উপ সম্পাদকীয়

নদীদূষণ বন্ধে সচেতন হোন

শামীম শিকদার প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-১০-২০১৯ ইং ০০:৫৭:২৮ | সংবাদটি ১২৬ বার পঠিত

বাংলাদেশ হাজার নদীর দেশ। তবে বাংলাদেশে ঠিক কত নদী আছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের কাছে নেই। কোন কোন নদী থেকে খালের উৎপন্ন হয়েছে, এ হিসাব করলে বাংলাদেশকে হাজার নদীর দেশ বলা যেতে পারে। যশোর, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালীতে রয়েছে অজস্র নদী। কোনো কোনো নদীর বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন নাম। বাংলাদেশের প্রধান নদী পাঁচটিÑ পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, পশুর ও কর্ণফুলী। এরপর আসে তিস্তা, গড়াই, মধুমতী, রূপসা, আড়িয়াল খাঁ, কুমার, আত্রাই, কীর্তনখোলা, বিষখালী ইত্যাদি নদনদীর নাম। এসব নদীর মধ্যে কোনটা বড় কোনটা ছোট বলা কঠিন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ দেশে ১ হাজার ২০০ নদনদীর নাম পাওয়া যেত; কিন্তু এখন ২৩০টির নাম আছে। যদিও বাস্তবে সবগুলো সচল নেই। নদীকে ঘিরেই বিশ্বের প্রতিটি শহর, বন্দর, গঞ্জ, বাজার প্রভৃতি গড়ে উঠেছে। কিন্তু প্রতিনিয়তই বাড়ছে নদীদূষণ। নদীগুলো ধ্বংসে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সব ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত এক হয়েছে। অধিক হারে নদীকে দূষিত করা হচ্ছে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন করপোরেট ব্যবসায়ীরা। আমাদের পানির উৎস মূলত তিনটি। আন্তর্জাতিক নদীপ্রবাহ, বৃষ্টি ও ভূগর্ভস্থ পানি। এর মধ্যে নদীপ্রবাহের অবদান দুই-তৃতীয়াংশের বেশি (৭৬.৫ শতাংশ), বাকি দুটোর অবদান যথাক্রমে ২৩ শতাংশ ও ১.৫ শতাংশ। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ২৫টি নদী সহসাই শুকিয়ে যাবে, পাশাপাশি চলছে ক্ষমতার প্রভাবে নদী, খাল ও জলাশয় দখলের উন্মত্ততা। ভূগর্ভস্থ পানির কথা ধরলে বর্তমানে দেশের ৯০ শতাংশ সেচ কাজ পরিচালিত অগভীর নলকূপের সাহায্যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের মাধ্যমে। ৩৫ বছরে পানির স্তর নেমে গেছে ৪ ফুট। কয়েক কোটি মানুষ আর্সেনিক ঝুঁঁকির মধ্যে বসবাস করছে। নদীগুলোর পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সমুদ্রের নোনা পানি ১৮০ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করছে। পৃথিবীর সুপেয় পানির সংকট তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছে। তাই অনেকের মতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে এ সুপেয় পানির জন্য। বাংলাদেশ সুপেয় পানির এক অমূল্য ভান্ডার। পৃথিবীর মোট সুপেয় পানির ১৭ শতাংশ আছে বাংলাদেশে। এর যথাযথ ব্যবহার করে আমরা নিজেদের অনেক উন্নতি করতে পারি। অথচ এ সম্পদ ব্যবহারে কোনো উদ্যোগ বা পরিকল্পনা শাসক দলগুলোর নেই। নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করতে এবং পানিসম্পদকে রক্ষা করতে না পারলে আমাদের অবস্থা হবে হরাধনের ‘দশটি ছেলে’ গল্পের মতো। আমাদের নদীগুলো দিয়ে বছরে কী পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয়, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কত, পানিপ্রবাহ ও নদীনালা, খালবিল, হাওর-বাঁওড়ের ধারণক্ষমতার ভারসাম্য কতটুকু, এ পানির কতটুকু সাগরে যায়, আর কতটুকু সেচ-গৃহস্থালি ও শিল্পকারখানায় ব্যবহার করি; নৌপরিবহনসহ মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও বিকাশের জন্য নদীর নাব্য কতটুকু প্রয়োজন, নদীভাঙন, বন্যা ও খরা রোধ করার জন্য কী করণীয়, ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ কত, নদীগুলো দিয়ে কী পরিমাণ পলি আসে এবং সেগুলোর কী গতি হয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সমন্বিত সমীক্ষার মাধ্যমে যে মহাপরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল আজ পর্যন্ত তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যেটা হচ্ছে তা অন্ধের হাতি দেখার মতো। তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতির জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত ঢাকা শহরের পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকার কারণে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ঘনমিটারেরও বেশি পয়োবর্জ্যরে প্রায় সবটাই উন্মুক্ত খাল, নদী, নর্দমা বেয়ে অপরিশোধিত অবস্থায় বুড়িগঙ্গায় এসে পড়ছে। টঙ্গী, বাড্ডা প্রভৃতি অঞ্চলের বর্জ্য চলে যাচ্ছে বালু ও তুরাগে। বুড়িগঙ্গার দূষণমাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নদীর পাশ দিয়ে হাঁটা যায় না। মাত্রাতিরিক্ত এ দূষণের ফলে রাজধানীর জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ। মানুষের স্বাস্থ্য এখন হুমকির সম্মুখীন। দূষণের ফলে ভূ-উপরিভাগের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা যে পরিমাণ পানি সরবরাহ করছে, তার শতকরা ৮৬ ভাগই ভূগর্ভস্থ স্তর থেকে তোলা হচ্ছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর দুই থেকে তিন মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় নগরবাসীর জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। অন্যদিকে নদীতীর বা আশপাশের বসবাসকারী লোকজন গোসল, রান্নাবান্নাসহ বিভিন্ন কাজে নদীর পানি ব্যবহার করায় ডায়রিয়া, কলেরাসহ নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। নদী রক্ষায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সমন্বয়ের আবশ্যকতা বোধ করছি। বলাবাহুল্য, নদী দখল ও দূষণ রোধে সরাসরি দায়িত্ব প্রায় ১৫টি মন্ত্রণালয়ের। পরিবেশ অধিদপ্তরের কাজের আওতায় রয়েছে নদীর পানিদূষণ রোধ করা। প্রতিদিন ক্রোমিয়াম, পারদ, ক্লোরিন, নানা ধরনের এসি দস্তা, নিকেল, সিসা, ফসফোজিপসাম, ক্যাডমিয়াম, লোগাম অ্যালকালি মিশ্রিত বর্জ্যরে কারণে নদীগুলো প্রায় মাছশূন্য হয়ে গেছে। লাখ লাখ মানুষ পরিবেশ দূষণের শিকার হয়ে জন্ডিস, ডায়রিয়া, উচ্চরক্তচাপ, মূত্রনালি ও কিডনি, চর্মরোগসহ ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হতে শুরু করেছে। এসব নদীর পানি ব্যবহারকারী বেশিরভাগ মানুষই চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ‘নদী দূষণ বন্ধে করণীয়’ শীর্ষক এক সভায় ওয়াসা দাবি করেছে, বুড়িগঙ্গায় ওয়াসার বর্জ্য যায় না। যা যায়, তা ঢাকাবাসীর অবৈধ সংযোগের কারণে।
পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও উপযোগী আইনি কাঠামোর প্রয়োজন। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নিজ নিজ এলাকার দূষণ ও পরিবেশসংক্রান্ত সমস্যাগুলোর তালিকা প্রণয়ন করতে হবে ও শিল্পবর্জ্য দ্বারা ভূপৃষ্ঠের পানির দূষণ রোধের উদ্দেশ্যে জরুরি ভিত্তিতে নদীতীরবর্তী সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি তৃণমূল পর্যায়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নিজ নিজ এলাকায় পরিবেশ ও নদী রক্ষার লক্ষ্যে সংগঠিত ও সংঘবদ্ধ হতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • প্রয়োজন সচেতনতা ও ধর্মীয় অনুশাসন
  • চোরাকারবার বন্ধে চাই কৌশল
  • জাফলং ভ্যালি বোর্ডিং স্কুল
  • একটি বর্ণনাতীত ভাষ্য
  • Developed by: Sparkle IT