মনুষ্যরূপী অসুরগণ পৃথিবীর সর্বত্র পাশবিক কর্মকান্ড চালিয়ে মানবাতর নিপীড়নে মেতে উঠেছে। ওদের কর্মকান্ডে মানব সভ্যতা আজ হুমকীর সম্মুখীন। দুর্দ্দমনীয় অসুরিক তান্ডবে মানব সমাজ আজ বিপর্যস্ত। এহেন পরিস্থিতিতে মায়ের শক্তির বিকাশে আসুরিক শক্তির বিনাশই সকলের কাম্য। তাই জগজ্জননীর বিভিন্ন মূর্তিতে প্রকটিত শক্তিরূপের কিঞ্চিৎ বর্ণনার প্রয়াস পেয়েছি। পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে যেখানে যত দ্বন্ধ, তার সমাধান ‘মা সরস্বতীর’ সাক্ষাৎকারে। তাই প্রার্থনা শারদীয় মহাপূজায় আমাদের জীবনে মহাসরস্বতীর আবির্ভাবে বিপদের ঘোর ঘনঘটা যেন কেটে যায়। সকল দেবতার সম্মিলিত শক্তি যেহেতু দেবী দুর্গাতে প্রকাশ- তাইতো মা সর্বশক্তি স্বরূপিনী, দুর্গতিনাশিনী। মায়ের বাহুই বিষ্ণু, চরণই ব্রহ্মা, শ্রীবদনই শিব, কেশে যম, নাসিকায় পবন, নয়নে অগ্নি, ক্রোড়ে ধরনী, সর্বাঙ্গেঁ রবিরশ্মি। শূলীর শূল, চক্রীর চক্র, কালের দ-, ইন্দ্রের বজ্র, সকলই মহাশক্তির শ্রীহস্তে স্থিত। তাই মায়ের চরণে আমাদের প্রার্থনা- মহামাতৃকা তাঁর সর্বশক্তি প্রকাশের মাধ্যমে আসুরিক শক্তির সকল অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার ও আঘাত থেকে আমাদের রক্ষা করুন। অসুর সংহারের পর দেবতাদের উদ্দেশ্যে মায়ের সান্তনা বাণী ছিল-
‘ইত্থং যদা যদা বাধা দানবোত্থা ভবিষ্যতি।/ তদা তাদবতীর্য্যাহং করিষ্যাম্যরিসংক্ষয়ম’।
‘যখনই দানবের অভ্যূদয়ে জীবগণ এরূপ উৎপীড়িত হবে তখনই আবির্ভূতা হয়ে শত্রু নাশ করে শান্তি আনয়ন করবো।’
গীতাতে শ্রীভগবান অনুরূপ সান্তনা দেন এই বলে-‘যখনই ধর্মের গ্লানি ও অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখন সাধুগণের রক্ষণ, দুষ্কৃতির বিনাশ ও ধর্ম সংস্থাপনের জন্য যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।’ ‘সম্ভবামি যুগে যুগে’। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও ভগবতী দূর্গা উভয়ের সান্তনা বাণীতেই- দুর্দশাগ্রস্তদের রক্ষা ও দুষ্কৃতির বিনাশের কথাটি ঘোষিত হয়েছে। মূলত: একই মহাসত্য সর্বত্র ঘোষিত।
মাতৃ আরাধনার এই শুভলগ্নে মা ভগবতীর সান্তনা বাক্য স্মরণ করে কৃপা প্রার্থনা পূর্বক তাঁর রাতুল চরণে প্রণতি জানাই এই বলে-
শরণাগত-দীনার্ত্ত - পরিত্রাণ - পরায়ণে।
সর্ব্বস্যার্ত্তিহরে দেবী নারায়ণি নমোহস্ত তে।।
লেখক : কবি।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • ‘জঙ্গি’ অপবাদ প্রসঙ্গে
  • ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে
  • মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই বদলে দেবে বাংলাদেশ
  • যানজটে লোকসান ও ভোগান্তি
  • বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস
  • আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?
  • আবরার হত্যা ও বুয়েট শিক্ষার্থীদের দশ দফা
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে রেগিং প্রসঙ্গ
  • মানব পাচার মামলা নিষ্পত্তি প্রসঙ্গ
  • মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য উপসাগর ও বৃহৎ শক্তির রাজনীতি
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথ ভর্তি পরীক্ষা
  • হিমশীতল মৃত্যু উপত্যকা
  • আমাদের ও এই গ্যাংরিনাক্রান্ত সমাজকে তুমি ক্ষমা করো আবরার
  • টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ
  • শতবর্ষী রিক্সা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা
  • Developed by: Sparkle IT